Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব চীনের অপরূপ গ্রাম আতাউর রহমান

চীনের অপরূপ গ্রাম আতাউর রহমান

চীনদেশের উত্তর গুয়ানজি অঞ্চলের একটি শহর গুইলিন। প্রকৃতির নিপুণতায় তৈরি এক দৃশ্যপট, যাকে বলা যায় ‘আ প্যালেস অফ ন্যাচারাল আর্টস’। চীনা ভাষায় গুইলিন কথার অর্থ হচ্ছে, ফরেস্ট অফ সুইট অস্‌মানথাস।
অস্‌মানথাস হচ্ছে এক ধরনের সুগন্ধি ফুল, চিনে বিশেষ করে গুইলিনে, এই ফুলের বিস্তর গাছ ছিল, এখনো আছে। এই ফুল গাছের আধিক্যের জন্যই এই জায়গার নাম হয়েছিল গুইলিন। চীনাদের অন্ধ বিশ্বাস ছিল এই গাছ সৌভাগ্য বয়ে আনে, তাই চিনা মেয়েরা অতীতে প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় এই গাছ টবে লাগিয়ে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেত।
গুইলিন এক সময় ছিল শুধুই জেলেদের গ্রাম। চারদিকে ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ের সমাবেশ, যেন ছুঁচালো খাড়া খাড়া পাহাড়ের জঙ্গল, গাছপালা আর ফল-ফুলে ভরা এক গ্রাম।
চুনাপাথর, জিপসাম আর ডলোমাইটের মত দ্রাব্য পাথরের পাহাড় এখানে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে এই সব পাহাড়ের দল মাথা তুলে জেগেছিল সমুদ্রের তল থেকে। পাহাড়গুলোর ভেতরে আছে অনেক গুহা। পাহাড়ের চুনাপাথর ক্ষয়ে গিয়ে গুহার ভেতরে তৈরি হয়েছে স্ট্যালেকটাইট, স্ট্যালাগমাইটের গুহাভাস্কর্য। এখনো চলছে সেই প্রক্রিয়া।
সেই গ্রামের এক রাখাল ছেলে একদিন লুকোচুরি খেলতে খেলতে ঢুকে পড়েছিল এক গুহায়, শুনেছিল পানির শব্দ আর পাহাড়ের ফাটলের মধ্য দিয়ে হু হু করে বয়ে আসা বাতাসের তৈরি বাঁশির আওয়াজ। ছেলেটি ডেকে আনল বন্ধুদের, সবাই মিলে ঢুকল মাটির নিচের সেই বিশাল অন্ধকার গুহায়, হাতে তাদের জ্বলন্ত কাঠের মশাল। তারা সন্ধান পেল মাটির নিচে এক আশ্চর্য রাজ্যের।
সেই গুহার ওপরের চুনা পাহাড়ের গায়ের ফাটল দিয়ে বয়ে আসা বৃষ্টির পানিতে গলে যাওয়া চুনাপাথর জমে তৈরি হয়েছে নানান অপরূপ ভাস্কর্য। কিছুদিন পর গ্রাম থেকে শহরে শহরে ছড়িয়ে পড়লো এই খবর। চীন সরকারও নজর দিলেন। আবিষ্কার হল মাটির নিচের মায়াপুরী- ‘রিড ফ্লুট কেভ’। গুহার আশপাশেই রিড ফ্লুট নামে বাঁশি তৈরির কাঠ হয় এমন গাছ মিলত অনেক। সেই গাছের নামে নাম রাখা হল গুহাটির।
দুটি নদী, চারটি লেক আর চারদিকে ক্ষয়িষ্ণু খাড়া পাহাড়ে ঘেরা গুইলিন আর গুয়াংজি অঞ্চলে হান বংশীয় চীনা মানুষরা ছাড়াও ১২টি বিভিন্ন আদিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন। লি নদীর দুই পাড়ে অনেক গ্রাম, সবই জেলেদের বসতি।
নদীর ধারেই বিশেষ বিশেষ জায়গায়, গ্রামগুলিতে ঢোকার মুখে আছে মাছের পাইকারি বিক্রির অস্থায়ী কেন্দ্র। ক্রেতারা বড়ো বড়ো আইস বক্স নিয়ে হাজির থাকে জেলেদের ধরে আনা মাছ কেনার জন্য।
জাল দিয়ে মাছ ধরা ছাড়াও এরা আর এক উপায়েও মাছ ধরে। সেটি প্রাচীন পদ্ধতি। করমোরেন্ট বার্ড নামে হাঁস জাতীয় একরকম পাখি আছে, এদের গলার অংশটা খুব স্থিতিস্থাপক। দরকারে অনেকটা ফোলাতে পারে, আর অনেক মাছও রাখতে পারে গলার এই ফোলানো থলেতে। আর এই সুযোগটাই নেয় জেলেরা।
তারা এই পাখিদের ধরে রাখে, এদের গলার নিচের অংশে একটা শেকল বেঁধে রাখে, যাতে ধরে আনা মাছ সবগুলো গলার মধ্য দিয়ে পেটের মধ্যে চলে যেতে পারে না। জেলেরা সেই মাছগুলো সংগ্রহ করে, বিক্রি করে।
এই পাখিরা পানির অনেক গভীরে গিয়ে মাছ তুলে আনতে পারে। লি নদীতে ক্রুজে গেলে দেখা যায় অনেক জেলেই টুকরিতে মাছ আর বাঁকে বসানো দুটি মাছশিকারি পাখি বসিয়ে মাছ নিয়ে চলেছে মাছ বিক্রি করতে।
অনেক বৈশিষ্ট্যের মাঝে গুইলিনের সবচেয়ে সেরা রিড ফ্লুট কেভ আর লি নদীতে ভাসতে ভাসতে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা।

SHARE

Leave a Reply