Home দেশ-মহাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল স্প্যানিশভাষী দেশ মেক্সিকো -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল স্প্যানিশভাষী দেশ মেক্সিকো -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

মেক্সিকো উত্তর আমেরিকার দক্ষিণ অংশে অবস্থিত একটি দেশ। সরকারি নাম ইউনাইটেড মেক্সিকান স্টেটস বা সংযুক্ত মেক্সিকান রাজ্যসমূহ। এটি একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র। এই দেশের সীমান্তে রয়েছে উত্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ ও পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ-পূর্বে গুয়াতেমালা, বেলিজ ও ক্যারিবিয়ান সাগর এবং পূর্বে মেক্সিকো উপসাগর। আয়তনের দিক দিয়ে মেক্সিকো দুই আমেরিকার পঞ্চম বৃহত্তম রাষ্ট্র, বিশ্বের ১৩তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। জনসংখ্যার দিক দিয়ে মেক্সিকো বিশ্বের দশম সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র এবং বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল স্প্যানিশভাষী দেশ। মেক্সিকো ফেডারেশন ৩১টি রাজ্য ও মেক্সিকো সিটি (রাজধানী ও বৃহত্তম মেট্রোপলিস) নিয়ে গঠিত। অন্যান্য প্রধান শহুরে এলাকার মধ্যে রয়েছে গুয়াডালাজারা, মনটেরারি, পুয়েবলা, তোলুকা, টিজুয়ানা, সিউদাদ জুয়ারেজ ও লিওন।
মেক্সিকোর আয়তন ১৯ লাখ ৭২ হাজার ৫৫০ বর্গকিলোমিটার (৭ লাখ ৬১ হাজার ৬১০ বর্গমাইল) এবং জনসংখ্যা ১৩ কোটি ২ লাখ ৭ হাজার ৩৭১ জন। এদেশে ৫৬টি আমেরিন্ডিয়ান এবং বিচিত্র বৈদেশিক জাতিগত গ্রুপ রয়েছে। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টান ৯০.৭ শতাংশ (রোমান ক্যাথলিক ৮২.৭% ও প্রোটেস্ট্যান্ট ৬.৬% ও অন্যান্য খ্রিষ্টান ১.৪%), অধার্মিক ৪.৭ শতাংশ, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ১.৯ শতাংশ এবং অঘোষিত ২.৭ শতাংশ। ২০১০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এদেশে মাত্র আড়াই হাজার মুসলিম আছে।
প্রাক-কলম্বিয়ান মধ্য-আমেরিকায় ইউরোপীয়দের আগমনের পূর্বে ইওলমেক, তোলতেক, তিওতিহুয়াকান, মায়া ও আজটেক সভ্যতার মতো একাধিক উন্নত সভ্যতা বিকাশ লাভ করেছিল। ১৫২১ সালে স্প্যানিশ সা¤্রাজ্য তার মেক্সিকো সিটি ঘাঁটি থেকে এই অঞ্চল দখল করে, যা তখন নিউ স্পেন নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এই দেশটিই পরে মেক্সিকো উপনিবেশে পরিণত হয়। ক্যাথলিক চার্চ এসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কেননা তখন লাখ লাখ আদিবাসী খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়। এই জনগোষ্ঠীকে তাদের মূল্যবান বস্তুর সমৃদ্ধ মজুদ থেকে ভীষণভাবে বঞ্চিত করা হয়। এগুলো তখন স্প্যানিশদের সম্পদের প্রধান উৎসে পরিণত হয়। ১৮২১ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে সফল স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে মেক্সিকো স্বাধীনতা অর্জন করে।
মেক্সিকো একটি আঞ্চলিক শক্তি এবং ১৯৯৪ সাল থেকে অর্গ্যানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)-এর একমাত্র লাতিন আমেরিকান দেশ। মেক্সিকো উচ্চ মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। মেক্সিকোকে সদ্য শিল্পায়িত দেশ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। জিডিপির বিচারে মেক্সিকো বিশ্বের একাদশ বৃহত্তম অর্থব্যবস্থা। এছাড়াও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের হিসেবে মাথাপিছু জিডিপির বিচারে মেক্সিকো লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম রাষ্ট্র। দেশের অর্থব্যবস্থা মেক্সিকোর নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (নাফটা) সহযোগীদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে মেক্সিকো বিশ্বের এক উত্থানশীল শক্তি হওয়া সত্ত্বেও অসম আয় বণ্টন এবং মাদক-সংক্রান্ত হিংসার ঘটনা দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা বলে বিবেচিত হয়। ২০০৬ সালের পর থেকে সরকার এবং মাদকপাচার সিন্ডিকেটের মধ্যে সংঘর্ষে ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। মেক্সিকো জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, জি৮+৫, জি২০ এবং প্যাসিফিক অ্যালায়েন্স ট্রেড ব্লকের সদস্য। এদেশের মুদ্রার নাম মেক্সিকান পেসো।
এটি ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে উত্তরে ও সবচেয়ে পশ্চিমে অবস্থিত দেশ এবং পৃথিবীর বৃহত্তম স্পেনীয় ভাষাভাষী রাষ্ট্র। স্পেনের অধীনতা থেকে মুক্তিলাভ করার পর নিউ স্পেন স্থির করে নতুন রাষ্ট্রের নামকরণ করা হবে রাজধানী মেক্সিকো সিটির নামে। ১৫২৪ সালে প্রাচীন আজটেক রাজধানী তেনোচতিৎলনের ওপর এই শহরটি স্থাপিত হয়। শহরের নামটি এসেছে নাউয়াত ভাষা থেকে।
মেক্সিকোতে একটি ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান। রাষ্ট্রপতি একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান। বর্তমান রাষ্ট্রপতি আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওবরাডর। আইনসভা দ্বিকক্ষীয়। নিম্নকক্ষের নাম ফেডারেল চেম্বার অব ডেপুটিজ, যার সদস্যসংখ্যা ৫০০। উচ্চকক্ষের নাম সিনেট, যার সদস্যসংখ্যা ১২৮।
জিওফিজিক্যালি, কিছু জিওগ্রাফার মেক্সিকোর ৮৮ শতাংশ উত্তর আমেরিকায় এবং ১২ শতাংশ মধ্য আমেরিকায় পড়ে বললেও, ভূরাজনৈতিকভাবে, মেক্সিকোকে সম্পূর্ণরূপে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তর আমেরিকার অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। মেক্সিকো লম্বায় ২,০০০ মাইলের (৩,২১৯ কিলোমিটার) সামান্য বেশি। উত্তর থেকে দক্ষিণে মেক্সিকোকে অতিক্রম করেছে দু’টি পার্বত্য রেঞ্জ। এগুলো সিয়েরামাডরে ওরিয়েন্টাল এবং সিয়েরামাডরে অকসিডেন্টাল নামে পরিচিত। রেঞ্জ দু’টি হচ্ছে উত্তর আমেরিকার উত্তরাঞ্চল থেকে আসা প্রস্তরময় পর্বতমালার বর্ধিত অংশ। মধ্যভাগে পূর্ব থেকে পশ্চিমে দেশটিকে অতিক্রম করেছে ট্রান্স-মেক্সিকান ভল্কানিক বেল্ট, যাসিয়েরা নেভাডা নামে পরিচিত। চতুর্থ একটি পার্বত্য রেঞ্জ, সিয়েরামাডরে ডেলসুর, মিচোয়াকান থেকে ওয়াক্সাকা পর্যন্ত চলে গেছে।
মেক্সিকোর মধ্য ও উত্তর অঞ্চলের বেশির ভাগ উঁচুতে অবস্থিত এবং সবচেয়ে উঁচু স্থানগুলো ভল্কানিক বেল্টেবা আগ্নেয়গিরি অঞ্চলে অবস্থিত। সেগুলো হলো পিকোডি অরিজাডা (৫,৭০০ মিটার), পোপোকাটেপেটল (৫,৪৬২ মিটার), ইজতাসসিহুয়াটল (৫,২৮৬ মিটার) ও নেভাডাডি টলুকা (৪,৫৭৭ মিটার)। আর এই চারটি উঁচু স্থানের মধ্যকার উপত্যকাগুলোতে তিনটি প্রধান শহুরে এলাকা অবস্থিত। সেগুলো হলো টলুকা, বৃহত্তর মেক্সিকো নগরী ও পুয়েবলা।
মেক্সিকোর আবহাওয়া বড়ই বৈচিত্র্যময়। কর্কটক্রান্তি কার্যত দেশটিকে নাতিশীতোষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে বিভক্ত করেছে। কর্কটক্রান্তির উত্তরের ভূমিতে শীতের মাসগুলোতে অধিকতর ঠাণ্ডা তাপমাত্রা বিরাজ করে। কর্কটক্রান্তির দক্ষিণে তাপমাত্রা সারা বছর চমৎকারভাবে অপরিবর্তিত থাকে তবে শুধুমাত্র উচ্চতার কারণে সামান্য ওঠানামা করে। এর ফলে মেক্সিকো বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় দেশগুলোর অন্যতম।
মেক্সিকোয় জনপ্রিয় খেলাধুলার মধ্যে রয়েছে ফুটবল, বেজবল, বাস্কেটবল, কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধ ও ষাঁড়ের লড়াই। এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল। মেক্সিকোর শীর্ষ ক্লাবগুলো হলো আমেরিকা, গুয়াডালা ও তলুকা। এন্টোনিওকার বাজাল হলেন প্রথম খেলোয়াড় যিনি পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলেন এবং আইএফএফএইচএস হুগো সানজেকে বিংশ শতাব্দীর সেরা কনকাকাফ খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করে। রাফায়েল মারকুয়েজ হচ্ছেন যিনি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় করেন। মেক্সিকো দু’বার, ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালে, ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজন করে।
মেক্সিকো সিটিতে ১৯৬৮ সালে ১৯তম অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়।
মেক্সিকান পেশাদার বেজবল লিগের নামকরণ করা হয়েছে লিগা মেক্সিকানাডি বেজবল। যুক্তরাষ্ট্র, ক্যারিবিয়ান দেশগুলো এবং জাপানের মতো শক্তিশালী না হলেও মেক্সিকো বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বেজবল শিরোপা অর্জন করেছে। মেক্সিকান দলগুলো ৯ বার ক্যারিবিয়ান সিরিজ জয় করে।

SHARE

Leave a Reply