Home গল্প তিতির ও সান্তিয়াগোর নৌকা -ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

তিতির ও সান্তিয়াগোর নৌকা -ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

বাদল মামু যখন শান্তিনগরের বাড়িতে এলেন তখন চারপাশে থইথই পানি। ভোর বেলা একপশলা বৃষ্টি হয়েছে তাতেই এই হাল। আজ রোববার। তিতিরের স্কুল খোলা। অন্যদিনের মতো রোদ ঝকঝকে সকাল হলে ও স্কুলগাড়িতেই থাকতো। থ্যাংক গড, ভোরবেলাতেই বৃষ্টি নেমেছে অঝোর ধারায়। ছাতা টাঙিয়ে রিকশাতে গিয়ে উঠলো, প্লাস্টিকের পরদা দিয়ে বুক পর্যন্ত স্কুলের ব্যাগ ঢেকে বসা। এর পরেও ঠাণ্ডা লেগে যায় তিতিরের। একটুতেই খুক খুক করে কাশি, হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো করে হাঁচি শুরু হয়ে যায় ওর। ঠাণ্ডায় ওর এলার্জি।
টবের তুলসী গাছ থেকে পাতা এনে এর মাঝে আদা কুচো দিয়ে মধু মিশিয়ে তিতিরকে খেতে দেওয়া হয়। চুমুক দিয়ে খেয়ে নাক-মুখ কুঁচকে বলে, ইশ্শ কী ঝাল! আম্মু বলেন, এবার থেকে সাবধান হও তিতির। বড়ো হচ্ছ। ঠাণ্ডা যেন না লাগে। তুলসী গাছের পাতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে তো ন্যাড়া হয়ে গেল গাছ, তবুও তোমার কাশি ভালো হয় না।
মায়ের এ কথার অনেক জবাব রয়েছে তিতিরের কাছে। তবু মুখে কিছু বলে বৃষ্টির ঝাপটা কখন শরীরে লাগে, ঠাণ্ডা হাওয়ায় কখন খুক খুক কাশিহয়-তাকে আগে ভাগে কেউ বলতে পারে? পারে না। পাড়ার বিট্টু ভাইয়া তো সারাক্ষণই খালি গায়ে থাকে। বৃষ্টি এলে ছাদে দাঁড়িয়ে ভিজে- কই ওর তো কোনো কিছু হয় না! ও বুক ফুলিয়ে বলে, আমি সিজনড কাঠ হয়ে গেছি।
সে যা হোক-আজও যে বৃষ্টির জন্য স্কুলে যেতে হয়নি এ জন্য দারুণ খুশি তিতির। নাহলে মামুর বেহাল দশা দেখতে পেত নাকি?
মামুও অবাক।

– সায়েদাবাদ থেকে এলাম, রাস্তার এখানে-ওখানে অল্প পানি জমা হয়ে আছে, তোদের তো সয়লাব হয়ে গেছে রে তিতির। তোর আব্বুর যেমন বুদ্ধি- এ এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিল কেন?
ঝড়ো কাকের মতো ভিজে একসা হয়ে মামু ভেতরে ঢুকেছেন। রেইনকোট থেকে পানি ঝরছে। ছাতা ভিজে চুপসে গেছে, কিন্তু ছাতার শিকগুলো কিছুতেই বাগে আনতে পারছেন না। মামু শিকগুলো ধরে যত টানাহেঁচড়া করেন, অবাধ্য শিক ততই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আম্মু রেগেমেগে বলল, এই বাদল-দিলি তো কার্পেটটা ভিজিয়ে। কী ঝড়-বৃষ্টি! আবহাওয়া অফিস চার নম্বর সিগন্যাল দিয়েছে। তুই আর আসার সময় পেলিনে বুঝি!
মলিন মুখে মামু বলে, একটু বৃষ্টিতেই তোমাদের শান্তিনগর যে পানিতে সয়লাব হয়ে যায়- তা আমি কি করে জানব? তিতির বলে, সত্যিই তো আম্মু, মামু তো সবসময় শীতের দিনে পিঠে নিয়ে আসে। বৃষ্টিতে তো কখনো আসেনি। রানা চাচ্চু এসে বলে, তুমি জানবা না ক্যান মিয়া! নামই তো তোমার হইলো গিয়া বাদল। ঝড়-বাদল নিয়াই তো তোমার কাম।
বুয়া এসে গরম চা দিয়ে গেছে। গজগজ করে বলেছে, মাইনষের বাড়ি মেহমান আইলে এমুন হেনস্থা করেনি? এত দূর থেইকা জার্নি কইরা আইল, সুখ-দুঃখের কথা জিগাও-তা না খালি মুখ করে। আমি বাবা উচিত কথার মানুষ। যা সত্য তাই কমু।
এই সভ্যভাষী বুয়ার চায়ে চুমুক দিয়ে মুহূর্তে চাঙ্গা হয়ে ওঠে মামু।
-শোনো রানা, এজন্যই তো টিভির নাটকে মাঝির রোল ছাড়া আর কোনো কাজ পাও না।
-শাট আপ।
চেঁচিয়ে ওঠেন রানা চাচ্চু।
পেঁয়াজ-কাঁচালংকা, সর্ষের তেল দিয়ে মাখা মুড়ির বাটি ঠক্ করে রাখতে গিয়ে বুয়া বলে, এবার চুপ যান। ঠাণ্ডা দিনে এমুন মাথা গরম করেনি মিয়ারা!
আম্মু-আব্বু সবাই চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছে। বাইরে একটানা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। ঘরে রানা চাচ্চুর মাথা ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। না হয় মাঝির রোলেই অভিনয় করি, লোকজন তো আমারে অ্যাক্টর কইয়াই চিনে।
মামু নকশা করা বড়ো টাওয়েল দিয়ে চুল মুছে আরাম করে বসেছে। বৃষ্টি-বাদলার এই দিনে সবাই দারুণ খুশি। শুধু আব্বুর মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে আছে। এখনই তৈরি হয়ে অফিস ছুটতে হবে। এমন জমা আড্ডা ছেড়ে বাইরে যেতে কি ইচ্ছে করে?
বাদল মামু এক কোণে দাঁড়ানো তিতিরের দিকে তাকায়।
-হ্যাল্লো তিতির, কেমন আছিস রে?
এতোক্ষণে ও গাল ভরে হাসে। মামু এসেছে-এ খবরে ওর চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হয়নি। কারণ বাদল মামু যে ওর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। প্রিয় বন্ধু।

দুই.
বৃষ্টি হয়েছে বলে আজ না হয় স্কুলে যেতে হয়নি। কিন্তু বরাবর তো এমন বৃষ্টি হবে না, রোদ উঠবে, স্কুলে যেতে হবে। তখন কী হবে? দাদীর হাতে করা অপরূপ এক নকশিকাঁথা গায়ে দিয়েও শিরশির করে কেঁপে ওঠে তিতিরের ছোট্ট শরীর।
ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষার খাতা আজকে দেবার কথা। অংক, ইংরেজি দুটো পরীক্ষা খুব খারাপ হয়েছে ওর। খাতাগুলো বাড়িতে এনে আব্বু-আম্মুকে দেখাতে হবে, এরপরই শুরু হবে বকুনির ঝড়।
সবাই পারে তুমি কেন অংক কষতে পারো না?
তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।
তুমি এক্কেবারে ডাল।
মাথায় তোমার গোবর পোরা।
নিচু ক্লাসে এইট্টি নাইনটি পারসেন্ট মার্কস পাবে না- এটা কোনো কথা হলো!
বড়োদের এসব কথা যখন একসাথে কানে এসে ঝাপটা দেয় তখন বড্ড খারাপ লাগে তিতিরের। মন খারাপ করে গালে হাত দিয়ে বসে থাকলে রানা চাচ্চু চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে- কি রে, কি হইলো তর, আম্মু গাইল পাড়ছে? পরীক্ষায় খারাপ করছস?
নাটকের ডায়ালগ বলতে বলতে এমন ভাষাই রপ্ত করেছে চাচু। মাঝে মাঝে এমনটাই হয় ওর। কিছু ভালো লাগে না। শেষ পরীক্ষার দিন মাথাটা একেবারেই হালকা লাগে। ঠিক যেন পাখির পালক। রেজাল্ট বের হবার কদিন আগে থেকেই শুরু হয় ফের মন খারাপের পালা। খেতে ভালো লাগে না শুতে ভালো লাগে না। ওয়াশরুমের শাওয়ার অনেকক্ষণ ধরে খুলে দাপাদাপি করতে মোটেও ইচ্ছে করে না। মন খারাপের দিনে বাদল মামু যদি বৃষ্টিতে ভিজে ঝড়োকাকের মতো আসে-তা ভাল্লাগবে না তিতিরের! যে কদিন ঢাকাতে থাকে ভাগ্নেকে সারাক্ষণ সঙ্গ দেয় মামু। সাড়ে নয় বছরের ক্লাস থ্রি-এ পড়–য়া ভাগ্নের সঙ্গে জমে যায় মফস্বল শহর থেকে আসা মামুর। ওর মন খুব ভালো বুঝতে পারে মামু। রানা চাচু ওর নাটকের রিহার্সেল আর রেকডিং নিয়ে ব্যস্ত। আম্মু ব্যস্ত সংসার আর আবৃত্তি নিয়ে। আব্বু অফিসের সব জরুরি কাজ নিয়ে হিমশিম খায়। তাহলে ছোট্ট এই ছেলেটির মনের কথা বুঝবে কে?
ক্লাসে পড়ে ইয়া মোটা এক ছেলে, নাম ওর রুবাইয়াত। গাবলু-গুবলু চেহারা বলে ওকে সবাই গোলগাপ্পা বলে ডাকে। টিফিন আওয়ারে ওর হাত থেকে আচমকা স্যান্ডউইচ কেড়ে খেয়ে নিল রুবাই। তা কি ও আম্মুকে বলতে পেরেছে?
শুনলে হয়তো আম্মু বলত, নিশ্চয়ই তুমি কিছু করেছ নয়তো হঠাৎ করে তোমার টিফিন রুবাই কেড়ে নিলো কেন?
আরে বাবা হঠাৎ করেই তো করেছে। আমি ক্লাসের এক কোণে বসে টিফিন বক্সটা খুলেছি- ও যে পেছন থেকে ঝপ করে খাবারটা কেড়ে নেবে বুঝতে তো পারিনি।
আম্মু বিশ্বাস করবে না তাই তো তিতির কথাটি বেমালুম চেপে গেছে। এই যে মামু এসেছে, ওর কাছে সব কিছুও খোলাখোলি বলতে পারে। মামু ছোটোদের বোঝে, ছোটোদের মনের হাসি-কান্না-খুশি-দুঃখ সব বুঝতে পারে।
কোনো কথা নিয়ে বুয়া যখন বলে, ও তো চোরের সাক্ষী বাটপার, সঙ্গে সঙ্গে মামু বলে ওঠে, আই অবজেক্ট বুয়া। চোখ পাকিয়ে মামু বকুনি দিল না, কাউকে চড় কষাল না, গর্জন করল না, শুধু মিষ্টি করে বলল, আই অকজেক্ট বুয়া। তোমার পানের ডাব্বা চুরি গেছে- এই তো ব্যাপার! পাশের বাড়ির ছোট্ট কাজের ছেলে রমিজকে কথাটি বললে তুমি, এটি আমি একদম পছন্দ করিনি। চোর শব্দটি খারাপ- আসলে তোমার পানের ডাব্বাটা কাউকে কি চুরি করতে দেখেছ? আর না দেখলে কাউকে শুধু শুধু চোর বলতে নেই। বুয়া, বাটপার শব্দটি তো আরও বাজে, মানে হলো ঠক। আমি তোমাকে একটা স্টিলের পানের বাটা কিনে দেব, কাউকে আর ঠক বলো না। বাড়িতে তিতির নামের ছোট্ট একটি ছেলে রয়েছে, এর সামনে কক্ষনো বাজে কথা বলবে না তুমি।

আম্মু গুনগুন করে চমৎকার গান গায়, কী সুন্দর আবৃত্তি করে কিন্তু বুয়া কি বলল, তিতিরের সামনে এসব বলা উচিত নয়- এসব নিয়ে কখনো ভাবে না। আব্বু সারাদিন অফিসেই থাকে। তবে মামু ওসব নিয়ে খুব ভাবে। তাহলে মামুকে ও ভালোবাসবে না কেন? খুব কাছের মানুষ যে।
মামু প্রশ্ন করে, কি রে তিতির, আমি এসেছি বলে খুশি হয়েছিস তো! বড়ো বড়ো চোখের পাপড়ি নিয়ে মামুর দিকে তাকিয়ে থাকে তিতির। ডাগর চোখ দুটি যেন বলে, আমি খুশি না হলে আর কে খুশি হবে মামু? আমি তোমাকে ভালোবাসি- খুব ভালোবাসি।
মুখে কিছু বলে না সে।
মামু তিতিরের ঘর ঝাড়ন দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে বলে, সব সময় ঘর সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখবি। পরিচ্ছন্ন রাখবি। ক্লাস থ্রি-তে পড়ছ, এখন আর ছোটো নয়। নিজের কাজ নিজে করে নেবে, বুয়া করবে, মা করে দেবে এমন আশায় থেকো না।
এলোমেলো একগাদা বইয়ের দিকে তাকিয়ে মামু বলে, এগুলো কি? এগুলো সাচকুয়াচ, অরণ্যদেব, ম্যানড্রেক-এর বই। এসব বই তো অনেক পড়েছ। এবার থেকে নতুন বই পড়বে।
মেঘের ছায়া নেমে আসে তিতিরের মুখে।
আমাকে নতুন বই পড়তে দিলে তো! রানা চাচু, আম্মু, আব্বু সবাই বলে আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। শুধু পড়ার বই পড়ো, গল্পের বই কক্ষনো নয়।
ঠ ঠা করে হাসে মামু। মেঘের বিকেল যেন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কার কী হবে কেউ কি বলতে পারে? খেলায় হারলে, পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলে কেঁদে কেটে একসা হয়ে যাও। তাই তো তিতির? তা করবে না। কাঁদলেই তুমি হেরে গেলে, রাগ করলেও তুমি হেরে গেলে। একদম স্ট্রং থাকবে। সবসময় ভাববে, আমি সব পারি। ঠিক আছে কাঁদব না, রাগও করব না। স্ট্রং থাকবো।
মামুর কথা শুনতে হবে কারণ ছোট্ট শহরের খুব নামি স্কুলে তিনি পড়ান। অংক-ইংরেজি-বাংলা সব কিছুতেই দারুণ দখল ওর। এমন মামুর কথা কি না শুনে পারা যায়?
দুপুরে খেতে বসে মামু বলে, এ্যাই আপা, খিচুড়ি হলে ভালো হতো না? কী ঝুমঝুম বৃষ্টি। আম্মু বলল, কদিন থেকে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে তো, খিচুড়ি খেতে খেতে আর ভালো লাগে না। ঠিক আছে তুই বলেছিস যখন রাতে আবার খিচুড়ি হবে।
-দারুণ হবে তাহলে, মামু হাসিমুখে বলে, কি বলো রানা?
রানা চাচু জিজ্ঞেস করে, কি খিচুড়ি হইবো ভাবী? ল্যাডা খিচুড়ি না ঢেলঢেইল্যা খিচুড়ি?
আব্বু ছোটো ভাইকে ধমক দিয়ে বলেন, নাটক করিস বলে সারাক্ষণ এমন কথাবার্তা প্র্যাকটিস করতে হবে নাকি? হিরো হলে তো ভালো করে কথাবার্তাই বলতে পারবি না।

তিন.
সোমবার একটুও বৃষ্টি হলো না। আকাশ ঝকঝকে নীল। বাড়ির সামনের নারকেল গাছের চিরল পাতাগুলো মৃদু হাওয়ায় দোলে। হলুদ রঙা সকাল।
মামু চায়ে চুমুক দিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, একেই বলে সানি ডে। ঠোঁট ফুলিয়ে তিতির বলে, সানি যে না ছাই।
-কেন কেন?
-আজ স্কুলে যেতেই হবে। টিচাররা একের পর এক খাতা দেবেন। তারপরের ব্যাপারটা বুঝতে পারছ মামু?
-খুব বুঝতে পারছি। কিন্তু তোমার তো এত ভয় পাবার কিছু নেই। আমি তো রয়েছি, তিতির। স্ট্রং থাকবে, ভেরি স্ট্রং।
স্কুলের ড্রেস পরা তিতির স্মার্টলি বলে, হ্যাঁ মামু, তুমি তো আছ। কার্টুনের বইগুলো ঘরের এক কোণে পুরনো সেলফে রেখে দিয়েছে মামু।
-কম্পিউটার হটাও। সারাক্ষণ যন্ত্র নিয়ে থাকলে তো যান্ত্রিক হয়ে যাবি।
-যান্ত্রিক?
-হ্যাঁ যান্ত্রিক মানে মেকানিক্যাল। মানুষ আর থাকবে না। এক কথায় যাকে বলে রোবট।
ঠিক স্কুলে যাবার মুখে ‘কম্পিউটার হটাও’ শুনে ভালো না লাগলেও চুপ করে থাকে তিতির। মামুর কথা, নিশ্চয়ই কোনো প্ল্যান রয়েছে মাথায়। স্কুলে যাবার পর মেঘভরা ভারী আকাশটা যেন নেমে এলো তিতিরের মাথায়। ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজে। টিচার আসেন। রোল নম্বর ও নাম ধরে ডেকে খাতা দিতে থাকেন।
অঙ্ক ক্লাসে স্যার খাতা দিয়ে বলেন, কি পরীক্ষা দিলে, একেবারে যে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছ।
ওর স্কুলের নাম বিপ্লব, পেয়েছে দশ। স্যার এ কথা বলতেই পারেন। ক্লাস থ্রি-তে দশ নম্বর আর কেউ পায়নি। একশ-নিরানব্বই-পঁচানব্বই-আশি নম্বর নিয়ে বন্ধুরা হৈ হৈ করে। ইংরেজি পরীক্ষার নম্বরও ভীষণ বাজে। চুপটি করে ক্লাসের এক কোণে বসে থাকে তিতির। আম্মু-আব্বুকে কী করে খাতা দেখাবে?
কী করে সবাইকে সে বোঝাবে-ও চেষ্টা করে, ভীষণভাবে চেষ্টা করে কিন্তু কিছুতেই পেরে ওঠে না। বাংলা, ড্রইং এগুলোতে বেশ ভালো করেছে, তবে আব্বু বলেন অঙ্ক আর ইংরেজি হলো মেইন সাবজেক্ট।
খুব মনমরা হয়ে বাড়িতে ফিরে ও। ফ্রিজ খুলে ও কোল্ড ড্রিংক খায় না। আইসক্রিম বের করে না। ভীষণ কান্না পাচ্ছে ওর। মামু বলেছে, কাঁদতে নেই। কাঁদলেই তুমি হেরে যাবে। তাহলে কী করবে ও? চোখ দুটি ওর খরখরে।

ইংরেজি মিস খাতা দিয়ে বলেছেন, তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না বিপ্লব।
দু’হাত ভরা ঝোলা নিয়ে বাদল মামু ঘরে আসে।
-খুব মন খারাপ? সামথিং রং?
ওর টলটলে চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, খাতা দিয়েছে, নিশ্চয়ই খুব খারাপ করেছ। তাই তো!
এতোক্ষণে চোখে পানি উপচে পড়ে তিতিরের।
-আমাকে দিয়ে নাকি কিচ্ছু হবে না।
-কিছু হবে না মানে? বললেই হলো!
বিছানায় ঝাঁকিয়ে বসে মামু।
-হেলেন কেলারের নাম শুনেছ? তার কথা ভেবে দ্যাখো। অন্ধ ছিলেন, কানেও শুনতে পেতেন না, যে কথা বলেছে ওর ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে সব বুঝতে শিখেছিলেন। তুমি দেখতে পাও, কানে শুনতে পাও- তুমি পারবে না কেন? হেলেন কেলারের কথা সব সময় মনে রাখবে।
মামুর কাছে বসলে, তার কথা শুনলে মনে হয় আমি সব পারব। পারব না কেন? কোত্থেকে যেন বুকের ভেতর ভরসা চলে আসে। আম্মু কিচেনে রয়েছেন, রাঁধছেন নিশ্চয়ই। খুন্তি নাড়ার ঠক ঠক আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ভেসে আসছে এলাচ-লবঙ্গ আর ঘিয়ের চমৎকার মনকাড়া গন্ধ। আম্মু তিতিরের এমন রেজাল্টে সব সময় হতাশ হয়ে বলেন, ছেলের এই রেজাল্টে, আমার কি ভালো-মন্দ কিছু রাঁধতে ইচ্ছে করে-বলো!
আব্বু বলে, যুগটা হলো অঙ্কের, অঙ্ক না জানলে কি চলে? আধুনিক যুগ বিজ্ঞানের যুগ। আর বিজ্ঞানের মূল কথাই হলো-অঙ্ক।
মা-বাবার কথা শুনে প্লেটে শুধু ভাত মাখতে থাকে তিতির। আব্বু বললো, পড়ায় মন আছে নাকি? পড়লে তো পারবে।

রানা চাচু বলে, পড়ো ভাইজতা পড়ো, বেশি কইরা পড়ো। লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নাই।
ধোঁয়া ওড়া মসুর ডাল, বেসন মাখা মুচমচে বেগুন ভাজা দিয়ে সবাই ভাত খাচ্ছে। আড় মাছ আর গোশতের বাটি রেখে যায় বুয়া। ঘরজুড়ে তেল-মসলার মনকাড়া গন্ধ। কেউ তাকিয়ে দেখে না ক্লাস থ্রি-তে পড়া ছোট্ট ছেলেটিকে। মামু শুধু দেখে, কুঁকড়ে যাচ্ছে সে। শামুকের খোলের ভেতর নিজেকে সে গুটিয়ে নিচ্ছে। ছোটো হয়ে যাচ্ছে তিতির, এবার সে গোপনে কাঁদবে।
মামু ভাত নেয় না, তরকারি কি নেয় না। গম্ভীর গলায় বলে, শুধু অঙ্ক শিখলেই বুঝি সব হয়ে যায় দুলাভাই? যে গান গাইতে জানে, যে চমৎকার আবৃত্তি করতে শেখে, সে বাঁদর তেল মাখানো বাঁশে কতটুকু উঠল, কতটুকু নামল, গোয়ালা দুধে কতটুকু পানি মেশাল-অঙ্কগুলো না পারলে খুব একটা এসে যায় না।
আম্মু বলল, তুই এত সিরিয়াস হয়ে গেলি কেন বাদল?
মামুর হাত ধরে নিজের ঘরে ফিরে আসে তিতির। খুব ভালো লাগছে। স্কুলের টিচার-আব্বু-আম্মু-রানা চাচু সবার কথা শুনতে শুনতে ওর সামনে থেকে হাসি-আনন্দ-খুশি সব কিছু যেন ফড়িংয়ের পেছনে ঘুরে বেড়িয়েছিল। কিছুতেই ধরতে পারেনি প্রজাপতি আর ফড়িং। মামি আদুরে গলায় ডেকেছেন, ও তিতির ঘরে আয়। আম-দুধ দিয়ে মুড়ি মেখে খাবি।
আম্মু বলেছিলেন-ঘরে এসো তিতির। সন্ধ্যে হয়ে আসছে দেখতে পাচ্ছ না? কত সাপ-খোপ রয়েছে বাগানে।
হারিয়ে যাওয়া সেই আনন্দভরা বিকেলের কথা মনে করে ফিক করে হেসে ফেলে তিতির।
মামু বলে, খুব যে হাসছিস-এবার এমন এক জিনিস দেব তুই ঠা ঠা করে হাসবি তিতির। হা হা করে হাসবি। লাফিয়ে উঠবি।

সত্যিই তিতির লাফিয়ে ওঠে।
-তুমি নিশ্চয়ই কিছু আমাকে দেবে মামু। এবার তো আমাকে কিচ্ছু দাওয়নি তুমি। কী এনেছ বলো। আমি পছন্দ করি-এমন কিছু জিনিস এনেছ-তাইতো!
মামুর ঝোলা থেকে বেরোয় পাঁচটি বই। চমৎকার রঙের নতুন বই। কাগজের সোঁদা গন্ধ বুক ভরে নিতে থাকে তিতির। -এবার কম্পিউটার চালাব না। কার্টুন-ফিল্ম দেখব না, শুধু বই পড়ব।
ইশ্শ বই। তিতিরকে টলিয়ে দেবার মতো নতুন ও রঙিন বই। বাদল মামু ওর খুশি দেখে বলে, কম্পিউটার অবশ্যই চালাবে কিন্তু রুটিন করে। না হলে যুগের সঙ্গে তুমি চলবে কী করে?
সবগুলো বই সেলফে রেখে একটি বই নেয় সে। বুড়ো লোক ও একটি সমুদ্রের গল্প।
আম্মু এসে বলে, তিতির, দাঁত ব্রাশ করেছ?
-হুঁ
-তো এবার ঘুমাও-ভোরে স্কুল আছে।
মামু বলে, আপা ও ঘুমোবে, আমি তো আছি। বই পড়ছে, পড়–ক না। যা করতে তিতির আনন্দ পায় তাই ওকে করতে দাও প্লিজ।
ও একমনে পড়তে থাকে। বাইরে আষাঢ়ের ভিজে রাত গভীর হয়। শুধু মামু আর তিতির জেগে থাকে।

চার.
রূপকথার গল্প, হাসির গল্প, জীবনী সব বই পড়া হয়ে গেল তিতিরের। কিন্তু একটি বইয়ের গল্প ও কিছুতেই ভুলতে পারে না। স্কুলে যেতে, অঙ্ক কষতে, ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিয়ে, ফুটবলে পা ঠেকাবার সময় বারবার ফিরে ফিরে আসে অদেখা নীল সমুদ্র ও বুড়ো সান্তিয়াগোকে। মাছের স্বপ্ন দেখে দেখে সময় কেটে যাচ্ছে ওর।
তিতিরকে যেন বিভোর করে রেখেছে ঘন নীল সমুদ্র।
বই বই, আহা বই।
কত গিফট পায় সে জন্মদিনে, ঈদে, নববর্ষে। দামি দামি জামা-কাপড়, জিনসের প্যান্ট।
বই ওকে কেউ দেয় না। মামু এলেই মনের মতো জিনিস পায়। যে মামু বৃষ্টিতে ভিজে কাকতাড়ুয়ার মতো আসে, কার্পেট ভিজিয়ে দেয়, রানা চাচু যাকে দেখে তামাশা করে বলে, তোমার নামই হইলো গিয়া বাদল। ঝড়-বাদল নিয়াই তো তোমার কাম। সেই সহজ-সরল মামু ছোট্ট তিতিরের মনের কথা সব বোঝে। ওর খুশি, ওর সুখ, ওর কষ্ট। ওকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে মামু।
বাদল মামু কি ম্যাজিক জানে? মামু কি সুপারম্যান? বায়োনিকম্যান? কী করে যেন মামু এসেই তিতিরের সব হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। মনে মনে সে গর্জে ওঠে, আই অ্যাম দ্য বেস্ট।
আমি পারব না কেন? আমি সব পারব, নিশ্চয়ই পারব। হেলেন কেলার পারেন, বুড়ো সান্তিয়াগো পারেন-আমিও পারব।
রোজই মামু তৈরি হয় বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য। আব্বু-আম্মু দুজনই বলে, আরো দু’দিন থেকে যাও বাদল ভাইয়া। রানা চাচু বলে, কি কও যাইবা গিয়া-যাওন তো আমাগো ইচ্ছায়। মামু তিতিরকে বলে-পারবে না, এ কথাটি কক্ষনো বলবে না। কি বলবে এবার থেকে বলো তো!
-লেট মি ট্রাই। আমি পারব, আমি চেষ্টা করবো।
-হ্যাঁ ট্রাই ট্রাই ট্রাই অ্যাগেইন। একবার না পারিলে দেখো শতবার।
তিতিরের বুকের ভেতর আনন্দের শতধারা যেন বয়ে যায়। পেছনের দিনগুলো ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ও।

হ্যাঁ, আমি পারি, সব পারি।
মামাবাড়ির সেই প্রজাপতি আর ফড়িংয়ের পেছনে ছুটোছুটি করার বিকেলটা যেন ফিরে এসেছে। মন খারাপের দিনগুলো মামু ভ্যানিশ করে দিয়েছে।
চারপাশে বাড়ি ভাঙার খুটখাট আওয়াজ। বিচিত্র সুরে কাগজওয়ালা হাঁক দিয়ে যায়। লাউ-কমড়ো, ডাঁটা, লালশাক নিয়ে ঠেলাওয়ালা এগিয়ে যায়। চেনা এই চারপাশের পৃথিবীতে থেকেও তিতির যেন দূরে-বহু দূরে। মামুর গড়ে দেওয়া নতুন এক জগতে।
ঘুমের মাঝে বারবার একটি স্বপ্ন ফিরে ফিরে আসে ওর কাছে।
সেই বুড়ো লোকটি সমুদ্রে ভাসছে। ঢেউয়ের আঘাতে দুলছে তার নৌকা। ভেসে চলছে সে দিনের পর দিন। মাছ তাকে পেতেই হবে। সান্তিয়াগো এত কুশলী জেলে, সে কি মাছ না পেয়েই ফিরে যাবে? জীবন মানে তো লড়াই, জীবন মানেই তো আশা।
অবশেষে ধরা পড়ে বিশাল এক মাছ। কিন্তু মাছটিকে যে হাঙর খেয়ে নিলো। বুকের ভেতর বড়ো কষ্ট ওর, তবু সান্তিয়াগো গর্জন করে ওঠে-তুই আমাকে কত ভয় দেখাবি হাঙর? আমি হারব না। মানুষ কি কখনো হারতে পারে? মানুষের জন্মই তো লড়াই করবার জন্য।
মামুর দেওয়া গল্পের বইটির পাতা বাতাসে সরসর আওয়াজ তুলছে। শেষরাতের মিষ্টি বাতাসের সাথে একরাশ ফুলের গন্ধ ভেসে আসে। বাইরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সাথে ওর দু’চোখে স্বপ্ন ভিড় করে।
গভীর নীল সমুদ্রে ভাসছে সান্তিয়াগোর নৌকা। তার মাঝে শুয়ে আছে তিতির। সান্তিয়াগোর মতো গম্ভীর গলায় সেও বলে,-আামিও হারব না, লড়াই করব। মানুষের জন্ম হারবার জন্য নয়।

SHARE

Leave a Reply