Home গল্প অনুবাদ গল্প সামা সঙ্গীত মূল : জালালুদ্দিন রুমি অনুবাদ : নাসির মাহমুদ

সামা সঙ্গীত মূল : জালালুদ্দিন রুমি অনুবাদ : নাসির মাহমুদ

প্রাচীনকালের ঘটনা। ইরানে তখন দরবেশদের আনাগোনা ছিল অহরহ একটি ব্যাপার। দরবেশদের জন্য তখন ইরানের বিভিন্ন এলাকায় খানকা বা সুফিদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা ছিল। সুফিরা যেহেতু শহর-গ্রাম সর্বত্র ঘুরে বেড়াতো তাই শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও এরকম খানকার ব্যবস্থা ছিল। না, কেবল দরবেশ বা সুফিদের জন্যই নয় বরং অচেনা-অপরিচিত মুসাফিরদের জন্যও এই ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তাই খানকাগুলো হয়ে উঠেছিল অনেকটা অতিথিশালার মতো। সুফি-দরবেশরা এইরকম অতিথিশালায় নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারতেন বেশ কিছুদিন। তাদের জন্য থাকা-খাওয়ার নিরাপদ ব্যবস্থা ছিল এখানে।
এইসব খানকায় ঐতিহ্যগতভাবে একটা নিয়ম প্রচলিত ছিল। নিয়মটা হলো খানকায় আগে থেকে যারা অবস্থান করবে, তারা নতুন অতিথিদের স্বাগত বা অভ্যর্থনা জানাবে। তাদের আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা করবে। কখন কী প্রয়োজন হয় তার দেখভাল করবে।
যথারীতি একদিন এক দরবেশ সবেমাত্র খানকায় এলো। তার গাধাটাকে বেঁধে রাখলো খোঁয়াড়ে। তাকে তার খাবার এবং পানি খেতে দিয়ে খানকার খাদেমের কাছে বুঝিয়ে দিলো। ঐ খাদেম এই দায়িত্বেই নিয়োজিত ছিল।
কিন্তু ঐ খানকায় আগে থেকে যেসব সুফি-দরবেশ অবস্থান করছিলেন প্রচলিত নিয়ম এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী নতুন আগন্তুক সুফির অভ্যর্থনার দায়িত্ব তাদের ওপরেই বর্তায়। খানকায় অবস্থানরত সুফিরা ছিল খুবই নিঃস্ব ধরনের। তাই তারা যখন নবাগত দরবেশকে খানকায় প্রবেশ করতে দেখতে পেলো, কোনোরকম অজুহাত ছাড়াই তারা একত্রিত হলো এবং গাধার মালিকের অগোচরে তারা গাধাটিকে গোপনে বিক্রি করে ফেললো। গাধা বিক্রির পয়সা দিয়ে তারা ঐ রাতে মরমি সঙ্গীতের আসরের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সামগ্রী কিনলো, এমনকি রাতের খাবার-দাবারসহ রাত্রি জাগরণের জন্য যা যা লাগে সবকিছুর আয়োজন করলো।
আসলে কখনো কখনো এমন এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় যে কিছুই করার থাকে না। মানুষ অনেকটা নিরুপায় হয়ে প্রয়োজনের খাতিরে এ ধরনের কাজ করতে বাধ্য হয়। জরুরি প্রয়োজনে মৃত মানুষের মাংস খাওয়াও যেন হালাল। এটা অবশ্য কথার কথা। এরকম এক জরুরি প্রয়োজনেই খানকায় অবস্থানরত দরবেশরা নবাগত দরবেশের গাধাটিকে বিক্রি করে রাতের আপ্যায়নসহ অতিথি অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করলো। খানকার ভেতরের পরিবেশটা কেমন যেন উৎসব মুখর হয়ে উঠলো। সবার মধ্যেই আনন্দ-উল্লাসের ভাব বিরাজ করছিল।
নবাগত সুফি-দরবেশ ভীষণ ক্লান্ত ছিল। তার গাধাটিকে যে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে তা সে জানতো না। অন্যান্য দরবেশরা যখন তাকে ব্যাপক আদর-আপ্যায়ন করতে শুরু করলো, সে ভীষণ খুশি হয়ে গেল এবং দরবেশদের সাথে মিশে গেল। তার যখন যা লাগে সবকিছুর যোগান দিতে লাগলো দরবেশরা। নবাগত সুফি এরকম মেহমানদারি বা অতিথি আপ্যায়ন দেখে মনে মনে বললো: আজ রাতটা তো দেখছি আনন্দের পসরা সাজানো রাত। তাই আনন্দ-খুশিতেই রাতটা কাটানো উচিত। অতিথিপরায়ণতা দেখে মুসাফির দরবেশ সবকিছু ভুলে অর্থাৎ উদাসীনভাবে দরবেশদের সমাবেশে এসে যোগ দিলো।
কেউ ব্যস্ত তার হাত-পা টিপে দিতে
কেউবা ব্যস্ত চাহিদার যোগান দিতে
কেউবা করে ভিড় থাকা-পরার খোঁজে
কেউ দেয় চুমু হাতে-মুখে চোখ বুজে
দরবেশরা খাবার খেল এবং সামার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে দিল। সামা এক ধরনের মরমি সঙ্গীত যা তালে তালে গাওয়া হয়। সামার আসরে ঢুকলেই শোনা যাবে যন্ত্রসংগীতের বিট। বিটের তালে তালে সবাই একসাথে এক ধরনের নাচের মতো দোলে। অবশ্য যে যার মতো নীরবে দোলে তাল ঠিক রেখে। সেইসাথে মরমি সঙ্গীত শিল্পী গান গায়। এই দোলের কারণে অনেকেই সামাকে নাচ বলে থাকেন। যদিও প্রচলিত নৃত্যকলার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
গায়ক যখন তার বাদ্য বাজনা শেষ করলো তখন বেজে উঠলো আরেকটু সুর। সেই সুরের তালে সবাই মিলে গাইতে শুরু করলো আরেকটি নতুন মরমি সঙ্গীত, যে সঙ্গীতের ভেতর একটি পঙক্তি দরবেশরা বারবার গাচ্ছিলো। পঙক্তিটি হলো খার বারাফত ও খার বারাফত অর্থাৎ গাধা গেল গাধা গেল। এই পঙক্তিটি নবাগত দরবেশ অন্য সবার সাথে এতো মজা করে এবং গলা ছেড়ে গাচ্ছিলো যে উপস্থিত দরবেশদের সবাই আরো বেশি উত্তেজিত এবং অনুপ্রাণিত হলো। তারা সবাই সমস্বরে নবাগত দরবেশের সাথে ঐ পঙক্তিটি গাইতে লাগলো। কোরাসের উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে উঠলো দরবেশদের সামার আসর। নবাগত দরবেশও আনন্দের সাথে খার বারাফত ও খার বারাফত বারবার গাইলো। তার গাধার ঘটনাটা তখনো সে জানতো না। সে জন্য খানকার দরবেশদের সাথে সমান তালে আনন্দের জোয়ারে ভাসলো।
অবশেষে রাত কেটে সকাল হলো। খানকার দরবেশরা একেকজন একেক দিকে যেতে লাগলো। নবাগত দরবেশও যাবার জন্য প্রস্তুত হলো। কিন্তু যখন সে খোঁয়াড়ে গেল তার গাধার সন্ধানে, গাধাকে দেখতে পেল না। মনে মনে ভাবলো হয়তো বা খানকার খাদেম গাধাকে চরাতে বাইরে নিয়ে গেছে। কিন্তু খাদেম এলো, তার সাথে গাধা নেই। নবাগত দরবেশ তাকে জিজ্ঞেস করলো : আমার গাধা কোথায়? খাদেম শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখে হাসি তুলে বললো ‘খার বারাফত ও খার বারাফত’। দরবেশ বললো আমি আমার গাধাকে তোমার কাছে সোপর্দ করেছি, তুমি ছিলে আমার আমানত রক্ষাকারী। তোমার উচিত এখন আমার আমানত ফেরত দেওয়া। খানকায় কেউ নেই। এর দায়িত্ব এখন তোমার ওপরেই ন্যস্ত। আমি তাই তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করবো।
খাদেম বললো-দরবেশরা সবাই মিলে খোঁয়াড়ে এসে গাধাটিকে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। আমার কী করার ছিল? দরবেশদের দলকে আমি একা কী করে এ কাজ থেকে ফেরাতাম? দরবেশ বললো : তুমি তোমার আমানতদারির দায়িত্ব পালন করতে। আমাকে জানাতে পারতে যে ওরা এ কাজ করতে যাচ্ছে। তাহলে আমি নিজেই তাদেরকে এ কাজ থেকে ফেরাবার সুযোগ পেতাম।
খাদেম বললো : আমি তোমাকে বহুবার খবর দিতে চেয়েছি। কিন্তু যতবারই এসেছি, ততবারই দেখলাম তুমি নিজেই আনন্দ-উল্লাসের সাথে চিৎকার করে গাইছো : খার বারাফত ও খার বারাফত। আমি তাই ভেবেছি তোমার অবগতিতেই হয়তো এ কাজ হয়ে থাকবে এবং এতে তোমার আপত্তি নেই। দরবেশ বললো : আমি তো তাদের সুরে সুর মিলিয়েছি মাত্র। আসলে অন্ধভাবে অনুকরণ করার কারণেই মাথায় আমার বাজ পড়েছে।

SHARE

Leave a Reply