Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস সাদা পাথরের কান্না -সোলায়মান আহসান

সাদা পাথরের কান্না -সোলায়মান আহসান

খবরটা জেনে বিশ্বাস হতে চায়নি সবার। এমন ঘটনা জীবনে এই প্রথম শোনা। মালাচাচীকে কে বা কারা ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিয়েছে। মারাত্মক আহত হয়ে তিনি মেডিক্যালে ভর্তি।
মালাচাচী নাকি দুপুরে গোসল করে ভেজা কাপড় রোদে শুকাতে দিতে গিয়েছিলেন। যেভাবে হামেশা দেওয়া হয়। এমন সময় একটা দমকা হাওয়া আসে। দক্ষিণ দিক হতে। এর পরপর অদৃশ্য হাত চাচীকে পাঁজাকোলা করে নাকি বাড়ির পেছনে উড়িয়ে ফেলে। ওই বাড়ির পেছনে। সবজির বাগানে। চাচী পড়ে থাকেন বেহুঁশ হয়ে। কতক্ষণ তা কেউ জানে না। কী প্রয়োজনে বাড়ির কাজের মেয়ে ফরিদা বাগানে গিয়ে দেখতে পায় চাচীকে। নাক দিয়ে গল্গল্ রক্ত ঝরছে। হুঁশ নেই। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে দৌড়ে এসে খবরটা দেয় প্রথম শাহরিনকে। শাহরিন তার আব্বুকে সঙ্গে নিয়ে তখনই বাগানে এসে দেখে, পড়ে আছে তার আম্মু, বেঁহুশ হয়ে।
‘ইয়াল্লা-আম্মুর কিতা অইছে-’ শাহরিনের আর্ত চিৎকার কান্না। দৌড়ে আসে আইরিন। ছোট চাচীরা। সবাই মিলে ধরাধরি করে ঘরে এনে শুইয়ে দেওয়া হয়। হুঁশ ফেরাতে মাথায় পানি ঢালতে থাকে। শাহরিন আইরিন দুইবোন মিলে। স্থানীয় টি গার্ডেনের ডাক্তার বিশ্বমিত্রকে খবর দেওয়া হয়। সুজন স্ট্যান্ডবাই থাকা একটা গাড়ি নিয়ে এক ঘণ্টার মধ্য নিয়ে আসে ডাক্তারবাবুকে।
ইনজেক্শন পুশ্ করার পর জ্ঞান আসে। কিন্তু গায়ে প্রচ- ব্যথা অনুভব করেন। ডাক্তারের পরামর্শে প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট দেওয়ার পর নিয়ে যাওয়া হয় সিলেট। ইতোমধ্যে মালাচাচীর ছেলে শাহাবকে খবরটা দেওয়া হয়। সে মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। বেসরকরি মেডিক্যাল কলেজে ফাইনাল ইয়ারে। তার মেডিক্যাল কলেজের হসপিটালেই চাচীকে ভর্তি করা হয়। যাতে শাহাব সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান করতে পারে। পরে জানা যায় চাচীর একটা হাত একটা পা এবং বুকের পাঁজরের হাড় দু’খান ভেঙেছে। তবে মাথায় তেমন আঘাত না লাগায় ব্রেন একদম ঠিক আছে। সিটি স্ক্যান করে জানা যায়।
টেলিফোনে শাহরিন দুপুরে খবরটা দেয় কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে। ঘটনা এর আগের দিনের। তুতুলের সঙ্গে কথা হয় শাহরিনের।
ব্যস, এরপর চলে টেলিফোনের পর টেলিফোন। এ প্রান্ত ও প্রান্ত উভয় প্রান্ত থেকে। প্রতিদিন অন্তত চার-পাঁচ বার। উদ্বেগে দিন কাটে।
মালাচাচী এদের সবার খুব প্রিয় চাচী। আব্বুর ফুপাতো ভাই আনছার চাচার স্ত্রী। ভীষণ ভালো মানুষ তিনি। বেড়াতে গেলে এদের এটা ওটা বানিয়ে আনিয়ে খাওয়াতে ব্যস্ত শুধু হন না, এখানে সেখানে বেড়াতে নিয়ে মাতিয়ে রাখেন তিনি। তেমনি মেয়ে দুটোও হয়েছে মায়ের মতো মিশুক। আর মেহমানদারি কাকে বলে! তুতুল-পুতুল-আফিফরা এখন বেড়ানোর কথা এলেই নিজেদের গ্রামের বাড়ি বাদ দিয়ে আব্বুর ফুপুর বাড়ির কথা আগে তোলে। এইতো গ্রীষ্মের ছুটিতে ওই চাচীর বাড়িতে যাওয়ার কথা উঠেছিল। গেল বছর হেমন্তেও ওরা মালাচাচীর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছে। সেবার একটা জায়গায় ওদের যাওয়া হয়নি। চাচী বলেছিলেন-তোমরা আগামী গ্রীষ্মের ছুটিতে আসিও, নিয়া যাইব, শাহাবরে খবর দিয়া আনিব।
সেই চাচীর এমন দুর্ঘটনার খবর শুনে ওদের মন খারাপ হবে না? এখন ওরা চাচীর জন্য উদ্বিগ্ন। কীভাবে ঘটল এমনটা? কে ছাদের ওপর থেকে চাচীকে ফেলল? চাচাদের মধ্যে ভাইয়ে ভাইয়ে খুব মিল। তবে এক চাচী নাকি একটু হিংসুটে। কিন্তু একটা মানুষকে তুলে ছুড়ে মারতে হলে অনেক শক্তি থাকা দরকার শরীরে। তেমন শক্তি কি কোন মেয়েলোকের গায়ে থাকে?
তুতুল বারবার জানতে চায়-চাচীকে কে বা কারা ফেলল? জবাবে শাহরিন বলেছে-আম্মু তেমন কিছু বলতে পারেন না। শুধু বলেছেন-একটা দমকা বাতাস এসে তার গায়ে লাগতেই তাকে কে যেন শূন্যে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ধপাস্ একটা শব্দ কানে আসে।
তাহলে কি এটা জিনের কাজ? তুতুল পাল্টা প্রশ্ন করেছিল। শাহরিন জবাবে বলেছিল-জিনের হইতে পারে, পেরতেরও হইতে পারে। পেরত মানে আমরা যাকে ভূত-প্রেত বলি আরকি!
জিনের কথাতো কুরআনে আছে। জিন বিশেষ করে দুষ্টু জিনরা মানুষের ক্ষতি করতে চেষ্টা করে। ইবলিস তো জিন ছিল। কিন্তু ভূত-প্রেতের কথা শুনেছে ঠিক, এর সম্পর্কে তেমন সঠিক জ্ঞান বা ধারণা তুতুলের নেই। বিশ^াসও তেমন করে না এদের অস্তিত্ব।
পাল্টা প্রশ্ন করেছে- ‘পেরত বা প্রেত ওইটা আবার কী, আছে নাকি?’
‘আছে-আছে এইবার আসিও দেখাইমুনে।’ শাহরিনের কথায় একটা দৃঢ় বিশ^াসের ঘ্রাণ পাওয়া গেল। হয়তো আছে। হয়তো নেই। তুতুল শুধু চাচীর কথা ভাবতে চায়।
বাসায় চাচীর ব্যাপারটা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলে কয়েক দিন। তুতুলের আম্মু খোশনূর বললেন-এসব ঢাকায় বসে শুধু আলোচনা করা, খবর নেওয়ার মধ্যেই কি আমরা সীমাবদ্ধ থাকব? প্রশ্নটা তুতুলের আব্বুকে উদ্দেশ্য করে খেতে খেতে বলা।
‘ঠিক বলেছ আম্মু, মালাচাচীকে দেখতে যাওয়া দরকার।’ পুতুল বলে উঠল। খাওয়ার টেবিলে সেও ছিল।
‘দেখতে যাওয়া বললেইতো পারা যায় না-আমরা সবাই শিকল দিয়ে বান্ধা না?’ রায়হান রহস্য করে।
‘শিকল! কোথায় শিকল আব্বু?’ আফিফ বলল মুখে লোক্মা না তুলে।’
‘হুম! অদৃশ্য শিকলে বান্ধা-তোর আম্মুর স্কুল, আমার চাকরি, তোমাদের স্কুল এইসব শিকল আরকি!’ একটু বিজ্ঞের হাসি হাসল রায়হান।
‘এতোবড়ো দুর্ঘটনার খবর পেয়েও আমরা কেউ যাবো না?’ খোশনূর ম্যাডাম বলল।
‘ম্যাডাম, কথা একদম খাঁটি, তাহলে দেখি আমি একা একা সিলেট থেকে ঘুরে আসতে পারি কি না, শুক্রবার ছুটির সঙ্গে এবার ভাষা দিবসের ছুটি যুক্ত, মানে দু’দিন ছুটি এমনিতে, তার সঙ্গে একটা ছুটি নিয়ে নিলেই।’
‘বাহ্ তুমি একা একা গেলেই হলো, এতো বড়ো ঘটনা-’খোশনূর রাগতভাবে বলল।
‘আব্বু, আমরাও যাবো-’ তুতুলের আব্দারমাখা কণ্ঠ।
এভাবে যাওয়ার ব্যাপারে সবার মত পজিটিভ। কিন্তু হুট্ করে যাওয়াটা যে কোনভাবেই সম্ভব নয় তা সবাই জানে। খোশনূর যে স্কুলে চাকরি করে সেখানে ছুটি মেলা ভার। আর রায়হান ব্যাংকার শুধু নয় ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, মতিঝিল লোকাল ব্রাঞ্চের। বাণিজ্যিক পাড়ার ব্রাঞ্চ। ব্যস্ততা সংজ্ঞার সঙ্গে মিল নেই এখানে। আর তুতুল পড়ে এইটে। সামনেই জেএসসি। পুতুল সিক্সে এবং আফিফ ফাইভে তারও পিইসি পরীক্ষা। মানে ওরা বান্ধা পরীক্ষার শিকলে।
যাওয়ার ব্যাপারটা এভাবে যখন কর্তব্যের শিকলে আটকে যাচ্ছিল, তখন এলো শাহাবের পক্ষ থেকে প্রায় নিষেধাজ্ঞা। শাহাব জানাল, প্রথমে তার চাচী খোশনূর এবং পরে চাচা রায়হানকে। আব্বু কইছুইন আম্মুরে এখন দেখতে সিলেট না আসতে। কারণ আম্মুর দুইটা অপারেশন বাকি। অপারেশন বাদে বোঝা যাইব তার শরীরের প্রকৃত অবস্থা। দোয়া করবেন বেশি বেশি আম্মুর জন্য সবাই। রাজনগর আম্মুরে নেওয়ার পর আপনারা আসবেন।
ব্যস, মিটে গেল ঝামেলা! এই কথার পর সিলেট যাওয়ার চিন্তা বাতিল। কিন্তু যাওয়া বাতিল হলেও চাচীর শারীরিক অবস্থার খবরাখবর নেওয়া চলল। প্রতিদিন সকাল বিকাল।
একদিন যায়। দু’দিন যায়। একেকটা ভালো খবর আসতে থাকে। অপারেশন সাকসেসফুল। হুঁশ আসা। কথা বলতে পারা। স্মৃতি তাজা থাকা। ইত্যাদি।
মাসখানেক চাচীকে হসপিটালে কাটাতে হয়। পালাক্রমে আনছার চাচা, শাহরিন-আইরিন হসপিটালে থাকে। বাড়িতে চাচীকে নিয়ে আসার পর আনছার চাচা জানালেন যাওয়ার জন্য। কিন্তু যাওয়া আর তখন হয়নি।

দুই.

গ্রীষ্মের ছুটিতে নয় যাওয়ার প্রোগ্রাম হলো পূজোর ছুটিতে। কালটা শরৎ। বেশ মজার। মেঘ-বৃষ্টির খেলা। এর ভেতর থাকল অনেক কথা। অনেক জল্পনা কল্পনার জাল বোনা তুতুলদের। চাচী এখন সুস্থ, কী হবে গিয়ে।
অন্য কোথাও এবার যাওয়া যাক। রাজশাহীতে নাকি বাদশাহী করেন রায়হানের এক চাচাত ভাই। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক, যেই সেই কথা নয় ‘বাদশাহী’ করারই কথা! সেই ফারুককে যোগাযোগ করে রাজশাহী বেড়ানোর ইচ্ছা জানাতেই খুশি মনে জানাল-চলে আসুন ভাইজান! বরেন্দ্র সভ্যতার ইতিহাসটা নিজ চোখে দেখে যান!
দোটানায় পড়া গেল। তুতুল পুতুল রাজশাহী যেতে চায়। ট্রেন জার্নি ওদের ইচ্ছা। তাই ঘড়ির পেন্ডুলামের মত দুলতে থাকল-রাজনগর না রাজশাহী? খোশনূর ভাঙল দ্বিধা দ্বন্দ্ব, কী যে বলো না তোমরা, ভাবীকে দেখার জন্য আমার মন সেই কবে থেকে ছুটে গেছে!
সিদ্ধান্ত হলো রাজনগর যাওয়া। সেভাবে জানান হলো আনছার চাচাকে। শাহরিন আইরিন জেনে খুশিতে আটখানা। চাচীও খুশি। চলল এ প্রান্ত ও প্রান্ত থেকে ফোনে কথা চালাচালি। ফারুককে জানান হলো এবার নয় রাজশাহী।
কোথাও বেড়াতে যাওয়া মানে তুতুল-পুতুলদের নোয়ামামা খবিরকে চাই। কিন্তু সমস্যা দেখা গেল গার্ডেন ম্যানেজার খবির সাথী হতে পারছে না এবার। জানিয়েছে তার কোম্পানির বিগ-বস্ লন্ডন থেকে তশরিফ আনবেন। একদম নড়চড় করা চলবে না। বিগ-বস্ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট মেম্বারও। সরকারি প্রটোকলও তাকে মানতে হবে। তাই, রিসেপ্সন দিতে সরকারি কর্মকর্তাদের যুক্ত করতে হচ্ছে। মনটা দমে গেল খানিকটা তুতুলদের। নোয়ামামা ছাড়া? মনটা কেমন জানি করে।
হই হই রই রই
আনো দেখি দই খই
আমরা যাব রাজনগর
নেই কথার নড়চড়,
হই হই রই রই
আনো দেখি চিড়া দই!
ছড়া আওড়াচ্ছিল পুতুল। পুতুলের কবি-প্রতিভা বেশ দেখা যাচ্ছে ইদানীং। তুতুল ক্ষেপানোর জন্য বলে, স্বভাব কবি গোবিন্দ দাশ। পুতুল তাতে ক্ষেপে যায়। এভাবে পুতুলকে ক্ষেপাচ্ছিল তুতুল। পুতুল কান্না করতে করতে আম্মুর কাছে গিয়ে নালিশ দিলো। আম্মু বললেন-তুমি শুধু শুধু ক্ষেপছো কেন? জান না গোবিন্দ চন্দ্র দাশ নামে একজন স্বভাব কবি ছিলেন? তিনি মুখে মুখে কবিতা রচনা করতে পারতেন। শোনো তাহলে তার একটা কবিতা-
ধৈর্য ধর ধৈর্য ধর, বাঁধ বাঁধ বুক,
শত দিকে শত দুঃখ আসুক-আসুক!
এ সংসার কর্মশালা
জ¦লন্ত কালান্ত জ¦ালা,
পুড়িতে হইবে খাদ থাকে যতটুক।
‘বাহ্ তোমার দেখছি ছেলেবেলার কবিতা এখনও মুখস্থ আছে!’ পুতুল বলল নাচতে নাচতে।
‘হ্যাঁ মামনি, এমন সুন্দর কবিতা মনে থাকবে না। আগের কবিতায় সুন্দর উপদেশ থাকতো। জ্ঞানের কথা থাকতো। তাই পড়লে মনে গেঁথে যেতো। যেমন আরেকজন কবির কথা বলি-কবি জীবনানন্দ দাশের কথা শুনেছ?
‘হ্যাঁ, শুনেছি আম্মু, অনেক বড় কবি-বাঙলার প্রকৃতি নিয়ে কবিতা লিখতেন-’
সেই কবির মা-ও ছিলেন বড় কবি, কুসুম কুমারী দাশ-তাঁর একটা কবিতা এতো লোকপ্রিয় হয়, যা আজও মানুষের মুখে মুখে-
আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে;
মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন,
‘মানুষ’ হইতে হবে-এই তার পণ।
পুতুলের মন খুশি হয়। ভুলে যায় তুতুল আপুর কথা। চলে আসে নিজের ঘরে। তুতুল আর পুতুলের ঘর একটাই। দু’বোন পাশাপাশি একজনী ছোট দুটো খাটে শোয়। পড়ার টেবিলও দু’জনের দুটো। ঘরের উত্তর দক্ষিণ কোণে ফিট করা। যাতে পড়ার সময় খুনসুটি না জমাতে পারে।
গোছগাছ করতে হবে। আগামীকাল সকালের ট্রেনে ওরা যাবে। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন তাদের বাসা থেকে অনেক দূর। তার মানে খুব ভোরেই রওনা দিতে হবে। কু-ঝিক্ ঝিক্-ট্রেনের কথা মনে পড়তেই বুকে খুশিতে ভরে যায়।
পুতুল তাই নিজের কাপড়-চোপড় একটা জার্নি ব্যাগে গুছিয়ে রাখে জটজলদি। এসব ব্যাপারে লেট লতিফের গল্পটা মনে রাখে সবসময়। একজন লোক নাকি সবকিছুতেই লেট করতো-ট্রেন ধরতো দৌড়ে-ট্রেন ছাড়ার পর। তাই তার নাম হয়েছিল লেট লতিফ। সে তা হতে চায় না।
আম্মুর তাড়া খেয়ে তুতুলও ঘরে এসে নিজের কাপড়-চোপড় ব্যাগভর্তি করতে লেগে যায়। একের কাপড় অন্যের সঙ্গে অদলবদল না হওয়ার জন্য এদের প্রত্যেকের আলাদা ব্যাগ। অনেক জামা-কাপড় তুতুল-পুতুলের এক। মাপ বা ডিজাইনের যা পার্থক্য। পুতুলটা তিন বছরের ছোট হলে কি হবে বাড়ন্ত বেশি বলে তুতুলের কাঁধ ছাড়িয়ে মাথা ছুঁই ছুঁই। জামার মাপ সহসা পার্থক্য করা কঠিন। তুতুলের জামা পুতুল পরে ফেলার ঘটনাও মাঝে মাঝে ঘটে। আর তা নিয়ে বাধে দু’বোনে তুমুল হাতাহাতি। সে কারণে আম্মু আজকাল এক ডিজাইনের কাপড় নিলেও রঙটা ভিন্ন অথবা কাটিং ভিন্ন দেন।
গোছগাছ কমপ্লিট করে পুতুল নিজ বিছানায় গুনগুন করে একটা ছড়া গান ভাজছিল-
দোল দোল দোলনি
রাঙ্গা মাথায় চিরুনি
বর আসবে এক্ষনি
নিয়ে যাবে তক্ষনি….
‘পুতুল, তোর গোছানো শেষ?’
তুতুল তার লাল রঙের জার্নিব্যাগটার চেইন এক টানে খুলে বলল।
‘হ্যাঁ- কখোন-’
‘তুই কি এখুনি ঘুমাবি?’ তুতুলের আবার প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ-কাল ভোরে উঠতে হবে যে-’
পুতুল চুপ করে যায়। তুতুলও দ্রুত গুছিয়ে ফেলে তার ব্যাগ।

তিন.

ট্রেনে উঠে জানালার পাশের সিট দখল করা পুতুলের বরাবরের স্বভাব। ট্রেনে বসে বাইরের দৃশ্য দেখা উদ্দেশ্য। তা ছাড়া চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে ঝড়ো বাতাস গায়ে লাগা পছন্দ করে সে। তুতুল এখানে ফোড়ন কাটে-প্রকৃতি প্রেমিক।
পুতুলের মৃদু প্রতিবাদ-‘একটা আকার যোগ করতে হবে। তা নাহলে গ্রামার ভুল হবে। এ জন্যইতো তুতুল আপু পরীক্ষায় বাংলায় কম নম্বর পায়।’
‘কবে কম নম্বর পেলামরে!’ তুতুলের প্রতিবাদ।
আফিফ ব্যস্ত মোবাইলে গেম খেলা নিয়ে। পুতুল জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিল। আকাশে পেঁজা-তুলোর মত মেঘ ভেসে যাচ্ছে। টেলিফোন তারে বসা ফিঙে পাখিদের লেজ নাচানো। ছোট খালে ছোট ছেলে-মেয়ের মাছ মারার দৃশ্য। রেল লাইনের পাড় ঘেঁষে গরুর ঘাস খাওয়া, এসব দেখে পুতুলের মন তরতাজা হয়ে উঠে।
‘পুতুল, এ্যাই পুতুল, একটা কবিতা রচনা কর না! শুনব।’ তুতুল বলল।
‘সত্যি, তুমি আমার কবিতা শুনতে চাও?’ পুতুল বাইরের দৃশ্যে চোখ রেখে বলল-হুম্ তাহলে একটা ছড়া শোনাই-’

ঝিক ঝিক রেল গাড়ি
আমরা যাব মামা বাড়ি
মামাবাড়ি মামী নাই
আমরা সবে খাই দাই।
‘বাহ্ খুউব সুন্দর হয়েছে ছড়া, পুতুল মনি! তবে ছড়ায় একটু ভুল আছে। আমরা মামাবাড়ি যাচ্ছি না। চাচা বাড়ি যাচ্ছি।’ তুতুল বলল।
হি হি হি হি…
পুতুল হাসে।

হিস্ হিস্ হিস্ হিস্ …হিস্ হিস্ হিস্ হিস্ …
পৌনে দুটোয় ট্রেন কুলাউড়া স্টেশনে ইন করল। স্টেশন আদি আমলের। ব্রিটিশ আমলের। তবে বড়সড়। জংশন বটে।
শুরু হয়ে যায় ছুটোছুটি মানুষের। কেউ নামছে। কেউ উঠতে চেষ্টা করছে। যাত্রীর সংখ্যাও বেশ। তুতুলরা একে একে নেমে প্লাটফর্মে এক স্থানে দাঁড়ায়।
‘চাচা-চাচা-আমি আইছি আমি আইছি-’
নীলরঙের শার্টপরা হাত দিয়ে ইশারা করছিল শাহাব। দ্রুত হেঁটে শাহাব ভাইয়া হাজির হলো।

‘চলেন গাড়ি বাইরে।’ শাহাব ভাইয়ার সাথে সুজনও। সুজন বড়ো বড়ো দুটো স্যুটকেস হাতে তুলে নেয়। শাহাব নেয় ছোট দুটো জার্নি ব্যাগ। স্টেশন থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠে। কুলাউড়া থেকে রাজনগর মুন্সিবাজার আনছার চাচাদের বাড়ির দূরত্ব অন্তত দশ কিলো। আবার শ্রীমঙ্গল থেকে দূরত্বটা আরো বেশি। তাই এখানে আসার সহজ উপায় মাইক্রো অথবা কার। এর আগে যতবার রায়হানরা এসেছে মাইক্রোতেই। এবার তুতুল পুতুলরা বায়না ধরল ট্রেনে চড়বে। তাই এই বাড়তি ঝামেলা পোহানো।
‘তোমার আব্বা ভালো আছেন? ভাবীর কী অবস্থা?’ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দু’এক মিনিট চলতেই রায়হান জানতে চায় শাহাবের কাছে।
পাজেরো নিয়ে এসেছে শাহাব। ড্রাইভারের পাশের সিটে সুজন ও শাহাব চাপাচাপি করে বসেছে।
‘জি চাচা আব্বু ভালা, আম্মু হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন।’
চাপাচাপির জন্য শাহাব পেছন ফিরে জবাবটা দিতে পারল না। উসখুস করে।
‘আহ্হা এমন ফুর্তিবাজ কাজের মানুষটার হুইল চেয়ারে দিন কাটে!’
‘সবই আল্লাহর ইচ্ছা, তবু জীবনটা রক্ষা পেয়েছে-’ খোশনূর যোগ করে রায়হানের কথার সঙ্গে।
পি-প্ পিপ্ পিপ…
গাড়ি এসে থামল খান মঞ্জিলের গেইটে। সাদা পাথরের ওপর কালো অক্ষরে লেখা-খান মঞ্জিল, মুন্সিবাজর, রাজনগর, মৌলবীবাজার।
বিশাল গেইট। বন্ধ।
পি-প্ পিপ্ পিপ…
গেইট খুলে যিনি সামনে দাঁড়ালেন তিনি আর কেউ নন স¦য়ং আনছার চাচা। সুজনও ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে গেইট খুলতে এগোয়।
‘কী ব্যাপার আব্বু তুমি গেইট খোলাত আইছ, বাড়িত আর কেউ নায়নি?’
শাহাব কিছুটা বিচলিত হয়ে বলল। কারণ আনছার চাচার শরীর তত সুস্থ না। হার্ট অপারেশন করা মানুষ।
‘মনে করলাম আমি পহেলা বরণ করতাম আমার মামুর ঘরর ভাই-ভাবী ভাতিজী-ভাতিজা তারারে-’
আনছার চাচার মুখে হাসি।
সুজন গেইট বন্ধ করার জন্য থেকে গেল। আনছার চাচা শাহাবের সঙ্গে গাড়িতে উঠলেন।
মূল বাড়ি বেশ দূর। গাড়িতে মিনিটের পথ। পুরো বাড়ি এগারো কিয়ার জমির ওপর। কিয়ার সিলেটের আঞ্চলিক মাপ। বিঘার চেয়ে বড়ো। সেই হিসাবে প্রায় চৌদ্দ বিঘা জমির ওপর ওই বাড়ি। জমিদার বাড়ি বলা যায়। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরাও পুরো সীমানা। দুটো পুকুর ওই সীমানায়। একটা বহির্ভাগে শান বাঁধানো। অপরটা অন্দর বাড়িতে, মহিলাদের জন্য।
পি-প্ পিপ্ পিপ…
গাড়ি এসে থামল বাড়ির উঠোনের ঠিক মাঝখানে। সাধারণত কোন গাড়ি এ পর্যন্ত প্রবেশাধিকার পায় না। গাড়ি বারান্দা আছে বহির্ভাগে, সেখানে থামে। কিন্তু সম্মানিত মেহমান এলে উঠোন পর্যন্ত এসে গাড়ি এসে থামে। ড্রাইভার আকবরের জানা।
গাড়ি থামতেই দৌড়ে আসে শাহরিন আইরিন দুই বোন। এক চাচা ও দুই চাচী। চাচাত ভাই মিল্লাত।
বিশাল বাড়ি, বাসিন্দা খুব কম। চারিদিকে বিশাল বিশাল দেবদারু, সুপারি, কড়ই গাছের ছায়ায় পুরো বাড়িটা শীতল হয়ে আছে। উঠোনের দু’পাশে ফুল গাছের সমাহার। নানা জাতের ফুল ফুটে আছে। রাজগাঁদা, সূর্যমুখী, ডালিয়া, গোলাপ, নয়নতারা, অপরাজিতা কত কি!
গাড়ি থেকে নেমে চলল সালাম আদান প্রদানের মহড়া। বড়দের ছোটরা করতে থাকে সালাম।
‘কোথায় মানুষ জন কোথায় ভাবীসাব?’ রায়হান চিৎকার করে বলল।
‘মানুষ যিনি বাড়ি মাতাইয়া রাখতা তাইনত লন্ডনো আর বড়জনতো কবরো-আল্লা নিছুইন গি-’ আনসার চাচা বললেন।
আনছার চাচারা চার ভাই এক বোন। বোন সবার ছোট থাকে শ^শুরবাড়ি। একভাই লন্ডন আর একজন মারা গেছেন। এই বাড়িতে তিনটি পরিবার থাকে। একমাত্র আনছার ভাইর পরিবার বড়। পাঁচজন। এ বিশাল বাড়িটা এরাই আলো ছড়াচ্ছে। বড়জনের ছেলেরা থাকে অস্ট্রেলিয়া। ছোট দু’জনের একজন নিঃসন্তান। আরেক জনের একটি ছেলে মিল্লাত। এছাড়া কাজের লোক আছে গোটা পাঁচেক।

চার.

হুইল চেয়ারে বসা মালাভাবীকে দেখে খোশনূর হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ে। তুতুল পুতুলও চাচীকে জড়িয়ে ধরে। একটা হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় মুহূর্তে।
‘চাচী, আপনি হাঁটতে পারেন না?’ পুতুল জিজ্ঞেস করে কান্না কণ্ঠে।
‘না, মাইগো – কোমড়ে ব্যথা, বুকে ব্যথা, হাঁটতে খুব কষ্টগো মাই- তোমরা আইছ আমি তোমরারে রানদিয়া খাওয়াইতে পারতাম না- এইখান আমার বেশি কষ্ট-শরীর কষ্ট থাকি -’
মালাচাচীর চোখে পানি দেখে সবার চোখেই পানি এসে যায় একে একে।
‘ভাবী, আল্লাহর রহমতে আপনে ভালা হয়ে উঠবেন- আমরা আবার আপনারে নিয়া বেড়াইতে যাইমু’
রায়হান বলল।
‘দোয়া করিও রায়হান, আল্লাহ যেন তানরে পুরা সুস্থ করি দেয়। এখনও আমার পোয়া-পুরীর বিয়া-শাদি অইছে না-তাইন সুস্থ না অইলে-’
আনছার চাচা ভেঙে পড়লেন। তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন খানিক পর চাচা। চাচার কান্নায় শাহরিন-আইরিন যোগ দিলো। আবার মিনিট দু’য়েক চলল কান্নার রোল। শোকস্তব্ধ পরিবেশ সৃষ্টি হলো।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে গল্পের আসর বসল। এ বাড়িতে রুমের কোন অভাব নেই। শাহরিন বলল, আমার ঘরে হবে আড্ডা। আইরিন বলল তার ঘর সবচেয়ে গোছানো পরিপাটি, তার ঘরে হোক আড্ডা। অবশেষে ঠিক হলো, দু’জনের মাঝে যে ঘরটা, ওই ঘরে কেউ থাকে না, সেই ঘরে হবে ওদের আড্ড্।া
বড়ো একটা কালো রঙের পালঙ্ক ঘরে। বেশ কারু কাজ করা। দেখেই বোঝা যায় অন্তত একশ বছর আগের।
‘এই পালঙ্কে আমাদের দাদী, রায়হান চাচার ছোট ফুফু থাকতেন।’ শাহরিন বলল।
পালঙ্কের মাথার দিকে একটা জানালা। বন্ধ ছিল। শাহরিন জানালা খুলে দিলো। দক্ষিণ দিকের জানালা। এখানে একটা সবজির বাগান। চোখের সামনে দৃশ্যমান হলো।
‘দাদী এই সবজি বাগানটা করাইছিলেন।’ শাহরিন বলল।
‘হইছে আপা, দাদীর কিচ্ছা পরে করবা, আগে আম্মুরটা কও।’ আইরিন ঝাঁজ নিয়ে বলল।
‘এই সবজি বাগানেই আম্মুকে ফেলে রাখে।’ ধরা গলায় শাহরিন বলল।
‘এই গল্পটা শোনাও শাহরিন আপু, চাচীকে ছাদ থেকে নিচে ফেলার-’ পুতুল বলল।
‘বলছি পুতুুল বলছি- তখন দুপুর একটা বাজে নাই। জোহরের আজান হয় নাই। আমাদের বাড়ির সামনে রাস্তা, ওই রাস্তার অপর পাড়ে জামে মসজিদটা, আমাদের চাচাদের করা- ওই মসজিদের মিনার থেকে আজান দিলে আমরা শুনতে পারি। তখনও আজান হয় নাই। আমাদের কাজের মেয়েটা কী একটা কাজে সবজি বাগানে যায়। দেখে আম্মু বেহুঁশ পড়ে আছেন। নাক দিয়ে রক্ত পড়তেছে। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে দৌড়ে এসে আমাকে খবর দেয়। বাকিটা তোমরা জানো। কী আর বলব। আমাদের কিসমত খারাপ।’

শাহরিন মাথায় ডান হাত দিয়ে চাপড়াতে থাকে।
‘কিন্তু কে বা কারা ফেলেছে জানা গেছে?’ তুতুল জিজ্ঞেস করে।
‘জানা গেছে। আম্মু বলতে পারেন নাই। আম্মু শুধু দমকা হাওয়ার কথা বলেন। আর বলেন তিনি বাধা দিতে পারেন নাই। শক্তিশালী কিছু একটা তাকে মুহূর্তে তুলে ফেলে দেয়। এরপর হুজুরকে ডাকা হয়। তিনি আমাদের অন্দর মহলের বাইরে একটা বৈঠকখানা আছে, ব্যবহার খুব কম হয়, হুজুর ওই ঘরে তিন দিন মোরা কাবায় ছিলেন। তিনি আব্বুকে সব খুলে জানান।’ শাহরিন বলল।
‘কী জানা গেছে শাহরিন আপু?’ পুতুলের প্রশ্ন। পুতুলের এসব ব্যাপারে বেশি আগ্রহ।
‘হুজুর বলেছেন-আমাদের এই বাড়িটা বানাবার আগ থেকে নাকি ওরা বসবাস করে আসছিল-’
‘ওরা মানে কারা আপু?’ এবারে তুতুলের প্রশ্ন।

‘খারাপ আত্মা, পেরত। যেসব মানুষ আত্মহত্যা করে, ফাঁসিতে ঝুলায়ে মারে, নানান অপঘাতে মারা যায়, সেসব আত্মা নাকি ফিরে যেতে পারে না আপন আবাসস্থলে, তারাই পৃথিবীতে নাকি বিচরণ করে এবং মানুষের ক্ষতি করে। হুজুর বলেছেন এ রকম দুই পাপীষ্ট আত্মা আমাদের ছাদে বাস করত। ওদের নাকি বহুদিন ধরে কুমতলব এ বাড়ির মানুষদের ক্ষতি করার। সেদিন আম্মুকে ছাদে একা পেয়ে তাদের পুরানা কুমতলব হাসিল করেছে।’
শাহরিন অনেক কথা বলে হাঁপায়ে ওঠে।

‘তাহলে ছাদে যাওয়া নিষেধ? আমরা রাতে ছাদে বসে আগে গল্প করতাম, তা আর করা যাবে না?’
পুতুল হতাশ কণ্ঠে বলল।
‘যাবে, যাবে, হুজুর বলেছেন, ওই দুই পাপীষ্ট আত্মাকে শিকল দিয়ে বেন্ধে একটা মাটির কলসিতে ভরে একটা বিলে ফেলে দিয়েছেন, আর ওদের উপদ্রব হবে না।’
‘সত্যি, কিন্তু হুজুর এতোসব করলেন কীভাবে-কেউ কি দেখেছে?’ হি-হি-হি-হি- আফিফ হাসতে থাকে প্রচুর।
হি-হি–হি—হি—হি—হি—হি–হি–
মিলিতভাবে হাসতে থাকে সবাই।
‘কিরে পুঁচকা পুঁচকিরা এতো হাসাহাসি কীসের?’
শাহাব ভাইয়ার প্রবেশ।
‘এসো হাফ ডাক্তার ভাইয়া!’ আইরিন বলল হাসতে হাসতে।
‘হাফ ডাক্তার না, আম্মুর বিপদে কে ছিল, তোমরা না আমি? আর আমি ফাইনাল দিয়া আইছি। পরীক্ষা ভালা হইছে। পাস করুম ইনশাআল্লাহ।’ শাহাব বলল হাত নাচিয়ে নাচিয়ে।
‘ঠিক আছে ভাইয়া ফুল ডাক্তার-এবার বল আমাদের বেড়াতে নিয়া যাইবে কোথায় এবং কবে?’ তুতুল বলল।
‘এইবার তোমাদের নিয়া যাইব পাথরের কান্না দেখাইতে-’
শাহাব একটু রহস্য করল।
‘পাথরের কান্না, বুঝছি ঝরনা দেখাইতে নিবা আমাদের, ঝরনা তো কত দেখছি ভাইয়া-নতুন কোন স্পটে নিয়া যাও-’ শাহরিন বলল।
‘বাংলাদেশের কাশ্মিরে নিয়া যাইব তোমাদের-একদম নতুন স্পট-গেলে বুঝতে পারবা কেন বাংলার কাশ্মির বলা হয়।
‘বা-ং-লা-দে-শে-র কাশ্মির। ওইটা আবার কোথায়?’ আইরিন হাসতে হাসতে বলল।
‘খুলে বলেন না ভাইয়া, আমরা খুব এক্সাইটেড ফিল করছি-’ পুতুল বলল।
‘মাথা খাটাও, মাথাটাকে অলস বানিয়ে ফেলছ মোবাইলে চোখ রেখে রেখে- ভেবে দেখ আমি কোন্ স্পটের কথা বলছি। আব্বুর সঙ্গে আমি একবার গেছিলাম। তখন আমি পড়ি ক্লাস নাইনে। চলি, তোমরা ভেবে দেখ!’
বলে শাহাব ভাইয়া উঠে গেল।

পাঁচ.

মালাভাবীর ঘরেও একটা আড্ডা জমে ওঠে। বড়দের। রায়হান, খোশনূর, আনসার ভাই, আরজু ভাবীসহ এক বড়সড় আড্ডা চলছিল। বিষয় ওই মালাভাবীর ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার দুর্ঘটনা নিয়ে।
ফরিদা বেতের ট্রেতে টিপয়তে চা, কাপ এবং একবাটি চিড়া ভাজা রেখে গেছে একটু আগে।
মালাভাবী বিছানায় শোওয়া। বেশিক্ষণ বসে থাকতে অসুবিধা। খোশনূর ও আরজুভাবী বিছানায় বসা। রায়হান ও আনছার ভাই চেয়ারে। তাদের সামনে একটি টি-টেবিলে ফরিদা ট্রেতে ওসব রেখে চম্পট। তাই খাট থেকে নেমে আরজুভাবী চা পরিবেশন করতে লেগে যান। চিনি ছিল সুগার পটে। চা কাপে চা ঢেলে সুগারপট এগিয়ে দেয়। যাতে নিজের নিজের পছন্দ মতো নিয়ে নিতে পারে। যথারীতি চিড়াভাজা ছোট্ট বাটিতে দিয়ে সবার হাতে হাতে ধরিয়ে দেয় আরজু।
চা পান করতে করতে আড্ডা আরো জমে উঠল। মালাভাবীর ঘটনা আর শোনা শেষ হলো না। ঝড়ের গতিতে শাহাব আর আফিফ এসে হাজির। এভাবে ছোটদের প্রবেশ নিষেধ। সবাই আচমকা খায়।
‘চাচা-চাচী, আপনারা এক জাযগায় বেড়াইতে যাইবানি?’
শাহাবের এসেই প্রশ্ন। যাক শাহাব এখন ডাক্তার। ওর ব্যাপারে সবাই রহম দিল।
রায়হান চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে ফ্রিজ। শাহাবের দিকে তাকায়। কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। মালাভাবী এখনও পুরো সুস্থ না। উনি যেতে পারবেন না তাদের সঙ্গে। এমন হাসি-খুশি চমৎকার মানুষটা ছাড়া কীভাবে তারা বেড়াতে যাবার কথা ভাববে? তাই মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে।
‘বাবা শাহাব, তুতুল-পুতুল-শাহরিন-আইরিন-আফিফ তোমরা মিলে ঠিক কর না!’ খোশনূর বলল।
‘আমি তাহলে বলি, নতুন একটা স্পট আবিষ্কার হইছে, আগে রাস্তা খুব খারাপ আছিল, এখনও সামান্য রাস্তা খারাপ, কিন্তু তেমন খারাপ না-আর বাকি রাস্তা খুব ভালো-বর্তমানে ওই স্পটের নাম দেওয়া গেছে, বাংলার কাশ্মির।’
‘কি কাশ্মির!’ খোশনূর বিস্ময় প্রকাশ করে।
‘জি চাচী, কাশ্মিরে আপনি গেলে যেরকম সৌন্দর্য দেখতে পাবেন, এইখানে একই সৌন্দর্য পাবেন-’ শাহাব তার আব্বুর দিকে তাকায়।
‘অইছেবা কইলাও সাদা পাথ্থর যাইতায়-যাও ব্যবস্থা কর গিয়া আমরা রাজি।’
আনছার চাচা হাসতে হাসতে বললেন।
শাহাব আফিফ যেভাবে ঝড়ের গতিতে এসেছিল সেভাবে চলে গেল।
‘এইসব ব্যাপারে শাহাবের অভিজ্ঞতা আছে। তার লগে সব কিসিমের মানুষের সম্পর্ক-সে ঠিক ব্যবস্থা করবে।’
আনছার ভাই বলল।
‘তাহলে কি আমরা আগামীকাল যাচ্ছি কোথাও?’ খোশনূর প্রশ্ন করল রায়হানের দিকে তাকিয়ে। শেষ পর্যন্ত শাহাবের ইচ্ছার জয় হলো। ঠিক হলো ‘বাঙলার কাশ্মির’ নামে খ্যাতি পাওয়া কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ভোলাগঞ্জ যাওয়া হবে। সেভাবেই একটা মাইক্রোবাস ঠিক করল শাহাব। তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর রেন্ট-এ-কার সার্ভিসের গাড়ি। ভাড়া করা গাড়ি তাদের নিয়ে যাবে এবং ফেরত আনবে।
রাতে খাবারের টেবিলে শাহাবের পক্ষ থেকে ঘোষণা এলো। সকাল সাড়ে দশটায় গাড়ি আসবে। সেভাবে রেডি থাকতে হবে সবাইকে। অন্তত এগোরোটার মধ্যে স্টার্ট দিতে হবে। কারণ ভোলাগঞ্জ যেতে দু’ঘণ্টার মতো সময় লাগবে তাদের।
‘শাহাব ভাইয়া, আমরা দুপুরে খাব কী?’ পুতুলের প্রশ্ন ছিল।
‘দুপুরের খাবার আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। এ ব্যাপারে চাচীর সঙ্গে আলাপ হইছে। তিনি মোরগ পোলাও রাতে রান্না করে রাখবেন। আমরা সেই রান্না করা খাবার নিয়ে খাব দুপুরে।’ শাহাব বলল।
‘কোথায় খাব আমরা ভাইয়া?’ তুতুল জানতে চায়। কারণ তুতুল আবার যেখানে সেখানে খেতে পারে না।
‘সেটা গেলেই দেখতে পাবে। সবকিছু আগ থাকি বলা যাবে না, বুঝলে?’
বলেই শাহাব কাট মারল ঘর থেকে।
সকালে উঠে সাজ সাজ রব পড়ে গেল বাড়িতে। হাঁক-ডাকে মুখর পরিবেশ। মেয়েদের সাজুগুজু করতে সময় লাগে। শাহাব তাই বার দু’য়েক এসে তার ছোট বোন শাহরিন আইরিনকে তাগদা দিয়ে গেছে। মেহমান হিসেবে তুতুল পুতুলকে কিছু না বললেও ইঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছে দেরি করা চলবে না ওদেরও।
‘গাড়ি এসেছে গাড়ি এসে গেছে…’ চিৎকার দিতে দিতে আফিফের প্রবেশ।
‘ইস্ গুলতানি মারছ-’ পুতুলের জবাব।
পুতুল মাথার চুলে একটা প্রজাপতি ক্লিপ আঁটতে ছিল নিমগ্ন। সবার সাজুগুজু শেষ। পুতুল সবাইকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে পেছনে পড়ে গেছে। তবে তার চুলটাই যা বাকি, আর সব কমপ্লিট।
পিপ্-পিপ্-
গাড়ির শব্দ শোনা গেল। পুতুল এবার নিশ্চিত হলো গাড়ি আসার খবর সত্যি।
‘শাহাব ভাইয়া, আমরা এখন গাড়িতে উঠব?’ ড্রয়িংরুমে এসে আফিফ জিজ্ঞেস করে।
‘না, এখন না গাড়ি গ্যাস ভরতে যাবে, গ্যাস ভরে আসার পর উঠব।’ শাহাব বলল।
ড্রাইভারের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে একটু আগেই রাগ করেছে শাহাব। কেন গ্যাস ভরে একবারে আসল না। ড্রাইভার বলেছে-গ্যাস ভরার জন্য মালিক তাকে টাকা দেয়নি। তাই সোজা এখানে চলে এসেছে। রেন্ট-এ-কার মানেই এই স্বভাব। ভাড়া নেওয়া লোকের অগ্রিম টাকা দিয়ে গাড়ির গ্যাস বা তেল কিনবে। গ্যাস ভরে গাড়ি ফিরে আসতে বেশি দেরি লাগেনি। শাহাবদের বাড়ি থেকে মুন্সিবাজার ফিলিং স্টেশন দু’মিনিটের পথ। গাড়ি এসে উঠোনে দাঁড়াতেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় উঠার। ছোটরা আগে উঠবে তারপর গাড়ির সামনের দিকে বড়োরা।
এদিকে মালাচাচীকে রেখে বেড়াতে যাওয়ায় সবার মনে খচখচ করতে থাকে। তুতুল পুতুল শাহরিন আইরিন আফিফ সবাই এসে মা-চাচীকে সালাম জানায়। খোশনূর, রায়হান আরজুও এসে বিদায় নেয় মালাভাবীর কাছ থেকে। সবশেষে আসে আনছার চাচা ও শাহাব।
এ বাড়ির নিয়ম কেউ বাইরে গেলে ঘরের লোকজনদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া। এভাবে একের পর একজন এসে বিদায় নেওয়ার এ রেওয়াজ মালাচাচীকে বিমর্ষ করে তোলে। নিজের অসুস্থতার কষ্ট বেশি করে অনুভব করতে থাকে। আজ তিনিও ওদের সঙ্গী হওয়ার কথা ছিল।
একে একে গাড়িতে সবাই উঠেছে। দুপুরের খাবার রান্না করা মোরগ-পোলাউর সসপেন, প্লেট, প্লাস্টিকের গ্লাস কয়েক বোতল পানিও গাড়ির পেছনে তোলা হয়েছে। শাহাব তদারকি করছে এসব। আনছার চাচাও লক্ষ রাখছেন কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস পত্তর রয়ে গেল কি না।
শাহাবের কাঁধে একটা ভিডিও ক্যামেরা। ক্যামেরাটি দিয়ে একটু পরপর ভিডিও করছে সে। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে, কেউবা বাগানের সামনে নানা স্থানে পোজ দিয়ে যাচ্ছিল। শাহাব তা ভিডিও করে চলেছে পরম যতেœ।
‘সবাই গাড়িতে উঠিছনি?’ ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে আনছার চাচার কণ্ঠ।
‘জিয়ো আব্বু উঠছুইন হগলে, গাড়ি স্টার্ট দেউকো-’ জবাব শাহাবের।
শাহাব বসেছে মাইক্রোর সর্বশেষ সিটে। আব্বুকে প্রাধান্য দিতে। যদিও নিয়ম মতো তার ড্রাইভারের পাশে বসা উচিত ছিল। কারণ সে ড্রাইভারকে তদারকি করতে পারত। অবশ্য তার আব্বুও এ রাস্তা ভালো চিনিয়ে নিতে পারবেন। আব্বুদের যখন এখানে পাথরের ব্যাবসা চালু ছিল তখন ঘন ঘন এখানে আসতে হতো।
‘গাড়ি স্টার্ট দাওবা ড্রাইভার!’ আনছার চাচা বললেন।
গাড়ি স্টার্ট করেছে কেবল এমন সময় কোথা থেকে খোকন এসে গাড়ির সঙ্গে দৌড়ানো শুরু করেছে। মুখে বলছে-আমি যাইতাম-আমি যাইতাম-আনছার চাচার নির্দেশে গাড়ি থামানো হলো। খোকন আনছার চাচার ছোট ভাই আখলাকের ছেলে। আখলাক থাকে দুবাই। তার স্ত্রী অসুস্থ। বিছানায় পড়ে থাকে বছরের অধিকাংশ দিন।
গাড়ির জানালার কাছে এসে খোকন আব্দার জানায়- চাচাজী, আমিও যাইতাম-। খুব সকালে মাদরাসায় গিয়েছিল হিফ্জ করতে। জানতে পারেনি বেড়ানোর এই প্রোগ্রামের কথা। এখন! কী করবে ভেবে উঠতে পারে না আনছার চাচা। ওর মাকে না জানিয়ে নেওয়া যাবে না।
‘এই শাহরিন, কিতা করতে যা তোর চাচীরে জানাইয়া আয়গি, খোকন আমরার লগে গেল।’ বিরক্তির সঙ্গে বললেন।
আনছার চাচা বলার সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভার গাড়ির দরোজা টান দিয়ে সিট ভেঙে পথ তৈরি করে দেয় শাহরিন যাতে ভেতর হতে বের হতে পারে। শাহরিন বের হয়ে আসে। খোকন ততক্ষণে উঠে পড়ে গাড়িতে। একটু পরে শাহরিন এসে জানায় চাচীকে সে বলেছে। সবাই বিরক্তি প্রকাশ করে খোকনের কর্মকা-ে। কিন্তু মুখে প্রকাশ করে না।
গাড়ি ছুটছে পাহাড়ি পথে। দু’ধারে টিল্লা। চা-বাগান। এঁকে বেঁকে চলে গেছে পথ। রাস্তাও প্রশস্ত নয়। ড্রাইভার রানা বেশ দক্ষ বোঝা যাচ্ছে। চালানোর ভঙ্গিমায়। সাঁই সাঁই বাতাস কেটে গাড়ি ছুটছে। এভাবে ছুটতে ছুটতে কখন যে সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্র হুমায়ুন রশীদ চত্বরে এসে গেলো টের পাওয়া যায়নি। গোলাকৃতির বিশাল এ চত্বরে এসে গাড়ি থামল। একটা হোটেলের সামনে। কেউ যদি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে চায় সে কারণে।
গাড়ি থেকে একে একে সবাই বের হলো। কেউ কেউ হোটেলের ভেতরে গেল প্রয়োজনে। পনেরো মিনিটের বিরতি।
‘শাহাব ভাইয়া, চিফ্স খাওয়াও না!’ পুতুল বলল।
‘আমিও ভাবছিলাম।’ শাহাব বলল।
রাস্তা পেরিয়ে গেল শাহাব চিফ্স কিনতে। এ পাশের দোকানে চিফ্স ছিল না। বড় পলিথিনের ব্যাগে জনপ্রতি একটা হিসাবে চিফ্স কিনল শাহাব। কয়েক প্যাকেট বিস্কুট ও চানাচুরও নিলো।
‘এই নাও তোমাদের চিফ্স।’ বলে পলিথিনের ব্যাগটা এগিয়ে দিলো শাহরিনের দিকে। শাহরিন এদের মধ্যে বড়ো।

গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। আম্বরখানা চৌরাস্তায় এসে সালুটিকর বিমানবন্দরের রাস্তা ধরল। এখান থেকে নাকি ভোলাগঞ্জ তেত্রিশ কিলো দূরত্ব। সময় লাগতে পারে দেড় ঘণ্টা। তার মানে ওদের পৌঁছতে দুটো বাজবে। সাঁই সাঁই গাড়ি ছুটছে। রাস্তা এদিকটা ভালো। তবে কোম্পানীগঞ্জের খানিকটা পথ নাকি ভালো না। ভালো না মানে নতুনভাবে প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। কোম্পানীগঞ্জ হচ্ছে সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড় ঘেরা অঞ্চলের কাছে। এখানে সীমান্ত বাজার বসবে কিছুদিন পর। সেজন্য রাস্তা উন্নত করা হচ্ছে।
দেখতে দেখতে গাড়ি চলে আসল ভোলাগঞ্জ। বড়ো বড়ো হরফে লেখা ‘সাদা পাথর’। এই তাহলে সাদা পাথর? তুতুল পুতুল ভাবে।
গাড়ি যেখানে এসে থামল আশপাশে বেশ অনেক গাড়ি। ট্যুরিস্ট এসেছে। সংখ্যায় কম না। অন্তত কয়েক শ’।
মাথার ওপর ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুর। ঝড়ো বাতাস। দৃষ্টি আটকে যায় মেঘালয় পাহাড়ের বুকে। সবুজ আর সবুজ। কুয়াশায় অস্পষ্ট পাহাড়।
শাহাব সবাইকে গাড়ির পাশে রেখে একাই গেল নৌকা ভাড়া করতে। একটুপর এসে বলল-‘চলেন চলেন নৌকা ভাড়া করা হইছে!’
শাহাবকে সবাই অনুসরণ করতে থাকে। কিছুটা পথ হাঁটতেই ঢালু নদীর পাড়। বেশ ঢালু। সাবধানে পা না ফেললে গড়িয়ে ‘পা পিছলে আলুর দম’ হবার জোগাড় হবে।
‘সাবধান সাবধান’ আনছার চাচা সবাইকে বললেন। লম্বা টাইপের নৌকা। নৌকার মাঝামাঝি খানিকটা ছই আছে। দু’জন মাঝি। একজন বাচ্চা বয়সী। আরেকজন মধ্যবয়সী। তার হাতে মূল বৈঠা। চেহারাটা খাসিয়া মার্কা।
নৌকায় একে একে উঠে বসে। নৌকার মাঝে তিনচার সারি কাঠের পাটাতন পাতা। বসার জন্য। ছইয়ের ভেতর বসল খোশনূর চাচী, আরজু চাচী, আনছার চাচা ও শাহাব ভাইয়া। আর ছইয়ের নৌকার দুই ধারে বসল শাহরিন আইরিন তুতুল পুতুল আফিফ ও খোকন।
এটা ধলাই নদ। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে এসেছে নাচতে নাচতে। ঘুঙুর পায়ে। কল কল। ছল ছল। গান গেয়ে গেয়ে। সেই সঙ্গে নিয়ে এসেছে আমাদের জন্য অসংখ্য সাদা পাথর। যেদিকে চোখ যায় সাদা পাথরের সারি। চোখ জুড়িয়ে যায়। সৌন্দর্য কাকে বলে। কাকের চক্ষুর মত স্বচ্ছ পানি। হিম্ প্রচ- হিম। হাত দিলে শরীর শীতল হয়ে আসে।
‘কি তুতুল পুতুল বাংলাদেশের কাশ্মির না?’ শাহাব ভাইয়ার খুশি চোখে মুখে।
‘কাশ্মিরতো দেখি নাই, তবে ভীষণ সুন্দর, ভীষণ ভীষণ-’ পুতুল বলল।
‘তাহলে পুতুল মনি একটা কবিতা হয়ে যাক।’ তুতুল বলল।
‘কবিতা না গান হোক-’ আইরিন বলল।
‘শাহরিন আপু একটা গান ধর না!’ তুতুল বলল।
‘হ্যাঁ আপু, একটা গান গাও- ওইযে বড়লোকের বিটিলো-’
পুতুল বলল হাসতে হাসতে।
‘তাহলে আমার সঙ্গে সাধ দিতে হইব তোমাদেরও-’ শাহরিন বলল।
আমি দিমুনে আপু- আইরিন বলল।
শাহরিন গান ধরল। সবাই হাত তালি দিয়ে উৎসাহ দিলো।
বড়লোকের বিটিলো লম্বা লম্বা চুল
এমন মাথায় বেঁধে দুবো লাল গেন্দা ফুল
বড়লোকের বিটিলো লম্বা লম্বা চুল
এমন মাথায় বেঁধে দুবো লাল গেন্দা ফুল

দেখেছিলাম শরানে ওরে শরানে
দেখেছিলাম শরানে ওরে শরানে
আমার সঙ্গে দেখা হবে বাবুর বাগানে
আমার সঙ্গে দেখা হবে বাবুর বাগানে

বড়লোকের বিটিলো লম্বা লম্বা চুল
এমন মাথায় বেঁধে দুবো লাল গেন্দা ফুল
ওরে লাল ধুলোর শরানে ওরে শরানে
লাল ধুলোর শরানে ওরে শরানে

গান শেষ হতে না হতে নৌকা ভিড়ল পাথরের রাজ্যে। এটাকে জিরো পয়েন্ট বলে। বিস্তীর্ণ পাথরের সমুদ্্র পাড়ি দিয়ে যেতে হবে ধলাই নদের আরেক প্রান্তে।
কেমন লাগল গান ভাইয়া?’ পুতুল জানতে চাইল।
‘ভীষণ সুন্দর লেগেছে-তবে তোমরা দু’জন ঠোঁট মিলিয়েছ কণ্ঠ মিলাওনি- ফাঁকি দিয়েছ।’ শাহাব হাসতে হাসতে বলল।
‘গানটা আমাদের জানা নাই, শাহরিন আপু ভলো পারেন।’
পাহাড়ের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সেই ধলাই নদের আরেক প্রান্ত সবাই চলে এলো। এখানে অনেক ট্যুরিস্ট ভিড় করেছে। কেউ নেমে পড়েছে ধলাই নদে। পানি অপেক্ষাকৃত কম। বাতাস ভরা টায়ার পাওয়া যায়। পাওয়া যায় লাইফ জ্যাকেট। স্বচ্ছ পানির নিচে পাথরগুলো দেখা যাচ্ছে। কী সুন্দর!
কেউ নামছে কেউ পাথরের ওপর বসে ভাবছে। ভাবার লোকজনের সংখ্যাই বেশি। শাহরিন আইরিন সবার আগে নেমে পড়ে। ডাকতে থাকে তুতুল-পুতুলকে। নিরাপত্তার জন্য ভাড়া করে টায়ার। অনেক ভেবেচিন্তে নামে তুতুল-পুতুলরা। শাহাব কিন্তু চোখের পলকে হাওয়া। শাহাব জানে আব্বুর কাছ থেকে অনুমতি নিতে গেলে ধল্ ানদীতে জলকেলি করা হবে না। তাই সবার চোখের আড়ালে চলে যায়। পটাপট পোশাক পাল্টিয়ে। অনেক মানুষের মাঝে শাহাবকে খুঁজে পায় না কেউ।
একটু পর শাহাব ভাইয়া হেলে দুলে হাজির। পুুরো গা ভিজে একসার।
‘কোথায় গিয়েছিলে শাহাব ভাইয়া?’ তুতুলের প্রশ্ন।
‘ওই মোহনায়- গভীর পানিতে।’ শাহাব হাসে।
‘বুঝলে তুতুল-পুতুল সাদা পাথরের কান্না একেই বলে। দেখছ না কীভাবে কান্নাগুলো কল্কল্ ছল্ছল্ ঝরে পড়ছে অনবরত?’ ওই মেঘালয় পাহাড় ঠিকানা।

SHARE

Leave a Reply