Home স্মরণ জসীম উদদীন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের কবি -সৈয়দ ইশতিয়াক

জসীম উদদীন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের কবি -সৈয়দ ইশতিয়াক

এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেলো বলে কেঁদে ভাসাইতো বুক।
অথবা
তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়
কিংবা
রাখাল ছেলে রাখাল ছেলে বারেক ফিরে চাও,
বাঁকা গাঁয়ের পথটটি ধরে কোথায় চলে যাও?

এসব সাড়া জাগানো কবিতার কবি জসীম উদদীন। হ্যাঁ এ নামটি আমরা সকলেই জানি। খুব করে জানি। একেবারে সহজেই জানি। জানি কেননা তাঁর মতো এতোটা দরদি কবিতা কজন কবি লিখেছেন! কজন কবি এমন করে বাংলাদেশের রূপ বর্ণনা করেছেন?
কজন কবি আমাদের গ্রামের সৌন্দর্য নিয়ে লিখেছেন!
খুব কম কবির নামই পাবো আমরা। কম মানে খুব কম! কোনো কোনো কবিতা এমন মায়াবী তাঁর এমন মায়ার কবিতা আর লেখেননি একজনও।
ধরা যাক তাঁর ‘কবর’ কবিতাটি! শুরুতে যে কবিতার কটি লাইন তুলে দিলাম।
এটি এমন একটি কবিতা যার তুলনা এ কবিতাটি নিজেই! কী অসাধারণ একটি কবিতা! কী চমৎকার তার ভাষা! কী অদ্ভুত তার বর্ণনা! পড়লে মনটি কেমন হয়ে যায়! মনের ভেতর এক অচীন জগতের চিত্র ভেসে ওঠে। কবরের জগৎ! কবর শব্দটি কানে গেলেই মন হাহাকার করে ওঠে! বুকের ভেতর জমতে থাকে বেদনা! মনে জাগে চিরদিনের জন্য হারানোর এক কষ্ট!
যখন তিনি লিখেছেন – এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে!
আহা মুহূর্তেই একটি চিত্র ভেসে ওঠে মনের আয়নায়! সেই গ্রাম! সেই ডালিম গাছ! ডালিম গাছের তলে দাদীর কবর!
যারা গ্রামে বাস করেন তারা তো এই দৃশ্য দেখেন প্রতিদিন। দেখেন সকাল বিকাল! আসতে যেতে দেখেন। পথ চলতে চলতে দেখেন! এ দেখার ভেতর কোনো ফাঁক নেই! কোনো নকল কিছু নেই! একেবারে সত্যি সত্যি কবর! এবং এই কবর বাংলাদেশের সব জায়গায়। সব গ্রামে। সব পল্লীতে! কী নিবিড় গ্রাম! নিঝুম গ্রাম! বাঁশঝাড়ের পাশে এমন কবর! দাদী নানী, দাদা নানা এবং মা বাবার কবর! ভাই বোন আত্মীয় স্বজনের কবর! আহা বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে বুকটি!
কবি জসীম উদদীন এই বেদনাকে ভাষা দিয়েছেন। দুঃখকে কবিতা করেছেন!
পৃথিবী থেকে চির বিদায়ের যে যন্ত্রণা, দুঃখ, বেদনা এসব কিছু এ কবর কবিতায় ভীষণ সুন্দর করে বলেছেন!
যখনই কেউ কবির এ কবিতাটি পড়েন তিনি দুঃখ অনুভব করেন!
যার দাদা দাদী, নানা নানী, বাবা মা চলে গেছেন পৃথিবী থেকে, তার বুকে বেদনার ওজন অনেক বেশি! কবি এসব খুব সহজ করে কবিতায় তুলে ধরেছেন।
এই কবিতাটির ভেতর দাদুর কবরের পরই আছে বাবা মার কবরের কথা! তারপর বুজির অর্থাৎ বোনের কবর! তারপর ছোট ফুফুর কবর!
কবিতার শেষের অংশটি খুব বেদনার! পাঠ করা যাক –
মসজিদ হইতে আজান হাঁকিছে বড় সকরুণ সুর,
মোর জীবনের রোজ কেয়ামত ভাবিতেছি কতদূর।
জোড়হাতে দাদু মোনাজাত কর, ‘আয় খোদা! রহমান,
বেস্ত নাজেল করিও সকল মৃত্যু – ব্যথিত- প্রাণ।’
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবন শেষ হয়ে যাবে একদিন! একদিন সবাইকে নিতে হবে বিদায়! কবি অনেক কবরের বর্ণনা দিয়ে নিজের জীবনের শেষ দিনের কথা বলেছেন! তিনি মৃত্যুকে বলেছেন- মোর জীবনের রোজ কেয়ামত।
আহা সত্যি তো প্রতিটি জীবনের মৃত্যু মানে তার জন্য কেয়ামত!
একটি অদ্ভুত বিষয় হলো এই কবিতার বাস্তব চিত্র যেন কবির কবরের দৃশ্যে দেখা যায়!
ফরিদপুর জেলার আম্বিকাপুর গ্রামে কবির কবর! কবরটি তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে।
দাদীর কবরের পাশেই কবির কবর। এবং কবি পরিবারের এগারোটি কবর এক সারিতে।
কবির কবরের শিয়রে একটি ডালিম গাছ। সেই ডালিম গাছের তলেই কবির কবর! বেড়ে ওঠা ডালিম গাছে কত পাখি ডাকে! কত প্রজাতি ঘুরে বেড়ায়! উড়ে উড়ে ফেরে!
কবির গ্রামে প্রতি বছর জসীম মেলা নামে অনুষ্ঠান হয়!
কবি তাঁর গ্রামকে কী ভালোবাসতেন ওপরে দ্বিতীয় কবিতাটি পড়লেই বোঝা যায়।
তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়! গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়! আহা কী মমতা মাখা আহ্বান! কী গভীর দরদিয়া দাওয়াত! গাছের ছায়া আর লতা পাতার দৃশ্য এদেশের সব মানুষের দেখা। এ লতা পাতা জড়াজড়ি করে আছে যেখানে সেই নীরব প্রকৃতির উদার সবুজে আহ্বান করেছেন কবি।
কবিতাটির এক জায়গায় লিখেছেন তিনি- গাছের ছায়ায় লতায় পাতায়,
মোর শিশুকাল লুকায়েছে হায়!
ইস্ কী স্মৃতি! কী বেদনা! ফেলে আসা জীবনের এ হলো চিহ্ন!

জসীম উদদীন জন্মেছেন ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে।
নানা বাড়িতে। তাঁর জন্ম সাল ১৯০৪, এক জানুয়ারি।
মৃত্যু ১৩ মার্চ ১৯৭৬।
মায়ের নাম- আমিনা খাতুন।
বাবা মাওলানা আনসার উদ্দীন মোল্লা। কুমার নদীর পাড়ে কবির গ্রাম! জসীম উদদীন বাংলা সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি।
বাংলাদেশের গ্রাম ও গ্রামের মানুষের সহজ সরল জীবন নিয়ে লিখেছেন তিনি। লিখেছেন বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের বিষয়।
তিনি কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, গীতিকার ও ভ্রমণ লেখক।
তাঁর নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট এ দুটি কাহিনী কাব্য অসাধারণ বাংলা কবিতার ইতিহাসে।
কবিতার বই হলো- রঙিলা নায়ের মাঝি, বালুচর, এক পয়সার বাঁশি, হাসু, ধান ক্ষেত, মাটির কান্না, রূপবতী, কাফনের মিছিল।
উপন্যাস- বোবা কাহিনী।
ভ্রমণ- চলে মুসাফির, হলদে পরীর দেশে, যে দেশে মানুষ বড়।
তাঁর লেখা গান এখনো বিস্ময় জনপ্রিয়! যেমন- আমার সোনার ময়না পাখি, আমায় ভাসাইলি রে, নিশিথে যাইও ফুলবনে রে ভোমরা, প্রাণ সখিরে ঐ শোন কদম্ব তলে বংশী বাজায় কে।
এমন কালজয়ী গানের রচয়িতা তিনি।
জসীম উদদীন আমাদের মাটি ও মানুষের কবি। জীবন ও জনগণের কবি। প্রকৃতির কবি। গ্রাম বাংলার ছবি বর্ণনার কবি।
তাঁকে পাঠ করা জরুরি। পড়তে হবে তাঁকে। পড়লে জানা যাবে তিনি কতটা ভালোবাসতেন বাংলাদেশকে। কতটা ভালোবাসতেন বাংলাদেশের প্রকৃতিকে। এবং কতটা ভালোবাসতেন বাংলাদেশের মানুষকে!

SHARE

Leave a Reply