Home গল্প ভুল ভাঙলো -মহিউদ্দিন আকবর

ভুল ভাঙলো -মহিউদ্দিন আকবর

আমাদের পাড়ার হাসান সাহেব। পবিত্র জুমার জামাত শেষে ফুরফুরে মন নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। অন্যান্য দিনের চেয়ে তার ভেতরটা আজ বেশ চনমনে। বিশেষ করে মসজিদে আজ খতিব সাহেব যে খুতবা দিয়েছেন- তা হাসান সাহেবের খুব মনে ধরেছে। খুতবার আলোকে নিজেকে মহান রাব্বুল আলামিনের প্রিয় বান্দাদের একজন ভাবতে পারছেন। বুকের ভেতরটায় কেমন একটা সুখ সুখ অনুভব তাকে প্রশান্ত করে তুলেছে।
কিন্তু এই আনন্দ অনুভব নিমেষেই কর্পূরের মতো হাওয়ায় মিলে গেলো, যখন তিনি তাদের বাসার ছোট্ট কর্মী সুজনের মুখটা বেজার দেখলেন। অমনি সুজনকে কাছ টেনে নিয়ে জানতে চাইলেন- কিরে মুখটাকে অমন পেঁচার মতো করে রেখেছিস কেন? কী হয়েছে তোর?
হাসান সাহেবের প্রশ্ন শুনে সুজন মুখটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললো- কিচ্ছু অয় নাই সাব, এমনেই ইকটু মনটা খারাপ লাগতাছে।
সুজনের কথায় সন্তুষ্ট হতে পারলেন না হাসান সাহেব। তিনি আলতো করে সুজনের মুখটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ধরে মায়াবী কণ্ঠে বললেন- উঁহু! এমনি এমনি মন খারাপ বললে তো আমি কিছুতেই মেনে নেবো না। তোকে কি আমরা কম আদর করি। আমার ছেলে-মেয়েদের যে কাপড় কিনে দেই তোকেও তা-ই দিচ্ছি। ডাইনিং টেবিলে সবার সাথে বসে খাবার খেতে দিচ্ছি। খেলাধুলা করার সুযোগ পাচ্ছিস। নাইট স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি। শুধু কি তাই? তোকে আমরা ভালোবাসি বলে তোর ওই ‘পচামিয়া’ নামটা বদল করে আদর মেখে ‘সুজন’ রেখেছি। চিপস-চানাচুর; যখন যা মন চায় কিনে দিচ্ছি। তারপরও তোর মন খারাপ থাকবে কেন রে?
সুজন আবারও মুখ ঘুরিয়ে বলে- না সাব, আমার কিচ্ছু অয় নাই।
হাসান সাহেব আবারও সুজনের মুখটা নিজের দিকে তুলে ধরে ওর চোখে চোখ রেখে বলেন- হুম! বুঝেছি। নিশ্চয় তোর মা-বাবার কথা মনে পড়েছে। বাড়িতে যাবি?
সুজন নিজেকে সামলে নিয়ে বলে- না সাব। এমনেই মনটায় খারাপ লাগতাছে।
হঠাৎ করেই হাসান সাহেবের নজর চলে যায় সুজনের বাম গালের দিকে। কাঁচা হলদেটে রঙের ফুটফুটে গালটিতে চার-চারটি আঙুলের দাগ ফুটে আছে লালে-লাল বর্ণ নিয়ে। দেখেই আঁতকে ওঠেন তিনি। প্রায় চিৎকার করে বলেন- কিরে তোর এ অবস্থা করলো কে? এমনভাবে কে মেরেছে তোকে?
এবার আর সুজন নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে। হাসান সাহেবের হাত জড়িয়ে ধরে বলে- সাব আস্তে কন, বিবিসাব শুনলে রাগ করবো।
সুজনের জবাব শুনে হাসান সাহেব প্রায় হুংকার ছাড়েন- কইগো শিহাবের মা! তুমি এটা কী করেছো। এভাবে কাউকে মারতে হয়?
তার হুংকার শুনে মিসেস হাসানও প্রায় কুঁদে আসেন- মারবো না মানে, জানো তুমি! ও আমাদের কি সর্বনাশ করেছে?
– সর্বনাশ! সেটা আবার কীভাবে করলো?
– আর বলো না, চাকর-বাকর বেশি মাথায় তুলতে নেই। তুমি বেশি বেশি প্রশ্রয় দিয়ে একেবারে সর্বনাশ করেছো। কাজের ছেলে তো নয়- যেন নিজের ছেলে। যত্তসব!
– আহা, অত কথা বলো না তো। আগে আসল কথাটাই বলো।
– তা-ই তো বলছি। আজ রাতে মেহমান আসবে বলে ওকে কয়েকটা প্লেট সুন্দর করে ধুয়ে রাখতে বলেছিলাম। শো-কেস থেকে প্লেট নামাতে গিয়ে ও আমার তিন-তিনটা প্লেট ভেঙে খান খান করে দিয়েছে। আমার এতো শখের ডিনার সেটটা শেষ করে দিলো!
– ও এই কথা! তাতে সর্বনাশের কী হলো?
– সর্বনাশ হয়নি মানে! মহা সর্বনাশ হয়েছে। আমি সোজাসাপটা বলে দিলাম, এই ছেলেকে আর আমি বাসায় রাখতে পারবো না। ওর মা-বাবাকে খবর দাও। এসে ওকে নিয়ে যাক।
– সে তো ভালো কথা। ওকে রাখতে না চাও, রাখবে না। কিন্তু যেভাবে মেরেছো তা তো সুন্নতের খেলাপ হয়েছে। এতে আমাদের রব এবং তাঁর রাসূল সা. অসন্তুষ্ট হয়েছেন। সে কথা কি একবারও ভাবলে না? এমনিতেই আমরা ওকে দিয়ে কতো শ্রমের কাজ করাচ্ছি।
– উঁহ! দরদ একেবারে উছলে উঠছে দেখছি। বলি কোনো বাসার কাজের ছেলে কি ওর মতো পরিবারের সদস্য হয়ে আদর-আপ্যায়নে থাকে? আবার কি না সন্ধ্যাবেলা নাইটস্কুলে পড়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
– আরে বোকা! এটা তো আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা কুরআন-সুন্নাহ অনুসারে ওকে লালন-পালনের সুযোগ পাচ্ছি। সে সাথে ওকে দিয়ে ফুটফরমায়েশও খাটাতে পারছি।
– তাই বলে আমার সর্বনাশ করবে, আর আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকবো, অ্যাঁ!
মিসেস হাসানের ঝাঁঝ মেশানো কথা শুনেও হাসান সাহেব মুচকি হেসে বলেন- হ্যাঁ, তোমাকে ধৈর্য ধারণ করতেই হবে। জানো শিহাবের মা, আজকের খুতবায় খতিব সাহেব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন- বাসার কাজের লোক হচ্ছে আমাদের আমানত। ওদের ভালো-মন্দের দিকে খেয়াল রাখা সুন্নাত। এ সুন্নাত মেনে চললে রাব্বুল আলামিন সন্তুষ্ট থাকেন।
– বলি হ্যাঁ, এমন সর্বনাশ করলেও?
– আরে এটাতো একটা এক্সিডেন্ট। সুজন কি ইচ্ছে করে প্লেটগুলো ভেঙেছে? ছোটোমানুষ, হয় তো টাল সামলাতে পারেনি। হাত ফসকে গেছে। একবার ভেবে দেখো তো, এই অপরাধটা যদি আমাদের কোনো সন্তান করতো- তাহলে কি তাকে এভাবে মারতে পারতে। না, না, মোটেও এভাবে মারতে পারতে না। মায়া লেগে যেত। এমনকি আমিও যদি হাত তুলতে যেতাম- তাহলে তুমি অবশ্যই বাধা দিতে চেষ্টা করতে। আচ্ছা, যদি সুজনের মা অথবা বাবা এখানে উপস্থিত থাকতো তাহলেও বোধ হয় এমন নিষ্ঠুরভাবে তুমি ওকে চড় মারতে পারতে না। দেখো তো ছোট্ট সোনামাখা গালটায় তোমার আঙুলের দাগগুলো কেমন ফুটে আছে!
এতক্ষণে মিসেস হাসানের টনক নড়ে। তিনি তাড়াতাড়ি সুজনকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে ওর ছোট্ট মুখটা নিজের দিকে তুলে ধরে আঁতকে ওঠেন- হায় হায় তোর একি অবস্থা! আহারে সোনা-মানিক, আমি বুঝতে পারিনি চড়টা এমনভাবে লাগবে। নারে বাপু তোর গায়ে আর হাত তুলবো না। আমাকে তুই মাফ করে দিস।
মিসেস হাসানের কথা শেষ হতেই আট বছর বয়সের ছোট্ট সুজন হাউমাউ করে তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে- বিবিসাব আমি ইচ্ছা কইরা প্লেট ভাঙি নাই। টান লাইগা পইড়া গিয়া ভাঙছে। আপনে আমারে মাফ কইরা দেন। আমি আর কোনোদিন কোনোকিছু ভাঙুম না।
সুজনের আকুতি শুনে মিসেস হাসানের দুটি চোখ ছলছলিয়ে ওঠে। তিনি নিজেকে আর সামলাতে পারেন না। সুজনের মুখটাকে নিজের দিকে তুলে ধরে আবেগের সাথে বলতে থাকেন- সুজন, সোনা বাপ আমার! আজ আমার ভুল ভেঙেছে রে বাপ!! তোকে মেরে আমি আর পাপ কামাতে চাই না, বাবা। এখন থেকে তুই সব কাজ ধীরে-সুস্থে করবি। তাহলে আর কোনো জিনিস নষ্টও হবে না, আর তোকে সাজাও দিতে হবে না…।

SHARE

Leave a Reply