Home গল্প দেয়াল ভাঙার পণ -হারুন ইবনে শাহাদাত

দেয়াল ভাঙার পণ -হারুন ইবনে শাহাদাত

ভাঙতে ভাঙতে গড়া শিখতে হবে। ভেঙে পড়লে চলবে না। শফিকুর এ কথা ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছে। তাই মাঠ থেকে ফিরেই বসেছে বই খাতা নিয়ে। ভাঙারচর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস থ্রিতে পড়ে শফিক। শিক্ষকরা বলেন, ‘ছেলেটার মাথা ভালো। লেখা-পড়া করলে ভালো করবে।’
শফিকের বাবা রমজান শেখ একথা বুঝতে চান না। তার এক কথা, ‘গরিবের আবার লেহা পড়া। একদিন কাজে না গেলে খাওয়া জুটে না, তা গো আবার লেহা-পড়া।’
শফিক গলা ছেড়ে পড়ছে, ‘আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর দেশ, বাংলাদেশ। গ্রীষমো, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত…।’ ইদ্রিস স্যার ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওর পড়ার শব্দ স্যারের কানে যায়। তিনি শফিকের কাছে গিয়ে বসেন। শফিককে বলেন, ‘বাবা আবার পড় তো।’ শফিক আবার পড়া শুরু করে, ‘আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর দেশ, বাংলাদেশ। গ্রীষমো…।’ স্যার শফিককে থামিয়ে বলেন, ‘গ্রীষমো নয়, গ্রীষ্ম পড়তে হবে, এখানে বাংলা ভাষার উচ্চারণ নীতি অনুসারে ম উচ্চারণ করতে হয় না।’
শফিক অবাক হয়। লেখা আছে অথচ উচ্চারণ করতে হয় না। বিষয়টি স্যার বুঝতে পারেন। তিনি বলেন, ‘অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাংলা ভাষায় আরো অনেক এমন শব্দ আছে : যেমন হ্রদ শব্দটি বানান করলে হরদ হয়, কিন্তু উচ্চারণ রদ, রশ্মি বানান করলে হয় রশমি কিন্তু উচ্চারণ রশশি।’
এবার শফিক প্রশ্ন করে, ‘স্যার অন্য ভাষায় যেমন ইংরেজিতেও কি এমন শব্দ আছে?’
ইদ্রিস স্যার ক্লাস থ্রিতে পড়া তার এই খুদে ছাত্রের জানার আগ্রহ দেখে অবাক হন। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আছে যেমন: ঐড়ঁৎ, ঐড়হড়ৎ বানান অনুসারে উচ্চারণ হাওয়ার, হনার হলেও পড়তে হয় আওয়ার, অনার, যখন ওপরের ক্লাসে পড়বে তখন আরো অনেক এমন শব্দ পাবে।’ এরপর থেকে স্যার মাঝে মাঝেই শফিককে পড়াতে আসেন।
শফিকের বাবা বিষয়টিকে খুব ভালো চোখে দেখেন না। তিনি মনে মনে ভাবেন, ‘ছেলে লেখাপড়া করা মানে কামাইয়ের লোক কমা আর খরচ বাড়া। তার আরো দুইটা ছেলে ও একটা মেয়ে আছে। মেয়ে সবার বড়ো। তাকে বিয়ে দিতে হবে। বিয়ে মানেই টাকা আর টাকা। ছেলেদের মধ্যে শফিক সবার বড়ো। সে যদি স্কুলে যায়। তার একার পক্ষে সংসারের খরচ জোগানো কষ্টকর। এই সহজ কথাটা কেন যে মাস্টার সাব বুঝেন না। তাদের এক কথা ছেলের মাথা ভালো। সে লেখাপড়া করলে বড়ো কিছু করতে পারবে। তখন আর তাদের কষ্ট থাকবে না। মাস্টার সাহেবের এই কথাগুলো মনে হলেই তার মাথা গরম হয়ে যায়। অনেক বড়ো হবে, বড়ো হওয়া কি মুখের কথা। খাওয়া-দাওয়া ভালো না পেলে ছেলের মাথা খুলবে কী করে। এই চরের মাটিতে ভালো ফসল হয় না। আর প্রাইমারি স্কুলের পড়া শেষে পড়তে হবে হাইস্কুল। গ্রামে কোনো হাইস্কুল নেই। সেই শহরে যেতে হবে। সেখানে টাকা দিয়ে পড়তে হয়। স্কুল ড্রেস, জুতা, আরও কত কী লাগে। পড়া শেষ করলেই কি সবাই চাকরি পায়? সেখানেও টাকার খেলা।’


মসজিদে আজান হচ্ছে, আসসালাতু খাইরুম মিনান না উম…। শফিক দ্রুত ঘুম থেকে ওঠে অজু করে মসজিদে যায়। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়। তার বাবাও নামাজ শেষ করে বের হয়েছেন। তিনি তার হাত ধরে বলেন, ‘চল, গম খেত পাহারা দিতে যেতে হবে। সকাল হলেই শালিকগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে খেতে গিইয়া বইসে। সব গম খাইয়া ফেলে।’
শফিক কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সাহস পায় না। এখন কিছু বললেই তাকে শাস্তি পেতে হবে। ম-লদের জমি বর্গা নিয়ে তার বাবা গম বীজ ফেলেছেন। শালিকরা সব বীজ গম খেয়ে ফেললে সর্বনাশ। পরের বছর ম-লরা তো জমি বর্গা দিবেই না। অন্যরাও দিবে না। বলবে ওরা আবাদ করতে পারে না। তাই কোনো কথা না বাড়িয়ে, বাবার সাথে সাথে চলে।
বাবা ওকে গম ক্ষেতে দাঁড় করিয়ে বলেন, ‘এখানে বসে বসে পাহারা দেও। একটা গমও যেন শালিক না খায়। আমি রমিজারে দিয়া তোমার খাবার আর একটা ছালা পাঠাইয়া দিতেছি। ছালায় বইসা বইসা পাহারা দিবা দুপুর পর্যন্ত। দুপুরের পর আর শালিক আসবে না। এভাবে কম পক্ষে ১৫ দিন পাহারা দিতে হইবো। চারা উঠলে তবেই শান্তি।’
শফিকের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল বাবাকে বলতে একটা বইও যেন পাঠিয়ে দেন। কিন্তু সাহসে কুলায় না। কিছুক্ষণ পর ওর রমিজা বুবু আসে খাবার নিয়ে। সাথে একটা বইও এনেছে। শফিক খুব খুশি হয়।
সে বলে: ‘বুবু বইও আনছো। খুব ভালো করছো। বাবারে বলতে সাহস পাই নাই।’
রমিজা বলে: ‘আমি জানি আমার ভাইডা বই ছাড়া বেশি সময় থাকলে পাগলা হইয়া যাবো।’ ভাইকে নাস্তা করিয়ে রমিজা চলে যায়। শফিক গম ক্ষেত পাহারা দেয় আর বই পড়ে। কিন্তু ওর মনটা পড়ে আছে স্কুলে। সে পণ করে যে কোনভাবেই হোক তাকে বড়ো হতে হবে। আর লেখাপড়া ছাড়া বড়ো হওয়া যাবে না। এই চরের মাটিতে পড়ে থাকলে তার মনের আশা কোনো দিন পূরণ হবে না। মনে মনে ভাবে সে এখান থেকে পালিয়ে যাবে। তারপর শহরের কোনো স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা করবে। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে মা-বাবা, ছোটো ভাই আর ওর রমিজা আপুর দুঃখী দুঃখী মুখ। পালিয়ে গেলে ওরা সবাই কষ্ট পাবে। আর সে তো একা বড়ো হলেই চলবে না, ছোটো ভাইরা যদি পড়ালেখা না করে, ওদেরকেও পরের জমি চাষ করতে হবে, নয় তো দিনমজুরি করতে হবে। বংশ পরম্পরায় ওদের এভাবেই চলছে। কিন্তু শফিক তো চায় এই পরম্পরার দেয়াল ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে। সে তার সিদ্ধান্ত বদলায়।
: শ-ফি-ক, শ-ফি-ক, চিৎকার শুনে সে পিছনে তাকায়। একটা বেত হাতে ইদ্রিস স্যার আর সাথে ওর ক্লাসের কয়েক জন বন্ধু এদিকেই আসছে। কিন্তু কেন? কিছুক্ষণ পর স্যার ওর সামনে বেত উঁচিয়ে বলেন: স্কুল বাদ দিয়ে তুমি এখানে কী করছো।’
শফিক ভয়ে ভয়ে বলে: ‘স্যার, গম ক্ষেত পাহারা দিচ্ছি।’
ইদ্রিস স্যার বলেন: ‘তোমার বাবা কোথায়? তার সাথে আমার কথা আছে।’
শফিক বলে : ‘স্যার, উনি মনে হয় ম-লের ক্ষেতে হাল দিতে গেছেন।’
স্যার জানতে চান: ‘কোন দিকে
শফিক হাত উঁচু করে বলে: ‘ঐ যে। পশ্চিম চরে, স্যার।’ ইদ্রিস স্যার আর কথা না বাড়িয়ে পশ্চিম চরের দিকে রওনা দেন।


স্যারকে দেখে রমজান শেখের মাথা গরম হলেও প্রকাশ করেন না।
আমতা আমতা করে বলেন: ‘স্যার স্কুল ফ্লাাইয়া এই সময় চরে কেনে?’
স্যার তার কথার উত্তর না দিয়ে বলেন: ‘শফিককে স্কুলে যেতে দেননি কেন?’
রমজান শেখ মনের রাগ মনে চাপা দিয়ে শরীরে ঘাম মুছতে মুছতে বলেন : ‘আগেই তো কইছি আমরা গরিব মানুষ। বাবা দাদা চৌদ্দ গোষ্ঠীর কেউ লেহা-পড়া করে নাই।’
স্যার শান্ত গলায় বলেন: ‘আপনারে কতবার আর বলবো, শফিকের মাথাটা ভালো। ওকে সুযোগ দিলে অনেক বড়ো কিছু করতে পারবে। আপনার চৌদ্দ-গোষ্ঠীর মুখ উজ্জ্বল করবে।’
রমজান বলেন: ‘লেহাপড়া করতে অনেক টেহা লাগে অত টেহা কই পামু, স্যার। গম খেতটা ১৫ দিন দেইখ্ ানা রাখলে খামু কী?’
স্যার বলেন: ‘গম খেত স্কুলের সময় আপনারা কেউ দেখবেন, স্কুলের পর শফিক দেখবে। আর টাকার চিন্তা করেন কেন? উপবৃত্তি আছে না? ওর অন্য ভাইরাও পাবে। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাইলে শহরের স্কুলে ফ্রি পড়তে পারবে, টাকাও পাবে।’
উপবৃত্তির টাকার কথা শুনে রমজান শেখ আস্তে আস্তে শান্ত হন। তিনি বলেন: ঠিক আছে স্যার কাল থাইকা ওরে আর সাথে ওর দুই ছোটো ভাইরেও স্কুলে পাঠাইয়া দিমু।’
শফিকরা তিন ভাই এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। শফিক নিজের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ভাইদের পড়ায়। রমজান শেখের সংসারের অভাব কাটে না। তিনি এখনো ম-লদের জমি চাষ আর দিনমজুরি করেন। তারপরও এখন স্বপ্ন দেখতে শিখেছেন। তার স্বপ্ন ছেলেরা পড়ালেখা শেখে অনেক বড়ো হবে। তার বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে। ক্লাস থ্রি থেকে ফার্স্ট হয়ে ফোর ওঠে শফিক। পরের বছর ফাইভেও উঠে ফার্স্ট হয়ে। শিক্ষকদের আশা ভাঙারচর স্কুল থেকে এবার একজন হলেও প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ভালো করবে। স্কুলের নাম ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে। হেড স্যার শফিকের পড়ালেখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন। শফিকের সাথে আরো পাঁচ ছাত্রকে আলাদা করে স্কুল ছুটির পর শিক্ষকরা পড়ান। হেড স্যার ওদের খাবার দাবারের দিকে খেয়াল রাখেন। তাদের পরিশ্রম বৃথা যায় না। বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সবাই খুশি। এ বছর ভাঙারচর স্কুল থেকে দুইজন ছাত্র বৃত্তি পেয়েছে। শফিক ওদের উপজেলায় ফার্স্ট হয়েছে।
এখন শফিককে ভাঙারচর ছাড়তে হবে। শহরের স্কুলে যেতে হবে। রমজান শেখ খুশি হলেও ভরসা পায় না। তার ভয় কাটে না। সে শুধু ভাবে সত্যি কি তার শফিক বংশ পরম্পরার দেয়াল ভাঙতে পারবে?

SHARE

Leave a Reply