Home প্রবন্ধ নিরানন্দ ঈদুল ফিতর ২০২০ -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

নিরানন্দ ঈদুল ফিতর ২০২০ -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

বিশ্বব্যাপী এক নিকষ কালো গভীর অন্ধকার মৃত্যুপুরীতে ২০২০ সালের পবিত্র ঈদুল ফিতর পালন করেছি আমরা। দেখতে দেখতে আরও একটি ঈদ আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। কিন্তু মহামারী করোনার ভয়ঙ্কর থাবা থেকে আমরা এখনও মুক্তি পাইনি। প্রায় ২৬ লক্ষ বনি আদম মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। গত বছরের ঈদে আমরা কি কোন আনন্দ করতে পেরেছি? সর্বত্র সবাই অজানা-অদৃশ্য ভয়, আতঙ্ক ও মৃত্যু বিভীষিকার মাঝে কাটিয়েছি।
মনে পড়ছে ২৬ মার্চ ২০২০ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো স্বাধীনতা দিবস পালন না করে সাধারণ ছুটিসহ দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন আরোপ করা হয়। ঘর থেকে বের হবার কোনো উপায় ছিল না। সব ধরনের যানবাহন বন্ধ ছিল। রাজপথ ছিল ফাঁকা। শুধুমাত্র কাঁচাবাজার, ফার্মেসি, হাসপাতাল খোলা ছিল। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহনসহ গুটিকয়েক জরুরি সার্ভিসের গাড়ি ও লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স চলেছে মাঝে মাঝে রাস্তায়। আর সবাই গৃহবন্দী। মসজিদে মসজিদে লেগেছে তালা। জামাতে নামায পড়েছে হাতেগোনা কয়েকজন। তাও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে।

কী আশ্চর্য! সরকার নিয়ম বেঁধে দিয়েছে যে, মসজিদে মাত্র ১০জন মুসল্লি প্লাস ইমাম-মুয়াজ্জিন ২ জনসহ মাত্র ১২ জন মিলে জামাতে নামায পড়তে পারবে। এর বাইরে কেউ মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে না। প্রথম জুম’আয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ১২ জনই পবিত্র জুম’আর নামায আদায় করেছেন। অবাক কাণ্ড, সরকারি নির্দেশ পালন হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকগণ গিয়েছিলেন বায়তুল মোকাররমে। তাদের সংখ্যা ছিল ক্যামেরাম্যানসহ ১২০ জন। অর্থাৎ- ১২ জন ধর্মপ্রাণ মুসলমান নামায পড়েছেন আর তা নিরীক্ষণ করেছেন বে-নামাজি ১২০ জন। এদের মধ্যে হয়তো কোন অমুসলিমও থাকতে পারেন।

করোনাকালীন লকডাউন শুধু বাংলাদেশ নয়; সারা পৃথিবীকেই স্তব্ধ করে দিয়েছিল। করোনায় মৃত্যুর চাইতেও চরম আতঙ্ক, ক্ষুধা ও পিপাসার ক্লান্তিতে মারা গিয়েছে অসহায় অনেক খেটে খাওয়া মানুষ।
আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ অতি ছোট একটি দেশ। তবুও এখানকার শহরের মানুষগুলো; বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষগুলো যানবাহনের অভাবে গ্রামে যেতে কত যে নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তা সে সময়কার পত্র-পত্রিকা দেখলে সহজেই বোঝা যাবে। ভারতে ঘটেছে এক মারাত্মক মৃত্যুর মিছিল। বিশাল দেশ বিশাল কর্মযজ্ঞ। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম ও কেরালার শ্রমিকরা গিয়েছে কাশ্মিরে, মুম্বাইতে, গুজরাটসহ বড়ো বড়ো নানা স্থানে কাজের খোঁজে। হঠাৎ করে লকডাউন দেওয়ায় লক্ষ লক্ষ অসহায় শ্রমজীবী মানুষ রাস্তায় আটকা পড়ে যায়। সকল প্রকার যানবাহনসহ চারদিকে সবকিছু বন্ধ। সবাই যার যার গৃহে বন্দী। মানবিক সহযোগিতা কোনদিক থেকে পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় খালি পায়ে হেঁটে যার যার গন্তব্যে ছুটেছে শ্রমিক কাফেলা। ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর নারী-পুরুষ কঙ্কালসার মানুষগুলো পথে পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। তাদের দিকে তাকাবার কেউ ছিলনা।

কী হয়েছিল সুসভ্য নগর অট্টালিকার গৃহবন্দী মানুষগুলোর? দিনের বেলায় কালেভদ্রে দু’চারজন মানুষ, পাখিদের ওড়াউড়ি, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দু’একটি গাড়ি, অ্যাম্বুল্যান্সের ভয়ার্ত চিৎকার প্রভৃতি দেখা এবং শোনা গেলেও সন্ধ্যার সাথে সাথে চারদিকে সুনসান নীরবতা। কোথাও থেকে কোনো জনমানবের সাড়াশব্দ ছিলনা। রাত ৮টাকে মনে হতো ঘুটঘুটে আঁধারে ঢাকা মধ্য রজনী। এ সময় কুকুরের চিৎকার মানবহৃদয়ে ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি করতো। এ অবস্থা একদিন বা দু’দিন নয়; দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। মৃত্যুভয়ের চাইতেও এ অবস্থা আরও চরম ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মানুষ মুক্তি চায়। পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চায়। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ছুটতে চায়। কর্মজীবীরা চায় কর্মস্থলে যেতে। কিন্তু কঠিন কঠোর লকডাউনের কারণে কেউ ঘরের বাইরে বের হতে পারেনা। এ সময় একটার পর একটা মৃত্যুর সংবাদ কানে এসে বিঁধছে, আপনজনের, প্রতিবেশীর, অনাত্মীয়ের অথবা জাতির কোনো বয়োবৃদ্ধ মনীষীর বা সুপ্রসিদ্ধ আলেমের মৃত্যুতে হৃদয় খানখান হয়ে যাচ্ছে। একান্ত ইচ্ছা থাকলেও শরিক হওয়া যাচ্ছে না জানাযায়। কী চরম দুরবস্থা!

করোনা মহামারীর প্রথম উৎপত্তিস্থল চীনের উহান শহরের বাসিন্দারা সিদ্ধান্ত নিলো, আমরা যে বেঁচে আছি তা কীভাবে বুঝবো? কীভাবে জগদ্বাসীকে বোঝাবো? তারা প্রতিদিন রাত ৯টায় যার যার বাসার/ফ্ল্যাটের জানালায় বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাদের স্মার্ট ফোনের টর্চ লাইট জালিয়ে রাখবে পরপর কয়েক মিনিট। ইতালির রোম শহরের বাসিন্দারা রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ে হারমোনিয়াম, বেহালা, বিউগল ও গিটার নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল নিজ নিজ বারান্দায়। ইচ্ছেমতো সুরে-বেসুরে গান গেয়ে জানান দিল আমরা বেঁচে আছি….। স্পেনের মাদ্রিদের বাসিন্দারা যার যার অবস্থান থেকে ঘণ্টাধ্বনি বাজিয়ে চললো ইচ্ছেমতো। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইতালি আর স্পেনে মৃত্যুর সংখ্যা এমনভাবে বেড়ে গেল যে, এই উন্নত দেশগুলোর চিকিৎসাব্যবস্থা একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। চারিদিকে মৃত্যু আর মৃত্যু। স্পেনের প্রেসিডেন্ট নিরুপায় হয়ে ঘোষণা করলেন, এই অতিমারীর মৃত্যুর মিছিল ঠেকানো আমাদের সাধ্যের বাইরে। আমাদের রক্ষার ভার ছেড়ে দিলাম ওপরওয়ালার ওপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সুপার পাওয়ারের সকল দম্ভ-দর্প করোনা ভাইরাসের চপেটাঘাতে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

একদিন রাতে ১০টা কি ১১টার দিকে লাহোর, করাচি, শ্রীনগর, দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, কলকাতা, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও আরাকানের বাসিন্দারা হঠাৎ করে সারা দুনিয়াকে জাগিয়ে দিল গগনবিদারী আযানের ধ্বনিতে। উদ্দেশ্য ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনির তীব্র আঘাতে করোনাভাইরাস পালিয়ে যাবে অন্য কোন গ্রহে। মুরুব্বিরা জানালেন গত শতাব্দীর ষাট এর দশকে মহামারী কলেরা ও গুটি বসন্ত তাড়াতে তাঁরা এই ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
গত রমযানে একজন ব্যক্তিও ওমরাহ্ পালনের জন্য পবিত্র মক্কা ও মদিনায় যেতে পারেননি। পবিত্র কা’বা ও মসজিদে নববীর দরজা ৯ মার্চ থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। কা’বা শরীফের মহামান্য খতিব আবদুর রহমান আস সুদাইসি বুকফাটা কান্নায় আল্লাহ্র দরবারে ফরিয়াদ জানিয়ে বলেন,
‘হে আল্লাহ! আপনার ঘর থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করবেন না।
হে আল্লাহ! আমাদের পাপের কারণে পবিত্র মসজিদের নামাযের জামাত থেকে বঞ্চিত করবেন না।
হে আল্লাহ! আপনার কাছে আমাদের আবার ফিরিয়ে নিন।
হে আল্লাহ! আমাদের তাওবা কবুল করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের এবং মুসলিম উম্মাহ্কে সব ধরনের মহামারী ও দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে হেফাজত করুন।
হে আল্লাহ! আমাদের এ অবস্থার ওপর দয়া করুন। আমাদের অক্ষমতাগুলো দূর করে আমাদের ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আপনিই আমাদের অভিভাবক।’
কী আশ্চর্য! জন্মের পর থেকেই আযানে শুনে এসেছি ‘হাইয়ালাস্সালাহ্ হাইয়ালালফালাহ্’- এসো নামাযের পানে এসো কল্যাণের ধ্যানে। কিন্তু তার পরিবর্তে পবিত্র মক্কা মদীনাসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আযানের নতুন আহ্বান- ‘সাললু ফি রিহালিকুম’ অর্থাৎ নিজ নিজ জায়গায় নামায পড়ে নাও। কুয়েত, কাতার, লেবানন, ফিলিস্তিন, সুদান, মিসর, ইয়েমেন, মরক্কো, বাহরাইন, ওমান, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মসজিদ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে মুয়াজ্জিন ‘হাইয়ালাস্সালাহ্ হাইয়ালালফালাহ্’ এর পরিবর্তে উচ্চস্বরে নির্দেশ দিচ্ছেন ‘আস্সালাতু ফি বয়ুতিকুম’ অর্থাৎ নামায ঘরে পড়ো।
পৃথিবীর কোটি কোটি মুমিন-মুসলমানের হৃদয় পড়ে থাকে মসজিদ পানে। এক ওয়াক্ত নামায পড়ার পর পরবর্তী আযানের ডাক শোনার জন্য কান খাড়া করে রাখেন তারা। কিন্তু আযান হয়, নামাযী মসজিদে যেতে পারে না। এটা এমন এক নিষ্ঠুর নীরবতা, মসজিদের পিলারগুলো, মিম্বর-মেহরাব, অজুখানা ও নামাযের কাতারগুলোকে নিশ্চুপ করে দিয়েছে অদৃশ্য যমদূত করোনাভাইরাস। তারা যেন চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে বেদনার চাপা কান্নায় অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। নীরবে আপনজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

এভাবে কেটে গেল মার্চ-এপ্রিল অর্থাৎ রজব-শাবান মাস। এল পবিত্র রমযান। কিন্তু মসজিদের তালা বন্ধই রয়ে গেল। সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল রইল। ১০ জন মুসল্লির বেশি কেউ তারাবিহ্ নামাযে অংশ নিতে পারবে না। ফলে যে যার সুবিধামতো নিজ নিজ ঘরকেই নামাযের মুসল্লা বানিয়ে নিলো। মৃত্যুর বিভীষিকায় মানুষের মন এমনিতেই ভেঙে পড়েছিল। চারদিকে শুধু নীরবতা। এর মাঝে শান্তি ও আশার আলো নিয়ে এলো তারাবিহ্র নামায। রাত ৮টার পর প্রায় সকল পাড়া-মহল্লা, নগর-মহানগরের ঘরে ঘরে জামাতে তারাবিহ্র নামায পড়া হলো। এতদিন যে মা-বোনেরা তারাবিহ্র জামাতে শরিক হতে পারতেন না তারাও নিজ হাফেজ সন্তানের পেছনে, নিজ স্বামীর পেছনে অথবা পুত্রসম কোন মাদ্রাসা পড়–য়া ছাত্রের পেছনে হৃদয়-প্রাণ ঢেলে দিয়ে তারাবিহ্র নামায পড়ার সুযোগ পেল। এই মহামারী করোনা আমাদের ঘরগুলোকে বেহেশতের এক একটি টুকরো বানিয়ে দিল। কিন্তু একটি কথা না বললে নয়, চিরাচরিত নিয়মে ইফতার পার্টির কোন আয়োজন চোখে পড়েনি।
মৃত্যুর মিছিল থেমে থাকেনি। রোগী নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে মানুষের দৌড়াদৌড়ির শেষ ছিল না। কত রোগী যে শুধু একটি ভেন্টিলেটর সংযুক্ত আইসিইউ শয্যা না পেয়ে এই হাসপাতাল থেকে ঐ হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপের মাঝেই মৃত্যুবরণ করেছে। ঐ সময়কার পত্র-পত্রিকাগুলো দেখলে এখনও স্বজনহারা মানুষের ভয়াল কান্নার ছবি ফুটে ওঠে। আর এতেই ফুটে উঠেছে চিকিৎসাব্যবস্থায় খোদ আমেরিকা, ব্রিটেনসহ বাংলাদেশের চরম অবহেলা ও দৈন্যতা……।

বলতে লজ্জা লাগছে তবুও না বলে উপায় নেই। মানুষ কত নিষ্ঠুর হতে পারে এই মহামারী আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। আপন পিতার লাশ দাফন করতে যায়নি অতি আদর ও যতেœ লালিত সন্তানেরা। চট্টগ্রামে এক সম্পদশালী ব্যক্তির লাশ অ্যাম্বুলেন্স করে তার বাড়ির নিচতলায় পাঠানো হয়। দু’দিন ঐ অবস্থায় পড়েছিল। ৪ তলা ভবন থেকে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাড়াটিয়াসহ একটি প্রাণীও নিচে নামেনি। কোন আত্মীয় স্বজন দেখতে আসেনি। শেষ পর্যন্ত আল মানাহিল ফাউন্ডেশনের সেবকগণ কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেন।
নারায়ণগঞ্জে অসংখ্য হিন্দুর এবং চট্টগ্রামে হিন্দু ও বৌদ্ধদের লাশ পুড়িয়েছে ও দাফন করেছে মুসলমান স্বেচ্ছাসেবীরা। তাঁদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন। মানবতা এখনও মরে যায়নি। তার ভূরিভূরি প্রমাণ এই মহামারী আমাদের জন্য রেখে গেছে। ধনীরা তো অসহায় খেটে খাওয়া মানুষকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। আদর্শবাদী তরুণরা, মানবতাবাদী ছাত্র-ছাত্রীরা অলিতে-গলিতে, পাড়ায়-মহল্লায় গিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দিয়েছে। এমনকি স্বল্প আয়ের লোকগুলো মানুষের উপকারে নিজের অর্জিত অর্থের কিছু অংশ হলেও দান করেছে। এ-ও দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুধার্ত কাক ও কুকুরকে অনেকে খাদ্য দিয়েছে। পাশাপাশি এ-ও দেখে হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, মানুষ কি নিষ্ঠুর হতে পারে, কি অমানবিক হতে পারে, দরিদ্র-অসহায় মানুষের জন্য যে রিলিফের ত্রাণসামগ্রী সরকারের পক্ষ হতে দেওয়া হয়েছে অনেক অসাধু জনপ্রতিনিধি তা আত্মসাৎ করেছে।

করোনাকালে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের শুধু ছন্দপতন ঘটেনি; আমাদের ভাষা এবং আচরণেও নানা পরিবর্তন এসেছে। মুসলিম মেয়েদের নেকাব নিয়ে সারা পৃথিবীতে কত তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে তার কমবেশি আমরা সবাই জানি। আর এই করোনা কী করল! মেয়েদের কথা আমাদের চিন্তা থেকে বাদ-ই দিলাম। এখন সমগ্র পৃথিবীর পুরুষরা মাস্ক বা মুখোশ নামের নেকাব পরা ছাড়া ঘর থেকে বের হতে পারে না। একি মহা পরাক্রমশালীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার উদাহরণ নয়! অন্য একটি সুফলও এসেছে, যা সবার নজরে পড়েছে, লক্ষ কোটি ক্লিন সেভ পার্সন হয়েছেন দাড়িওয়ালা সুদর্শন সুপুরুষ।
করোনা আমাদের ভাষাকেও নতুন নতুন শব্দ দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে। আজকাল আমরা কথায় কথায় বলি- মহামারী, অতিমারী, লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, মাস্ক, স্যানিটাইজার, পিপিই, স্বাস্থ্যবিধি, সোস্যাল ডিস্ট্যান্স, সামাজিক দূরত্ব, সম্মুখযোদ্ধা, কমিউনিটি ট্রান্সমিশন, হার্ড ইমিউনিটি, সীমিত পরিসরে, প্লাজমা থেরাপি, হোম অফিস, অনলাইন ক্লাস, জুম, ভার্চুয়াল মিটিং, ওয়েবিনার, নিও নরমাল (নতুনভাবে স্বাভাবিক জীবন), ভ্যাকসিন, নো মাস্ক নো সার্ভিস, ক্লাস-এক্সামবিহীন অটোপ্রমোশান…… এবং আরও কত কি!

দেখতে দেখতে ঈদ এল। কিন্তু আনন্দ এল না। করোনা পৃথিবী থেকে আনন্দ উঠিয়ে নিয়ে শোকের চাদরে ঢেকে ফেলল পৃথিবী। লক্ষ লক্ষ লোক মৃত্যুমুখে পতিত হলো। হাজার হাজার চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যও মারা গেলেন। যারা সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে মানুষের পাশে বুক টান করে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে এই ঈদে কোনো স্ত্রী তার স্বামীর কাছে লাল শাড়ির আবদার করেনি। কোনো ছেলে বা মেয়ে বাবা-মায়ের হাত ধরে শপিং মলে যায়নি। মৃত্যু শোক, লকডাউন, চরম দারিদ্র্য আর অভাব-অনটনের মাঝে নিরানন্দ ঈদ ২০২০ কাটিয়েছে। বড়ো বড়ো শহরের প্রবেশ ও প্রস্থানের মুখে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি। কাউকে শহর ছেড়ে বের হতে দেওয়া হয়নি আবার মফস্বল থেকেও নগরে প্রবেশ করতে পারেনি। ঈদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মসজিদে গিয়ে ঈদের নামায পড়েছি। দূর থেকে আমরা শুধু একে অন্যকে সালাম দিতে পেরেছি কিন্তু পারিনি বুকে বুক মিলিয়ে কোলাকুলির পরম আলিঙ্গনে একে অপরকে জড়িয়ে নিতে। মমতার বন্ধন যেন করোনার দেয়াল আমাদের আপনজনদের আড়াল করে দিয়েছে। এ আড়াল শুধু এ বুকে আর ও বুকে নয়; গোটা পৃথিবী থেকে।

ঈদের একটি বিশেষ অনুষঙ্গ ঈদসংখ্যা। দেশের সব লেখক, পাঠক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে কখন ঈদসংখ্যা বাজারে আসবে। হকারদেরকে বলে রাখে যার যার পছন্দ মতো ঈদসংখ্যা প্রদানের জন্য। কিশোরকণ্ঠ, দ্বীন দুনিয়া, ফুলকুঁড়ি, কিশোর পাতা প্রভৃতি প্রকাশ হতো নিয়মিত প্রতি বছর। লকডাউনের কারণে ২০২০ সালে কোথাও কোন পত্রিকার ঈদসংখ্যা প্রকাশ পায়নি। না ছোটদের, না বড়োদের। এক নিরানন্দ ঈদ ঘরের কোণে শুয়ে বসেই কাটাতে হয়েছে। আমাদের সবার একান্ত আশা ২০২১ সালের ঈদ আগের মতো আনন্দের বন্যা নিয়ে সারা পৃথিবীতে ফিরে আসবে। সবার প্রতি ঈদ মোবারক।

SHARE

Leave a Reply