Home স্মরণ চলে গেলেন কবি আহমদ -আখতার মতিন মাহমুদ

চলে গেলেন কবি আহমদ -আখতার মতিন মাহমুদ

বলতে গেলে অল্প বয়সেই চলে গেলেন কবি সাংবাদিক আহমদ আখতার। ৬২ বছর এমন কী আর বয়স, বহু মানুষ তো ৮০, ৯০ এমনকি ১০০ বছরও বাঁচে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে চারটার দিকে রাজধানীর পূর্ব রামপুরার বাসায় তিনি ইন্তেকাল করেন। দিনটি ছিল শুক্রবার। বেশ কিছুদিন ধরে কিডনি জটিলতা থেকে শুরু করে নানা রোগ বাসা বেঁধেছিল হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত এই মানুষটির শরীরে। তার আগে ধরা পড়েছিল ডায়াবেটিস। অবস্থা একটু খারাপ হয়ে ওঠায় প্রায় দু’ মাস আগে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে। সেখানেই ধরা পড়ে কিডনি সমস্যা। এ জন্য সপ্তাহে তিনবার তাকে ডায়ালাইসিস করা হতো। কিছুটা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছিলেন আর আকুল হয়ে উঠেছিলেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। শিশুদের সাথে মিশতেন, কেননা তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন। বাসার আশপাশের শিশুদের সঙ্গে তিনি মজা করতেন গল্প করতেন, ছড়া কবিতা শোনাতেন। কে না চায় এই হাসিমাখা জীবন ফিরে পেতে? পরে আবার অসুস্থতা দেখা দিলে নেওয়া হয় হাসপাতালে। ধরা পড়ে নতুন রোগ। তাকে আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে। সেখানে কয়েকদিন আইসিইউতে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও আল্লাহর মেহেরবানিতে কিছুটা ভালো হয়ে জেনারেল বেডে ফেরেন। তখন মোবাইলে কত লোকের সাথে গল্প করতেন, সবার খোঁজ খবর রাখতেন। এরপর আরো ভালো হলে হাসপাতাল রিলিজ দেওয়ার পর নতুন বাসায় ফেরেন। কারণ ততদিনে পুরনো ভাড়া বাসা আবার পরিবর্তন হয়েছে। বাড়ির নাম অর্কিড ভ্যালি। না সেখানে পুরো একটি মাসও কাটানোর ভাগ্য হলো না তার। দুপুরে ঘুমের মধ্যেই সম্ভবত সবার অলক্ষ্যে তার প্রাণবায়ু বের হয়ে যায়। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য ছেলে সৈয়দ আরিফ দরুদ ও দরুদের আম্মা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যান রামপুরা বাজারের কাছে বেটার লাইফ হাসপাতালে। সেখানেই কর্তব্যরত ডাক্তার জানালেন দুঃখজনক খবরটি, তিনি আর নেই। সময়ও বলে দেন সাড়ে চারটার পর পৌনে পাঁচটার দিকে। সম্ভবত ঘুমের মধ্যেই স্ট্রোক হয়েছিল তার।
এভাবেই আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেল একটি ভালো মানুষ, ছোটদের বন্ধু আর আপন একজন কবি ও ছড়াকার। ছোটদের জন্য অনেক ছড়া কবিতা লিখেছেন আখতার। তার ভেতরে একটি আলাদা কবিসত্তার বাস ছিল। তার ছিল অসংখ্য বন্ধু। তাদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে থাকতে আর মজার মজার কাহিনি বা গল্প করতে ভালোবাসতেন তিনি। তিনি অনেক বই পড়তেন, দেশ-বিদেশের সাহিত্যের নানা খবর রাখতেন। তার বাসাটি বইয়ে ঠাসা। তার খাটের চারপাশে বই চেয়ারে বই, আলমারিতে বই, টেবিলে বই। বই আর বই। প্রচুর বই কিনতেন তিনি। আর এগুলো দাগিয়ে দাগিয়ে পড়তেন। যে অংশ ভালো লাগতো তাতে আন্ডারলাইন করে রাখতেন। আর সেসব তিনি আড্ডায় উপস্থাপন করতেন। এতক্ষণ কত কথা বললাম কিন্তু তার আসল পরিচয়টাই তো দেয়া হয়নি।

২.
কবি আহমদ আখতার বাংলাদেশের সেরা কবি, কবিদের কবি ফররুখ আহমদের সন্তান। সেই ফররুখ যিনি তোমাদের জন্য লিখে গেছেন অজ¯্র কবিতা ও ছড়া। আর কিছু কিছু গল্প। কলকাতায় থাকতেই নাম করেন কবি ফররুখ। ঢাকায় আসার পর তিনি পেলেন নতুন প্রাণ, কাজের নতুন ক্ষেত্র। ফররুখ তার কবিতায় বলেছেন-
তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে
খোদার মদদ ছাড়া,
তোরা পরের ওপর ভরসা ছেড়ে
নিজের পায়ে দাঁড়া।
কী সুন্দর কথা। সেই পিতার সন্তান ছিলেন আহমদ আখতার। তোমরা এ নামে তাকে চিনলেও এটা তার আসল নাম নয়। তার আসল নাম সৈয়দ মো. আখতারুজ্জামান। কিছুদিন কবিতা লিখেছেন স ম আখতারুজ্জামান নামে। পরে তার লেখক নাম হয় আহমদ আখতার। অনেকটা তার পিতার নামের সাথে মিলিয়ে। আর পিতার মতো সৈয়দ পরিচয়ও তিনি বাদ দিয়ে সাধারণ হয়ে উঠে ছিলেন। তার জন্ম হয়েছিল ১৯৫৯ সালে ঢাকার কমলাপুরে। তখন ফররুখ পরিবার কমলাপুরে থাকতেন। এর পর মালিবাগের বাসায়ও থেকেছেন। আরো পরে আজিমপুর কলোনিতে ও ইস্কাটনের ফররুখ আহমদের সরকারি বাসায় বেড়ে উঠেছেন। কবি ফররুখ তখন ঢাকা রেডিওর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আহমদ আখতার তার পিতার পরিচয় তেমন একটা দিতে চাইতেন না, পাছে কেউ ফেভার করে। এমনি প্রখর ছিল তার আত্মসম্মানবোধ। তিনি চাইতেন নিজের পরিচয়ে বড় হতে। স্কুলজীবন শেষ করে পিতার ইচ্ছায় ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ডিগ্রি নেন আহমদ আখতার। নামে মাদ্রাসা হলে কী হবে এটা আসলে একটি বিশ^বিদ্যালয়ের মতো। সেখান থেকে পাস করে প্রথমে দু’ একটি ছোটখাটো চাকরি করে দৈনিক সংগ্রামে সাংবাদিকতায় নাম লেখান তিনি। ক্রমে তিনি রিডিং সেকশন থেকে সাবএডিটর হিসেবে পদোন্নতি পান। পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে তার লেখার অবারিত সুযোগ হয়। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি কক্ষে সেখানকার স্টাফ একাধারে চিত্রশিল্পী, কার্টুনিস্ট ও কবি সংগঠক শেখ তোফাজ্জল হোসেনের পরিচালিত অনুশীলন সংঘের সাহিত্য সভায় কবিতা ও ছড়া পাঠ করে হাত পাকান। আরো পরে তিনি সরকারি বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় দীর্ঘ দিন সাংবাদিকতা করেন। সেখান থেকে চাকরি অবসানের পর যোগ দেন দৈনিক নয়া দিগন্তে সিনিয়র সাবএডিটর হিসেবে। ২০১৯ এর নভেম্বরে তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দেন। সাংবাদিকতায় থাকার সময় তিনি আরো কয়েকটি মাসিক পত্রিকা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রায় ৩৫ বছর সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন।

৩.
আহমদ আখতার প্রচারবিমুখ ছিলেন। তবে তিনি তার পিতার অপ্রকাশিত সাহিত্য সম্ভার প্রকাশে যথেষ্ট কাজ করেছেন। আখতার লিখেছেন অজ¯্র কবিতা ছড়া ও কিছু প্রবন্ধ। কিন্তু পুস্তকাকারে এর অনেকগুলোই প্রকাশ হয়নি। বলতে গেলে এ ব্যাপারে তার আগ্রহ কম ছিল। তার মাত্র দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে অবিরাম গ্রামোফোনে ও অনন্তের প্রথম অক্ষর। ছোটদের জন্য অনেক লিখেছেন তিনি কিন্তু সেগুলো বই আকারে প্রকাশ পায়নি। হয়তো অবসর জীবনে এসে এগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়ার চিন্তা তার ছিল, কিন্তু সহসা অসুস্থতা আর তারপরে মৃত্যু সব তছনছ করে দিলো। তিনি কারো কাছে বই প্রকাশের জন্য ধরনা দিতে চাননি, এ জন্যই হয়তো এগুলো বই হিসেবে প্রকাশ পায়নি। কোন প্রকাশনা সংস্থা এগিয়ে এসে কাজটি সম্পন্ন করতে পারেন। তাহলে শিশুসাহিত্যের বিরাট সম্পদ যে তার রয়েছে তা ছোটরা হাতে পেতে পারে।

৪.
আহমদ আখতারের লেখার আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি ছোট ছোট কবিতা লিখতেন। ছড়ার মতো মনে হতো। আসলে কবিতা। শেষ দিকের কয়েকটি লেখার উল্লেখ করছি।
২০১৯ সালের জুলাই-আগস্ট সংখ্যা ‘কবিতাপত্র’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘কথার রাজ্যে নিবি!’ নামক একটি কবিতা। এতে তিনি লেখেন-
বলা হয়ে গেছে সব কটি কথা
নিশ্চুপ বাসা বাড়ি
প্রকৃতিতে নেই কোন সংবিৎ
পাখিরা নিয়েছে আড়ি।
কাকে বলি আমি ভালো নেই
এই কথাটা নিরর্থক
না বলা কথারা থেকে যায় মনে
বলবার কত শখ।
(কবিতাপত্র পৃষ্ঠা ১৩)
বলা হয়ে গেছে সব কথা- তার মানে কী তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আর সময় নেই, কথা বলা কবিতা লেখা শেষ! কী জানি। তিনি যে ভালো নেই এ কথাটা বলার লোক পাচ্ছেন না আর বললেও কথাটা নিরর্থক তিনিই বলছেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে প্রকাশিত ‘কবিতাপত্র’ পত্রিকায় তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন। এই পত্রিকারই অক্টোবর ২০২০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য’ নামে একটি কবিতা। কবি তখন শয্যাশায়ী। রামপুরার পাগলা নগরের বাসায় বসে লেখা এটি সম্ভবত তার শেষ কবিতা। বড় বড় অক্ষরে লেখা কবিতাটির পাণ্ডুলিপি তার বাসায় গিয়ে আমি দেখতে পাই। পরে সেটি কবিতাপত্রে প্রকাশিত হলে পত্রিকার কপিটিও পৌঁছে দিয়েছিলাম। খুব খুশি হয়েছিলেন আখতার। কবিতাটি আমাদের সাহিত্যের আরেক প্রধান কবি আহসান হাবীবকে নিয়ে লেখা। আহসান হাবীব ছিলেন আহমদ আখতারের বাবার বন্ধু, একই সময়ে তারা কাব্যচর্চা করেছেন। কবিতায় আখতার লিখেছেন-
আহসান হাবীব
আপনাকে তুচ্ছ
ভাবছে যারা
তাদের সঙ্গে আবার
কীসের সন্ধি!
শত্রুশিবিরে কর্কশ দাঁড়কাক
যতই চেঁচাক
ওরা বিবেকের কাছে বন্দী

আহসান হাবীব-¯িœগ্ধ
পেলব নাম তার
অজেয় সে
কবি- সবুজ, শ্যামল বাংলার।
(কবিতাপত্র পৃষ্ঠা ১৪)
এখানে আহসান হাবীবের প্রতি তার মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে।

পুরো বিকশিত হননি কবি ছড়াকার আহমদ আখতার। সময়ও হয়তো পড়েছিল। কিন্তু নিয়তির লেখা খণ্ডানো যে কঠিন। প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক সাহিত্যের সুবাদে তিনি ২০০৬ সালে ন্যাশনাল প্রেস ক্লাব লিটারারি মেডেল ও ২০১১ সালে ন্যাশনাল প্রেস ক্লাব রাইটার্স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। একজন সাহিত্যিকের বড় মেডেল হচ্ছে মানুষ যে তার বই কেনে, লেখা পাঠ করে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কম হলেও নিজস্ব কবিতার ধারা তৈরি করে আখতার সে কাজটি করতে পেরেছিলেন। তার অগ্রন্থিত কবিতা তো কম নয়।
আমরা তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

SHARE

Leave a Reply