Home জাতীয় কিশোরকণ্ঠ পাঠ প্রতিযোগিতা লালমাটিয়ার দস্যিরা -ইয়াসিন আরাফাত আলিফ

লালমাটিয়ার দস্যিরা -ইয়াসিন আরাফাত আলিফ

কিশোরকণ্ঠ জাতীয় গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০২০-এর খ-গ্রুপে ৪র্থ স্থান অধিকারী গল্প

মফস্বল শহরেই বিপুদের বাস। পুরোপুরি শহর না হলেও শহরের সবকিছুই আছে। পাকা রাস্তাঘাট, বড় দালানের ছড়াছড়ি, স্কুল-কলেজ, শপিং কমপ্লেক্সসহ কত কি। আবার শহর না হওয়ারও অনেক কারণ আছে। শহরের পরিবেশের অনেক কিছু যেমন এখানে বিদ্যমান, ঠিক তেমনই গ্রামের অপার সৌন্দর্যের কোনো রূপ কমতি নেই। এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সরু খাল। সারাদিন নৌকা আর মাছ ধরা ট্রলারের আনাগোনা চলে। মফস্বলের কিছুটা দূরে আছে ফসলি জমি। সারা বছরই ফসল ফলে জমিতে।
বিপুরা এ মফস্বল এলাকায় আছে বছর তিনেক হলো। তাদের পৈতৃক নিবাস পার্বত্য চট্টগ্রামে। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে বদলি হয়ে ওখানে আসা। প্রথম দিকে পার্বত্য এলাকার নদী-পাহাড় ছেড়ে কিছুটা শহুরে বদ্ধ পরিবেশে আসায় মনমরা হয়েছিল। সাথে নতুন পরিবেশের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার ও নতুন বন্ধু জোগাড় করার ঝামেলা তো আছেই। বিপু কিছুটা লাজুক প্রকৃতির ছেলে, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথেই তার দুরন্তপনা যেন ডালপালা মেলতে শুরু করলো।
বাবা চাকরিজীবী, মা গৃহিণী। মা-ই সারাদিন ঘর সামলান এ কাজ ও কাজ করে। বিপু ও নিপুর তদারকি করতেই তার দিন চলে যায়। নিপু বিপুর ছোটো বোন। গলায় গলায় ভাব তাদের। বাবা কিছু আনলেই কাউকে ছাড়া কেউ খাবে না। প্রতি রাতে নিপুর গল্প শোনা চাই নিত্যনতুন। তার সব বায়না বিপুর কাছেই। সারাদিন এখানে-ওখানে ঘুরে ফিরে মহল্লার যাবতীয় আজগুবি গল্পের পসরা সাজিয়ে বসে নিপুর কাছে। নিপুও তেমন, কিছু বুঝে উঠতে পারুক বা না পারুক মাথা নেড়ে সায় দেবে।
বাড়ির কিছু দূরেই বিপুর স্কুল। হেঁটে যেতে সময় লাগে মিনিট-দশেক মতো। সে স্কুলে যায় দলবেঁধে। পাশের বাড়ির রামিম-হাসান-ইমন তার সহপাঠী, তাদের সাথেই বিপুর ওঠাবসা। গৎবাঁধা রুটিনের ফাঁকে যে সময়টা পাওয়া যায় তার সবটাই কাটে তাদের সাথে। সকালে পড়া শেষ করে খেলতে যাওয়া, ঘুড়ি উড়ানো, নিত্যনতুন জিনিস খুঁজে বের করাই তাদের নেশা। তাই স্কুল ছুটির দিনগুলোতে তারা বেরিয়ে আসে নানান জায়গায়। কখনো রেলস্টেশনে, কখনো বন-জঙ্গল আবার কখনো বা তাদের সময় কাটে নদীর পাড়ে। এসব উড়নচণ্ডী আর খামখেয়ালিপনার সাথে গা ভাসাতেই তাদের যত ভালো লাগা। এসব কাজের অবশ্য কিছুটা যে তার বাসায় জানে না তা নয়, মায়ের কড়াকড়ি তো আছেই। তবে বাবার প্রশ্রয়ও আছে বেশ। অন্য কিছু যাই হোক বাবার চাই পড়াশোনা। বিপু বরাবরই অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে, তা হোক পড়ালেখা বা খেলাধুলায়।

২.
সবেমাত্র স্কুলের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বিপুদের হাতে এখন অফুরন্ত সময়। ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই। নেই সাত সকালে মায়ের ডাকাডাকি, টেবিল কামড়ে পড়ে থাকার ব্যস্ত সময়ও তেমন একটা নেই। স্কুল খোলার আরো সপ্তাহ-দুয়েক বাকি। এদিকে বাবার অফিসের ব্যস্ত শিডিউল। নিপুর পরীক্ষা চলছে। বাড়ির সামনের দাওয়ায় বসে আছে বিপু। সাথে তার বন্ধুরা।
‘কিরে, বিকেলে কোথাও যাবি আজ?’ বিপু উৎসাহ নিয়ে বললো।
‘চাইলেই যাওয়া যায়, তোরা বল কই যাবি?’ রামিমের পাল্টা প্রশ্ন।
হাসান ওদের দলের সবচাইতে চতুর। আশপাশের এমন কোনো জায়গা নেই সে ঘুরে দেখেনি। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক দুর্গম স্থানেও নাকি গিয়েছে তার ছোটো মামার সাথে। হাসানই তাদের শেষ ভরসা। সিদ্ধান্তহীনতা থেকে মুক্তি পেতে তাকে চেপে ধরলো সবাই। সে বিজ্ঞদের মতো মুখ করে বললো, ‘চাইলে একটা জায়গায় যেতে পারি। তবে এখান থেকে প্রায় ঘণ্টা দু’য়েকের পথ। পায়ে হেঁটে যেতে হবে। জায়গার নাম লালমাটিয়া।’
চটপটে স্বভাবের ইমন বলল, ‘পাহাড় নাকি জঙ্গল?’
হাসান বললো, ‘ছোটো মামা বলেছিলো উঁচু পাহাড় নাকি অনেক। লালমাটির পাহাড় আর ছোটো ঝর্ণাও আছে নাকি। গোসল করে নেওয়া যাবে।’
হাসানের কথা শেষ হতে না হতেই বিপু ধমক দিয়ে বললো, ‘আগে ত চল। তারপর দেখা যাবে বাকি সব।’
হাসান আমতা আমতা করে বললো, ‘তবে একটা সমস্যা আছে। আমার জায়গাটা চেনা নেই।’
ইমন রাগ ঝেড়ে বললো, ‘গোসল করার চিন্তা করে এখন বলছো জায়গা চিনো না। বুদ্দু একটা।’
হাসান কিছুটা দমে গেলো মনে হলো। বললো, ‘কারো কাছ থেকে জিজ্ঞেস করলেই হয়তো জানা যেতে পারে। চল হালিম মামার কাছে যাই।’
বিপু নিরুপায় হয়ে বললো, ‘তাই চল।’
সামনের কয়েক বাড়ি পেরিয়ে ব্যস্ত রাস্তার মোড়। বড় ট্রাক আর বাস বাদে বাকি সবই চলে এ রাস্তায়। পাশেই বাজার। সারাদিন মানুষের ভিড়ে গিজগিজ করে। এসব বিপুর সহ্য হয়ে গেছে। রিকশার যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকা, কুলি-মজুরদের হাঁকডাক আর ব্যস্ত সড়কের নিত্য কোলাহলের সাথে মানিয়ে নিতে বিপুর কোনো সমস্যাই হয়নি। এভাবেই রাস্তা ঘাটের জ্যাম ঠেলে গিয়ে বসলো হালিম মামার দোকানে।
তাদের দেখলেই অন্য সময় হালিম মামা গালভর্তি হেসে বসতে বলতো। আজ সে রকম কিছুই করলো না মামা। বসতে বলে চা দিলো তাদের। হাসান অনুযোগের সাথে বললো, ‘কি রাগ করলা নাকি মামা? মন খারাপ?’
‘কি কও ভাগিনা, তোমাগো লগে কিয়ের রাগ?’ হালিম মামা মাথা নেড়ে বললো।
বিপু বললো, ‘মুখটা এমন করে রাখলা কেন?’
তাদের জোরাজুরিতে অবশেষে মামা মুখ খুললো। হালিম মামা তারপর যা বললেন তার জন্য তারা কেউই প্রস্তুত ছিলো না। হু হু করে কেঁদে বুক ভাসালেন মামা।
ঘটনাটা হলো এই যে, গত দুই দিন হলো হালিম মামার ছেলে নিখোঁজ। আট বছর বয়সী ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে দোকান খুলেছিলেন মামা। সেদিন বারোটা বেজে গেলেও নাকি সে ফিরেনি। আজ দুই দিন ধরে তার কোনো খোঁজ নেই। আশপাশে নিজে অনেক খুঁজতে গিয়েছে। কোথাও পাননি। গত রাতে নাকি হঠাৎ অচেনা নম্বর থেকে কল এসেছিলো। টাকা চাইলো দুই লাখ। হালিম মামা অনেক আকুতি মিনতি করেও কোনো ফল হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অপহরণকারী নাকি তার সম্পর্কে আর তার পরিবার সম্পর্কে অনেক কিছু জানে। এমনকি কাদের সাথে তার সখ্যতা তাও। এ ঘটনা কাউকে জানালে বা থানা পুলিশ করলে নাকি ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে।
হাসান গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলো, ‘আর কাকে বলেছো এ কথা?’
‘এহানে তো আমাগো কেউই নাই। আরেক জন আছে আমাগো দেশি। নাম কাশেম। বাজারে পানের দোকান আছে’, হালিম মামা বললো।
বিপুদের পূর্বপরিচিত কাশেম লোকটা। এলাকায় মোটামুটি চেনাজানা। ভালোই বলা চলে। লোকটার একটা স্বভাব আছে তা হলো ভবঘুরে, সপ্তাহের দু-তিন দিন ছাড়া দেখা পাওয়া ভার। ভবঘুরে হলেও এলাকায় বাড়ি আছে, পরিবার আছে।
বিপু হালিম মামাকে সান্ত¡না দিয়ে বললো, ‘ধৈর্য ধরো, আমরা দেখি কিছু করতে পারি কি না। যেহেতু তার টাকাই দরকার সে টাকা পেলে ছেড়ে দেবে।’
হালিম মামা কাতর স্বরে বললো, ‘কী বলিস তোরা, এত টাকা কই পামু? ঘর ভাড়া আর পেট চালাইতে ইনকামে কুলাইতে পারি না। এক সপ্তাহ সময় দিসে, দেহি কী করা যায়।’ বলেই আধময়লা শার্টের হাতায় চোখ মুছে নিলেন তিনি।
তাদের কথা শেষ হতে না হতেই এক লোক দোকানে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ালো। হালিম মামা বিনীতভাবে বললো, ‘আসেন কাশেম ভাই, এদের কইতাসিলাম খোকনের কথা।’
কথা শুনে কাশেম মিঞার মুখ কেমন ফ্যাকাশে দেখালো। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, ‘সবই কপালের দোষ, আমাগো গরিবেরই যত কপাল খারাপ। পোলাটা চাচা চাচা কইয়া ডাকতো আমারে। এহন যা করার নিজেদের করতে হইবো। তোমরা কাউরে কইয়ো না। ঘটনা জানাজানি হইলে সমস্যা হইবার পারে।’
দোকানে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যাবার কারণে বেশি কথা বলা গেলো না। অগত্যা হালিম মামার দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে হলো। তাদের সাথে বেরিয়ে আসলো কাশেম মিঞাও। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে কাশেমের সাথে একথা ওকথা বলে যা বুঝলো লোকটা আসলেই আজব কিসিমের। কাজকর্ম নিয়ে চিন্তাভাবনা কম। হালিম মামার ছেলের কথা উঠলেও কেমন যেন উদাসীন হলেন। বললেন, ‘টাকা না পাইলে ছাড়বো না তারে, এ এলাকার অনেক পোলায় এক-দু’মাস ধইরা নিখোঁজ আছিল তারপর ট্যাহা দিলেই ছাইড়্যা দেয়।’
কাশেমের মুখে এ কথা শুনে তাজ্জব বনে গেলো। তার এ সোজাসাপ্টা কথায় তাকে কিছুটা পাষণ্ডও মনে হলো তাদের।
হঠাৎ মনে পড়লো লালমাটিয়ার কথা। বিপু ভাবলো ইনি হয়তো জানতে পারেন রাস্তা। বিপু তাদের পরিকল্পনার কথা জানালো তাকে। বিপুরা যেতে চায় শুনে কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বললেন, ‘লালমাটিয়া তো বহুত দূর। যদি যাইবার চাও তাইলে চলো কাইলকেই আমার লগে, রাজবাড়ী ঘুইরা দেখামু।’
কাশেমের মুখে কালকে যাবার কথা শুনেই তারা যেন হাতে চাঁদ পেলো। তারা ভুলেই গেলে হালিম মামার কথা। কাশেম মিঞা তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, ‘তয় কাইল সকাল ১০টায় রওনা দেই চলো, হালিমের দোকানে থাইকো।’
এ দিকে বেলা বেড়ে দুপুর হতে লাগলো। গ্রীষ্মের দুপুরে রোদের তেজ বেশি। তাই বেশিক্ষণ বাইরে না থেকে বাড়ির দিকে পা বড়ালো তারা।
বিপু বাসায় এসে ভাবলো হালিম মামার কথা বলবে। কিন্তু পরক্ষণেই কী ভেবে আর জানালো না বিপু। রাতে টিভি দেখে কিছুক্ষণ সময় কাটালো তারপর খেয়েই শুয়ে পড়লো। নিপু অনেকক্ষণ ডেকেও ভাইয়াকে ডেকে তুলতে পারলো না। আজ আর গল্প শোনা হলো না বলে মুখ গোমড়া করে সেও ঘুমিয়ে পড়লো।

৩.
পরদিন সকাল ১০টা না হতেই সবাই এসে হাজির। বিপু বাসায় বলে দিলো এক বন্ধুর বাসায় দুপুরে দাওয়াত। বাসায় প্রথমে যেতে বারণ করলেও শেষে রাজি হলো। শর্ত হলো, সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হবে।
দোকানে এসেই দেখলো। হালিম মামা আনমনে বসে আছে। কাজে মনোযোগ নেই। কিছুটা ভয়ার্ত চোখেই চারপাশ তাকিয়ে বললো, ‘তোগেরে যে খোকনের কথা কইছি তাও জাইনা গেসে। আর কইছে যদি বেশি মাতামাতি করি তাইলে আমার পোলারে আর দেখতে পামু না।’ এ বলে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন মামা।
আবার বললেন, ‘যতট্যাহা লাগুক আমি দিমু ট্যাহা, আমার পোলা দরকার।’
বিপু ভাবতে লাগলো, কে জানতে পারে সব খবরাখবর; তার হঠাৎ মনে হলো নাকি কাশেম মিঞার কাজ এসব। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো, এলাকায় হালিম মামার দূর সম্পর্কের আত্মীয় বলতে কাশেমই আছে। তা ছাড়া তার যে উদাসীনতা, তার দ্বারা এসব সম্ভব না। কী আবোল তাবোল ভাবতে লাগলো ভেবে নিজের ওপরই নিজের রাগ হলো। হালিম মামাকে বললে আবার কষ্ট পাবেন ভেবে আর সেদিকে আগালোনা সে।
মিনিট ত্রিশেক পর কাশেম মিঞা এসে হাজির। তার পরনে নতুন লুঙ্গি, সাদা ফতুয়া আর গলায় ঝুলানো গামছা। তাকে দেখে বেশ ফুরফুরে মেজাজের মনে হলো আজ। সময় নষ্ট না করে চলা শুরু করলো তারা। সাথে কিছু খাবার দাবার নিয়ে নিলো বিপু।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পাকা রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলো তারা। পাকা রাস্তা থেকে নেমে এবার শুরু হলো নদীরপাড় ধরে হাঁটা। একপাশে নদী আর চরে ফুটে আছে কাশফুল। তারা গল্প করছে আর এদিক ওদিক তাকিয়ে এগোতে লাগলো। বিপু ভাবতে লাগলো, এতো রসিক আর মজার মজার মানুষটাকে নিয়ে কিসব ভাবছিলো সে। কাশেম মিঞা পুরো পথজুড়েই মাতিয়ে রাখছিলো তাদের। হরেক রকম গল্পের ঝুলি তার। পাহাড়-সমুদ্র আর জঙ্গলে কাটানো সময়ের কথাগুলোই শোনাচ্ছিলো তাদের।
বিপুর প্রকৃতি ভালো লাগে। ভালো লাগে প্রকৃতির বুকে মিশে যেতে। বন-জঙ্গল, নাম না জানা নদীর বুকে ভেসে যাওয়া, আঁকা বাঁকা পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে পথ চলতে তার হাজার বছর বেঁচে থাকার ইচ্ছা। একটা সময় নদীর পাড় হয়ে তারা বনের ভেতর দিয়ে চলতে লাগলো। বন তেমন ঘন না হলেও এবার প্রথম আসায় গা কেমন ছমছম করছিলো তাদের।
কাশেম মিঞা তাদের ভয় আঁচ করতে পেরে বললো, ‘এখানে ভয়ের কিছু নাই। মানুষের আনাগোনাও নাই। বন্যপ্রাণীরা থাহে আরো গভীরে।’ এভাবে ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর তারা পৌঁছে গেলো লালমাটিয়ার রাজবাড়ীতে। রাজবাড়ী হতে পাহাড় দেখা যায় আবছা আবছা। কাশেম মিঞা জানালো, পাহাড়ে পৌঁছুতে সময় লাগে বিশ-পঁচিশ মিনিট। তাই তারা ভাবলো, প্রথমে রাজবাড়ীই দেখে নেওয়া যাক।
সুনসান নীরবতা। সীমানা দেওয়া প্রাচীর পেরিয়ে বিশাল উঠোন। সামনে বটবৃক্ষের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। বিশাল করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলো তারা। এর আগে কারো এমন পুরনো জরাজীর্ণ রাজবাড়ীতে আসা হয়নি। বিপুর মনে হতে থাকলো, এখানে নিশ্চয় মানুষের আনাগোনা আছে। কারণ পুরনো বাড়ির যে গুমোট গন্ধ থাকে তা এখানে নেই। ধুলো-ময়লা নেই বললেই চলে।
হঠাৎ কোথা হতে চাপা কান্না শুনতে পেলো তারা, তাও অবশ্য কিছু সময়ের জন্য। বিপুরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ভড়কে গেলো। কাশেম মিঞা যেন অন্যজগতের মানুষ। তাকে কান্নার আওয়াজের কথা বলতেই তিনি বললেন, ‘আরেহ এহানে মানুষ আসবো কোত্থেইক্কা? ভয় পায়তাছো তাই লাগতাছে এমুন আর হুনো দোতলার দিকা যাইয়ো না কেউই। বাড়ি পুরান হইছে, নরম দেয়াল। তোমরা থাহো, আমি মুইতা আহি’, বলেই পা বাড়ালেন।
কাশেম মিঞা চলে যাবার পর অজানা এক ভয় তাদের ঘিরে ধরলো। একপাশে জবুথবু হয়ে ঘুরে দেখতে লাগলো তারা। হাসান নীরবতা ভেঙে বললো, ‘তোরা কি শুনেছিস কান্নার শব্দ?’
ইমন বলে উঠলো, ‘হুম, স্পষ্ট শুনছি। ছোটো ছেলের কান্নার মতো।’
বিপু, রামিমও সায় দিলো হাসানের কথায়। গল্পে শোনা ভূতের ভয় আর রাজবাড়ীর পিনপতন নীরবতা তাদের ক্রমে গ্রাস করলো। তবে কেউই দমে যাবার পাত্র না। বিপু চুপচাপ হাঁটলেও তার চোখ যেন চরকির মতো চারদিক খেয়াল করতে লাগলো। আচমকা তার চোখে পড়লো দোতলার বন্ধ দরজা। তার উপর গামছা জড়ানো। গামছা দেখেই বিপু চিনলো এটা কাশেম মিঞার গামছা। সে অন্যদের তা ইশারায় দেখাতেই সবার কৌতূহল বেড়ে গেলো। এখানে যদি কেউ না-ই থাকে তাহলে কোনো কামরা থাকার কথা না। কাশেম মিঞা কি তাদের কাছে কিছু লুকোচ্ছে?
হাসান ফিসফিসিয়ে বললো, ‘তোরা থাক, দেখে আসি ওদিকটায়।’ বলেই পা টিপে টিপে এগোতে লাগলো সিঁড়ি দিয়ে।
অন্য সবাই উত্তেজনা আর ভয়ে রীতিমতো কাঁপতে শুরু করলো। তবে হিতাহিত জ্ঞান হারালো না কেউই। যা হোক, তারা দমে যেতে রাজি না।
হাসান দরজার কিছুটা কাছে যেতেই মানুষের কথার আওয়াজ পেলো।
ওপাশ হতে মোটা গলায় কেউ একজন বললো, ‘কামের মতো কাম করসোস কাশেইম্যা। গত পরশু আনলি হালিমের পোলারে, আইজকা আরো চাইডা মাল। সব গুলারে বর্ডার পার করলেই তো ট্যাহা আর ট্যাহা।’
কথাটা কানে যেতেই চমকে উঠলো হাসান। তাহলে হালিম মামার ছেলের অপহরণকারী এরাই। আর মাল বলতে যে তাদের বোঝানো হয়েছে তাও বুঝে নিলো সে। বন্ধ দরজার ফাঁকে চোখ রাখতেই দেখা পেলো হালিম মামার ছেলে খোকনের। চোখ-মুখ বাঁধা।
এবার কাশেমের গলা শোনা গেলো, ‘এতো তাড়াহুড়ো কইরো না বাবুল ভাই। সুযোগে সবই হইবো। মুক্তিপণ না নিয়া সবগুলারে বর্ডারে পাঠায়া দিমু। ফোরকান ভাই পাইলে খুশি হইবো।’
খোকনকে লক্ষ্য করে কাশেম মিঞা বললো, ‘অপেক্ষা করো বাজান। তোমার বড় ভাই আইতাসে কিছু। বাপ মারে ভুইলা যাও। আরেক দ্যাশে যাইবা, সব রঙিন সেই দ্যাশে।’
মোটা গলার বাবুল নামের লোকটার কথা আবার শোনা গেলো, বললো, ‘দেরি কইরো না, এখন কথা হইলো আগামী শুক্রবার তাগোরে নিয়া আইসো দক্ষিণ সাগর পাড়। ওইহানে ফোরকান ভাই রেডি থাইকবো।’
কাশেম গলা ঝেড়ে বললো, ‘তার সমস্যা নাই, তোমার মাল বুইজ্যা পাইলে চলবো। তুমি খোকনের খেয়াল রাহো। হালিমরে জ্বালানোর দরকার নাই। থানা পুলিশ হইবো না, হে দায়িত্ব আমারে দাও।’
কাশেম নিচে আসবে দেখে এক লাফে নেমে এলো হাসান। নিচে দাঁড়ানো বিপুদের নিয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে সব খুলে বললো। এসব শুনে যেন বিপুদের পিলে চমকে উঠলো। একসাথে যত রাগ আর ক্ষোভ যেন উপচে পড়ছিলো তাদের চোখে-মুখে।
হাসান উত্তেজিত হয়ে বললো, ‘আমরা তো চারজন আছি। চাইলেই শালা দু’টাকে সাইজ করতে পারি।’
বিপু বিচক্ষণতার সাথে পরিবেশ বুঝে বললো, ‘তাদের পুরো দলটাকে হাতেনাতে ধরার সুযোগ আছে। এখন এমন কিছু করা যাবে না যাতে তারা কিছু টের পেয়ে যায়।’ বিপুর কথায় সবাই নিজেদের সামলে নিলো।
পেছন থেকে কাশেম মিঞার আসার শব্দ শোনা গেলো। এসে ফুরফুরে গলায় বললো, ‘কী ভাইসব, দেখা হইসে তো সব? রাজবাড়ী কেমন লাগতাছে?’
ক্রোধের আগুন চেপে মাথা ঠাণ্ডা রেখে হাসান কৌশলে বললো, ‘দারুণ জায়গা। দোতলায় গিয়ে দেখা যাবে?’
হাসানের কথায় থতমত খেয়ে কাশেম বললো, ‘না, উইঠো না। এ রাজবাড়ীর বাতাস খারাপ। আসরের আগে বাইর হওয়া লাগবো।’
বিপুরা আর কথা বাড়ালো না। সাথে আনা পিঠা খেয়ে জিরিয়ে নিলো কিছুক্ষণ। অনেক পথ হেঁটে এসে আর ঘুরে পাহাড়ের দিকে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো তারা। ফেরার পথে কাশেম মিঞা বললো, ‘সামনের শুক্রবার দক্ষিণ সাগড়পাড় যামু। তোমরা যাইবা আমার লগে। সন্ধ্যার আগে ফিইরা আসমু। আমার বন্ধুর ট্রলার আছে, ওইডা নিয়া মাছ ধরা দেখমু আর খাওনও ঐখানে খামু। কী বলো ভাইসব?’
বিপুরা সরল মনে রাজি হয়ে গেলে কাশেম মিঞা খুশিতে গদগদ করতে লাগলো। মনে মনে বললো, ‘এমন সাগরে নিয়া ফেলমু, কিনারা খুঁইজা পাবি না।’
ফিরতে ফিরতে আসরের নামাজের সময় হয়ে গেলো। কাল সিদ্ধান্ত নিবে বলে যে যার মতো বাড়ি ফিরে আসলো।

৪.
ঘরে ঢুকতেই দেখা হলো বাবার সাথে। সোফায় বসে আছেন তিনি। ছুটির দিনগুলোতে বাবা শুয়ে-বসে সময় কাটান। বিপু ফ্রেশ হয়ে এসে বসলো বাবার পাশে। তার মনে হলো এখনই বলা দরকার বাবাকে।
কিভাবে শুরু করবে, কি বলবে ভেবে অস্থির হলো সে। বাবা তা আঁচ করতে পেরে বললেন, ‘কিছু বলবি?’
শুরুতে আমতা আমতা করলেও পুরো ঘটনা এক নাগাড়ে বলে গেলো। হালিম মামার ছেলের অপহরণ থেকে শুরু করে তাদের রাজবাড়ী যাওয়া আর অপহরণকারীদের হাত থেকে ফিরে আসা সব। এদিকে ছেলের বিরাট দুর্ঘটনার কথা ভাবতেই তার দম বন্ধ হবার জোগাড়। ঠাণ্ডা মাথায় সব শুনে ফোন দিলেন তার বন্ধু জেলা পুলিশ সুপার মোরশেদ খানকে।
তিনি শুনেই বললেন, ‘কালই আমি আসছি।’
সেদিন বিপুর আর ঘুম আসছিলো না। নিপুর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ভাবতে লাগলো সবকিছু। ঘুম এলো বেশ রাত করে।
সকালে হাসান, রামিম ও ইমনকে ডেকে পাঠানো হলো তাদের বাসায়। মোরশেদ খান তার সিভিল ফোর্স নিয়ে সকালে পৌঁছুলেন। ঘরভর্তি মানুষ দেখে যারপরনাই অবাক হলো বিপুর বন্ধুরা। তাদের কাছে বেশ কিছু তথ্য জেনে নিয়ে সিভিল ফোর্সকে দিকনির্দেশনা দিলেন মোরশেদ খান।
আগেই বলে রাখা হয়েছিলো হালিম মামাকে। কাশেম মিঞাকে ধরতে তেমন বেগ পেতে হলো না। কৌশলে দোকানে বসিয়ে রেখে আটক করা হলো। কাশেমকে নিয়ে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হলো রাজবাড়ীতে। চারদিকে ঘেরাও করে বাবুলসহ দু’জনকে আটক করলো পুলিশ। উদ্ধার করা হলো খোকনকে।
এদিকে ফোরকানকে দক্ষিণপাড় আসতে বলা হলো বাবুলের মাধ্যমে। চারদিক থেকে ঘেরাও হলো দক্ষিণ পাড়। অবশেষে পুলিশ বাহিনীর তৎপরতায় আটক করা হলো পনেরো সদস্যের মানবপাচারকারী দলকে। সাথে উদ্ধার হলো দশজন বিভিন্ন বয়সের ছেলেকে। যাদের অনেকের বাড়িই বিপুদের এলাকার আশপাশে।
হালিম মামা ও উদ্ধারকৃত অন্যান্য ছেলেদের মা-বাবারা বিপুদের জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদলেন। তাদের প্রত্যাশা যেন এমন ছেলের জন্ম প্রতিটি ঘরে ঘরে হয়। যারা দেশ ও মানুষের কল্যাণে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
এ ঘটনার পর সব পত্রিকায় বিপুদের নামে খবর ছাপাতে লাগলো। পেপারে হেডলাইন হলো, ‘চার দস্যিছেলের সাহসিকতায় ধরা পড়লো মানব পাচারকারীদের বড় চক্র। সপ্তাহখানেক পর জেলা পুলিশ ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হলো বিপুদের আর ভূষিত করা হলো ‘সাহসী তরুণ’ পদকে।

SHARE

Leave a Reply