Home ফিচার মোগল স্থাপত্যের সুরম্য ঝাউদিয়া শাহি মসজিদ -হাফিজ ইকবাল

মোগল স্থাপত্যের সুরম্য ঝাউদিয়া শাহি মসজিদ -হাফিজ ইকবাল

প্রাচীন, পুরাকীর্তির খোঁজে গেছিলাম ঐতিহ্যের জেলা কুষ্টিয়ায়। বিশেষ করে খুঁজছিলাম মুসলিম ঐতিহ্য ও প্রত্নসামগ্রী। কেননা আমরা যদি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সোনালি দিনগুলো সম্পর্কে সম্যকভাবে জ্ঞাত না হই তাহলে, আমরা কোত্থেকে এসেছি; আমাদের ভিত্তি কী; এ বিষয়ে আমরা জানতে পারবো না। আমাদের ভিত শক্ত, আমরা যে কোনও নড়বড়ে জাতি নই, আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য যে কোনো ঠুনকো নয়; এ বিষয়গুলোকে পোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজন আমাদের ইতিহাস জানা। আমাদের সোনালি দিনগুলোকে জানা।
বর্তমান সময়ে আধুনিকতায় গা ভাসিয়ে দিয়ে আমরা আল্লাহ তা’লার ইবাদত থেকে যেভাবে গাফেল হয়ে যাচ্ছি, এ বিষয় থেকে উত্তরণের জন্যও আমাদের প্রাচীন ইতিহাস, প্রাচীন-পুরাকীর্তি খোঁজ নিয়ে দেখা দরকার। কেননা সে সময়কার মানুষজন কতটা পরিশ্রমী ছিলেন, কতটা ঈমানদার ছিলেন, কতটা আল্লাহভীরু ছিলেন, তা উপলব্ধি করা যাবে। সে সময় পুরো এলাকাজুড়ে মাত্র একটি মসজিদ ছিলো। সে মসজিদে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিগণ এসে নামাজ আদায় করতেন। তাতে নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতগুলোর প্রতি তাদের যেমনি আন্তরিকতা বাড়তো, তেমনি পারস্পরিক সম্পর্কও মজবুতি পেতো। মসজিদই ছিলো সকল ধর্মীয় ও সামাজিক কাজের কেন্দ্রমূল। কিন্তু এখন আমাদের বাড়ির আশপাশে অনেক মসজিদ থাকা সত্ত্বেও আমরা সেগুলোতে নামাজে উপস্থিত হই না। আজান শুনেও সতর্ক হই না। ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক আজ কোথায়? দিনদিন ঈমানের তেজ নিভুনিভু করছে। পরাজিত হচ্ছি শয়তানের প্ররোচনায়।
সকালের নাস্তা সেরে মুসলিম এইড মাইক্রো ফিন্যান্স হরি নারায়ণপুর শাখার ম্যানেজার আসাদুজ্জামান মানিকের বাইকে করে লক্ষ্মীপুর থেকে গ্রামের ভেতর দিয়ে সরু পাকা রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে চলে গেলাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলাস্থ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ঝাউদিয়া নামক গ্রামের উদ্দেশে। গ্রামের পাকা রাস্তার উভয় দিকের গাছে কিছু কাগজ লেমিনেটিং করে পেরেক দিয়ে লাগানো। সে কাগজগুলোতে লেখা সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার এরকম। কতটা ধর্মভীরু মানুষ হলে এ ধরনের কাজ করতে পারেন! মূলত চৌকস ঈমানদার মানুষ এ কাজটি করেছেন। কারণ শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই সেগুলোতে নজর গেলেই মনের অজান্তেই উচ্চারণ করবেন উপরোক্ত জিকিরগুলো। আর সেগুলোর সওয়াব যিনি জিকির করছেন তার আমলনামায় যাবে এবং যিনি লাগিয়েছেন তার আমলনামায়ও সদকায়ে জারিয়া হিসেবে চলে যাবে। সবুজে মোড়ানো গ্রামগুলোতে অনেক বড় বড় পানের বরজ আছে। চাষিগণ পানের পরিচর্চায় ন্যস্ত।
সকাল দশটা বাজে। আমরা দু’জন পর্যটক উপস্থিত হলাম আল্লাহর এবাদতের সাক্ষী হয়ে থাকা ঝাউদিয়া শাহি মসজিদ প্রাঙ্গণে। আমি আগে থেকেই এই মসজিদটি সম্পর্কে অল্প-বিস্তর জেনে নিয়েছি। বিশেষ করে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া স্যারের ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ নামক গ্রন্থে। মসজিদটির প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিষয়াবলি জেনে সেটি সম্পর্কে জানার আগ্রহ বেড়ে গিয়েছিলো। মসজিদটি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। আওরঙ্গজেবের আমলের অর্থাৎ মোগল আমলের স্থাপত্য কীর্তিতে যে ধরনের রঙ এর ব্যবহার থাকে মসজিদটি দেখে সে ধরনের রঙের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় না। সাদা রঙ ব্যবহার করা হয়েছে এবং যে নকশাগুলো আছে সে নকশাগুলোতে বিশেষ করে লাল রঙের ব্যবহার এবং অন্যান্য কিছু রঙের ব্যবহার করা হয়েছে। এটি নির্মাণে লাল জাফরি ইটের ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদের সামনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর কর্তৃক টাঙানো নোটিশ থেকে জানলাম যে, এটি ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে সংস্কার করা হয়েছিলো। সে সময় হয়তো এ মসজিদের দেয়ালের যে কারুকার্য, রঙ ইত্যাদি ছিলো সেগুলো পরিবর্তন করে বর্তমান রূপ দেওয়া হয়েছে।
মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। মসজিদে প্রবেশের পূর্বেই সুরম্য এক দরজাবিশিষ্ট ফটক আছে। ফটকের দু’পাশে দুটো গম্বুজ আছে। ফটকটিতে বিভিন্ন ধরনের কারুকাজ এবং ফুল দেখতে পেলাম। দক্ষিণ দিকের যে গম্বুজটি সেখানে এলাকার কিছু লোককে চেয়ার পেতে বসে গল্প করতে দেখা যাচ্ছিলো। তারপর অনেকটুকু অংশ অর্থাৎ মসজিদের আঙিনা পাকা। আঙিনার উত্তর এবং দক্ষিণ পার্শ্ব পুরু দেয়াল দিয়ে ঘেরা।
মূল মসজিদে প্রবেশের দরজা পূর্ব দিক থেকে তিনটি। এবং মসজিদের উত্তর পাশের দেয়াল এবং দক্ষিণ পাশের দেয়ালে দুটো দরজা ছিলো। কিন্তু সে দরজা দুটো এখন বন্ধ এবং এমন করে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে যে সেগুলোতে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের ওপরে ৩টি গম্বুজ দেখতে পেলাম। উত্তর দিকে একটি। দক্ষিণে একটি এবং মাঝখানে একটি। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব আমরা দেখতে পেয়েছিলাম। তবে উত্তর এবং দক্ষিণ পার্শ্বের মেহরাব আগের অবস্থায় নেই। সেগুলোর চিহ্ন অবশিষ্ট আছে। কিন্তু সেখানে আলমারি বা জায়নামাজের চট রেখে দেওয়া হয়েছে। মাঝখানে ইমাম দাঁড়ানোর যে মেহরাব, সেখানে নান্দনিক কিছু কারুকার্য চোখে পড়েছিলো। এবং ইমামের খুতবা দেওয়ার সময় যে মিম্বরটি ব্যবহার করেন সে মিম্বরটি আমরা দেখলাম যে চুন-সুরকি খসে গেছে এবং ইট দেখা যাচ্ছে।
বৈদ্যুতিক সংযোগের জন্য মসজিদের দেয়ালের কিছু কিছু জায়গায় ড্রিল মেশিন দিয়ে কাজ করেছেন কর্তৃপক্ষ। সেগুলোর ক্ষতের চিহ্ন স্পষ্ট এবং যা মসজিদটির স্থাপনার ক্ষতি করেছে।
মসজিদটির পূর্ব এবং পশ্চিম দেয়ালের ওপরে চারটি করে মিনার আকৃতি আছে। তবে উত্তর ও দক্ষিণের যে মিনার আকৃতি সে দুটো তুলনামূলক উঁচু ও মোটা। আর মাঝখানের যে মিনার আকৃতির স্তম্ভ সে দুটো তুলনামূলক সরু ও ছোট্ট। মূল গম্বুজ তিনটির অগ্রভাগও শাপলা ফুলের পাপড়ি দিয়ে ছড়িয়ে হাঁড়ির পরস্পর ওপর দিকে সুচালো। মসজিদটির বাইরের মাপ ১৭.৫৭ মিটার * ৭.২৭ মিটার। দেয়ালগুলি ১.২১ মিটার প্রশস্ত।
মসজিদটির যে পাকা আঙিনা সেখানে মুসল্লিদের দিনের বেলা নামাজ পড়তে রোদে যেন কষ্ট না হয়, এ জন্য নীল ট্রিপল দিয়ে শামিয়ানা তৈরি করা হয়েছে। মসজিদের আঙিনার বাইরে যে ফটক সে ফটকের বাইরে উত্তর-পূর্ব সংলগ্ন একটি অজুখানা আছে। পাশেই একটি পাকা ঘর আছে যেখানে শুক্রবার মানতের ভাত, গোশত, মুরগি ইত্যাদি রাখা হয় এবং নামাজ শেষে মানুষদের মাঝে সেগুলো বণ্টন করা হয়। মসজিদের উত্তর বরাবর চৌধুরী এবং খান পরিবারের ঘাস ও লতাপাতায় আচ্ছাদিত একটি পারিবারিক কবরস্থান আছে।
অজুখানায় বসে থাকা ৮৬ বছরের বৃদ্ধ ব্যক্তি আফাজ উদ্দিনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। তিনি জানান যে, এই মসজিদটির একটি পিতলের পাতে ফারসি লিপিতে লেখা ইতিহাস ছিলো। ১৯৭০ সালে সে সময়কার পাকিস্তানি সরকারের কুষ্টিয়া জেলার ডিসি এসে সেই লিপিটি তার তত্ত্বাবধানে নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধের পর আর সে লিপিটি ফেরত পায়নি চৌধুরী পরিবার। এভাবেই হাতছাড়া হয়ে যায় ইতিহাস।
মসজিদের দক্ষিণ দিকে এই মসজিদের সমসাময়িক নির্মিত একটি বাড়ি ছিলো। যেটিতে খান এবং চৌধুরী পরিবারের লোকজন বসবাস করতেন। বংশ পরম্পরায় উত্তরাধিকারী অনেক বেড়ে গেলে সে বাড়িটিতে আর সঙ্কুলান হয়নি। ফলে বাড়িটি আর নতুন করে সংস্করণ ও সংরক্ষণ করা হয়নি। উত্তরাধিকারীগণ যে যার মতো পাশে বা দূরে বাড়ি নির্মাণ করে জীবনযাপন করেছেন। আমরা ননী নামক এক ঠিকাদার ব্যক্তির সহযোগিতায় সেই ভাঙা হাড্ডিসার কক্ষগুলোর দিকে গেলাম। সেখানে দেখলাম যে বেরিয়ে থাকা দুটো পরিত্যক্ত ইট কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়াল ও মেঝের বুক চিরে সবুজ কচি পাতা নিয়ে লকলকে কত্ত গাছ!
এ চৌধুরী পরিবারের কোন ব্যক্তির কাছে প্রাচীন একটি ফারসি কাব্যগ্রন্থ এবং ফারসিতে লেখা কিছু পুরাতন কাগজপত্র রয়েছে সেগুলোর খোঁজ নিচ্ছিলাম। কিন্তু আশপাশের লোকজন বললেন, আসলে সেই ফারসিতে লেখা কাব্যগ্রন্থ ও প্রাচীন ছিঁড়ে যাওয়া কাগজপত্র কার তত্ত্বাবধানে বা অধিকারে আছে সেটা কেউই জানেন না। অনেক খোঁজাখুঁজি করে ব্যর্থ হয়েছি। যদি কাব্যগ্রন্থ বা কোনও একটি কাগজ হাতে পেতাম, তাহলে হয়তো মসজিদ বা এ সম্পর্কিত ইতিহাসের কোনো খোঁজ মিলতো।
মসজিদ থেকে পশ্চিমে একটি বাড়ি, তারপরে পুকুর এবং পুকুর থেকে খানিক দূরে ঠিক পশ্চিমে একটি জীর্ণ এবং লতাপাতায় ঢাকা কবরস্থান আছে। সেখানে একটি কবর আছে যে কবরটির গায়ে ফারসিতে লেখা লিপি আছে। সেটি উদ্ধারের জন্য ঠিকাদারসহ আমরা গেলাম। নিজ হাতে কবরের সেই শিলালিপিকে ঢেকে রাখা ময়লা-আবর্জনা, পিঁপড়ের বাসা পরিষ্কার করে শিলালিপির ছবি তুললাম। পাঠে বুঝলাম যে, আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগে এক কাবুলি ব্যবসায়ী মৃত্যুবরণ করেন। এই কবরের সিমেন্টের ফলকের ছবিটি ইরানের ইয়াজদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজেম কাহদুয়ি স্যারকে হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে পাঠালে জানান যে, ব্যক্তির নাম ছিলো আব্দুল্লাহ খান। বাবার নাম হাজি পানিদ মোহাম্মদ খান। খোরাসানের মানাখিলের শাদইয়াখিলের বাসিন্দা। ১৩৪৮ হিজরির জামাদিউল উখারা মাসের ২১ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন।
ঠিকাদার ননী জানালেন যে, এই কবরটি একজন কাবুলি (খোরাসান আফগানিস্তানের একটি অংশ ছিলো। যা বর্তমানে ইরানের অংশ।) ব্যবসায়ীর। যিনি এখানে বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। তিনি মারা গেলে তাকে এখানে সমাহিত করা হয়। তার সাথে এ চৌধুরী ও খান পরিবারের হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল।
অতঃপর আমাদেরকে মসজিদের উত্তর-পশ্চিম দিকে এক কামেল ব্যক্তির মকবরায় নিয়ে গেলেন। মকবরার ফটকের ফলকে লেখা ‘শাহ্ সুফি সৈয়দ আহাম্মেদ আলী (আদারী মিয়া চৌধুরী) এর মাজার। মাজারে সিজদা করবেন না, মাটি খাইবেন না।’ উঁচু দেয়াল দিয়ে মাজারের এলাকাটি ঘিরে রাখা আছে এবং মাজারটি একটি পাকা ঘরে লাল-শালু কাপড় দিয়ে ঢাকা। ননী সাহেব জানালেন যে, ‘খুব সম্ভবত এই আদারী মিয়া চৌধুরীই মসজিদটি নির্মাণ করে থাকবেন। আর ইনিতো সৈয়দ বংশের মানুষ।’ তার কাছ থেকেই জানলাম যে, মসজিদটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব চৌধুরী পরিবারের লোকজনের হাতেই ন্যস্ত।

SHARE

Leave a Reply