Home গল্প রহস্যময় এক বুড়ো -দেলোয়ার হোসেন

রহস্যময় এক বুড়ো -দেলোয়ার হোসেন

সোহাগের বয়স বারোর বেশি নয়। প্রায় চার মাস হলো ওরা যশোর থেকে ঢাকা এসেছে। সোহাগের বাবা প্রফেসর। সোহাগ ঢাকায় একটা ভালো স্কুলে ভর্তি হয়েছে। এরই মধ্যে দু’চারজন বন্ধুও জুটেছে ওর। একদিন সোহাগের বাবা আমজাদ সাহেব ছেলেকে বললেন, তোমাকে একটা কথা বলা দরকার। আমাদের বাসার পরের বাড়িটার পর একটা দোতলা বাড়ি আছে। দোতলার বারান্দায় এক বুড়ো বসে থাকেন দেখেছো? সোহাগ বই-এর পাতায় চোখ রেখেই উত্তর দিল- সে তো রোজই দেখি। বুড়ো আমাকে দেখলেই হাসে, ইশারায় কাছে ডাকে।
– খবরদার; ঐ বুড়োর কাছে কখনো যাবে না। তার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। লোকটা নাকি জাদুটোনা জানে। যাকে ইচ্ছে তাকেই ক্ষতি করে বসে। কখনো তাকে রাগাতে যেও না। লোকটার স্বভাব বড় বিদ্ঘুটে।
– ঠিক আছে, আমার মনে থাকবে।
সোহাগের ভালো বন্ধু নাজিম। ক্লাসে দু’জন পাশাপাশি বসে। দু’জনই পড়ালেখায় ভালো। খেলাধুলার প্রতিও দু’জনার সমান আকর্ষণ। একদিন কথায়-কথায় নাজিম বললো, আবেদ আলি সরকার তো তোদের বাসার আশপাশেই থাকে। সোহাগ অবাক হয়ে বলল, সে আবার কে?
– তুই বুড়োটাকে দেখিস নি? টাক মাথা, ক্লিন সেভ- সব সময় রঙবেরঙের ফতুয়া পরে বারান্দায় বসে থাকে।
– তার নাম যে আবেদ আলি সরকার তা জানতাম না। তাকে তো রোজই দেখি।
– অনেক তন্ত্র-মন্ত্র জানে। শুনেছি তাকে যে চটাতে যায় সেই বিপদে পড়ে।
– বাবাও একদিন এই কথাই বলেছে।
একদিন সোহাগদের বাসায় এক প্রতিবেশী এলেন আলাপ করতে। আগে কখনো আসেননি। তিনি সোফায় বসতে বসতে বললেন, অনেকদিন ধরেই ভাবছি, আপনার সঙ্গে আলাপ করবো। একই পাড়ায় থাকি, জানাশুনা হলে ক্ষতি কী। কিন্তু সময় আর হয়ে ওঠে না। তো এসে ডিস্টার্ব করলাম না তো? আমজাদ সাহেব বললেন, এসে খুব ভালো করেছেন। আপনি তো ব্যাংকে আছেন।
– হ্যাঁ, এখানে আমি একাই থাকি। ছেলে-মেয়েরা মাগুরাতে থাকে। আমি শুনেছি আপনি যশোরের মানুষ- তাই এলাম। পাড়ার একজন ছাড়া সবাইকেই আমার ভালো লাগে।
– একজনটা আবার কে?
– আবেদ আলি সরকার। নামটা হয়তো শুনে থাকবেন। কাঠের ফলকে ছোট্ট করে লেখা এ. এ সরকার।
– তা শুনেছি। একটা বাড়ির পরের বাড়িটাতেই থাকেন।
– লোকটার মধ্যে অনেক গোলমাল।
– জানতাম না। এখানে আসার পর কিছু-কিছু শুনেছি।
– মস্তবড় পুরনো একটা ট্যাঙ্ক তিনি নিয়ে এসেছেন। সেটা নাকি তার জাদু-মন্ত্রের বাক্স। তার মধ্যে না জানি কতো কিছু আছে। বাড়িটা আগে খালিই পড়ে ছিল। বুড়োর সাথে তিনজন চাকর থাকে- তারাই দেখাশুনা করে।
– জাদু-মন্ত্রের ব্যাপারটা আপনি কিভাবে দেখছেন?
– সঠিকভাবে কিছু বলা মুশকিল। তবে, পাশের বাড়ির বাদল সাহেব ঐ বাড়ির অনেক খবরই রাখেন। তার মুখেই শুনেছি রাতে নাকি বাড়িতে ডুগ্ডুগি বাজে। মাউথ অর্গান বাজে, তা ছাড়াও নানান রকম শব্দ হয়। তার ঘরের জানালায় অশরীরী আত্মার মুখও দেখেছেন। তার চেয়ে বড় কথা যে, তিনি একদিন গুলির শব্দও শুনেছেন। এসব নিয়ে রফিক মিয়া একদিন বুড়োকে বেশ শাসায়। তার ফলটা কী হলো জানেন? একদিন পরই রফিক মিয়া বিছানায় পড়লেন। একশ’ পাঁচ ডিগ্রি জ্বর। চোখের সামনে অন্ধকার। ঔষুধ খাচ্ছে কিন্তু জ্বর নামছে না। শেষে দশ দিন পর সেই জ্বর নামল। তারপর থেকে পাড়ার লোকজন অনেক সজাগ হয়ে গেছে।
সোহাগের বাবা বুড়ো লোকটা সম্পর্কে সোহাগকে বললেও নাজিমের বাবা নাজিমকে কিছু বলেনি। তিনি জাদুমন্ত্র বা ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করেন না। তিনি বলেন, একটা নিরীহ বয়সী লোককে না জেনে এমন ভাবা উচিত নয়। আমি বিশ্বাস করি তার মধ্যে কোন গোলমাল নেই।
বাবার এসব কথায় নাজিম বেশ সাহসী হয়ে উঠল। সে তার বন্ধু সোহাগকে বলল, আজ ছুটির পর তোর সাথে যাব। বুড়ো লোকটাকে কাছ থেকে দেখব। সে কী বলে সেটাও শুনব। সোহাগ অবাক হয়ে বলল, তুই তো একদিন বলেছিলি বুড়োর কাছে না যেতে। বেশি সাহস দেখানো ভালো নয়।
– কিন্তু বাবা বলেছে বুড়োর মধ্যে কোনো গোলমাল নেই। একবার গিয়ে দেখলে ক্ষতি কী? এটাও একরকম অ্যাডভেঞ্চার।
– যাবো কিন্তু ওপরে উঠব না।
– তাই হবে।
স্কুল থেকে ফেরার পথে দু’বন্ধু গেল বুড়োর বাড়ির সামনে। সোহাগের বুকের মধ্যে ধুক্ধুক করছে। বুড়ো রোজকার মতো বসে আছে বারান্দায়। ওদের দেখে সে তো মহা খুশি। নাজিম বলল, আপনি হাসছেন কেন? বুড়ো বলল, আমি ডাকলে তোমরা আস না কেন? সোহাগ বলল, আপনার কালো বাক্সটার মধ্যে কী আছে? লোকটা বললো, অনেক কিছু আছে। ওপরে এলেই দেখতে পাবে। নাজিম বলল, আপনি রতনকে নাটাই দিয়েছেন- সেটা পেলেন কোথায়?
– আমার কাছে অনেক আছে। আমি ঘুড়ি তৈরি করতে জানি। তোমাদের কি ঘুড়ি চাই?
– আরেকদিন এসে বলব। আজ যাই- বাড়িতে কাজ আছে।
তারপর দু’জন চলে এল সেখান থেকে। সোহাগদের বাড়িতে এসে মুখ-হাত ধুয়ে খেয়ে নিল দু’জনেই। এমন সময় সোহাগের বাবা এলেন বাড়িতে। তিনি নাজিমকে দেখে কিছু একটা ভাবলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। সোহাগ নিজেই বুড়ো লোকটার বাড়ির সামনে যাওয়া এবং কথা বলার ঘটনাটা বাবাকে বলল। আমজাদ সাহেব ছেলের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন। দু’একবার দৃষ্টি ঘুরালেন দু’জনের দিকে। তারপর বললেন, একবার গিয়েছ কিন্তু আর যাবে না। রাতে বুড়োর বাড়িতে ভূত-প্রেতের মেলা বসে। নাচা-নাচি, হই-চই- যেন রাতভর নাটকের মহড়া চলে। ঐ বুড়োর অনেক ক্ষমতা। কারো সাথে সে লাগতে যাবে না তবে, মন্ত্র বলে ভূত-প্রেত চালান করে দেবে। খুব সাবধান।
এক সপ্তাহ পর কেউ একজন সোহাগদের দরজায় নখ করল। আমজাদ সাহেব তখন চা খাচ্ছিলেন। তিনি ছেলেকে বললেন, দেখতো কে এলো। সোহাগ দরজা খুলে দেখলো এক অপরিচিত ভদ্রলোক। কাঁধে ট্র্যাভেল ব্যাগ, মাঝারি বয়স। তিনি বললেন, আবেদ আলি সরকারের বাড়িটা কোন দিকে। আমজাদ সাহেব এগিয়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, ঐ বাড়িটার পরের বাড়িটা। লোকটা ধন্যবাদ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আমজাদ সাহেব বললেন, আপনি কি তার আত্মীয়? লোকটা বললেন, আমি উনার ছোট ভাইয়ের ছেলে। ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর আমজাদ সাহেব আপন মনেই বললেন, আমি ভেবেছিলাম বুড়োর তিন কুলে কেউ নেই।
বিকালে ভদ্রলোক আবার এলেন। আমজাদ সাহেব বললেন, চা খাবেন তো? তিনি বললেন, ধন্যবাদ- এই মাত্র খেয়েছি।
– কেমন দেখলেন আপনার কাকাকে?
– কাকার বিষয়টা নিয়েই আপনার সাথে কথা বলতে চাই। তার আগে আমার পরিচয়টা দিয়ে রাখি। আমার নাম সাকুর সরকার। আমার পেশা মনের চিকিৎসা করা। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছাটা মনের মধ্যে জাগ্রত ছিল। তার জন্য বাবা বিদেশ পাঠিয়ে দিলেন। কিছুদিন হলো দেশে ফিরেছি। বাবার কাছেই কাকার বিষয় জানতে পারলাম। কাকা কারো সাথে মিশতেন না, কথাও তেমন বলতেন না। ডাক্তার বলেছেন, তার কোনো অসুখ নেই।
– যে বাড়িটাতে তিনি রয়েছেন সে বাড়িটা কার?
– ওটা আমার দাদু তৈরি করিয়েছিলেন। তিনি ব্যবসা করতেন। টাকা-পয়সাও করেছিলেন অনেক। মরার আগে দুই ছেলের মধ্যে সমান ভাগ করে দেন। তাঁর টাকা-পয়সার অভাব নেই। সংসারও করেননি তিনি। সারা জীবন দেশ-বিদেশে ঘুরেছেন। শেষে নিজের বাড়িতে এসে ঠাঁই নিয়েছেন।
– উনি কি জাদু-মন্ত্রের চর্চা করেন?
– কী যে করেন তা ঠিক বলতে পারবো না। তবে, তিনি এক ধরনের মানসিক রোগে ভুগছেন এটা আমার ধারণা।
– রোগটা কী?
– সেটা এখনো বুঝা যাচ্ছে না। তিনি আমার সঙ্গে তো কথাই বলতে চান না। তবে, কাজের লোকদের কাছে শুনলাম, তিনি ছোটদের খুব ভালোবাসেন। তাদের ওপর কখনো রাগ করেন না। বারান্দায় বসে ছেলেদের ডাকেন, হাসি মুখে কথা বলেন। কিন্তু কেউ নাকি তার কাছে যেতে চায় না। সে জন্যই তার মনে কষ্ট। তাই ভাবলাম আপনার ছেলেকে যদি সঙ্গে নিয়ে যাই তা’হলে হয়তো তিনি মুখ খুলবেন।
সোহাগ বলল, উনার একটা মস্তবড় কালো বাক্স আছে কি? সাকুর সরকার বললেন, সে তো বিশাল এক ট্রাঙ্ক। অনেক কাল আগের। এখন ওরকম জিনিস কোথাও আর দেখা যায় না। আমি জানতে চেয়েছিলাম ওটার মধ্যে কী আছে? তিনি বললেন, সে কথা তোমাকে বলব কেন! তুমি চলে যাও, তোমাকে আমার পছন্দ নয়। তাই বলছিলাম…
আমজাদ সাহেব প্রফুল্ল চিত্তে বললেন, সোহাগ অবশ্যই যাবে তবে, তার সাথে তার বাবাও যাবে। কেন না অনেক দিন ধরেই মনের মধ্যে একটা কৌতূহল বাসা বেঁধে আছে। সাকুর সরকার খুশি হয়ে বললেন, আপনি গেলে তো আমি মনের মধ্যে একটু জোর পাব।
তখনই তিনজন বুড়োর গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কাজের লোকটা বলল, সাহেব ওপরে শুয়ে আছে। তিনজন ওপরে গিয়ে বুড়োর ঘরে ঢুকলো। বুড়ো বালিশে ঠেস দিয়ে শুয়ে আছে। সোহাগ ট্রাঙ্কটার মধ্যে কী আছে সেটা দেখার জন্যই আগে-আগে ঢুকল বুড়োর ঘরে। সোহাগকে দেখেই হাসি ফুটল বুড়োর মুখে। তিনি বললেন, আমি জানতাম তুমি আসবে। সোহাগ বলল, আপনার কালো বাক্সটার মধ্যে কী আছে দেখতে এলাম। লোকটি বিছানা থেকে নেমে হাতে চাবি নিল। কিন্তু আমজাদ সাহেব আর সাকুর সরকারকে দেখে বুড়োর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তিনি বললেন, ওরা এসেছে কেন? সাকুর সরকার আমজাদ সাহেবকে বললেন, চলুন আমরা পাশের ঘরে গিয়ে বসি।
তাঁরা দু’জন চলে যেতেই লোকটা ট্রাঙ্ক খুলে সোহাগকে বললেন, দেখো এর মধ্যে কত কিছু রয়েছে। সোহাগের বুকের মধ্যে তখন ধুক-ধুক করছে। না জানি কী দেখতে কী দেখব। তবু সাহসে ভর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিল। একি! এ যে সব খেলনা! এসব খেলনা তো সে জীবনেও দেখেনি। ও বলল, এসব কার খেলনা? লোকটি বিজয়ের হাসি হেসে বলল, সব আমার। তোমরা এলে তোমাদের সাথে খেলব আমি। ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের খেলার বল আছে, বেঞ্জু আছে, বাঁশি আছে, অর্গান আছে, ডুগ্ডুগি আছে বন্দুক আছে ভয়ঙ্কর সব মুখোশ আছে; আরো অনেক কিছু আছে। আমি এসব বাজিয়ে রাতে গান গাই।
সোহাগ বলল, ঠিক আছে আমি আসব। এবার ডাক্তার সাহেবকে ডাকি?
– ডেক না, ওরা আমার খেলনা নিয়ে নেবে।
– না, নেবে না। উনারা খুব ভালো মানুষ। আপনার কোনো ক্ষতি করবে না।
– তা’হলে ডাক। কিন্তু আমার খেলনা যেন না নেয়।
তখন আমজাদ সাহেব ও সরকার ভেতরে ঢুকলেন। ট্রাঙ্কটা তখন খোলা। সরকার বললেন, এসবই ব্রিটিশ আমলের খেলনা। কাকার ছেলেবেলার জিনিস। এখন আর এসব জিনিস পাওয়া যাবে না। তারপর কাকাকে বললেন, আপনি বসুন, আমরা কেউ আপনার খেলনা নেব না। আপনি আপনার জগৎ নিয়ে ভালো থাকুন।
এক সময় তিনজনই ঘরের বাইরে এলেন। ডাক্তার সাকুর বললেন, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিরহস্য কারো বুঝার উপায় নেই। কাকে যে তিনি কেমন মন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা শুধু তিনিই জানেন। কাকা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন কিন্তু তার মন সেই ছেলেবেলাতেই পড়ে আছে। তাইতো তিনি বড়দের পছন্দ করেন না। ছোটদের আদর করেন, ভালো বাসেন। তাদের মধ্য দিয়ে নিজের ছেলেবেলা খুঁজে পেতে চান। এর কোনো চিকিৎসা নেই।
আমজাদ সাহেব ছেলের মাথায় হাত দিয়ে বললেন, তুই মাঝে-মাঝে এসে তোর এই দাদুকে সঙ্গ দিস, আর তোর বন্ধুদেরও নিয়ে আসিস।

SHARE

Leave a Reply