Home প্রচ্ছদ রচনা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী -মাসুক চৌধুরী

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী -মাসুক চৌধুরী

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আমাদের জন্য সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। কারণ সামরিক শক্তির অপ্রতুলতা সত্ত্বেও বেসামরিক জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এতো অল্পসময়ে এমন বিজয় ইতিহাসে বিরল।
তোমরা নিশ্চয়ই জানো বাংলাদেশের সমসাময়িক আরও দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হলো বাহরাইন ও আরব আমিরাত। দুটো দেশই কিন্তু বিনাযুদ্ধে স্বাধীনতা লাভ করে এবং দুটো দেশেরই অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ়।
বাহরাইন স্বাধীন হয় যুক্তরাজ্য থেকে। ১৫ আগস্ট ১৯৭১ সালে। যুক্তরাজ্যের আগে সৌদি আরবের অধীনে এবং তারও আগে ইরানের অধীনে ছিল বাহরাইন। বাহরাইন আরবি শব্দ। এর অর্থ দুটি সমুদ্র। এর চারপাশে কিন্তু সাগরবেষ্টিত। অর্থাৎ এটি একটি দ্বীপরাষ্ট্র।
প্রায় একই সময়ে স্বাধীন হওয়া আরেকটি রাষ্ট্র হলো আরব আমিরাত।
সংযুক্ত আরব আমিরাত স্বাধীন হয় ২ ডিসেম্বর ১৯৭১। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান, উম্মুল কুয়াইন, ফুজিরা ও রাস-আল-খাইমা, মোট ৭টি ইমারত নিয়ে গঠিত সংযুক্ত আরব আমিরাত।
তেল রফতানিকারক দেশ হিসেবে এর অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী। এই আরব আমিরাতকেও কোনও যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়নি। ১৯৬৮ সালে ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নেয় চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর ওপর থেকে তাদের আধিপত্য সরিয়ে নেবে। আর তারই আলোকে ১৯৭১-এ সাতটি যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গঠিত হয় স্বাধীন রাষ্ট্র আরব আমিরাত। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসটা অন্যরকম।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এর রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। অন্তত ২শ’ বছরের ইতিহাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তোমরা নিশ্চই জেনে থাকবে বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদদৌলার কথা!

১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীন নবাব সিরাজউদদৌলাকে পরাজিত করে ব্রিটিশ বেনিয়ারা দখল করে নেয় বাংলা। অস্তমিত হয় বাংলার শেষ স্বাধীনতার সূর্য! আসলে এই যুদ্ধে ইংরেজদের হাতে নয় বরং নিজ দেশের বিশ্বাসঘাতকদের হাতেই নবাব সিরাজউদদৌলা পরাজিত হন। এটি ছিল বিশ্বাসঘাতকতার যুদ্ধ। এই পরাজয় ছিল বিশ্বাসঘাতকদের কাছে পরাজয়।
এই পরাজয়ের মাধ্যমে যেমন স্বাধীনতার শেষ সূর্য অস্তমিত হলো, তেমনি গোলামির জিঞ্জির পরতে হলো স্বাধীন জনগণের। ইংরেজরা জানতো এ জাতি ঐক্যবদ্ধ হবার সুযোগ পেলে আবার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে চেষ্টা করবে, তারা যাতে আর ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, তাই তারা ভারতবর্ষের জনগণকে বিভক্ত করে একের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়ে পরস্পরবিরোধী দু’টি গোষ্ঠী তৈরি করলো। সে এক বিশাল ইতিহাস। তোমরা বড়ো হয়ে সে সকল ইতিহাস জানতে পারবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস কোনওভাবেই স্বস্তির ইতিহাস নয়। স্বাধীন ভূখণ্ডে আজ আমরা কারও গোলামি করছি না ঠিকই, কিন্তু যে স্বাধীনতার জন্য আমরা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হারিয়েছি, আমাদের প্রিয়জনেরা হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন সেই স্বপ্ন কি আজও সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে?
স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস থেকে যে শিক্ষা আমরা পেলাম, তা হলো শোষণবঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শিক্ষা। অধিকার আদায়ের শিক্ষা।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর শুরু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে দেখা দিলো চরম দুর্ভিক্ষ। সেই দুর্ভিক্ষে কতো হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারালো! কতো মানুষ খেতে না পেয়ে রাস্তার ধারে মরে থাকলো!…
সেই দিনের কথা ভাবলে আজকের দিনটাকে বড় উজ্জ্বল মনে হয়। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে শিখেছে। উন্নয়নের মহাসড়কে পা ফেলতে শুরু করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পরও আমরা সেই স্বপ্নকেই খুঁজে ফিরি। কিসের বাধায় আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে পারিনি? কেন এখনও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারিনি? কেন রাস্তার পাশে এখনও ভিটেমাটিহীন মানুষেরা, ছিন্নমূল শিশুরা পড়ে থাকে? সামগ্রিক উন্নয়নের পথে কী সেই বাধা? এ সম্পর্কেও আমাদের জানতে হবে।

আমাদের স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে বিশ্বের কাছে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছি অনেকটা। কিন্তু ভৌগোলিক মুক্তির মতো করে অর্থনৈতিক মুক্তি সেভাবে অর্জিত হয়নি। এখনও বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণে জর্জরিত। বিদেশী অনুদান বা ঋণ ছাড়া সম্পন্ন হয় না আমাদের বাজেট পরিকল্পনা। এখনও আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায়। স্বাধীনতার সুফল পেতে হলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি জরুরি। আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক উন্নয়ন। প্রতিটি সেক্টরে উন্নয়নের গতি সঞ্চরণ। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠন। এর জন্য দরকার বেকারত্বের অভিশাপ থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা। ঘরে ঘরে জনে জনে চাকরির ব্যবস্থা করা। প্রবাসে যারা আছেন তারা যেন যে কোনও সময়ে ফিরে আসতে পারেন। তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। দুর্নীতি প্রতিরোধ করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। সুশাসন ও দারিদ্র্য-বিমোচনের ব্যবস্থা করা।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ছোট বড় সকলের কাছে নিবেদন থাকবে, আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাই স্বাধীনতার স্বপ্নচূড়ায়। সকল ভেদাভেদ ভুলে, বিভাজন ভুলে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে, অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে আমরা হারিয়েছি তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে এই দেশটাকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলি।
এসো, আমাদের এই সবুজ-শ্যামল উর্বর দেশকে ভালোবাসি। দেশের উন্নতি, সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এটাই হোক আমাদের সুদৃঢ় অঙ্গীকার।

SHARE

Leave a Reply