Home চিত্র-বিচিত্র হাম্বল্ট স্কুইড -জামিল হোসেন

হাম্বল্ট স্কুইড -জামিল হোসেন

সব প্রাণীরই রয়েছে ভিন্ন ভাষা। প্রজাতিভেদে বিভিন্ন প্রাণী বিভিন্নভাবে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে। কোনো প্রাণী শব্দ উৎপন্ন করে আবার কোনো প্রাণী অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে বিভিন্ন ইঙ্গিতের সাহায্যে যোগাযোগ করে থাকে।
সমুদ্র এবং স্থলের কয়েকটি প্রাণী নিজের শরীরের মাধ্যমে আলো উৎপন্ন করে যোগাযোগ করতে পারে। তেমনই একটি সামুদ্রিক প্রাণী স্কুইড। তারা শরীরে রঙিন আলো উৎপন্ন করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে থাকে।
স্কুইড সমুদ্রের একটি অন্যতম অদ্ভুত প্রকৃতির প্রাণী। বেশ কয়েকটি প্রজাতির স্কুইড শরীরে আলো উৎপন্ন করতে পারে। স্কুইড টেউথিডা গোত্রভুক্ত এক প্রকার সামুদ্রিক প্রাণী।
প্রায় ৩০০ প্রজাতির স্কুইড রয়েছে টেউথিডা বর্গের। অন্যান্য সেফলাপোডার মতো স্কুইডিরেও স্বতন্ত্র মস্তক, বাহু ও ছদ্মবেশ ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। স্কুইডের মাঝে অন্য একটি প্রজাতি হাম্বল্ট স্কুইড।
স্কুইডের দৈর্ঘ্য সাধারণত ২ মিটার এবং ওজন ৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। হাম্বল্ট স্কুইডের দৈর্ঘ্য ছয় ফুট পর্যন্ত হতে পারে। এদের শরীরের বাইরের অংশে শক্ত আবরণ নেই। পায়ের নিচের অংশে চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ফানেল রয়েছে। হাম্বল্ট স্কুইডের রক্ত বর্ণহীন।
স্কুইডের উভয় পাশে সাঁতার কাটার জন্য পাখা রয়েছে। বেশির ভাগ সামুদ্রিক প্রাণী সাঁতারের জন্য পাখনার ওপর নির্ভরশীল হলেও স্কুইডরা ভিন্ন।
এরা দলবেঁধে চলা কিংবা শিকার ধরার সময় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে। এই স্কুইড প্রজাতি শরীরে রঞ্জকের সাহায্যে আলো উৎপন্ন করতে পারে এবং এর ধরনও পরিবর্তন করতে পারে। এ সময় তারা শরীরে ঝাঁকুনিও সৃষ্টি করে। গবেষকরা মনে করেন, রঞ্জকের মাধ্যমে রং পরিবর্তন করে বার্তা প্রদান করে এরা। তবে রহস্য হলো গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে কিভাবে হাম্বল্ট স্কুইডের মতো একটি স্বতন্ত্র প্রাণীর রঙিন আলোর ধরনগুলো দৃশ্যমান হয়।
স্কুইডে বায়োলুমিনেসেন্স রয়েছে, যা শরীরের নিচের অংশটি আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে। এই বৈশিষ্ট্যটি শিকারিদের শিকার এবং বিভ্রান্ত করতে সহায়তা করে।
গবেষকরা পর্যবেক্ষণ করেছেন, বৃহৎ সেফলাপোড দল শিকার ধাওয়া করার সময় সমন্বয় সাধন করে। একাধিক স্কুইড একই শিকারের পেছনে ছোটে না। এর থেকে গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান শরীরের ঝাঁকুনি কিংবা আলোর সংকেতের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে বার্তা প্রদান করে স্কুইডরা। গবেষক বার্ফোর্ড স্কুইডদের আলোর সাহায্যে বার্তা দেওয়াকে ট্রাফিক সিস্টেমের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
হাম্বল্ট স্কুইডের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন একটি গবেষণায় আলোচনা করা হয়েছে। গবেষণাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির প্রসিডিংস-এ প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে। গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বেনজামিন পি বার্ফোর্ড।
তিনি বলেন, হাম্বল্ট স্কুইডের আলোর বিকিরণ পুরো শরীরজুড়ে ক্ষুদ্র বিন্দু আকারে ছড়িয়ে থাকে। এরা বাইরের পরিবর্তে আলোকিত বিন্দুর সাহায্যে শরীরের অভ্যন্তরের কোষগুলোতে আলোর বিকিরণ করে। এর ফলে তাদের পুরো শরীর আলোকিত হয়ে ওঠে।
হাম্বল্ট স্কুইড রেড ডেভিলস বা লাল শয়তান নামেও পরিচিত। শত শত স্কুইড দলবেঁধে গভীর সমুদ্রে বাস করে। তারা আলোর মাধ্যমে ৬০০ ফুটের গভীর সমুদ্র থেকেও যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তবে উৎপন্ন আলোর ক্রোমাটোফোরগুলো খুবই সূক্ষ্ম।
গবেষকরা স্কুইডারের শরীর থেকে কমপক্ষে ২৮টি ভিন্ন ধরনের আলোর ভিজ্যুয়াল ডিসপ্লে রেকর্ড করতে পেরেছেন। বার্ফোর্ড এবং তার সতীর্থ গবেষক দল প্রাণীটির বার্তা প্রদান করার ভিজ্যুয়াল কোড বোঝার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। গবেষকরা বিশ্বাস করেন, এই কোড বুঝতে পারলে হয়তো মানুষও স্কুইডারের ইঙ্গিত ব্যবহার করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে।
হাম্বল্ট স্কুইডের সম্পূর্ণ জীবন সম্পর্কে জানা যায় না। এদেরকে পরীক্ষাগারে স্থানান্তরিত করা সম্ভব নয় কারণ এটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়। তাই এই মাছের অনেক তথ্যই অজানা রয়ে গেছে।
এই স্কুইডগুলো যে উপকূলে পাওয়া যায় সেখানকার স্থানীয় জনগণের পছন্দের খাবার এটি। তাদের কাছে এটি সুস্বাদু খাবার। উপকূলীয় প্রায় সব দোকানে এটি পাওয়া যায়। বিভিন্ন দেশে রফতানি হয় প্রচুর পরিমাণে হাম্বল্ট স্কুইড।

SHARE

Leave a Reply