Home স্বপ্নমুখর জীবন আত্মবিশ্বাসের শক্তি এবং কৌশল -আমিনুল ইসলাম ফারুক

আত্মবিশ্বাসের শক্তি এবং কৌশল -আমিনুল ইসলাম ফারুক

এই প্রবাদটি হয়তো তোমরা জেনে থাকবে- যদি লক্ষ্য থাকে অটুট আর বিশ্বাস হৃদয়ে, তবে হবেই হবে দেখা, দেখা হবে বিজয়ে। লক্ষ্যের সাথে আত্মবিশ্বাসের মিথস্ক্রিয়া ঘটানো গেলে কোনো অবস্থাতেই মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয় না। ব্যর্থতা এসে তাকে গ্রাস করতে পারে না। আজ কিংবা কাল হোক সে সফল হবেই। জীবন চলার পথ সব সময়ই কঠিন। যদি নিজের ওপরই বিশ্বাস না রাখা যায় তাহলে সেপথ আরও কঠিন। আত্মবিশ্বাস শুধু একটি শব্দ নয়। এটি আমাদের ভেতরকার একটি মহা অলৌকিক শক্তি। যা আমাদের জীবনের কঠিন পরিস্থিতিও সহজভাবে মোকাবেলা করার সাহস জোগায়। অনেক অসম্ভব কাজকে অনায়াসে সম্ভব করার অনুপ্রেরণা দেয়। আত্মবিশ্বাসের অভাবে আমাদের ভেতরের অনেক সম্ভাবনা কুঁড়িতেই ঝরে যায়। জীবনের অনেক সঙ্কল্প ও ইচ্ছা অসম্পূর্ণ থেকে যায় শুধু আত্মবিশ্বাসের অভাবেই। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান আছে তোমার হাতেই। তুমি দৃঢ়ভাবে চাইলেই এই বিশ্বাস নিজের মধ্যে গড়ে তুলতে পারবে। বিশ্বাস নিয়ে কোনো কাজ শুরু করলে দেখবে অর্ধেক বিজয় হয়ে গেছে।
আমি পারবো। এই একটি কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করার নামই আত্মবিশ্বাস। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক- একজন লোক বিশাল এক হাতিকে চিকন একটি রশি দিয়ে বেঁধে রাখতো। অপর একজন এটা দেখে চিকন রশি দিয়ে বেঁধে রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলে হাতির মালিক যে উত্তর দিয়েছিলেন তা শুনলে তুমি অবাকই হয়ে যাবে। হাতির মালিক বললেন- ছোটবেলা থেকেই হাতির পায়ে রশি লাগিয়ে বেঁধে রাখতাম। তখন হাতি ছোটো থাকায় এই রশি ছেঁড়ার ক্ষমতা তার ছিল না। আস্তে আস্তে হাতি বড় হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তার মধ্যে সেই বিশ্বাস জন্ম নেয়নি যে, সে এখন এই রশি ছেঁড়ার ক্ষমতা রাখে।
এই গল্পের নীতি শিক্ষা হলো, আত্মবিশ্বাস বাড়ে চর্চার মাধ্যমে। তুমি যে বিষয়েই উন্নতি করতে চাও। যত বেশি চর্চা করবে এবং তোমার শক্তিমত্তা সম্পর্কে জানবে ততই তোমার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
সমগ্র পৃথিবীতে যারা সফল হয়েছেন, আত্মবিশ্বাসের শক্তি ছাড়া কেউ সফল হতে পারেনি এবং সম্ভবও নয়। বিশ্বাসের এই শক্তি চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছিল আরবের তৎকালীন মহান নেতা হযরত উমর ফারুক (রা) এর জীবনে। উমর (রা) এর অর্থ-সম্পদ, বাড়িঘর, ভালো পোশাকাদি ও বিশাল সংখ্যক সৈন্যসামন্ত তেমন কিছুই ছিল না। কিন্তু তাঁর ছিল বিশ্বাসের শক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন সারা পৃথিবী তিনি পদানত করতে পারবেন। হযরত উমর (রা) সারা পৃথিবীটাকে পদানত করতে না পারলেও অর্ধেক পৃথিবীর শাসক হয়েছিলেন। বিশ্বের মানবেতিহাসে মহানুভবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে পেরেছিলেন। রবার্ট ব্রুস (১২৭৪-১৩২৯) তার দেশমাতা স্কটল্যান্ডকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন শুধু তার বিশ্বাসের বলে। আত্মবিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়ে মহাত্মা গান্ধী ভারতের বিশ কোটি মানুষের মহান নেতা হতে পেরেছিলেন। বিশ কোটি মানুষকে তিনি এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছিলেন। নেপোলিয়ন শুধু বিশ্বাসের বলে তাঁর হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পেরেছিলেন। বিশ্বাস এমন একটি অলৌকিক শক্তি যেটা তোমার অকেজো শরীর এবং মনকে মুহূর্তের মধ্যেই ক্রিয়াশীল করতে পারে। তোমার প্রতিভার সর্বোচ্চ বিকাশ সর্বোত্তমভাবে ঘটাতে পারে। বিশ্বাসের শক্তি কেমন হতে পারে তা নিয়ে ধর্মগুরু দালাইলামা একটি চমৎকার কথা বলেছেন– With realization of one’s can build a better world’’. মার্ক টোয়েন বলেছেন, ‘জীবনে সফল হতে চাইলে শুধু দুটি জিনিস প্রয়োজন। জেদ এবং আত্মবিশ্বাস।’
বেশির ভাগ মানুষ নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে না বলে শুধু সফল হতে পারে না। কী ভয়ঙ্করভাবেই না বহু লোকের জীবন আত্মবিশ্বাসের অভাবে এবং নিজেকে সন্দেহ করার কারণে বরবাদ হয়ে যায়। বিশ্বাসকে সূর্যের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। সূর্যের কিরণ ভোরবেলা যেমন দুর্বল থাকে এবং ধীরে ধীরে তেজোদীপ্ত হতে থাকে। তেমনি বিশ্বাসহীন মানুষ ভোরবেলার সূর্যের মতো দুর্বল এবং উত্তাপহীন। যখন সে কোনো কিছু পাওয়ার একটি শক্ত বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণ করতে পারে। তখন ধীরে ধীরে সে সূর্যের মতো তেজোদীপ্ত হয়ে প্রখর আলো ছড়াতে থাকে। সব মানুষের পক্ষেই যেকোনো সমস্যার মোকাবেলা করা সম্ভব। যদি তার যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস থাকে। একজন মানুষ যত বড় হতে চায় সে ততো বড়ই হতে পারে। যদি সে শুধু নিজেকে বিশ্বাস করে এবং তার সাহস ও শক্তি নিবেদন করে। সে যদি বড় অর্জনের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিতে রাজি থাকে, তবে তার পক্ষে কোনো কিছইু অসম্ভব নয়।
মানুষ যখন ভাবতে চায় সে কোনো কাজ করার যোগ্য তখন আশ্চর্যজনক ঘটনাই ঘটে। যেসব মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড রকম আত্মবিশ্বাস থাকে, যারা বাস্তবসম্মত পথে নিজের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে কাজ করে এবং সাফল্য পায়, তারা মানব সমাজের মূল্যবান সম্পত্তি। কারণ তারা তাদের গতিময় কর্মক্ষমতার রেশ অন্যের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে পারেন।
বিশ্বাস জীবনকে গতিময়তা দান করে। আর অবিশ্বাস করে জীবনকে দুর্বিষহ। তুমি যদি অন্যকরম প্রাপ্তি আশা করো তবে তোমার কাজও অন্যের থেকে আলাদা হতে হবে। কাজের গতিশীলতা অন্যের থেকে বেশি থাকতে হবে। তুমি অবশ্যই তোমার বিশ্বাস, জ্ঞান ও বিচার বিবেচনার সহায়তায় এ কাজ করতে পারো।
এইভাবে দক্ষতা অর্জন সম্ভব হয় শুধু নিজের ওপর বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারলে। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হলে প্রথমত যে গুণটি অর্জন করা দরকার তা হলো মন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। মনের ওপর সমস্ত ক্ষমতা অর্পণ করলে শুরু হয় মানসিক প্রক্রিয়া যা তোমার ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ঠিক করে দেয়। এ প্রসঙ্গে মনস্তত্ত্ববাদের প্রবক্তা ফ্রয়েড বলেছেন, ‘শুধু কাজ বদল করাই যথেষ্ট নয়। তাকে গঠনমূলক চিন্তাও করতে হবে। তা না হলে ব্যর্থতার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।’ সুতরাং কোনো বিশেষ কাজ বিশেষভাবে করো, তার ফলও সে রকমই পাবে। পৃথিবীর সব কিছুই নিয়মের অধীন। মহান আল্লাহ সব কিছুর মধ্যেই চমৎকার কতগুলো নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন। আমরা এই নীতি মেনে চলতে পারবো। যদি প্রচণ্ড রকম আত্মবিশ্বাস থাকে। মনস্তত্ত্ববিদ উইলিয়াম জেমস বলেছেন- ‘এই যুগের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলো মন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ তার জীবন বদলে নিতে পারে। গোটা পৃথিবীর চেহারা পরিবর্তন করতে পারে।’

আত্মবিশ্বাসের কৌশল
১. আমি আমার জীবনের সুনির্দিষ্ট মূল লক্ষ্যের কথা পরিষ্কারভাবে একটি কাগজে লিখে রেখেছি। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যতদিন পর্যন্ত আমার মনে যথেষ্ট পরিমাণ আত্মবিশ্বাস না জন্মাবে ততদিন পর্যন্ত এ চেষ্টা থেকে আমি নিজেকে বিরত রাখবো না।
২. আমি জানি আমার জীবনের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণ করার ক্ষমতা আমার রয়েছে। অতএব ইচ্ছা পূরণের কাজে অনড় থাকব এবং এ কাজে আমি আমার সর্বশক্তি নিয়োগ করব।
৩. আমি বুঝেছি আমার মনের সব চিন্তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে কর্মময় হয়ে উঠবে। এ কারণে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য আমি প্রতিদিন পনেরো মিনিট সময় উৎসর্গ করব। এই সময়ে আমার চিন্তা ভাবনার ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করব এবং ভাববো আমি আসলে কী হতে চাচ্ছি। আমার মনের মধ্যে যে আকাক্সক্ষা পুষে রেখেছি তা কিছু অভিব্যক্তির মাধ্যমে ওই মানুষটির একটি পরিষ্কার ছবি মনের মধ্যে ফুটিয়ে তুলব।
৪. আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কোনো সম্পদ বা অবস্থা চিরকাল থাকে না যদি তা সত্য এবং ন্যায়ের ওপর গড়ে তোলা না হয়। আমি এমন কাজ করব যাতে অন্যের উপকার হয়। সেসব কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখব না যাতে সমাজের ক্ষতি হয়। আমি অন্যের কাছে সেবা প্রত্যাশী হবো না। কিন্তু আমি অন্যের সেবা করব। মানবজাতির প্রতি আমার ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ এতটা প্রগাঢ় হবে যা দিয়ে আমি সমাজ থেকে নির্মূল করব ঘৃণা, হিংসা, বিদ্বেষ, জুলুম, নির্যাতন এবং নৈরাশ্যবাদ। সর্বোপরি সত্য, ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ একটি আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করে যাব যতদিন আমি বেঁচে আছি।
৫. সব কাজ আমি খুঁটিনাটি দিক যাচাই বাছাই করে করব কিন্তু সর্বাবস্থায় আমি ভরসা রাখবো একমাত্র আল্লাহর ওপর। সকল কাজে এগিয়ে যেতে আমি সর্বদা আল্লাহর সাহায্য প্রত্যাশী হবো। কারণ আমি বিশ্বাস করি একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই মানুষের জন্য উত্তম সাহায্যকারী। এই বিশ্বাস আমি আমার অন্তকরণে প্রোথিত করব যে, শয়তান দুনিয়ার সবচাইতে বড় নাফরমান হবার পরও তার ডাকে যেহেতু আল্লাহ সাড়া দিয়েছেন সেহেতু আমার ডাকে অবশ্যই সাড়া দিবেন। কারণ আমি তো আর শয়তান নই। আমি তারই বান্দা।
ফর্মুলার এই কাগজে আমি আমার নাম স্বাক্ষর করব এবং এই নীতি সব সময় মনে রাখবো। এই নীতি আমার চিন্তা এবং কর্মকাণ্ডে যাতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে তাই প্রতিদিন পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে একবার জোরে জোরে এটি আমি পুনরাবৃত্তি করব। যাতে আমি একজন আত্মবিশ্বাসী, স্বনির্ভর এবং সফল মানুষ হতে পারি। আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। আল্লাহ হাফিজ।

SHARE

Leave a Reply