Home প্রবন্ধ ঈদের কথা -ড. মোজাফফর হোসেন

ঈদের কথা -ড. মোজাফফর হোসেন

‘ঈদ’ অর্থ- খুশি, উৎসব। আরবি ভাষায় ‘ঈদ’ অর্থ- ফিরে আসা। খুশি ও আনন্দের সংবাদ নিয়ে ঈদ বারবার ফিরে আসে, সেজন্য ঈদ। আরবি ‘ঈদ’ এর বাংলা প্রতিশব্দ না থাকায় এটি এখন বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ। সে হিসেবে ‘ঈদ’ শব্দটি খুশি ও উৎসব অর্থে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আবার ‘ঈদগা’ বলতে নামাজের জায়গা বোঝান হয়। অর্থাৎ যে জায়গায় ঈদের নামাজ পড়া হয়ে থাকে, সে জায়গাকে ‘ঈদগা’ বলা হয়। ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ ফিরে আসা, আর ‘গা’ অর্থ জায়গা বা স্থান। তাহলে অর্থ দাঁড়ায়- ফিরে আসার স্থান। মুসলমানরা নামাজের জন্য বছরে দু’বার যেখানে একত্র হতে ফিরে আসে, সেটিই ‘ঈদগা’।
ঈদকে মুসলমানদের আনন্দের উৎসব বলা হয়। পৃথিবীতে নানান ধরনের আনন্দোৎসব রয়েছে; ঈদ অন্যতম। ঈদ এজন্য অন্যতম যে, ঈদে কোনো অশ্লীলতা নেই; খারাপ কিছু নেই। পৃথিবীর অন্যান্য উৎসবে কোনো না কোনোভাবে অশ্লীলতা লুকিয়ে থাকে। অশ্লীল মানেই খারাপ কিছু; অকল্যাণ কিছু। যেমন- কিছু কিছু উৎসবের দিনে পটকা বা বাজি পোড়ানো হয়; বাজিতে আগুন থাকে, বিকট শব্দও হয়। বিকট শব্দ অসুস্থ, দুর্বল মানুষদের অসুবিধা করে। শব্দে কানের পাতলা পর্দা ফেটে যেতে পারে। পটকার আগুনে অনেকের জামাকাপড় ও ঘরবাড়িও পুড়ে যেতে দেখা গেছে। আবার কিছু কিছু উৎসবের দিন ফুল দেওয়া নিয়ে মারামারি হতে দেখা গেছে। কে কার আগে স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দেবে; তা নিয়ে সংঘর্ষ বাধে। কিছু উৎসবে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার কারণে অশ্লীলতা সৃষ্টি হয়। মদ খেয়ে মাতাল হওয়া ব্যক্তিরা অনিষ্ট সৃষ্টি করে; উৎসব থেকে বাড়ি ফিরে অশান্তি তৈরি করে। ঈদের আনন্দে এ সব থাকে না। ঈদের উৎসবে মদ খাওয়া, বাজি পোড়ানো, অশ্লীল কাজকর্ম নিষিদ্ধ। অন্যান্য উৎসব মানুষ নিজেদের ইচ্ছে মতো তৈরি করে নিয়েছে। কিন্তু ঈদ আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য আনন্দের উপহার। সে জন্যই ঈদ আনন্দের ভেতর খারাপ কিছু নেই।
ঈদ প্রথম কীভাবে সৃষ্টি হলো তার একটি ইতিহাস রয়েছে। মহানবী সা.-এর সময় আরবসমাজ বিশৃঙ্খল ছিল। মূর্তিপূজারি ও অগ্নি উপাসক হিসেবে আরবরা নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিল। মানুষে মানুষে পার্থক্য তৈরি করেছিল। নারীর অবমূল্যায়ন হতো। হিংসা-হানাহানি, বিবাদ-বিসংবাদে মানুষ পশুতে পরিণত হয়েছিল। এ সময় মানুষের নৈতিকতা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। মানুষ আনন্দ বিনোদনের জন্য উৎসব; পার্বণ; লোকজমেলা ইত্যাদি বিচিত্র ও বীভৎস অনুষ্ঠান তৈরি করে নিয়েছিল। এসবের মধ্যে ‘ওকায’ মেলা ছিল প্রধান। সে সময় আরব অগ্নিপূজকদের উৎসব ছিল ‘নওরোজ’। পৌত্তলিকদের উৎসব ছিল ‘মিহিরজান’। এ দু’টি উৎসব এবং ‘ওকায’ মেলাতে মদিনাবাসীসহ আরবরা অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ কাজে মেতে উঠতো। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. মদিনায় হিজরত করার পরও মুসলমানরা এসব উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন। এসব উৎসব ছিল আরবসমাজের উচ্চবিত্তদের তৈরি করা খেয়ালিপনার উৎসব। ‘আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ’ গ্রন্থের এক হাদিসে এসেছে; আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- (এসব উৎসবে অংশগ্রহণকারী) ‘মুসলমানদেরকে মহানবী সা. ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি উৎসবের তাৎপর্য কী? মদিনাবাসী বললেন- এদিনে আমরা খেলাধুলা আমোদ-ফুর্তি করি। রাসূল সা. বললেন, আল্লাহ পাক এর চেয়ে উত্তম দু’টি উৎসবের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একটি ঈদুল আযহা; অন্যটি ঈদুল ফিতর’ (সুনানে আবু দাউদ)। আরবে ঈদ উদযাপনের সূত্রপাত হয় তখন থেকেই। পবিত্র কোরআনের সূরা হাশরের সাত নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘রাসূল সা. তোমাদের জন্য যা এনেছে, তা তোমরা গ্রহণ কর; আর যা তোমাদের জন্য নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক’। সুতরাং ঈদ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম ও বিশ্ববাসীর জন্য মূল্যবান এক উপহার।
রাসূল সা. সর্বপ্রথম ঈদের নামাজ আদায় করেন রমযানের সিয়াম (রোযা) ফরজ হবার পর। অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরির সাওয়াল মাসের ১ তারিখে। এই ঈদই ছিল মুসলিম উম্মাহর প্রথম ঈদ। ঈদের নামাজ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। রাসূল সা. ঈদের দিন যেভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতেন সেভাবে প্রস্তুত থাকাটা মুসলমানদের জন্য সুন্নাত। ঈদের এ প্রস্তুতি ফজরের নামাজ থেকে আরম্ভ করা উত্তম। যেমন- খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। মেসওয়াক করা। গোসল করা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরা। সুগন্ধি ব্যবহার করা। ফজরের নামাজের পর বিলম্ব না করে ঈদগাতে যাওয়া। যাওয়ার আগে মিষ্টিদ্রব্য আহার করা। ফিতরা আদায় করা। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না থাকলে ঈদের নামাজ মসজিদে না পড়ে ঈদগাহে পড়া। পায়ে হেঁটে এক রাস্তা দিয়ে গিয়ে অন্য রাস্তা ধরে ফিরে আসা এবং সমস্ত রাস্তায় মৃদুস্বরে তাকবির পড়া। কিন্তু ঈদুল আযহার দিন উচ্চস্বরে তাকবির পড়া।
আরবদেশে ঈদ শুরু হওয়ার অনেক বছর পর ভারতবর্ষে ঈদ শুরু হয়েছে। তারও পর বাংলাদেশে। কেননা ভারতবর্ষে মুসলমানদের আগমন ঘটেছে অনেক পরে। জানা যায়, হযরত ওমর রা. এর শাসনকালীন মুসলমানরা ভারতবর্ষে আগমন করেন। সেসময় ভারতবর্ষে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। এই দু’চারজন মুসলিম কীভাবে ঈদের নামাজ পড়েছেন তা জানা যায় না। তবে মোগলদের আমলে রাজদরবারে ঈদের জামায়াত ও আনন্দ উৎসব হতো সেটা জানা যায়। এ সময় সাধারণ মুসলমানরা রাজা-বাদশাদের সাথেই ঈদগাতে নামাজ আদায় করতেন।
১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে বঙ্গদেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। এ অঞ্চলটিতে মুসলিম সুফি, দরবেশ, সাধকরা ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে উত্তরভারত হয়ে আগমন করেন। আর বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে মুসলিম বণিকরা এসেছিলেন সরাসরি আরব থেকে আরাকান হয়ে চট্টগ্রাম নৌবন্দরের মাধ্যমে এই বাংলায়। তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে রোজা, নামাজ, ও ঈদের সূত্রপাত ঘটেছে বলে মনে করা যেতে পারে। একটি ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে সুবেদার শাহসুজার নির্দেশে ভূমি থেকে প্রায় তিন মিটার উঁচুতে একটি ঈদগা নির্মাণ করা হয়। ঈদগাটি রাজদরবার, আদালত, বাজার ও সৈন্য ছাউনির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল। প্রথম প্রথম সুবেদার, নায়েব, নাজিম ও মোগলদের অভিজাত কর্মকর্তা এবং তাদের আত্মীয়-বন্ধুরাই এই ঈদগাহে নামাজ আদায় করতেন। পরে ঈদগাটি সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এই ধারা উনিশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দরিদ্র মুসলমানদের অনেকেই আমির ওমরাদের ঈদগাহে নামাজ আদায় করতে পারতেন না। ঈদের দিন হইচই, আনন্দোল্লাস হতো মোগল বনেদি পরিবারের ধনী মুসলমানদের মধ্যে। সে জন্য ঈদ এই বঙ্গদেশে জাতীয় উৎসবে রূপান্তর হতে সময় লেগেছে। তবে মোগলদের সময় ঈদ যে সমবেতভাবে উদযাপন হতো, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে খোলামেলা গণমুখী শাহি ঈদগাহ দেখে তা বোঝা যায়।
বাংলাদেশে ঈদ উদযাপনের সবচেয়ে পুরাতন বর্ণনা পাওয়া যায় মির্জা নাথানের লেখায়। তিনি উল্লেখ করেন, সন্ধ্যায় মোমবাতির আলোয় যখন চাঁদ দেখা যেত, তখন শিবিরে বেজে উঠত শাহি তূর্য রণশিঙ্গা, গোলন্দাজ বাহিনী ছুঁড়তে থাকত গুলি। সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত অবধি চলত আতশবাজি, শেষ রাতে হতো কামান দাগানো। মোগলদের ঈদ উদযাপন হতো তিনদিন ধরে। সুবেদার ইসলাম খানের সেনাপতি মির্জা নাথানের বর্ণনা থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়। দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলির সময় ত্রিপুরা জয় করা হয়। ঈদের দিন নবাব মুর্শিদ কুলি খুশি হয়ে মুদ্রা বিতরণ করতেন। ঢাকার কেল্লাহ থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ঈদগাতে যাওয়ার পথে ছড়ানো হয়েছিল রাজকীয় মুদ্রা।
মোগলদের পর ভারত বর্ষের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন ইংরেজরা। তারা তাদের মতো করে বিভিন্ন উৎসব উদযাপনের ব্যবস্থা করেন। এ সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে ঈদের পরিবর্তে ক্রিস্টমাসডে বা বড়ো দিন। ইংরেজ ও হিন্দুদের রাজনৈতিক বিড়ম্বনায় পড়ে বাঙালি মুসলমানরা উৎসাহ উদ্দীপনা হারাতে থাকে। সেটি আবার উদ্ধার হয় পাকিস্তান আমলে। এ সময় পূর্ববাংলার আপামর মুসলমান সমাজ আড়ম্বরপূর্ণ ঈদ উদযাপনের সুযোগ পেয়ে বসে। ইতোমধ্যে গোটা বিশ্বে আর্থিক অগ্রগতি দ্রুত বদলাতে থাকল। বাঙালি মুসলমানদেরও সমাজকাঠামো বদলে গেল। আর্থিক সচ্ছলতা মুসলমানদের পরিবারকেও আনন্দঘন করতে সাহায্য করল। শুরু হলো আড়ম্বরতার সাথে ঈদ উদযাপন করা।
ঈদের আনন্দ অফুরন্ত ও নির্মল হলেও এ আনন্দ সবার জন্য সমান নয়। ঈদ কারো কারো জীবনে দুঃখ কষ্টও বয়ে আনে। ঈদের আনন্দ আনন্দ হয়ে আসে না ফকির, মিসকিন, গরিব, দুঃখী, ছিন্নমূল মানুষের ঘরে। যাদের ঘরে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোটে না তারা নিরন্তর বঞ্চিত হতে থাকেন ঈদের আনন্দ থেকে। ছেলে-মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুখাপেক্ষী হতে হয় পরের দুয়ারে। নতুন জামা-কাপড়, একমুষ্টি ভালো খাবার জোগাড় করতে গিয়ে কর্তাব্যক্তিকে বারবার নিজ কপালে চপেটাঘাত করতে হয়। যত ক্ষোভ আর কষ্ট রয়েছে সব অদৃষ্টের ওপর চেপে দিয়ে নিজের জন্য সান্ত¡না খোঁজেন। খাদ্য-বস্ত্রের সঙ্কুলান না হলে নীরবে চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে যায়। তখন ঈদের আনন্দের লেশ মাত্র তারা অনুভব করতে পারেন না। এসব মানুষের জীবনে ঈদ হয়ে ওঠে দলা পাকানো কষ্টের আধার। ঈদের দিন সন্ধ্যা নামলে তাদের কিঞ্চিৎ মুক্তি মিলে। ছেলে-মেয়ে স্বামী-স্ত্রী একসাথে নিকষ অন্ধকারে বসে জীবনের হিসেব মিলায়। এভাবে পরের বছর আবার ঈদ! সে চিন্তায় তাদের শরীর হিম হয়ে ওঠে। হিম ধরা রক্তে ঈদের উষ্ণতা নিয়ে মুসলিমবিশ্ব কবে প্রকৃত ঈদ উদযাপন করবে তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
ঈদের আনন্দকে সকলের মাঝে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে সকলকে।

SHARE

Leave a Reply