Home স্বপ্নমুখর জীবন পরিশ্রম উন্নতির চাবিকাঠি -আমিনুল ইসলাম ফারুক

পরিশ্রম উন্নতির চাবিকাঠি -আমিনুল ইসলাম ফারুক

ইংরেজিতে এই প্রবাদটি হয়তো তোমরা জেনে থাকবে – ‘Industry is the key to success’ অর্থাৎ পরিশ্রম সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। ছোটবেলায় পড়াশোনায় ভালো না হলে বড়ো হয়ে যে আর ভালো হবে না, এ কথার কোনো মানে নেই। ক্রমাগত চেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যে কেউ যেকোনো বয়সে নিজেকে বদলাতে পারে। একজন মানুষের জীবনে সাফল্য পেতে হলে চেষ্টা এবং পরিশ্রম কেমন হওয়া উচিত, আজ শুধু তার কয়েকটি উদাহরণ বিশ্লেষণ করব।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের এক চার্চে বিয়ে অনুষ্ঠানের জমকালো আয়োজন চলছে। কনে পক্ষের লোকজন উৎসবমুখর পরিবেশে কনেকে নিয়ে আগেই উপস্থিত হয়েছেন। পাত্র পক্ষেরও অনেকেই উপস্থিত। শুধু বর এখনো এসে পৌঁছায়নি। বিয়ের নির্ধারিত সময়ও অনেক আগেই অতিবাহিত হয়েছে। সকলেই অধীর উৎকণ্ঠায় বর আসার অপেক্ষা করছেন। কিন্তু বরের দেখা নেই। চার্চের পাদ্রিও অধৈর্য হয়ে উঠলেন। কনের বাবা পাত্রের এক বন্ধুকে ডেকে রাগত স্বরে বললেন, ‘কী ব্যাপার, এখনো তো তোমার বন্ধু এলো না? পথে বিপদ হলো নাতো আবার?
বন্ধু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলেন, দু’চার জায়গায় খোঁজ করলেন কিন্তু কোথাও বরের দেখা নেই। হঠাৎ মনে হলো, একবার ল্যাবরেটরিতে গিয়ে খোঁজ করে দেখি। যে কাজপাগল মানুষ, বিয়ের কথা হয়তো বেমালুম ভুলে গেছে।
যেই ভাবা সেই কাজ ল্যাবরেটরিতে গিয়ে হাজির হলেন বন্ধু। টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে নিবিড় মনে গবেষণা করে চলছেন বর। চারপাশে কী হচ্ছে তার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপও নেই। এমনকি বন্ধুর পায়ের শব্দেও তার তন্ময়তা ভাঙল না। আর সহ্য করতে না পেরে বন্ধু এবার রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল, আজ তোর বিয়ে। চার্চে সবাই অপেক্ষা করছেন। তোর উপস্থিতি না দেখে কনে পক্ষের লোকজন বিমর্ষ হয়ে পড়ছেন। আর তুই এখানে বসে বসে কাজ করছিস? এবার বর বন্ধুর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল- ‘বিয়ের চেয়ে আমার এই গবেষণা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া বিয়ের কথা আমার মনে আছে। কাজটা শেষ করার আগে কীভাবে বিয়ের আসরে যাই?’ বিজ্ঞানের গবেষণায় উৎসর্গকৃত এই মহান মনীষীর নাম লুই পাস্তুর (১৮২২-১৮৯৫)।
বাবা জোসেফ পাস্তুর প্রথম জীবনে ছিলেন নেপোলিয়নের (১৭৬৯-১৮২১) সেনাবাহিনীর সেনাধ্যক্ষ। ওয়ার্টার ল্যুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের শোচনীয় পরাজয়ের পর যোসেফ নিজ গ্রামে এসে ট্যানারিতে কাজ নেন। বাবার সামান্য আয়ে কষ্টেসৃষ্টে কোনো রকম পরিবার চলত। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। সেই স্বপ্নকে বৃথা যেতে দেননি লুই পাস্তুর।
পাস্তুর বিজ্ঞানের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করলেও বিনিময়ে যৎ সামান্যই পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। একবার তৃতীয় নেপোলিয়ন তাঁর সামান্য পারিশ্রমিকের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘আপনি এই সামান্য অর্থ নিয়ে এত বেশি পরিশ্রম কেন করেন?’ জবাবে পাস্তুর বলেন, ‘একজন বিজ্ঞানী কখনও ব্যক্তি স্বার্থের জন্য কাজ করেন না। মানবকল্যাণই আমার জীবনের লক্ষ্য।’ তিনি কীটপতঙ্গ এবং জীবনদানের বহু ঔষধ আবিষ্কার করেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কার হলো হাইড্রোফিয়া বা জলাতঙ্ক রোগ নিরাময়ের ঔষধ।
আত্মভোলা পাস্তুরের জীবনে মোট পাঁচটি বিয়ের আসর ভেঙে গিয়েছিল শুধু তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার জন্য। যেদিন মেরির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হলো, সেদিনও প্রায় বিয়ের কথা ভুলতে বসেছিলেন। স্ত্রী মেরি ছিলেন পাস্তুরের যোগ্য সহচরী। স্বামীর সব কাজে আজীবন সাহায্য করে গেছেন ছায়ার মতো। পাস্তুর সম্বন্ধে তৃতীয় নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘পাস্তুর ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান।’
টমাস আলভা এডিসনের (১৮৪৭-১৯৩১) নাম শুনেছো নিশ্চয়ই। এডিসন কোনো প্রতিভায় বিশ্বাস করতেন না। প্রায়ই তিনি বলতেন, ‘প্রতিভা এক ভাগ প্রেরণা, বাকি নিরানব্বই ভাগই পরিশ্রম ও সাধনা। এটাই প্রতিভার মূল কথা। এডিসনের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ফিলামেন্টের বাল্ব। আজকে আমরা যে লাইট থেকে আলো পাই, এটা তাঁরই আবিষ্কার। এছাড়াও তিনি টেলিফোন, গ্রামোফোন এবং টেপ রেকর্ডেরও আবিষ্কারক। এডিসন এই বাল্ব আবিষ্কার করতে গিয়ে কমবেশি দশ হাজার বার ব্যর্থ হন। তারপর মুখ দেখেন সফলতার। তিনি কয়েকবার ব্যর্থ হয়েই যদি হাল ছেড়ে দিতেন; চুপচাপ ঘরে বসে থাকতেন, তাহলে হয়তো আজও আমাদের পক্ষে এই লাইট জ্বালানো সম্ভব ছিল না।
এডিসন প্রথম যে বাল্বটি আবিষ্কার করেছিলেন, সেটি প্রায় চল্লিশ ঘণ্টা জ্বলেছিল। দিনটি ছিল ২ অক্টোবর ১৮৭৯ সাল। এডিসন সেদিন কল্পনাও করতে পারেননি, তাঁর সৃষ্ট আলো পৃথিবীর সব অন্ধকার দূর করে আলোর জোছনা এনে দেবে।
একবার তাঁর সম্বন্ধে একটি পত্রিকায় বলা হয়েছিল, ‘এডিসন এক মহান বিজ্ঞানী।’ এডিসন প্রবন্ধটি পড়ে বললেন, ‘আমি বিজ্ঞানী নই, আমি একজন উদ্ভাবক। বিজ্ঞানী হচ্ছেন মাইকেল ফ্যারাডে। তিনি অর্থের জন্য কাজ করেন না; কিন্তু আমি করি। প্রতিটি কাজকেই আমি বিচার করি তার অর্থমূল্য দিয়ে। যে কাজে উপযুক্ত অর্থ পাবার সম্ভাবনা নেই, সেই কাজে আমি আগ্রহ প্রকাশ করি না।’ তিনি উদ্ভাবক আর বিজ্ঞানী হোক না কেন, তাঁর পরিশ্রমই তাঁকে সফলতা এনে দিয়েছিলে এটাই তোমাদের জন্য অনুকরণীয়।
জীবনকে উন্নত করতে হলে পরিশ্রম তোমাকে করতেই হবে। ধরেই নিতে হবে জীবন সংগ্রামের। জীবনের এক নাম রহস্য, আরেক নাম সংগ্রাম। সংগ্রামী মানুষদের জন্যই আজকের পৃথিবী। উত্তরাধিকারসূত্রে খুব কম লোকেই সাফল্য লাভ করে থাকে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হয়, অন্য কেউ এসে তোমার পথ তৈরি করে দেবে না এটাই সত্য, এটাই চরম বাস্তবতা।
আরেকজন পরিশ্রমী মহান ব্যক্তির কথা বলি। যিনি শুধু ফরাসি ভাষারই শ্রেষ্ঠ কবি নন, সমগ্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম একজন। হ্যাঁ, তোমাদের সকলের প্রিয় কবি আল্লামা শেখ সা’দীর কথা বলছি। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এই মহান মনীষীর শিক্ষা লাভের প্রতি ছিল অস্বাভাবিক আগ্রহ। শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। শুরু হয় সংগ্রামমুখর জীবন। একদিকে সংসার দেখাশোনার ভার, অন্যদিকে জ্ঞানার্জন।
া’দীর জীবনকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ৩০ বছর শিক্ষালাভ, দ্বিতীয় ৩০ বছর দেশ ভ্রমণ, তৃতীয় ৩০ বছর গ্রন্থ রচনা এবং চতুর্থ ৩০ বছর আধ্যাত্মিক চিন্তা ও সাধনা। এক সময় কর্ডোভার মুসলিম সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্যে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা প্রভাবিত ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শেখ সা’দীর চোখের সামনে দুমড়ে মুচড়ে ধরাপৃষ্ঠ হতে মুছে গিয়েছিল মুসলিম সাম্রাজ্য। বর্তমান ইরাকের রাজধানী বাগদাদ পরিণত হয়েছিল এক মহাশ্মশানে। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, ‘আল মুকাদ্দিমায়’ লিখেছেন –‘বিশ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ষোল লাখ লোকই এ আক্রমণে নিহত হয়েছিল।’
মুসলমানদের এই দুরবস্থা দেখে সা’দী ভীষণভাবে ব্যথিত হলেন। তাঁর ক্ষুরধার কলম জ্বলে উঠল জালিম শাসকের বিরুদ্ধে। রচনা করলেন তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ, ‘গুঁলিস্তা’। তাঁর প্রায় সমস্ত কাব্যেই তিনি জালিমদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনের কথা বলেছেন।
শেখ সা’দীর গুঁলিস্তা ও বুস্তাঁ বিশ্ব কাব্যকাননে এক অমূল্য সম্পদ। গুঁলিস্তা ও বুস্তাঁ ছাড়া জগতে এমন গ্রন্থ খুব কমই আছে, যা যুগ যুগ ধরে বিপুলভাবে পঠিত হয়ে আসছে। তাঁর সমস্ত রচনাই অতি সরল, প্রাঞ্জল এবং আবেগধর্মী। আলেমগণ বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সভায় তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে থাকেন। প্রিয় নবির শানে কবিতার নিম্নোক্ত এই চারটি চরণ লিখে তিনি চির স্মরণীয় হয়ে আছেন–
‘বালাগাল উলা বিকামালিহি
কাশাফাদ্দুজা বি জামালিহি
হাসুনাত হামিউ খিসালিহি
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।’
জীবনে নানা বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করে, শুধু একাগ্রতা আর পরিশ্রমের জোরে মানুষ কীভাবে লক্ষ্য সাধনের পথে এগিয়ে যেতে পারে, তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হলেন আল্লামা শেখ সা’দী। জুন মাসে তোমাদের সাথে আবার সাক্ষাতের আশা নিয়ে আজকের মতো এখানেই বিদায় নিচ্ছি। সবাই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। আল্লাহ হাফিজ।

SHARE

Leave a Reply