Home গল্প রম্যগল্প দৈত্যের আস্তানায় রাজকুমার -তমসুর হোসেন

দৈত্যের আস্তানায় রাজকুমার -তমসুর হোসেন

অনেক দিন আগের কথা। পশ্চিমের কিরকুক রাজ্যে ছিল এক প্রবীণ রাজা। যেমন বিশাল ছিল তার রাজত্ব তেমনই বিপুল ছিল তার ধন দৌলত। সে রাজ্যের রাজকুমার ছিল বিদ্যাবুদ্ধি এবং রণনৈপুণ্যে অতুলনীয়। রাজ শিক্ষালয়ে মনোযোগ সহকারে সে লেখাপড়া করত। রাজ্যের জ্ঞানী পণ্ডিতেরা অত্যন্ত যতেœর সাথে তার লেখাপড়া পরিচালনা করত। রাজ কবি নিয়ামত জঙ্গ হৃদয় মন ঢেলে তাকে শের শেখাত।
সন্ধ্যার পর রাজকুমারকে নিয়ে নিয়ামত জঙ্গ রুটিন মাফিক শেরমহলে বসতেন। তখন তানপুরার মিষ্টি আওয়াজের সাথে রাজকুমারের কোমল কণ্ঠের সুর সারাটা রাজপ্রাসাদ মুখরিত করে তুলত। নিয়ামত জঙ্গ এর দরাজ কণ্ঠের সাথে যখন রাজকুমার সুর মিলাত তখন শাহে কিরকুক বড়ো অস্থির হয়ে উঠতেন। রাজকর্ম ছেড়ে তিনি তখন মন্ত্রীকে নিয়ে শেরমহলে তন্ময় হয়ে বসে থাকতেন। শের শেখানো শেষ হলে শুরু হত অস্ত্রশিক্ষার ক্লাস। রাজ সিপাহসালারের কাছে রাজকুমার তরবারি চালনা এবং ঘোড়দৌড়ের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত।
একদিন বিকেল বেলা বাগানে বসে রাজকুমার একা একা শের গাচ্ছিল। এমন সময় একটা মতির ডালিম তার সামনে পড়ল। ডালিম দেখে সে খুব অবাক হলো। এমন সুন্দর ফল সে জীবনে কোনোদিন দেখেনি। ফলের গায়ে সিজিস্তানি আতরের সুবাস। তার খোসা মরকত মনির মতো উজ্জ্বল। রাজকুমার গাছের ডালে এক সবুজ তোতাও দেখল। তার ঠোঁট সোনার পাতে মোড়ানো। আর পালকে জবরজদ নীলার আস্তরণ। তোতা রাজকুমারের শেরের প্রশংসা করল। তারপর বলতে লাগল, “শুনুন রাজকুমার তাহসিন, এখান থেকে দক্ষিণ দিকে একটা যাদুর পাহাড় আছে। সেই পাহাড়ে বাস করে আজখাস নামের এক দৈত্য। তান্ত্রিক গাছপালা দিয়ে সে বিশাল এক অরণ্য তৈরি করেছে। তার মধ্যে আছে অগণিত মায়াবী রুম্মান তরু। পাপিষ্ঠ আত্মা দিয়ে বানানো হাজার হাজার নাখাল বৃক্ষে গান গায় ঘুমঘুম পাখি। অরণ্যের প্রবেশপথে আছে বিশাল এক জয়তুন গাছ। সেই গাছের কিম্ভূত ফুলের দুর্গন্ধে নাড়িভুঁড়ি বের হতে চায়। সেই জয়তুনের ফুল থেকে প্রতিদিন জন্ম নেয় একশ একটা কাল মহিষ। গাছের তলে শুয়ে থাকা অন্ধ আজদাহা সেই কাল মহিষ গিলে খেয়ে বেঁচে থাকে। আজদাহার মাথার রক্তিম মুকুটে আছে এক বিষাক্ত সবুজ কেউটে। এই কেউটেই হলো দৈত্যের জীবন। আজদাহাটা অন্ধ হলেও ডাকিনী বিদ্যা দিয়ে সে সবকিছু অনুভব করতে পারে। যার জন্য ওই পাহাড়ের সীমানায় কেউ প্রবেশ করতে পারে না। আজখাস দৈত্য দারফুন রাজার কন্যাকে যাদুর পাহাড়ে বন্দি করে রেখেছে। তার মধ্যে সে এমন বদ স্বভাব সৃষ্টি করছে যা দিয়ে মানুষ অতি সহজে বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। রাজকন্যার মোহিনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একদিন সে সব রাজ্য জয় করে ফেলবে। আগামী বসন্তে রাজকন্যা স্বইচ্ছায় আজখাস দৈত্যকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নেবে। দেখুন রাজকুমার, এখনও সময় আছে। চেষ্টা করলে রাজকন্যাকে এ বদআমল থেকে ফেরানো যাবে। আমি অনেক চিন্তা করে দেখেছি আপনিই এ কাজের জন্য উপযুক্ত। অন্য কারও পক্ষে রাজকন্যা গুল-ই-নূরকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। আপনার শেরের মনোহর ঝঙ্কারে আজদাহা ঘুমিয়ে পড়বে। জয়তুন গাছ থেকে সহসা অসংখ্য ফুল ঝরবে। তা থেকে বেসুমার ক্ষিপ্ত কাল মহিষ বের হয়ে শিঙের গুঁতোয় আজদাহাকে মেরে ফেলবে। তারা ধারালো ক্ষুরের আঘাতে রুম্মান এবং নাখাল গাছও মিছমার করে দেবে। আপনার কাজ হলো মৃত আজদাহার মুকুট থেকে কাল কেউটে ধরে খতম করে ফেলা। বিষাক্ত কেউটের সাথে খবিস দৈত্যও পৃথিবী থেকে চিরতরে নিপাত হয়ে যাবে।
নিয়ামত জঙ্গকে তোতার সব কথা জানাল রাজকুমার। তিনি যথাসময়ে রাজা মহাশয়কে সব কথা সবিস্তারে ওয়াকিবহাল করলেন। রাজ জ্যোতির্বিদরা অনেক আগ থেকেই প্রবীণ রাজাকে এসব বিষয়ে ধারণা দিয়েছিল। যার জন্য রাজা মহাশয় অশুভ দৈত্যের এই হীন চক্রান্ত নস্যাতের জন্য যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে পরামর্শ সভা ডাকলেন। পরামর্শ অনুযায়ী একশত অশ্বারোহী ও দুইশত পদাতিক সৈন্য নিয়ে রাজকুমার এবং নিয়ামত জঙ্গ যাদুর পাহাড়ের দিকে রওনা হলো। একটানা সাতদিন চলার পর তারা সেখানে পৌঁছল। অরণ্যের সীমানায় মানুষের অস্তিত্ব টের পেয়ে আজদাহা বিকট শব্দে চিৎকার করতে লাগল। দূর থেকে আজদাহাকে দেখতে পেল রাজকুমার। তার মুখ থেকে বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া এবং আগুনের শিখা। আজদাহা রাজ সৈন্যবাহিনীর দিকে তীব্র বেগে ছুটে আসতে লাগল।
তখন রাজকবি নিয়ামত জঙ্গ নিপুণ হাতে তানপুরায় সুর তুলল। রাজকুমার তার সুরেলা কণ্ঠে মাতাল করা শের গেয়ে পাহাড় অরণ্য বৃক্ষলতা কাঁপিয়ে দিলো। তোতার কথা অনুযায়ী কাজ হলো। একটু পরে সোনালি পাখায় ভর করে বাতাসের ঢেউয়ে ভেসে কোথা থেকে যেন উড়ে এল তোতা। একটা গাছের ডালে বসে তোতা রাজকুমারকে সব কথা স্মরণ করে দিতে লাগল। রাজকুমারের সুরের মূর্ছনায় জয়তুন গাছে আশ্চর্যজনক ভাবে রাশি রাশি ফুল ফুটে তা থেকে লালচোখ কাল মহিষ বের হয়ে আজদাহার দিকে শিঙ উঁচিয়ে ছুটতে লাগল। আজদাহার মুখ থেকে বের হওয়া আগুনের শিখা তাদের গতিরোধ করতে পারল না। মহিষেরা উন্মাদের মতো আজদাহাকে আঘাতের পর আঘাত হেনে মেরে ফেলল। আজদাহাকে মেরে তারা ছুটল রুম্মান এবং নাখাল বৃক্ষের দিকে। এই অবসরে আজদাহার মুকুট থেকে বের হয়ে কেউটেটা ভয়ানক মূর্তি ধারণ করে পাহাড়ের গর্তে পালানোর চেষ্টা করল। শের গাওয়ার কারণে রাজকুমার তা লক্ষই করেনি। তোতা সৈন্যদের নির্দেশ দিলো কেউটেকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে। কেউটের ভেতর লুকানো দৈত্যের প্রতিক্রিয়ায় সে অত্যন্ত মারমুখি হয়ে উঠল। সে প্রতি মুহূর্তে তার রূপ বদলাতে শুরু করল। যার জন্য সৈন্যরা ভয় পেয়ে পিছু হটতে লাগল। তোতা সৈন্যদের কার্যকলাপ দেখছিল। এসব সৈন্যকে রাজা কী জন্য বেতন দিয়ে পালন করে সে কথা ভেবে হাসল তোতা। সে ঠোঁট দিয়ে একটা গাছের ফল ছিঁড়ে কেউটের দিকে নিক্ষেপ করল। ফলটা গায়ে আঘাত করতেই কেউটে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কোমরে রক্ষিত খাপ থেকে শাণিত তরবারি খুলে এক আঘাতেই কেউটেকে মেরে ফেলল রাজকুমার তাহসিন।
কেউটের মৃত্যুর সময় আলখাস দৈত্য আপন মূর্তি জাহির করে গগনবিদারী চিৎকারে আগুনে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আলখাস দৈত্য মরে গেলে শাহজাদী গুল-ই-নূরকে পাহাড়ের নিভৃত বন্দিশালা থেকে মুক্ত করা হলো। অত্যন্ত আনন্দিত মনে বীর বেশে রাজকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে রাজকুমার ফিরে এল দেশে। সারা দেশ জুড়ে খুশির বন্যা বয়ে যেতে লাগল। যাদুর পাহাড় থেকে দৈত্যকে বধ করে দারফুন রাজার একমাত্র কন্যার উদ্ধার কাহিনি বাতাসের বেগে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। প্রজারা ঘরে ঘরে আনন্দ করতে লাগল।
শাহে কিরকুকের আমন্ত্রণে কন্যাকে গ্রহণ করার জন্য বিশাল লোক লস্কর নিয়ে কিরকুক রাজ্যে এল দারফুন রাজা এবং রানি। হারিয়ে যাওয়া কন্যাকে ফিরে পেয়ে রাজা এবং রানি আনন্দের আতিশয্যে বিহ্বল হয়ে পড়ল। রাজকুমার তাহসিনের সাথে কন্যাকে শাদি দেওয়ার কথা মনস্থ করে ফেলল তারা। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে শাহে কিরকুকের কাছে অন্তরের বাসনা তুলে ধরল দারফুন রাজা।
রাজকন্যা গুল-ই-নুরের সাথে অত্যন্ত ধুমধামে বিয়ে হলো রাজকুমার তাহসিনের। যুদ্ধ সংঘাতে লিপ্ত প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে জন্ম নিলো অটুট সৌহার্দ্যরে বন্ধন।

SHARE

Leave a Reply