Home ঈদ স্মৃতি আমার ছেলেবেলার ঈদ অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান

আমার ছেলেবেলার ঈদ অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান

‘ঈদ’ মানে খুশি বা আনন্দ। আনন্দ-বেদনা নিয়ে জীবন। বেদনা যেমন কষ্টকর, আনন্দ তেমনিখুশির। প্রত্যেক মানুষতাই জীবনে আনন্দ খুঁজে বেড়ায়। ব্যক্তি জীবনে যেমন, সমষ্টি বা প্রত্যেক জাতি-ধর্মের মধ্যেও তেমনিবিভিন্ন উপলক্ষে আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করা হয়।
ঈদ মুসলিম জাতির ধর্মীয় উৎসব। ইসলামের মহান নবী বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব রাসূলুল্লাহ্ সা. মুসলিম উম্মতের জন্য বছরে দু’টি উৎসব বা আনন্দের দিন নির্ধারণ করেছেন, একটি ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আজহা। রমযানে একমাস সিয়াম বা রোযা রাখার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়। অন্যদিকে, জিলহজ মাসের ৯ তারিখে পবিত্র হজ পালনের পরের দিন কোরবানি ও ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হয়ে থাকে। এ দু’টি অনুষ্ঠান মুসলিম জাতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর ধর্মীয় পবিত্র ভাব-গাম্ভীর্য ও আনন্দ-উৎসবের সাথে এ দু’টি অনুষ্ঠান পালিত হয়। এ দু’টি উৎসব ইসলামী সাংস্কৃতিক জীবনধারার উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
প্রত্যেকের জীবনেই আনন্দ-উৎসবের প্রয়োজন আছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয়ভাবেও যুগে যুগে সব দেশে উৎসব-আনন্দের আয়োজন চলে আসছে। বিশেষ ঘটনা বা উপলক্ষকে কেন্দ্র করে আনন্দের অভিব্যক্তি ঘটে। তবে ব্যক্তিজীবনের আনন্দ সাধারণত ব্যক্তিগত ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সামাজিক, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় আনন্দ-উৎসব সামাজিক-জাতীয়-রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ব্যক্তিগত আনন্দ-উৎসব ব্যক্তি বা তার ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, অন্যধরনের আনন্দ-উৎসব সমষ্টিগত।
ঈদ সামাজিক বা সামষ্টিকউৎসব। এটা কোন সাধারণ উৎসব নয়, ধর্মীয় বিধান ও আবেগ এর সাথে জড়িত। তাই ঈদ একাধারে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ধর্মীয় উৎসব। পূর্ণ এক মাস রোযা রাখার পর ঈদুল ফিতর পালিত হয়। অন্যদিকে, মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম আ. কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইসমাইলকে আ. আল্লাহর নির্দেশে কোরবানি করার ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হয়। একটি আত্মসংযমের, অন্যটি আত্মত্যাগের মহান আদর্শে উজ্জীবিত। দুটোই মানবীয় মহৎ গুণের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন। দু’টি উৎসবই একদিকে ব্যক্তিগত, অন্যদিকে ধর্মীয় বা সামাজিক। এখানে ব্যক্তি ও সমষ্টির সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্বের সব মুসলিম একসাথে এতে অংশগ্রহণ করে। ফলে এ উৎসব বিশ্বজনীন সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন।
এবারে আমার ছোটবেলায় আমি কীভাবে ঈদ, বিশেষভাবে ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করতাম, সে বিষয় উল্লেখ করতে চাই। আমার বাড়ি বাংলাদেশের নিভৃত এক পল্লীর শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে। সবুজে-শ্যামলে শীতের শিশির-সিক্ত গ্রামের নাম চর বেলতৈল। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায়। এককালে এখানে খরস্রোতা হুরাসাগর নদী প্রবাহিত হতো। কালক্রমেনদী শীর্ণ হয়ে মরা খালে পরিণত হয়। জেগে ওঠে চর। সে চরের ওপর ক্রমান্বয়ে গড়ে ওঠেচর বেলতৈল গ্রাম। গ্রামের সামনে ও পিছনে বিল। বিলগুলো এখন শুকিয়ে ফসলি মাঠে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় এ বিলগুলোতে সারা বছর পানি থাকতো, নানা জাতের মাছ কিলবিল করতো, আমরা সেখানে গোসল করতাম, সাঁতার কাটতাম এবং মনের আনন্দে খালৈ ভরে মাছ ধরতাম। এ আনন্দ পাড়ার ছেলেরা সবাই মিলে উপভোগ করতাম।
ঈদের চাঁদ দেখা ছিল একটা উৎসব! রমযানের চাঁদ দেখার মতো সকলে পরম উৎসাহে ঈদের চাঁদ দেখতো। চাঁদ রাতে অনেকে ঈদ-উৎসবকে কীভাবে পালন করবে তার পরিকল্পনা করতো। বাড়ির মহিলারা ঐ সময় ব্যস্ত হতোঈদের দিনের নানা রকম খাবার তৈরিতে। কে কত রকমের খাবার তৈরি করবে, কার খাবার কত সুস্বাদু হয় তার প্রতিযোগিতা হতো। সেকালে ঘরেকলের সেমাই বানানো হতো। ছেলেবেলায় প্রথম যখন সেমাইর মেশিন বাজারে আসে তখন সম্পন্ন গৃহস্থের অনেকেই তা কিনে বাড়িতে সে মেশিনে সেমাই তৈরি করতো। গ্রামে ঈদের দিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার ছিল খিচুড়ি-গোশত ও সেমাই। এছাড়া, পায়েস, পিঠেপুলি, পোলাও বিরানি, কোপ্তা কালিয়া ইত্যাদি নানা রকম ব্যঞ্জনাদিও অনেক সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে রান্না হতো। ধনী-গরিব, ছোট-বড়ো সকলেই একসাথে ঈদের দিনে খাবার খেত।
সকাল বেলা ফযরের নামায পড়ে আমরা ঈদের মাঠে যাওয়ার আগে ঘরে তৈরি নানারূপ মিষ্টান্ন আহার করতাম। অন্যদেরকেও ডেকে খাওয়াতাম। পাড়া-প্রতিবেশীদের বাড়িতে খাবার বিতরণ করতাম। গরিব-দুঃখী, ফকির-মিসকিন এদেরকেও ঈদের দিনে সকলে খাবার দিত। সেদিন ধনী-গরিব সকলেই পেট ভরে খেতো। ঈদের দিনের আনন্দ তাই সকলে সমভাবে উপভোগ করতো।
আমাদের গ্রামের পিছনে বিশাল ঈদগাহ ময়দান। সাত গ্রামের মানুষ এখানে একসাথে ঈদের নামায আদায় করে। ছোটবেলায় শুকনোর দিনে পায়ে হেঁটে এবং বর্ষায় নৌকায় চড়ে ঈদের মাঠে যেতাম। মাঠের চারপাশে মেলা বসতো। নানারকম খাবার দাবার, ছোটদের খেলনা ও টুকটাক রঙবেরঙের জিনিস বিক্রি হতো। মেলা থেকে লজেন্স, বনবন, কদমা, জিলাপি ইত্যাদি কিনে খেয়েছি। ঈদের জামাতে নামায পড়ে ইমামের ওয়াজ শুনে এবং তাঁর দীর্ঘ মুনাজাতে অংশগ্রহণ করে মনে গভীর তৃপ্তি অনুভব করতাম। কিছুটা বড়ো হয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে ঈদের মাঠে নামাযের আগে নিয়মিত আমাকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আহ্বান করা হতো। ইসলামের মহান আদর্শ, মানবতা, সাম্য, শান্তি, উদারতা, নিয়ম-নীতি-শৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনেক আবেগময় বক্তৃতা দিয়েছি।
ছোটবেলায় আমাদের গ্রামে রেওয়াজ ছিল, ঈদের নামায পড়ে গ্রামের শিক্ষিত যুবকেরা দল বেঁধে গ্রামের পশ্চিম বাড়ি থেকে পূর্ব বাড়ি পর্যন্ত সব বাড়িতে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতো। অনেকে খাবার-দাবার সাজিয়ে রাখতো। আমরা সে সব খাবার অল্প-বিস্তর খেয়ে সকলের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতাম।ঈদের দিনে এভাবে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে সকলের সাথে মোলাকাত, কোলাকুলি, ঈদের আনন্দ একসাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার এ রীতি আমাকে সবসময় মুগ্ধ করতো।
ছোটবেলায় ঈদের দিনে বিকাল বেলা গ্রামে নানারকম উৎসবের আয়োজন হতো। সকলে জমা হতো গ্রামের সামনে খেলার মাঠে। সেখানে নানারকম খেলাধুলা হতো। লাঠি খেলা, হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, ভলিবল, ফুটবল এবং ছেলেমেয়েদের নানারকম খেলার আয়োজন। আমার আব্বা, চাচা এবং গ্রামের অন্যান্য শিক্ষিত ব্যক্তি বিশেষত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অথবা চাকরিজীবী এসব খেলাধুলার আয়োজন করতেন। গ্রামের শিক্ষিত লোকজন যারা বাইরে চাকুরি করতো অথবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতো, ঈদের সময় তারা সবাই গ্রামে আসতো। আশপাশের গ্রাম থেকেও অনেকে আসতো খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করতে অথবা দেখতে। বর্ষার সময় নৌকা বাইচ এবং ঘরোয়া নানারকম খেলাধুলার আয়োজন হতো ঈদের দিনে। এভাবে সারাদিন নানা আনন্দ-উৎসবে ঈদের দিন অতিবাহিত হতো। তবে এ আনন্দ-উৎসবের মধ্যে কোনরূপ অনৈতিক, অশ্লীল বা খারাপ প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো না। মুরুব্বিরা সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। একটা পবিত্র অনুভূতি নিয়ে ঈদের দিনের আনন্দ উপভোগ করতাম।

SHARE

Leave a Reply