Home স্বপ্নমুখর জীবন আত্মবিশ্বাসের শক্তি ও কৌশল -আমিনুল ইসলাম ফারুক

আত্মবিশ্বাসের শক্তি ও কৌশল -আমিনুল ইসলাম ফারুক

[পার্ট-২]

অটো সাজেশনের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস
গত সংখ্যায় বর্ণিত ফর্মুলায় মহান আল্লাহর এমন এক কুদরতি শক্তি রয়েছে যার সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ ন্যারেটিভ আজো দাঁড় করানো যায়নি। এটি সর্বযুগে এবং সর্বকালে বিশ্বাসীদের হতবুদ্ধ করে রেখেছে এবং চিন্তাবিদদের চিন্তার সাগরে ভাসিয়ে রেখেছে। মনোবিজ্ঞানীরা এ ফর্মুলার নামকরণ করেছেন অটো সাজেশন। এটাকে যে নামেই আমরা অভিহিত করি না কেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটি মানবসভ্যতার জন্য বিশেষ এক মহিমা। যা সাফল্য নিয়ে কাজ করে এবং এটিকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করা যায়। পক্ষান্তরে একে ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার করা হলে এ শুধু তোমার ধ্বংস সাধনই করবে। এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সত্য লুক্কায়িত আছে আর তা হলো যারা সহজেই পরাজয় মেনে নেয় এবং নিজেরা দারিদ্র্য, দুঃখ-দুর্দশার মাঝে দিনাতিপাত করে তারা অটো সাজেশনের বৈশিষ্ট্যকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করছে।
অবচেতন মন, গঠনমূলক ও ধ্বংসাত্মক আবেগী চিন্তা-ভাবনার মাঝে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না। এটি কাজ করে আমরা এটিকে যে চিন্তাভাবনা খাওয়াই তার মাধ্যমে বা আমাদের চিন্তার আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয়। অবচেতন মনকে ভয় দিয়ে চালিত করে যেমন সহজেই ব্যর্থ হওয়া যায় তেমনি অবচেতন মনকে সাহস ও বিশ্বাস দিয়ে চালানো গেলে খুব সহজেই জীবনে বিজয়ী হওয়া যায়। বিদ্যুৎ যেমন শিল্প কারখানার চাকা ঘোরায়, একে গঠনমূলকভাবে ব্যবহার করা হলে সঠিক সেবা পাওয়া যায়। তেমনি উল্টোটা ঘটলে তোমার জীবন এক দুর্ঘটনাতেই শেষ হয়ে যেতে পারে। অটো সাজেশনের সঠিক প্রয়োগ তোমাকে নিয়ে যেতে পারে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাফল্যের দোরগোড়ায়। আবার এই অটো সাজেশনের অপপ্রয়োগ তোমাকে ঠেলে দিতে পারে দুঃখ, ব্যর্থতা এবং মৃত্যুর উপত্যকায়। পুরো ব্যাপারটিই অবশ্য নির্ভর করছে তুমি এটিকে কতটুকু বুঝতে পেরেছো এবং কীভাবে যথার্থ ব্যবহার করছো তার ওপর।
তোমার মনে নিজের সামর্থ্য নিয়ে যদি থাকে ভয়, সন্দেহ এবং অবিশ্বাস তাহলে অটো সাজেশন তোমার এই অবিশ্বাস নিয়ে এমন একটি ন্যারেটিভ দাঁড় করাবে যে, তোমার অবচেতন মন সেটাকেই মূর্ত রূপ দেবে। এ যেন সেই বাতাসের মতো যার চাপে একটি জাহাজ যায় পূর্বে, অপরটি যায় পশ্চিমে। অটো সাজেশনের আইন তোমাকে হয় ওপরে তুলে নেবে অথবা ডুবিয়ে দেবে। পুরোটাই নির্ভর করবে তুমি তোমার চিন্তার পাল কোন দিকে উড়িয়ে দেবে তার ওপর। অটো সাজেশনের আইন কীভাবে একজন মানুষকে তার ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে, নিচের কবিতাটি একটু খেয়াল করে পড়ো। তাতে অনেকটাই অটো সাজেশনের নীতি সম্পর্কে বুঝতে পারবে-
If you think you are beaten, you are,
If you think you dare not, you don’t.
If you like to win, but you think you can’t
If is almost certain you won’t.

If you think you will lose, you are lost
For out of the world we find.
Success begins with a fellow’s will
It’s all the state of mind.
If you think you are outclassed, you are,
You’ve got to think high to rise.
You’ve got to be sure of yourself before
You can ever win a prize.

Life’s battles don’t always go
To the Stranger or faster man
But soon or late the man who wins
Is the man who thinks he can!

কবিতাটির শব্দগুলোর প্রতি খেয়াল করো, বিশেষত যেগুলোর ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। কবিতাটি বারবার পড়ে পাঠোদ্ধার করতে চেষ্টা করো এবং এর গূঢ়ার্থ অনুধাবন করো। দেখবে তোমার চিন্তা জাগতে ঝড় বইয়ে দেবে। তোমার মস্তিষ্কের কোথাও না কোথাও, সম্ভবত কোষের মাঝে অর্জনের বীজ ঘুমিয়ে আছে। ওটিকে জাগিয়ে তুলো এবং পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে কাজে নেমে যাও। ওটি তোমাকে এমন এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে যা তুমি কখনো কল্পনাই করোনি।
আবরাহাম লিংকন (১৮০৯-১৮৬৫) জীবনে শুরুর দিকে যে কাজেই হাত দিয়েছেন, ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁর বয়স চল্লিশ বছরের আগে তিনি সাফল্যের দেখা পাননি। তাঁকে তেমন কেউ চিনতো না। একদিন মনের ভেতর একটি ভাবনা তৈরি হলো তাঁর। তিনি তাঁর অতীত ব্যর্থতার কারণগুলো পর্যালোচনা করে দেখলেন তিনি যে কাজেই হাত দেন তাতে তিনি জয়ী হবেন এই বিশ্বাসটা পরিপূর্ণভাবে করতে পারেন না। সেদিনই তিনি শপথ গ্রহণ করলেন, তিনি যে কাজে হাত দেবেন সে কাজেই সফল হবেন, এটা তার দৃঢ় বিশ্বাস। এরপর কিছুদিন কিছু কাজ করলেন, দারুণ কতগুলো অভিজ্ঞতা হলো, তার মস্তিষ্ক এবং হৃদয়ের ভেতরকার ঘুমন্ত প্রতিভা জেগে উঠল। তিনি অতীতের সকল গ্লানি দূর করতে সক্ষম হলেন। আর জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে তিনিই হলেন আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট। আমেরিকা পেল এক মহানায়ককে। আর পৃথিবী উপহার পেল এক অসাধারণ নেতৃত্ব।
লিংকনের ওই অভিজ্ঞতায় দুঃখ, ভালোবাসা এবং ব্যর্থতার মিশ্রণ ছিল। এ অভিজ্ঞতার স্বাদ তিনি ব্যর্থতা থেকে নিয়েছিলেন। এ অভিজ্ঞতায় তার একমাত্র স্ত্রী অ্যানি রুটজলের ভালোবাসার সংমিশ্রণ ছিল। এটি সর্বজনবিদিত যে, ভালোবাসা নামক আবেগটির সঙ্গে বিশ্বাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রেম ভালোবাসা শব্দ দুটো শুধু নেতিবাচক অর্থে নয় বরং ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত। তুমি যদি কোনো মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চাও এবং সম্পর্কের এই বন্ধন আজীবন ধরে রাখতে ইচ্ছে করে এটাই ভালোবাসা। এর নামই প্রেম। নবীজির ঘরে বাতি জ্বালানোর মতো তেলটুকু পর্যন্ত ছিল না। অথচ তিনি সমগ্র বিশ্বকে আলোকিত করেছিলেন। গোটা আরবের জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের হৃদয় শুধু ভালোবাসা দিয়ে তিনি জয় করেছিলেন। নারী-পুরুষ আবালবৃদ্ধবনিতা এমনকি কাফেররা পর্যন্ত নবীজিকে বিশ্বাস করে তাদের গচ্ছিত সম্পদ তাঁর কাছে আমানত রাখতেন।
আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং (১৯২৯-১৯৬৮) যে কালো বর্ণের মানুষের অধিকার এনে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন তাতেও বিশ্বাস ও ভালোবাসার সংমিশ্রণ ছিল। বহু মানুষ তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিল। তাঁকে খুন হতে হয়েছিল শুধু কালো মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে গিয়ে। অবশেষে ভালোবাসারই জয় হয়েছিল অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরা তাদের অধিকার ফিরে পেয়েছিল।
গান্ধিজী (১৮৬৯-১৯৪৮) বিশ কোটি মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন শুধু ভালোবাসা দিয়ে। লোকেরা তাঁকে পাগলের মতো বিশ্বাস করতো। গান্ধিজীর বাড়ি গাড়ি, অর্থ কিছুই ছিল না। এমনকি দামি পোশাক পরিচ্ছদও না। কিন্তু তাঁর ছিল অফুরন্ত বিশ্বাসের শক্তি। কীভাবে তিনি এ শক্তির অধিকারী হয়েছিলেন? তিনি এ শক্তি অর্জন করেছিলেন তাঁর বিশ্বাসের ভান্ডার থেকে। আর এ বিশ্বাস তিনি প্রোথিত করেন বিশ কোটি মানুষের অন্তরে। বিশ্বাসের শক্তি দিয়ে তিনি যা যা করেছেন তা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর পক্ষেও করা সম্ভব ছিল না। তিনি শুধু বিশ্বাস এবং ভালোবাসার শক্তি দিয়ে বিশ কোটি মানুষের মনকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলেছিলেন। তার বিশ্বাস এবং চিন্তায় কোনো জাত-পাত ছিল না। সে কারণেই কংগ্রেস (হিন্দুদের দল হিসেবে পরিচিত) এবং খিলাফত একই প্লাটফর্মে এসে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে জয়ী হতে পেরেছিল। খেলাফতের মহান দুই নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও শওকত আলীকে তিনি আপন ভাইয়ের মতো মনে করতেন। বিশ্বাস এবং ভালোবাসা ছাড়া এত বড় আন্দোলনে সফল হওয়া আদৌ সম্ভব ছিল না। আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। আল্লাহ হাফিজ।

SHARE

Leave a Reply