Home জাতীয় কিশোরকণ্ঠ পাঠ প্রতিযোগিতা যে আলো ফুরায় না -মাহমুদ হাসান

যে আলো ফুরায় না -মাহমুদ হাসান

কিশোরকণ্ঠ জাতীয় গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০২০-এর ক-গ্রুপে চতুর্থ স্থান অধিকারী গল্প

কাটফাটা রোদে মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছে। চৈত্রমাস শেষ, তবুও এক ফোঁটা পানি নেই। কোন সময় এমনও হয় যে, গাছের পাতাটিও নড়ে না। শুকনো ডালগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় যেন হঠাৎ আগুন ধরে যাবে। এক ফোঁটা পানির আশায় অনেকে আবার মাজারে শিন্নি মানত করছে।
ধলগাঁও গ্রাম। আধুনিকতার কোন ছায়া পর্যন্ত নেই। মানুষের মধ্যে নীরবতা নেই। সময় সময় মারামারি, গালিগালাজ তো লেগেই আছে। শিক্ষা বা জ্ঞানের মানে পর্যন্ত বুঝে না লোকে। সকাল শুরু হয় ৬-৭টা ইতর ছেলের মারবেল খেলা দিয়ে। তাদের বয়স ৭-১০ বছর। এদের মধ্যে অনেকে আবার দুই মাইল হেঁটে গিয়ে কোন গাড়ির গ্যারেজে কাজ করে। এদের পড়ালেখার কোনো সুযোগ-সুবিধা তিন গ্রামের ভেতর নেই। তাই এদের কেউই শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয় না। তবে চার বছর আগে বহু সংগ্রাম করে ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করা শামসুদ্দিন ছাড়া। গ্রামের উত্তর দিকে তার বাড়ি। জন্মের বছর বাবা মারা যায়। মায়ের কারণে সে শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। কিন্তু সেটিও নিঃশেষ হচ্ছিল ক্লাস থ্রিতে থাকার সময়। শ্বাসকষ্ট রোগে মারা যায় মা। বাবার ভিটা ছেড়ে সে আশ্রয় নেয় গ্রামের এক বিধবা মায়ার বাড়ি। মায়ার কোন সন্তান না থাকায় সে শামসুদ্দিনকে তার কাছে রাখে। শুরু হয় শামসুদ্দিনের নতুন জীবন। বাড়িতে লাগানো বিভিন্ন সবজি বিক্রি করে চালিয়েছে তার পড়ালেখা।
গত চার বছর ধরে কোন কাজ না পেয়ে, সে কৃষি কাজে যুক্ত হয়। গ্রামের লোকেরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে বলে, বিদ্যা পড়ে শামসুদ্দিন হয়েছে ক্ষেতাল। কিন্তু শামসুদ্দিনের চিন্তাচেতনা যেন অন্য রকম।
কোন এক দুপুরে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে শামসুদ্দিনের মনে ঠাঁই পায় এক মহান চিন্তা। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে ধলগাঁও।
গ্রামে মারামারি তো দূরের কথা, গালাগালি পর্যন্ত থাকবে না। শান্তির বাতাসে নাড়া দেবে মানুষের বিবেক। মানুষে মানুষে প্রাণের মিল, সত্যের মিলের জন্য এক সাথে জয়গান গাইবে। মানুষ তার নিজ নিজ ধর্মকে চিনবে। কেননা “যে ধর্মকে চিনেছে, সে সত্যকে চিনেছে।” হঠাৎ ভাবনার শেষ হয়।
নতুন ভাবনা মাথায় ঠাঁই পায় শামসুদ্দিনের। এমন একটি কাজ করতে হবে, যাতে করে অন্ধকার ঘুচবে। বহু চিন্তা ভাবনার পর সিদ্ধান্ত নেয় গ্রামে স্কুলঘর বানাবে। যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়বে। কিন্তু গ্রামে এমন একটাও লোক নেই যে, তাকে সাহায্য করবে। তবুও শামসুদ্দিন হাল ছাড়ে না। তার পিতার বাড়ির ভিটাতেই সে স্কুল তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। জায়গা পরিষ্কার করতে সময় লাগে তিন দিন। যে করে হোক বছরের শুরুতেই স্কুলের উদ্বোধন করতে হবে। মাত্র তিন মাস সময়।
শামসুদ্দিন দিনরাত অনেক পরিশ্রম করে। তার পরিশ্রম দেখে তাকে স্কুল প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে আগ্রহী হয় তার সমবয়সী গ্রামের জালাল মিয়া।
শুরু হয় নতুন উদ্যমে কাজ। গ্রামের অনেকেই তাদের নিয়ে পিছু কথা বলে। কিন্তু কাজ থেমে থাকে না। দিন যায় কাজ হয়।
অবশেষে প্রায় দুই মাসে বাঁশ ও ছনের সাহায্যে তৈরি হয় ছোট্ট একটি ঘর। ওপরে ন্যাড়া দিয়ে তৈরি হয় চাল। বসার জন্য কয়েকটা পাটি। বাইরে টাঙানো হয় সাইনবোর্ড। যাতে লেখা ‘ধলগাঁও বিদ্যানিকেতন’ ।

ঘরের কাজ মোটামুটি শেষ। বাকি এক মাস সময়। এখন প্রয়োজন ছাত্র। শুরু হয় নতুন উদ্যমে কাজ। শামসুদ্দিন জালালকে নিয়ে গ্রামে হেঁটে বেড়ায়। ঘরে ঘরে গিয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তারা। লোকদের বুঝাতে থাকে শিক্ষার আলো। যে আলোয় আলোকিত হলে আলো কোন দিন নিভে না। সমাজে কাজ কেবল টিকে থাকা নয়, মানুষকে বড় করে তোলা। জীবনের তাৎপর্য উপলব্ধি করা। আর জীবনের এই প্রয়োজনীয়তা শেখায় বই। বিদ্যা শুধু খেত-খামারের মধ্যে শেষ নয়, জ্ঞানের পরিধি বিশাল। এসব কথা মানুষকে বুঝাতে থাকে তারা। স্কুলের খবর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে দুই-তিন গ্রাম। প্রথম ভর্তি হয় জালালের ছোট ভাই কামাল। তারপরই থমকে দাঁড়াতে হয় তাদের। ২০ দিন চলে গেল আর কেউই আসলো না। কোন মানুষের দেখা নেই। শামসুদ্দিন ও জালাল আবার গেল বাড়ি বাড়ি। কিন্তু লোকে তাদের গুরুত্ব দিলো না। আরো সাত-আট-নয় দিন যায়, তবুও কেউ এলো না। শেষদিন অত্যন্ত আগ্রহের সাথে সকাল সকাল শামসুদ্দিন আসল স্কুলে। শেষের দিন হয়তো কেউ না কেউ আসবে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। কিন্তু আর কেউ এলো না। সন্ধ্যা পর্যন্ত স্কুলে থাকে না তারা। শেষদিন বলে থাকল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। শামসুদ্দিন নিরাশ মনে চলে গেল বাড়ি। সারারাত চিন্তা করল কী করা যায়। কোন উপায় পাওয়া গেল না কিন্তু হাল ছাড়ল না শামসুদ্দিন।
সিদ্ধান্ত হলো, একজন হলেও স্কুল শুরু করবে, বন্ধ করা চলবে না। শামসুদ্দিন তার সিদ্ধান্তে অটল থাকল।
পরদিন সকালে কামালকে নিয়ে জালাল ও শামসুদ্দিন স্কুলে যায়। শুরু হয় ক্লাস। কোন শব্দ নেই। মনে হয় যে, সেই কাঠফাটা রোদে দাঁড়িয়ে এক ফোঁটা পানির আশায় বসে আছে ওরা।
বেলা ১১টা। গালে হাত দিয়ে বসে আছে শামসুদ্দিন। টেবিলে মাথা লাগিয়ে বসা জালাল, মনে হয় যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ বাইরে থেকে ডাক আসে- শামসুদ্দিন, ও শা…..মসুদ্দিন! হতোদ্যম হয়ে বাইরে তাকায় ওরা। তাৎক্ষণিক বাইরে আসে শামসুদ্দিন ও জালাল। গ্রামের সব ছোট ছোট ছেলে মেয়ে, সাথে কারো বাবা, কারো মা। কেউ একজন বলে, “তোমারই স্কুলে আমাগো বাচ্চারে দিলাম, তুমি তাগোরে পড়াও।” শামসুদ্দিনের যেন কথা বলার শক্তি নেই। আবার কেউ বলে, “কিহে কেলাস কি শেষ হইয়া গেল, নাও তাগোরে তুমার আলোয় আলোকিত করো।” চোখে হাসির কান্না নিয়ে শামসুদ্দিন কথা বলে “আমার আলো না জ্ঞানের আলো।”
সবাই একসাথে বলে উঠে হ…হ গেনের আলো। ৫০ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয় শামসুদ্দিনের যাত্রা।
সেদিন দুপুরে খাওয়ার পর শামসুদ্দিন ভাবে, যে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে স্কুলের চিন্তা তার মাথায় এসেছিল, সে পাহাড় চূড়ায় আজ উঠবে। জালালকে নিয়ে পা বাড়ায় পাহাড়ের পথে।
অবশেষে তারা যখন পাহাড় চূড়ায় পৌঁছায়, তখন পড়ন্ত বিকেলের গোধূলি যেন শামসুদ্দিনের চোখে ঝলমল করে ওঠে।

SHARE

Leave a Reply