Home উপন্যাস ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস গন্ধ-পাগল -জুবায়ের হুসাইন

গন্ধ-পাগল -জুবায়ের হুসাইন

[গত সংখ্যার পর]
বেশ উপভোগ করছিল আবিদ ও সুমি। অনুরোধ করল পুরোটা গাওয়ার জন্য। কিন্তু বিপ্লব ওদেরকে থামিয়ে দিল। বলল, ‘পরে একসময় গেয়ে শোনাব। এখন কাজের কথায় এসো।’
‘তুমি কি কিছু ভেবেছ?’ আবিদ জিজ্ঞেস করল।
‘আগে তোমরা কিছু ভেবেছ কি না বলো।’
‘আমি বাবা কিছু ভাবিনি। ওসব ভাবাভাবি আমার দিয়ে হবে না।’ হাল ছেড়ে দিয়ে বলল আবিদ।
‘আমিও কিছু ভাবিনি বিপু ভাইয়া। ভাববার বিষয়টা আমি তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম।’
‘শোনো বিপু, আমি আবারও বলছি, তুমি যা করবে এবং করতে বলবে, আমি তাতেই রাজি।’ বলল আবিদ।
‘খুব যে বললে রাজি,’ বলল সুমি, ‘বিপু ভাইয়া যদি বলে পানিতে ঝাঁপ দিতে, তুমি তাতে রাজি হবে?’
‘দেখ সুমি,’ বলল আবিদ। ‘আমি জানি বিপু তেমন কিছু করবে না এবং বলবেও না। আমার বন্ধুকে আমি ভালো করেই চিনি।’ বলে আড়চোখে বিপ্লবের চোখের দিকে তাকাল।
কিন্তু বিপ্লবের মুখটা তখন থমথম করছে। দেখে বেশ শব্দ করেই একটা ঢোক গিলল আবিদ।
সুমিদের পাশের বাড়ির মিজান আঙ্কেল বাইসাইকেল চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। সুমিকে ভীষণ আদর করেন তিনি। ওদের পাশে থেমে বললেন, ‘গ্রাম দেখতি বের হইছাও বুঝি? তা ভালো করে দেখ। তবে সাবধান, বাংলোটার ওদিকি যেন যাবা না।’
লোকটার মুখের দিকে একপলকে তাকিয়ে রইল বিপ্লব। তার কথার মধ্যে স্পষ্ট সাবধানবাণী আঁচ করতে পারল ও। এলাকার সবাই-ই দেখা যাচ্ছে বাংলোটাকে এড়িয়ে চলতে চায়। আসলে কী আছে ওখানে? কী ঘটছে বাংলোটাকে ঘিরে?
ওর ভাবনার মধ্যেই সুমি বলল, ‘বিপু ভাইয়া, আমি আঙ্কেলের সাথে বাড়ি চলে যাচ্ছি। তোমরা যেন বেশি দেরি করো না। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।’
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল বিপ্লব। মুখে কিছু বলল না। যখন গভীরভাবে কিছু ভাবে, তখন এভাবেই ইশারায় কথা বলে ও।
সুমিকে নিয়ে চলে গেলেন মিজান আঙ্কেল।
উঠে দাঁড়াল বিপ্লব। আবিদও। এদিক ওদিক আরো কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করল। তারপর সুমিদের বাড়ির পথ ধরল।
কিছু দূর এগিয়েছে ওরা, এই সময়ই ঘটল ঘটনাটা। একটা বাইসাইকেলকে সাইড দিতে গিয়ে কিছুটা সরে গিয়েছিল। ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল একটা ব্যাটারিচালিত রিকশা। নিজে ধাতস্থ হওয়ার আগেই দেখল আবিদকে কে যেন রিকশাটাতে টেনে তুলল। তারপর ওর চোখের সামনে হাওয়া হয়ে গেল।
এরপরই তো ও আশপাশের জায়গাগুলোতে খুঁজল। একে ওকে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু না, কোথাও রিকশাটা বা আবিদের ছায়াও দেখা গেল না। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
এখন আর বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিভাবে বাড়ি ফিরবে ও? ফুফু যদি আবিদের কথা জিজ্ঞেস করেন তাহলে কী জবাব দেবে ও? আর তা ছাড়া আবিদ তো ওর সাথেই বেড়াতে এসেছিল। কাজেই ওর ভালো-মন্দ সব দেখার দায়িত্ব তো ওরই। এখন ওকে বিপদের মধ্যে রেখে ও তো একা বাড়ি ফিরে যেতে পারে না। বন্ধুকে যেখান থেকে যেভাবেই হোক, উদ্ধার করে তবেই বাড়ি ফিরবে। কিন্তু কোথায় খুঁজবে তাকে ও? সবটা তো চেনে না এখানকার। লোকজনও সব অপরিচিত।
সামনের শানবাঁধানো পুকুরের সিঁড়িতে বসে এসবই ভাবছিল কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া।
এই মুহূর্তে মস্তিষ্কটা কম্পিউটারের মতো কাজ করছে। সম্ভাব্য নানান দিক ভেবে চলেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কোনোটারই উপসংহারে পৌঁছতে পারছে না। সবকিছু কেমন এলোমেলা হয়ে যাচ্ছে।
আচ্ছা, ভাবল ও। কেন হঠাৎ আবিদকে ওভাবে নিয়ে যাওয়া হলো? ও নিজে যদি কারোর কোনো কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে থাকে, তবে তার মাশুল তো ওকেই দেওয়ার কথা। তাহলে আবিদকে কেন? তবে কি আবিদকে নিয়ে গিয়ে ওকে সতর্ক করতে চায়? কী থেকে সতর্ক করতে চায়? কে চায়?
দূর! এখানে এভাবে বসে থেকে ভাবলে আবিদের খোঁজ পাওয়া যাবে না। তারচেয়ে ও আশপাশটা আরেকবার খুঁজে দেখতে তো পারে।
যেই ভাবা সেই কাজ, উঠে পড়ল বিপ্লব। আশপাশটা ভালো করে খুঁজল ও। একে ওকে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু ফল হলো ওই একই- কেউ কিছু জানাতে পারল না।
এখন ও যেখানটায় রয়েছে, জায়গাটা নদীর ধার ঘেঁষা। বাতাসে শীতল একটা পরশ থাকায় কিছুটা শীত শীত লাগছে। তবে ভালোই লাগছে। সারাদিনের গরমটা এই মুহূর্তে কমতে শুরু করেছে।
তখন সন্ধ্যা হয় হয়। নদীর কিনারেই একটা হিজল গাছের নিচে বসে পড়ল বিপ্লব। আর এখান থেকে বাংলোটা কাছেই। ক্লান্তিতে শরীরটা নুয়ে আসতে চাইছে। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। কিছুটা ক্ষিধে আর প্রচণ্ড মানসিক চাপেই এমনটা হচ্ছে, বুঝতে পারছে ও। কিন্তু কী করবে? আবিদকে রেখে ও তো আর বাড়ি ফিরে গিয়ে নরম বিছানায় শুতে পারবে না।
নদীর পানিতে কাঁপা কাঁপা একঝাঁক পাখির উড়ে যাওয়ার ছায়া পড়ল। অন্য সময় হলে তা নিয়ে ভাবনার জগতে হারিয়ে যেত ও। কিন্তু এক্ষণে তা পারছে না। এখন একমাত্র চিন্তা আবিদকে উদ্ধার করা।
বাংলোটার দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল ও। হঠাৎ করে কেন যেন মনে হচ্ছে, আবিদকে ওখানেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হ্যাঁ, এখানকার সবকিছুই যেহেতু ওই বাংলোটাকে ঘিরে ঘটছে, তাই ওকে শায়েস্তা করার জন্য যদি আবিদকে ওভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তাকে ওখানে রাখাই বেশি যুক্তিসঙ্গত। তবে যদি অন্য কারণে তুলে নিয়ে যেয়ে থাকে তাহলে অন্য কথা। আজকাল এরকম অহরহই ঘটছে। শিশু-কিশোরদের বিদেশে পাচারের উদ্দেশে রাস্তা থেকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর টাকা দিয়ে তাদেরকে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু না, বিপ্লব এই ব্যাপারটা ভাবতে চায় না। ও ভাবতে চায়- আবিদকে এজন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, বিপ্লব বাংলো রহস্যটার একটা সমাধান করতে চাইছে এবং যারা ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে তারা ওকে সেটা করতে দিতে চায় না। তাই আবিদকে তুলে নিয়ে গিয়ে ওকে ভয় দেখিয়ে এলাকা ছাড়া করতে চাইছে। কিন্তু বিপ্লব তো আর ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ছেলে নয়। ও যখন কোনো কেসে হাত দেয়, তখন তার শেষটা দেখেই তবে ছাড়ে। এই রহস্যটারও একটা শেষ ও দেখবে।
হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল ওর। উঠে দাঁড়াল। আর ঠিক তখনই মিষ্টি একটা গন্ধ ওর নাকে ঢুকল।
মাথাটা ঝাঁ করে উঠল কিশোর গোয়েন্দা বিপু ভাইয়ার। কী একটা আবেশ যেন ওর শিরা-উপশিরা দিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। মিষ্টি ওই গন্ধটা শরীরটাকেও যেন অবশ করে দিতে চাইছে।
পাঁই করে ঘুরে তাকাল বিপ্লব। হ্যাঁ, দুটো লোক দাঁড়িয়ে আছে ওর পাশে। সূর্যটা তখন বাংলোর ওপাশে হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলোর ছায়া এসে পড়েছে নদীর এদিকটায়। কিছুটা পানিসহ ওর শরীরের ওপরও সেই ছায়া। তাই লোক দুটোকে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। ওদের মধ্যে লম্বা ধরনের লোকটার গায়ে লাল গেড়–য়া ধরনের পোশাক। গলা পেঁচিয়ে লাল একটা গামছা মতো ঝুলছে বুকের ওপর। গলায় একটা মালাও আছে বোধ হয়। উসকো-খুসকো কাঁচা-পাকা চুলে মাথাভর্তি। নাকের ঠিক ওপরটা দিয়ে লম্বা করে সাদা চুনের মতো কিছু একটা লাগিয়ে রেখেছে। বাঁ হাতে আঁকাবাঁকা একটা লাঠি। খালি পা। দেখলে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতো মনে হয়। কুতকুতে চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
অন্য লোকটা ততটাই বেঁটে। হলুদ ফতুয়া পরে আছে। বোগলের নিচে দলা পাকানো একটা ছাতা বলেই মনে হচ্ছে।
মিষ্টি গন্ধটা আসছে লম্বা লোকটার গা থেকে। বিপ্লবের দৃষ্টিটা মূলত তার দিকেই নিবদ্ধ হয়ে আছে। এই ধরনের লোককে ও বরাবরই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। কারণ তাদেরকে ওর কাছে অভেদ্য এক রহস্য বলে মনে হয়। আর তেমনই এক জীবন্ত সত্তা কি না এখন ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। গলার মধ্যে কেমন গুলিয়ে উঠছে। অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘কে আপনারা?’
হলুদ ফতুয়া পরা লোকটা তক্ষুনি জবাব দিল, ‘উনি গন্ধ-পাগল। তোমার সাথে উনার জরুরি কথা আছে।’ বলেই হে-হে করে হাসল খানিকটা।
বিষয়টা বুঝতে একটু সময় নিল বিপ্লব। বুঝল, গন্ধ-পাগল বলতে লাল গেড়–য়া পরা লোকটাকেই বোঝাচ্ছে। কিন্তু এ কেমন নাম হলো? গন্ধ-পাগল কারোর নাম হতে পারে? কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর আবার প্রশ্ন করল, ‘আমার সাথে উনার জরুরি কী কথা? আমি তো উনাকে চিনি না।’
‘আমি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। উনি হলেন…’
হাত উঁচু করে তাকে থামিয়ে দিল গন্ধ পাগল। মুখের ভঙ্গি একটুও পরিবর্তন না করে বলল, ‘আমার সাথে এসো বিপু ভাইয়া।’ বলেই ঘুরে হাঁটা শুরু করল।
বিস্ময়ে মুখটা হাঁ হয়ে গেল বিপ্লবের। লোকটা দেখা যায় ওর নামও জানে। তার মানে আরো অনেক কিছু জানাটাই স্বাভাবিক। লোকটার সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল তক্ষুনি। মনে হচ্ছে রহস্যটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে ও।
লোক দুটোর পিছু পিছু বাংলোটার দিকে হেঁটে চলল বিপ্লব খান।
বাংলোর কাছে পৌঁছতেই ঝুপ করে সূর্যটা ঢুবে গেল দিগন্তের ওপারে। কিন্তু তক্ষুনি অন্ধকার নামল না। আবছা আলো-আঁধারি রইল আরো প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট। এই সময়টাকে গোধূলি বলে।
বাংলোয় প্রবেশের এই পথটা আগে দেখেনি বিপ্লব। মাটির সমান্তরাল একটা বিরাট পাথর। সেই পাথরটাই হচ্ছে বাংলোয় প্রবেশের একটি দরোজা। একপাশে লোহার আংটার সাথে হাত চারেক রশি বাঁধা। সেই রশি ধরে টেনে পাথরটা সরিয়ে ফেলল হলুদ ফতুয়াধারী। বেরিয়ে এলো একটা সিঁড়ি মুখ। নিচে একটা টিমটিমে আলো জ্বলছে।
বুকের কোন্ জায়গাটায় যেন চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করল বিপ্লব। কেন এমন হলো, তা বুঝতে পারছে না। তাহলে কি কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছে ও? স্বেচ্ছাই ধরা দিচ্ছে? যদি আবিদ এখানে না থাকে? এরা যদি তাকে ধরে না এনে থাকে? খালি খালি সময় ব্যয় হবে নাতো? আর তাছাড়া গন্ধ-পাগল নামের লোকটা ওর নাম জানে। আরো নিশ্চয়ই অনেক কিছুই জানে। তবে নিশ্চিত নয় কতটুকু জানে।
যা থাকে কপালে, মনে মনে বলে বুক টান করে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে লোক দুটোর পিছু পিছু সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। নিয়মিত ব্যবহার হয় এই সিঁড়ি। কোথাও ধুলোবালির আস্তর নেই।
সিঁড়ির প্রায় শেষ মাথায় চলে এসেছে ওরা। সামনে আর তিন ধাপ আছে, ঠিক এই সময় প্রচণ্ড জোরে একটা কথা বিপ্লবের কানে এলো, ‘বিপু তুমি ফিরে যাও…!’
চমকে উঠল বিপ্লব। এ কণ্ঠ ওর পরিচিত। কী করবে তা ঠিক করার আগেই দেখল ওর পেছনে সিঁড়িতে এসে হাজির হয়েছে আরো দুটো লোক। দু’পাশ থেকে ওর দুই বাহু আঁকড়ে ধরেছে তারা। মাথা ঘুরিয়ে পেছন ফিরে দেখার চেষ্টা করল। বাইরে তখন অন্ধকার থাকায় এবং নিচ থেকে ওপরে আলোর ছটা এসে পড়ায় তাদের চেহারা দেখতে পেল না। তবে তাদেরকে ওর কাছে চেনা চেনা মনে হলো। ঝাঁ করে লোক দুটোর চেহারা ভেসে উঠল মনের ভেতরে। প্রচণ্ড রকম চমকাল বিপ্লব। ধুক ধুক করে উঠল হৃৎপিণ্ডটা। হার্টবিট বেড়ে দ্রুত হলো।

চৌদ্দ.
কেমন একটা গুমোট ভাব রুমটার ভেতরে। বাতাসে ধুলো উড়ছে। এই ধুলো উড়ে এসে বিপ্লবের নাকে ঢুকছে। বিষয়টা একদমই সহ্য করতে পারে না ও। নাকের কাছটায় কেবলই সুড়সুড় করে। এখন হলোও তাই। ঘন ঘন নাক দিয়ে বাতাস বের করতে লাগল, যাতে হাঁচি না আসে।
ওদিকটা পশ্চিম দিকই হবে- আন্দাজ করল বিপু। দেয়াল থেকে কিছুটা সামনে হাতলওয়ালা একটা বড় কাঠের চেয়ার। সোজা গিয়ে ওটাতেই বসল গন্ধ-পাগল। লোকটার এই অদ্ভুত নামের কারণ এখনও পরিষ্কার নয় বিপ্লবের কাছে। লোকটা দেখতেও যেন কেমন। দেখলেই আপনা হতেই একটা ভয় এসে ভর করে বুকের মধ্যে। শিড়দাঁড়া বেয়ে ভয়ের ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে যেতে থাকে। চেষ্টা করেও পুরোটা সামাল দিতে পারছে না ও। খুবই শক্ত আর প্রবল মনের জোর থাকার কারণেই এতক্ষণ শান্ত থাকতে পেরেছে। কতক্ষণ আর পারবে তা বুঝতে পারছে না।
গন্ধ-পাগলের সঙ্গের লোকটা পাশের দরোজা দিয়ে কোথায় যেন চলে গেল। যে দু’জন বিপ্লবকে দু’পাশ থেকে আঁকড়ে ধরেছিল- এতক্ষণে তাদের চেহারা দেখার সুযোগ পেল ও- চিকমিক আর পিকমিক। কিছুটা অবাক হলেও ঘাবড়ে গেল না। নীরবে ভাবতে লাগল এসব কী হচ্ছে। যদিও এই অবস্থার মাঝে থেকে শান্ত হয়ে কিছু ভাবাও সম্ভব না। তবে ওর মস্তিষ্ক দ্রুতই কাজ করে চলেছে। কিছু মেলাতে চেষ্টা করছে।
বিপ্লবকে গন্ধ-পাগলের ঠিক মুখোমুখি একটা নড়বড়ে কাঠের চেয়ারে বসানো হলো। পেছনেই দাঁড়িয়ে রইল চিকমিক ও পিকমিক।
গন্ধ-পাগল হাত দিয়ে কিছু একটা ইশারা করল চিকমিককে। বিপ্লবের পাশে আরেকটা চেয়ার এনে রাখা হলো পরক্ষণে। একটু পর রুমের এক কোনা থেকে টেনে এনে তাতে বসানো হলো একটা ছেলেকে। ঘাড় ফিরিয়ে দেখেই চমকে উঠল বিপ্লব। এ কী চেহারা হয়েছে ওর? রাগে সমস্ত শরীর কিড়মিড় করে উঠল। তড়াং করে লাফিয়ে উঠে সরাসরি গন্ধ-পাগলের দিকে হুংকার ছুড়ল, ‘ওর এই অবস্থা কে করেছে? কিছু যদি আপনাদের করে থাকি, সে তো আমিই করেছি। তাহলে ওকে কেন এখানে ধরে এনেছেন? ছেড়ে দিন ওকে।’
জবাবে হা-হা করে রুম ফাটিয়ে হেসে উঠল গন্ধ-পাগল। গম গম করে উঠল তাতে পুরো রুমটা। দেয়াল ও ছাদের কিনারা থেকে ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ল শুকনো মাটি। তাতে ধুলো ওড়ার পরিমাণ বেড়ে গেল। ভীষণ জোরে একটা হাঁচি নাকের আগায় চলে এলো বিপ্লবের। কিন্তু ও হাঁচি আটকানোর কৌশল জানে। তাই ঘন ঘন কয়েকবার ঢোক গিলল। তাতে আপাতত বন্ধ হলো হাঁচিটা।
হঠাৎ নাকটা কুঁচকে উঠল বিপ্লবের। নাক টেনে আবিদের গা থেকে একটা গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করল। হ্যাঁ, মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে ওর গা থেকে। এই গন্ধটাই তো গন্ধ-পাগলের গা থেকে পেয়েছিল ও। তার মানে…
ভাবনায় ছেদ পড়ল ওর। আবিদ বলল, ‘তুমি কেন এসেছ এদের সাথে? এরা তোমাকে মেরে ফেলবে। প্লিজ পালাও!’
বিপ্লব তীক্ষè করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কী বলতে চাইছে আবিদ? এ কথা বলছে কেন ও? তাহলে ওকে কি কোনো ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে? মেরে ফেলার কথা বলা হয়েছে? বিপ্লবের সম্পর্কে কিছু আলোচনা করেছে ওর সাথে? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? ও বা ওরা তো এই লোকগুলোর কোনো ক্ষতি করেনি। এমনকি, আজকের আগে তো গন্ধ-পাগলকে ওরা চিনতই না। ধরে নেয়া হলো এলাকার সব সমস্যার কারণ এরাই, কিন্তু তারপরও তো ওরা কিছুই করেনি এদের বিরুদ্ধে। এমনকি চেষ্টা করেও এদের সম্পর্কে খুব বেশি জানতে পারেনি। বুঝতে পেরেছিল এখানে একটা রহস্য কাজ করছে, কিন্তু তা তদন্ত করারও তো তেমন সুযোগ পায়নি। তাহলে? কেন ধরে এনেছে ওদের?
গন্ধ-পাগল কথা বলে উঠল এই সময়, ‘তুমি বিপ্লব খান ওরফে গোয়েন্দা বিপু ভাইয়া। আমি জানতে পেরেছি তুমি যেখানেই যাও সেখানে একটা না একটা গণ্ডগোল বাধিয়ে তবে ছাড়ো। সব রকম খোঁজখবর নিয়েছি আমি তোমার সম্পর্কে। আসলে আমি কোনো রিস্ক নিতে চাইনি। আসলে আমার ডেরার আশেপাশে তোমাকে ছোঁকছোঁক করতে দেখেই আমি বুঝেছিলাম তুমি মালটা কোনো গোলমাল পাকানোর তালে আছো। তাই আমার লোকজন দিয়ে তোমার ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছি। আর তাতে তোমার ব্যাপারে সবকিছু জানার পরে আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। অন্য সময় হলে তোমাকে নিয়ে খেলতেই আমি পছন্দ করতাম। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার হাতে অত সময় নেই। যে মিশনটায় এখন আমি হাত দিয়েছি, সেটা দ্রুতই শেষ করতে চাই। আসলে…’
গন্ধ-পাগলের কথার মাঝে এই সময় কথা বলে উঠল বিপ্লব, ‘কী মিশন আপনার? আর কী করেন আপনারা?’
গন্ধ-পাগলের চেহারার কোনো ভাবান্তর হলো না। দুই মুহূর্ত বিপ্লবের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আবার বলা শুরু করলেন, ‘তোমার কৌতূহলটা আমি বুঝি। কিন্তু আমাকে আরো কয়েকটি কথা বলতেই হবে। তারপর তোমার সব প্রশ্নের জবাব পাবে।’ বলে পাশে রাখা কাঠের চৌকির ওপর রাখা পানির গেলাসটা উঠিয়ে এক ঢোক পানি পান করলেন। আবার বললেন, ‘তোমাদের কোনো প্রকার ক্ষতি করার ইচ্ছে আমার নেই। ভোর হওয়ার আগেই আমার লোকেরা তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি যাওয়ার বাসে উঠিয়ে দেবে। স্যরি তোমাদের ছুটিটা ভালোভাবে কাটাতে পারলে না বলে। এ ছাড়া আমার আর কোনো উপায়ও ছিল না। আমি আগেই বলেছি আমার এবারের মিশনটাতে আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না।’
‘কিন্তু মিশনটা কী আপনার?’ আবারও কথার মাঝে প্রশ্ন করে বসল বিপ্লব।
এবার একটু বিরক্তই হলেন গন্ধ-পাগল। সামনে কিছুটা ঝুঁকে এসে বললেন, ‘তুমি তো ভারি ত্যাদড়া ছেলে হে। আমি তো বলেছি তোমার সব প্রশ্নেরই জবাব দেব, আগে আমার কথাগুলো বলে নিই।’
ত্যাদড়া বলাতে বিপ্লবের আঁতে কিছুটা লাগল। কিন্তু আর কিছু বলল না, শোনাই যাক না লোকটার কথাগুলো। তবে আবিদ আর স্থির থাকল না। বলল, ‘খবরদার, আমাদেরকে ত্যাদড়া বলবেন না। আমরা ভদ্র ঘরের ছেলে।’ বলেই বাম চোয়ালে হাত বুলাতে লাগল। ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চিকমিক ঠাস করে ওর বাম গালে একটা চড় মেরেছে।
আরো তেঁতে উঠল আবিদ, ‘এই এই ব্যাটা, তুই আমাকে মারলি কেন?’ রেগে গেলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ও।
বিপ্লব ওকে শান্ত করল, ‘আবিদ, তুমি চুপ থাকো। আমি তো আছি। কিছুই হবে না আমাদের।’
‘তুমি বলছ এ কথা?’ বিপ্লবের দিকে তাকাল আবিদ।
বিপ্লব মাথা নাড়িয়ে সায় জানাল। আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো আবিদ।
গন্ধ-পাগল আবার বলা শুরু করল তার অসমাপ্ত কথা, ‘এই বাংলোটা আমার সর্বশেষ ডেরা। এটাকে আমি হাতছাড়া করতে চাইনে। এর আগে চার চারটা ডেরা আমি হারিয়েছি। বলা যায় সেখান থেকে উৎখাত হয়েছি। কিন্তু এবার আর কেউ আমাকে আমার এই ডেরা থেকে উৎখাত করতে পারবে না। আমি এটা কিছুতেই হাতছাড়া করবো না। আগেরগুলোর তুলনায় অনেক ভালো এটা। কাজ করতেও বেশ সুবিধা। সহজেই লোকজনের আড়ালে থাকা যায়। অবশ্য এলাকার কিছু পুলিশ ও সাংবাদিকদের সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তারাও আমাকে সাহায্য করে থাকে। আসলে কি জানো তো, এই এলাকাটাকে আমি অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।’
চেয়ারটাতে হেলান দিয়ে চোখ বুজে রইলেন পাক্কা প্রায় তিন মিনিট। তারপর আবার সোজা হলেন গন্ধ-পাগল। বললেন, ‘অনেক তো বললাম। বাকি কথা পরে বলব। এখন বলো তোমার কী জানার আছে গোয়েন্দা বিপু ভাইয়া।’ ‘গোয়েন্দা বিপু ভাইয়া’ কথাটা একটু যেন বাঁকা করে উচ্চারণ করলেন।
গায়ে মাখল না বিপ্লব। সুযোগ যখন পাওয়া গেছে, তখন কিছু কথা জেনে নেয়াই ভালো। সবটা জানতে পারলে হয়তো অন্য কোনো বুদ্ধিও বের হয়ে আসতে পারে। তাই বলল, ‘আপনি আসলে কে?’
মৃদু স্বরে হাসলেন গন্ধ-পাগল। কিন্তু বিপ্লবের কাছে মনে হলো, এই হাসির মাধ্যমে ওকে ঠাস ঠাস করে দু’গালে চারটা চড় মারা হলো। কেন এমন মনে হলো তা বুঝতে পারছে না।
‘আমি জানতাম তুমি প্রথমে এই প্রশ্নটাই করবে।’ বললেন গেড়–য়াধারী গন্ধ-পাগল। ‘কিন্তু আসল কথা কী জানো, আমি কে তা আমি নিজেই জানিনে। বিভিন্ন জন আমাকে বিভিন্নভাবে জানে, চেনে। আর আমি নিজেও মাঝে মাঝে ভাবি- কে আমি? কোনো উত্তর পাইনে। আচ্ছা বিপু, তুমিই বলে দাও না আমি কে?’ বলে তীক্ষè করে বিপ্লবের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
লোকটার চোখে চোখ রাখতে গিয়ে এই প্রথম কেমন অস্বস্তি লাগছে বিপ্লবের। যেন সাড়া শরীরে সুঁই ফুটে যাচ্ছে। থতমত খেয়ে বলল, ‘বারে, আপনি কে তা আমি কী করে বলব!’
‘ও রাইট রাইট, তুমি কী করে বলবে। আচ্ছা, এবার তোমার পরের প্রশ্নটা করো।’
‘এখানে কী কাজ আপনার? মানে আমি বলতে চাইছি, কী করছেন এখানে আপনি যে সবার থেকে আড়ালে থাকতে চান?’
মাথাটা নিচু করে কিছু একটা ভাবলেন লোকটা। হয়তো ভাবছেন গোয়েন্দা বিপ্লব খানের কাছে সব সত্য কথা বলে দেওয়াটা ঠিক হবে কি না। শেষে বললেন, ‘বিরাট কারবার আমার। বলতে পারো এটা আমার এটা নেশা। ওই যে দেখ না, মৌমাছি ফুলের ঘ্রাণে ছুটে যায় ফুলের কাছে, আর সেখান থেকে মধু আহরণ করে এনে নিজের চাক ভর্তি করে। কেন ছুটে যায় মৌমাছি ফুলের কাছে? মধুর লোভে তো। মধুর গন্ধ তাকে আকৃষ্ট করে। আসলে কি জানো তো, আমারও একটা গন্ধ বেশ করে টানে। এই গন্ধটা আমাকে কেন জানি পাগল করে দেয়। জানো সেটা কিসের গন্ধ? মানি, টাকা। টাকার গন্ধ আমি কিছুতেই অ্যাভয়েড করতে পারিনে। জীবনে পাঁচবারের বেশি আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই গন্ধের টানে আমি আর ছুটে যাব না। কিন্তু না, আমি সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারিনি। টাকার গন্ধই আমাকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে দেয়নি।’ লোকটা নিজের কথার মাঝে এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে, এর পরে তিনি আরো যেসব কথা বললেন তার অনেক কিছুই ছেলেরা বুঝতে পারল না। শেষে আবার তিনি বাস্তবে ফিরে এলেন। বললেন, ‘এবারের গন্ধটা আমার বেশ জোরালো। এটাকে কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইনি বলেই তোমাদের সাথে এরূপ আচরণ করতে বাধ্য হলাম। স্যরি। আসলে আমি চাইছিলাম না তোমাদের ছুটিটা মাটি করে দিতে। কিন্তু তোমরা যেভাবে আমার ডেরার চারপাশে ঘুরঘুর করছিলে আর তোমার ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে আমি যা জানলাম, তাতে…।’
‘বুঝলাম আপনি আমাকে নিয়ে বিপদের আশঙ্কা করছিলেন। কিন্তু আবিদকে কেন ধরে নিয়ে এলেন?’
‘আর বলো না সে কথা। আমি বলেছিলাম তোমাকেই আনতে। কিন্তু ওরা ভুল করল। তাইতো তোমাকে আনতে আমি নিজেই গেলাম। … বাদ দাও ওসব। তোমাদের নিশ্চয়ই ক্ষিধে পেয়েছে? এসো কিছু খেয়ে নেয়া যাক। তবে রুটি আর কলা ছাড়া অন্য কিছু আবদার করলে তা কিন্তু দিতে পারব না। হ্যাঁ, জুস খেতে পাবে। একেবারে খাঁটি জুস। আমার কিন্তু আনারসের জুসটা খুব প্রিয়। তোমাদের?’
‘একটা হলেই চলবে।’ বলল বিপ্লব। ‘কিন্তু আমার তো আরো কয়েকটা বিষয় জানার ছিল।’
‘তার মানে ক্ষিধে লাগেনি। ঠিক আছে, বলো আর কী জানতে চাও। তবে তোমাদেরকে কিন্তু আনারসের জুস খেতেই হবে। ভেব না আমি যেটা বাজারে সাপ্লাই দিই সেই ভেজাল জুসটা তোমাদেরকে খেতে বলব। … এই দেখ দেখি কাণ্ড, আমার আরেকটা পরিচয় তো বলেই ফেললাম। হ্যাঁ খুদে গোয়েন্দা বিপু ভাইয়া, আমার একটা জুসের কারখানা আছে। ওইসব মিষ্টি কুমড়ো আরো কি সব দিয়ে তা বানানো হয়। আমি ভালো করে জানিওনে। তবে প্রত্যেকটার মধ্যে ফলের ফ্লেভার দেওয়া থাকে।’
বিপ্লব বলল, ‘ধন্যবাদ সত্যটা এত সহজে স্বীকার করার জন্য। আর বুঝতে পারছি আপনাকে কেন গন্ধ-পাগল বলা হয়। কিন্তু আপনার শরীর থেকে সব সময় একটা মিষ্টি ঘ্রাণ আসতে থাকে। এটার উৎস ও কারণ কী?’
‘যেহেতেু নাম হয়ে গেছে গন্ধ-পাগল, তাই সেন্টটা ব্যবহার করি। আমি চাই সবার মাঝে মিষ্টি গন্ধটা ছড়িয়ে পড়–ক। টাকার গন্ধের মতো বাজে ও ক্ষতিকর গন্ধ যেন আর কাউকেই না টানে।’
‘আপনার পরিবার, আই মিন, আপনার স্ত্রী সন্তানরা কি জানে আপনি কী করেন?’
এই প্রশ্নে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন গন্ধ-পাগল। বললেন, ‘আমার কোনো পরিবার নেই।’
‘ও। তাহলে কেন করেন এসব? কার জন্য ছোটেন টাকার পিছে? কে ভোগ করবে আপনি মারা যাবার পর আপনার বিপুল পরিমাণ টাকার ভাণ্ডার?’
কিন্তু ওর আর সে প্রশ্নের উত্তর জানা হলো না, তার আগেই হুড়মুড় করে প্রবেশ করল এক দল পুলিশ। সামনের জন্য সতর্ক করে দিয়ে বলল, ‘খবরদার, কেউ এক পাও নড়বে না। চারদিক থেকে তোমাদেরকে ঘিরে ফেলা হয়েছে।

পনেরো.
দু’দিন পর। বিপ্লব, আবিদ ও সুমি বসে ছিল কপোতাক্ষ নদের পাড়ে। কথা হচ্ছিল গত পরশু দিনের ঘটনাগুলো নিয়েই। যাক, ছুটিটা একেবারে খারাপ কাটেনি। কালই ফিরে যাবে বিপ্লব ও আবিদ। আবিদের বেশ খুশি খুশি লাগছে যে, গন্ধ-পাগলের মতো একজন সমাজদ্রোহীকে ওদের কারণেই পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
বিপ্লব বেশ প্রশংসা করল সুমির কাজের। বলল, ‘তা সুমি, তোমার মাথায় পুলিশ নিয়ে যাওয়ার বুদ্ধিটা কিভাবে এলো?’
সুমি পাক্কা গোয়েন্দার মতো, ঠিক বিপ্লবের মতো রহস্যময়ভাবে একচিলতে হাসল। তারপর বলল, ‘আমি যে গোয়েন্দা বিপু ভাইয়ার সহকারী ছিলাম এই কেসে। তোমরা যখন অনেক রাত হয়ে যাওয়ার পরও বাড়ি ফিরছ না, তখন বিভিন্ন বিষয় ভাবতে ভাবতে এই সময় তুমি হলে কী করতে তা ভাবতেই বেরিয়ে এলো পুলিশ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা।’
আবিদ বলল, ‘সুমির জায়গায় আমি হলে কিন্তু এটা পারতাম না। আমার মাথায় বিপদের সময় কোনো বুদ্ধিই আসে না।’
গন্ধ-পাগলের আসল নাম জানতে পারেনি ওরা। তবে তার আরো অনেক কাজের কথা জানতে পেরেছে। ভেজাল জুস ছাড়াও ভেজাল গুঁড়া মসলা, ভেজাল চানাচুরসহ আরো কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিসের জোগানদাতা ছিলেন তিনি। এমনকি, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদক ও নেশাদ্রব্য এনে ছড়িয়ে দিতেন পুরো জেলাসহ পাশের অন্যান্য জেলায়ও।
‘এটাকে কোনো কেস না বললেও এটা থেকে একটা বিষয়ে আমরা শিক্ষা নিতে পারি কিন্তু।’ বলল বিপ্লব।
আবিদ ও সুমি একসাথে জানতে চাইল, ‘কী শিক্ষা?’
‘টাকার গন্ধে-পাগল হওয়া যাবে না। জীবন চলার মতো অর্থই যথেষ্ট। তবে অন্যকে উপকার করার উদ্দেশ্যে নিজের অর্থ-সম্পদ বৃদ্ধি করা দোষের না। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের সবাইকে ফুল হতে হবে। ফুলের ঘ্রাণ নিতে মৌমাছিরা যেরূপ ছুটে আসে, মধু আহরণ করে গড়ে তোলে মৌচাক, সেই মৌচাক থেকে আমরা উপকৃত হই- সেরকমভাবে আমাদেরকেও গন্ধ বিলাতে হবে। আমরা যদি একেকটা ফুল হয়ে ফুটতে পারি, বিলাতে পারি ঘ্রাণ, তাহলে আমরা সমাজটাকেও গড়তে পারবো।’
ওর কথার সাথে একমত হলো আবিদ ও সুমি। বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ বিপু ভাইয়া। আমরা এখন থেকে চেষ্টা করবো ঘ্রাণওয়ালা ফুল হতে।’
আগেই বিকেল হয়ে গিয়েছিল। এই মুহূর্তে একঝাঁক বুনো হাঁস নদের পানিতে ছায়া ফেলে আকাশ দিয়ে উড়ে গেল তাদের নীড়ে। পাশের কোথাও থেকে বুনো ফুলের মিষ্টি একটা গন্ধ এসে প্রবেশ করল ওদের নাকে।
(সমাপ্ত)

SHARE

Leave a Reply