Home সায়েন্স ফিকশন নীল বরণ ছেলেটা -আহমেদ বায়েজীদ

নীল বরণ ছেলেটা -আহমেদ বায়েজীদ

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আকাশটা ক্রমশ ছাইবর্ণ ধারণ করছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে নামবে অন্ধকার। পথের পাশ ধরে হাঁটছে একটি ছেলে। বয়স বারো-তেরোর বেশি নয়। উৎসুক চোখে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। মনে হলো কিছু একটা খুঁজছে। এই সময়টায় সাধারণত বাইরে বের হয় না কেউ। দুপুরের আগেই সব কাজ সেরে ঘরে ঢোকে। এখানে এটাই নিয়ম। সূর্য ওঠার অনেক আগেই যেমন এখানে দিন শুরু হয়। তেমনি রাতও শুরু হয় দুপুর গড়ালেই। দুপুরের পর থেকেই আকাশ ছাইবর্ণ ধারণ করতে শুরু করে। চারদিক অন্ধকার হতে শুরু করে। আরো কয়েক ঘণ্টা আকাশে সূর্য দেখা গেলেও সেটি আলো ছড়ায় না। এভাবেই দিন শেষ হয় এখানে।
আর দিনের শুরুটাও হয় মাঝরাতের পর থেকেই। আকাশে সূর্য দেখা দেওয়ার অনেক আগ থেকেই কালো আকাশ ধূসর রং ধারণ করে। চারদিক পরিষ্কার হয়ে যায়। আলো ফোটার অনেক পর ধীরে ধীরে সূর্য দেখা দেয় আকাশে। বিজ্ঞানীরা বলেন, সূর্যের সাথে গ্রহের কৌণিক অবস্থানের কারণেই নাকি এমন অদ্ভুত দিন-রাত এই গ্রহে। সূর্য দেখার আগেই যেমন চারদিক আলো হয়ে যায়, আবার সূর্য ডোবার আগেই নেমে আসে অন্ধকার।
অন্ধকার নেমে আসার পর এখানে বাইরে থাকা নিষিদ্ধ। ধীরে ধীরে কালো হয়ে আসা সূর্যটা যে রশ্মি ছড়ায় সেটা চোখের জন্য ক্ষতিকর। যে কারণে দুপুরের পর কেউ বাইরে বের হয় না। বহু শতাব্দী ধরেই এর সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে বাসিন্দারা। তবে ইদানীং অবশ্য অনেকে বাইরে বের হওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছে। বিজ্ঞানীরা এক ধরনের বিশেষ হেলমেট আবিষ্কার করেছেন, যেটি পরে বাইরে বের হলে চোখের কোন ক্ষতি হবে না; কিন্তু সেই হেলমেট এখনো সবার হাতে পৌঁছেনি। অনেক ব্যয়বহুল এই হেলমেট এখন পর্যন্ত গুটি কয়েক বিজ্ঞানী আর কিছু উচ্চপদস্থ লোকেরাই পেয়েছে। এই সময়ে তাই ছেলেটার বাইরে হেঁটে বেড়ানো অবাক করার মতোই। তবে অবাক হওয়ার তো আশপাশে কেউ নেই! সবাই ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। দিনের আলো ফোটার আগে আর সে দরজা খুলবে না।
হাঁটতে হাঁটতে একটা মাঠের কাছে পৌঁছলো ছেলেটা। মাঠের মাঝখানে গোলাকৃতির একটা বস্তু। মনে মনে ভাবলো, আমি যেটা খুঁজছি সেটাই কি এটা? জবাব পেল না মনের কাছ থেকে। আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ওদিকে অন্ধকার হয়ে এসেছে। দ্রুত ফিরতে হবে, এই সময়টাতে বাইরে ঘোরাফেরা চোখের জন্য ক্ষতিকর। কর্মকর্তাদের কেউ টের পেলেও ঝামেলা হবে; কিন্তু অদ্ভুত বস্তুটা কী সেটা না দেখেও ফিরে যেতে মন চাইছে না। মনে মনে ভাবলো ইস! অন্ধকার সহ্য করার মতো হেলমেট যে কবে সবার হাতে দিতে পারবেন বিজ্ঞানীরা? তাহলে আজ আর এত টেনশন হতো না।
ঘরে ঢোকার আগ মুহূর্তে ওই জিনিসটা দেখতে পেয়েছে ছেলেটা। এমন অদ্ভুত বস্তু আগে কখনো দেখেনি। আকাশ থেকে উড়ে এসেছে গোল বস্তুটা। কী ওটা? দেখার কৌতূহলে ছুটে এসেছে মাঠের কাছে। শুনেছে আকাশে উড়বে এমন যন্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা, তবে কি সেটা ইতোমধ্যেই আবিষ্কার করে ফেলেছেন! কিন্তু তাহলে তো শুনতে পেত। এই গ্রহে ভালো যেকোনো খবর দ্রুত সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়। অবশ্য গোপন করার মতো বিষয় এখানে খুব বেশি নেইও। মাত্র ১ লক্ষ বর্গমাইলের ছোট্ট গ্রহটাতে সবাই খুব মিলেমিশে বাস করে, সবাই কর্মকর্তাদের কথা মেনে চলে। আর বিরোধ, শত্রুতা না থাকলে গোপন করার মতো তথ্য খুব বেশি থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক।
এর মধ্যে গোলাকার বস্তুটার দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে এলো কয়েকজন লোক। তবে তাদের চিনতে পারলো না ছেলেটা। ওরা কেমন যেন অদ্ভুত পোশাক পরে আছে। ওরা কারা? আমাদের বিজ্ঞানী? … এর বেশি আর কিছু ভাবতে পারলো না ছেলেটা। অচেতন হয়ে পড়ে গেল মাটিতে।

স্পেসশিপ জুড়ে আনন্দ। রীতিমতো পার্টি শুরু হয়ে গেছে। ভরহীন যানটিতে ভাসতে ভাসতে নভোচারীরা একে অন্যকে অভিবাদন জানাচ্ছেন। ক্যাপ্টেন বললেন, কন্ট্রোল রুম থেকে মেসেজ এসেছে। সারা পৃথিবী আমাদের অভিযানের সফলতার খবর পেয়ে আনন্দ করছে।
‘আর ওই ছেলেটা কী করছে?’ জানতে চাইলো একজন নভোচারী।
‘ওকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। লম্বা ঘুম হবে ওর এখন। অন্তত এক মাস ঘুমাবে সে। এই সময়টা তার শরীরের কোষগুলো পরীক্ষা করবে আমাদের স্পেসশিপের সুপার কম্পিউটার। তারপরও এখানে ওর বেঁচে থাকার জন্য যা যা করা দরকার সেটি করা হবে। আমাদের পরিবেশে টিকতে না পারলে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হবে।’ এক নিঃশ^াসে কথা বলে থামলেন ক্যাপ্টেন।
‘কেমন দেখতে ছেলেটা? তাড়াহুড়োয় ভালো করে দেখাও হয়নি’ বললো আরেকজন পাশ থেকে।
‘অনেকটা আমাদের মতোই। সবচেয়ে বড়ো পার্থক্যটি হচ্ছে গায়ের রঙে। এই গ্রহের সবার গায়ের রঙ হালকা নীল। সবাই প্রায় একই বর্ণের। মাথার চুলগুলো সোনালি। আর চোখের ভেতরের সবটুকু সাদা, আমাদের চোখের মতো কালো রঙের মনি নেই।’ আবার বললেন ক্যাপ্টেন।
অন্যপাশ থেকে আরেকজন ভেসে ভেসে একেবারে ক্যাপ্টেনের সামনে চলে এসে বললো- ‘অবশেষে পৃথিবীর মানুষের কয়েকশো বছরের সাধনা সফলতার মুখ দেখলো আমাদের মাধ্যমে। আমরাও কিন্তু ইতিহাসে ঢুকে গেলাম, ক্যাপ্টেন’। তার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস।
‘তা তো বটেই’। বললেন ক্যাপ্টেন। ‘এখন আমাদের কাজ হচ্ছে এই ছেলেটাকে ভালোভাবে বিজ্ঞানীদের হাতে তুলে দেওয়া। তারা ওর ওপর গবেষণা চালাবে। তাহলেই মানুষ জানতে পারবে ভিন গ্রহের এই প্রাণীদের সম্পর্কে সব কিছু। তবে ছেলেটা পৃথিবীর আবহাওয়ায় বেঁচে থাকতে পারবে কি না সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
‘তাহলে ওকে ধরে আনার কী দরকার ছিল, ক্যাপ্টেন। এই গ্রহের বাসিন্দারা তো সবাই শান্তশিষ্ট। অযথা ছেলেটাকে পৃথিবীতে নিয়ে ঝুঁকিতে ফেলার কী দরকার? বললো আরেক নভোচারী।
ক্যাপ্টেন বললেন, ‘সবই কৌতুহল, বুঝলে! এই কৌতূহলের কারণেই কয়েকশো বছরের চেষ্টার পর মানুষ সৌরজগতের বাইরের এই ছোট্ট গ্রহটাতে প্রাণের অস্তিত্ব টের পেয়েছে। এরপর সেখানে পৌঁছানোর রাস্তা খুঁজে বের করেছে। এখন তারা এই গ্রহের বাসিন্দাদের ওপর গবেষণা চালিয়ে তাদের দেহের গঠন ও জীবনপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেষ্টা করবে। আর সেই কৌতূহলের কারণেই এই গ্রহের এক নিরীহ বাসিন্দাকে আমরা ধরে নিয়ে যাচ্ছি পৃথিবীতে। জানি না ছেলেটা সেখানে বাঁচতে পারবে কি না।’
কথাগুলো বলে একটু থামলেন ক্যাপ্টেন। তার কণ্ঠটা ধরে আসে শেষ দিকে। কয়েক সেকেন্ড বিরতির পর আবার বললেন, ‘নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে; কিন্তু দায়িত্বের কাছে তো মানবিকতার স্থান নেই। তবে নীল বর্ণের ছেলেটার জন্য খারাপ লাগছে। জানি না ওর ভাগ্যে কী আছে?

SHARE

Leave a Reply