Home প্রবন্ধ আমাদের স্বাধীনতা জীবনের স্বাধীনতা -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

আমাদের স্বাধীনতা জীবনের স্বাধীনতা -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

স্বাধীনতা! আহ প্রাণের স্বাধীনতা!
স্বাধীনতা মানেই প্রতিবাদ। স্বাধীনতা মানেই যুদ্ধ। স্বাধীনতা মানেই প্রশান্তি। স্বাধীনতা মানেই ভালোবাসা। স্বাধীনতা মানেই লাল-সবুজের মিষ্টি দোল। অবুঝ শিশুটাও স্বাধীনতা বোঝে। হাতের চকোলেটটিকে সে স্বাধীনভাবে উপভোগ করতে চায়। চকোলেটটা কেউ অন্যভাবে খেতে বললেও সে বিরক্ত হয়। কেড়ে নিতে চাইলে কিংবা স্বাধীন চিন্তায় ব্যত্যয় ঘটলে সে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। বারবার সান্ত¡না দিয়েও তাকে থামানো যায় না। দামি চকোলেট দিলেও সে স্বাধীনতার দিকেই ফিরে চায়। তাইতো স্বাধীনতাবোধ আমাদের জন্মগত চেতনা।
উনিশশো একাত্তরে আমরা স্বাধীন হয়েছি। রক্তের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা পেয়েছি। অনেক ত্যাগ, অনেক কষ্টের অর্জন এ স্বাধীনতা। ২০২১ সাল চলছে। আমাদের স্বাধীনতার বয়স এখন এসে পঞ্চাশে। দুই হাজার একুশ মানে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর স্বপ্নময় বছর। আমাদের উচ্ছ্বাসের ঢেউ এবার ভিন্নমাত্রায় আন্দোলিত। লাল-সবুজের পতাকায় নতুন উদ্দীপনা। নতুন উচ্ছ্বাস আমাদের মনের মুকুরে। আনন্দের পাশাপাশি আত্মপর্যালোচনারও সময়। দেখা দরকার আমাদের চাওয়া পাওয়ার হিসাব নিকাশ।

আমাদের স্বাধীনতার পথ অনেক লম্বা। আমরা মাথা নত করতে জানি না। স্বাধীন থাকতে চাই। ইতিহাস বলে, আমাদের সম্পদ আমাদের পরাধীন করেছে। আমাদের প্রাচুর্য আমাদের পরাধীন করেছে। সম্পদ এবং প্রাচুর্য রক্ষার জন্য আমাদের শক্তি ছিল না হয়তো। তবে প্রতিবাদে কখনো পিছপা ছিলাম না। তাইতো সেন শাসকদের বিরুদ্ধে আমরা স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলাম। আমরা মুখ বুজে থাকিনি মুগল আমলেও। ঈশা খান, মুসা খানের মতো বারভূঁইয়াদের স্বাধীনচেতা আহ্বান আমাদের আন্দোলিত করেছিল। স্বাধীনতার সত্যিকারের ডাক এসেছিল ইংরেজ কোম্পানি এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। সেখান থেকেই মূলত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল পর্বের যাত্রা।

ইংরেজরা এসেছিল ব্যাবসা করতে। ওরাও লাভ করবে, আমাদেরকেও লাভ করিয়ে দেবে। আস্তে আস্তে ওরা আমাদের ওপর মাতব্বরি শুরু করে। আমরাও প্রতিবাদ করলাম। আমাদের স্বাধীন নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ, নবাব আলিবর্দী খাঁ সবাই প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু খুব বেশি লাভ হয়নি। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব মির্জা মুহাম্মদ হায়বৎ জঙ্গ ইংরেজদেরকে সহ্য করতে পারেননি। হায়বৎ জঙ্গ মানে নবাব সিরাজউদদৌলা। তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলেন। কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে ইংরেজদের তৎপরতা রুখতে চাইলেন। বেশ সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতালোভীদের ষড়যন্ত্রের কারণে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন। আমাদের জেনে নিতে হবে যে, পলাশীতে কোনো যুদ্ধ হয়নি। ওটা ছিল প্রহসন। ষড়যন্ত্রের ফলাফল। তাইতো ১৭৫৭ সালের ৬ জুন আমাদের শত্রু-মিত্র চেনার দিন।

মুসলমান-হিন্দু সবাই আমরা মিলে মিশেই বসবাস করতাম। আমাদের মধ্যে কখনো ঝগড়া ফ্যাসাদ হয়নি। ইংরেজরা আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধিয়ে দিলো। ইংরেজরা বুদ্ধি আঁটলো যে, বাঙালিকে শাসনে রাখতে হলে এদের মধ্যে বিভেদ ছড়াতে হবে। ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ মানে ভাগ করো শাসন করো। এটাই তাদের কূটচাল। এভাবে মুসলমান আর হিন্দুর মধ্যে গণ্ডগোল বাধিয়ে দিলো। মুসলমানদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করলো। শাসন ক্ষমতা কেড়ে নিলো, জমিজমা কেড়ে নিলো। চাকরি থেকে ছাঁটাই করলো। লেখাপড়ার সবগুলো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলো। ধর্মীয় কাজে বাধা দিতে লাগলো। বেশি বেশি খাজনা নির্ধারণ করলো। অবশেষে আমরা আবারও প্রতিবাদ করলাম। মীর নেসার আলী তিতুমীর বাঁশের কেল্লা গড়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ, দুদু মিয়া সবাই প্রতিবাদ করলেন। বালাকোটে যুদ্ধ হলো। কিন্তু আমরা স্বাধীনতা ফিরে আনতে পারলাম না।

আমরা নতুন পরিকল্পনা হাতে নিলাম। নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, হাজী মুহম্মদ মহসিন, মুন্নুজান সবাই নতুন চিন্তায় জেগে উঠলেন। লেখাপড়া শিখতে হবে। তাই হলো। বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন সফল হলো। বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত বাংলা বিভক্তিকরণের মধ্য দিয়ে নতুন যাত্রা শুরু হলো। শিক্ষা-সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম-দর্শন সবক্ষেত্রে নতুন স্বপ্ন যোগ হলো। ভারতবর্ষ ভাগ হলো। আমরা স্বাধীন হলাম ১৯৪৭ সালে।
স্বাধীনতার স্বাদটি আমরা তখনো পুরোপুরিভাবে পাইনি। আমাদের মুখের ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হলো। আমরা আবারও জেগে উঠলাম। প্রতিবাদ করলাম। বাংলাভাষার জন্য আন্দোলন করলাম। বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। রাস্তার আন্দোলন। রক্ত দিলাম। জীবন দিলাম। ভাষা রক্ষার আন্দোলনে জয়ী হলাম। বাংলা ভাষার স্বীকৃতি পেলাম। সুযোগ পেলাম নিজের মতো কথা বলার।

অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু হলো। ভাতের অধিকার। ভোটের অধিকার। চাকরির অধিকার। আমরা আবারও জেগে উঠলাম। ২৬ শে মার্চ থেকে শুরু হলো স্বাধীনতাযুদ্ধ। আমাদের মুক্তিসংগ্রাম।
নয় মাস ধরে যুদ্ধ হলো। কৃষক, শ্রমিক, তরুণ-যুবা সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো। মরণপণ যুদ্ধ। দেশমুক্তির যুদ্ধ। স্বাধীন হওয়ার যুদ্ধ। রাজনৈতিক স্বাধীনতা। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা। কথা বলার স্বাধীনতা। ভোটের স্বাধীনতা। ভাতের স্বাধীনতা। নিজের দেশে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। মরণপণ চেষ্টা করলো হানাদার বাহিনীও। আমাদের বাধা দিলো। হত্যা করলো। বাড়িঘর পুড়িয়ে দিলো। শহীদ হলো আমাদের অসংখ্য মানুষ। মা-বোনের চোখের পানিতে ভিজে গেলো বাংলাদেশের মাটি। তবুও হাল ছাড়িনি আমরা। প্রাণপণে যুদ্ধ করেছি। খেয়ে না খেয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন এঁকেছি। বুকের গভীরে রেখেছি লাল-সবুজের পতাকা। তাইতো বিজয়টা আমাদেরই হয়েছে। আমরাই হেসেছি বিজয়ের হাসি।

দেশটা এখন আমাদের। বাংলাদেশ মানেই আমাদের স্বপ্ন। লাল-সবুজের পতাকা মানেই আমাদের উচ্ছ্বাস। বাংলাদেশের নদী, খাল-বিল, সবুজের মাঠ, পাহাড়-পর্বত, সাগর-বেলাভূমি, সুন্দরবন থেকে ছোটখাটো ফুলবাগান- সব আমাদের। এ আকাশ আমাদের। এ বাতাস আমাদের। এদেশের মানুষেরা আমাদের। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আমরা এক প্রতিবেশী। বাংলাদেশের কোনো মানুষের কান্না মানেই আমাদের কান্না। কোনো মানুষের হাসি মানেই আমাদের হাসি। সুখে দুঃখে আমরা সবাই এক দেহ। এক আত্মা। দেশের প্রতি ভালোবাসা মানেই নিজের প্রতি ভালোবাসা। তাইতো দেশটাকে নিজের মতো করেই গড়তে হবে।
আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব এখন আমাদেরই। গণতন্ত্রের জন্য আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছিল। এখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং বিকশিত করার দায়িত্ব আমাদেরই। গণতন্ত্রের চর্চা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। শুরু করতে হবে বন্ধু মহল থেকেই। পরিবারের সদস্যদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নামই পারিবারিক গণতন্ত্র। বন্ধুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকার মধ্যেও গণতন্ত্রের মজা পাওয়া যায়। গণতন্ত্রের চর্চা হতে পারে আমাদের স্কুল-কলেজেও। সকলের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কিংবা সকলের অধিকার সংরক্ষণও গণতন্ত্রের চর্চা। পরিবার থেকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পর্যন্ত গণতন্ত্র বিস্তৃত। আমাদের যার যেটুকু সীমানা তার সেটুকুতেই গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।

অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছিল। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য কাজ করা এখনকার স্বাধীনতা সংগ্রাম। ভালোভাবে লেখা পড়া করে উন্নত ক্যারিয়ার করার চেষ্টাই এখন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার চর্চা করাও স্বাধীনতা আন্দোলন। শুধু ভালো রেজাল্ট করে বড় অফিসার হলেই দেশের কল্যাণ করা যায় না। অনেক মেধাবী বড় কর্মকর্তাও দেশের শত্রু হয়ে ওঠে। অন্যায় দুর্নীতির মাধ্যমে তারা দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে। সুদ, ঘুষ, অপহরণ, ছিনতাই, চোরা কারবারি, মাদকের সিন্ডিকেট- এসব নোংরা কাজে শিক্ষিত শ্রেণির লোকজনই বেশি জড়িত থাকে। সুতরাং লেখাপড়া শিখলেই সে দেশের বন্ধু হয় না। নৈতিক মূল্যবোধ থাকতে হয়। থাকতে হয় দেশপ্রেম। ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অনুভূতিশীল হলে তিনি সহজেই ভালো মানুষ হতে পারেন। তাইতো একাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের চেষ্টা করাও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম।

দেশটা যেমন আমাদের, এদেশের ভাষা এবং সংস্কৃতিও আমাদের। আমরা আন্দোলন করেছিলাম ভাষা রক্ষার জন্য। জীবনও দিয়েছিলাম। তাইতো একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমাদের এতো আয়োজন। সেই বাংলা ভাষা রক্ষা এবং বিকাশ ঘটানো এখন আমাদের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতাযুদ্ধ। হিন্দি, ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিদেশী ভাষা থেকে আমাদের বাংলাভাষাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। অন্য ভাষা শিখলেও বাংলাভাষা শিখতে হবে ভালো করে। বাংলাভাষার ভালো ভালো বই পড়তে হবে। বাংলাভাষাকে ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন মিডিয়াতে চেষ্টা করতে হবে। বাংলাভাষায় লেখালেখিরও চেষ্টা করতে হবে। আঞ্চলিক ভাষা থাকলেও বিশুদ্ধ বাংলাভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতে হবে।
আমাদের দেশটা নদীমাতৃক এবং কৃষিপ্রধান। এখানকার মাটি মানুষের সংস্কৃতি রক্ষার জন্যও আমরা আন্দোলন করেছিলাম। এখনও সেই আন্দোলন চালাতেই হবে। বিদেশী অপসংস্কৃতির প্রতি ঝুঁকে গেলে আমাদের চলবে না। নিজেদের বিশ্বাসের আলোকে সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে। যে গান, নাটক, সিনেমা, সাহিত্য কিংবা আচার-আচরণ আমাদের ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেয় সেগুলো আমাদের সংস্কৃতি কিংবা সাহিত্য নয়।

আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি আমাদের চরিত্রকে সুন্দর করবে। আমাদের আচার ব্যবহার মাধুর্যময় করবে। কিন্তু যে সংস্কৃতি নোংরা কথা শেখায়, নোংরামিতে জড়িয়ে দেয়- সেটা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি নয়। এটা অপসংস্কৃতি। এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করাই আমাদের এখনকার স্বাধীনতাযুদ্ধ। আমরা নোংরা সাহিত্য পড়বো না। ভালো সাহিত্য পড়বো। এটাই আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ। খারাপ কোনো গান, নাটক, মুভি কিংবা কার্টুন দেখবো না- এটাই আমাদের সাংস্কৃতিক মুক্তিযুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমাদের জয়লাভ করতেই হবে। কারণ, আমাদের স্বাধীনতা মানেই জীবনের স্বাধীনতা।
এ বছর আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হচ্ছে। দারুণ মজা তাই না। আমরাও মজা করছি। এই মজার সাথে সাথে আমরা তিনটি বিষয়ে প্রতিজ্ঞা করতে পারি। কি পারবো তো? তা হলো- আমরা খারাপ কিছু দেখবো না। খারাপ কিছু শুনবো না। খারাপ কিছু বলবো না। এ তিনটি কাজই আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ। ভালো জিনিস দেখবো। ভালো বিষয় শুনবো। ভালো কথা বলবো। এ কাজগুলো করতে পারলেই আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করা সার্থক হবে। আমরা আমাদের দেশকে আমাদের মতো করে গড়তে পারবো। তাহলেই শান্তি পাবে আমাদের বীর শহীদগণের আত্মা। হেসে উঠবে আমাদের স্বাধীনতার বীরসেনানী। বিশুদ্ধ বাতাসে পতপত করে উড়বে আমাদের লাল-সবুজের মুক্তিনিশান।

SHARE

Leave a Reply