Home জাতীয় কিশোরকণ্ঠ পাঠ প্রতিযোগিতা কিশোরকণ্ঠ জাতীয় গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০২০-এর খ-গ্রুপে তৃতীয় স্থান অধিকারী গল্প

কিশোরকণ্ঠ জাতীয় গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০২০-এর খ-গ্রুপে তৃতীয় স্থান অধিকারী গল্প

হলুদ সবুজেরা
সাদিয়া ইসলাম রাত্রি

“সামনের রুমটায় এতো গোলমাল হয় সবসময়!
রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত মেয়েগুলো হৈ-হল্লা করে। রাতে আমাদের একটু বিশ্রাম নেওয়ার সময়, একটু ঘুমুবো, তারও সুযোগ নেই। হলে থাকি বলে এত মেয়েদের হইচই সহ্য করতে হয়। আর এদের তো কোনো কিছুরই ঠিক নেই। ঘুমায় রাত ৩টায় উঠে ১০টা-১১টায়। এ দিকে আমাদের নিরিবিলি থাকা হয় না।”
এক মাস আগেও পুঁই ডাঁটা, পাথরকুচি, বেলি, রেইন লিলি আর এলোভেরা গাছগুলোর অভিযোগ ছিল এরকমই। সেই ঝাঁ দুপুরে লম্বা করিডোরের নির্জনতার সাথে ওরা সবাই একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতো।
সন্ধ্যায় ও একটু নিরিবিলি পরিবেশ পেত। কিন্তু এরপরই আবার করিডোরটা মানুষের আসা-যাওয়ায় সরব হয়ে উঠতো।
গাছেদের নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ সেটা যেন এই মানুষগুলো বুঝতেই চাইতো না।
আর এখন!
সবকিছু একদম নীরব, সুনসান।
দুপুরের ঝাঁ রৌদ্রে একটু পানির অভাবে মরো মরো অবস্থা পুঁই পরিবারের। সামনের রুমের মেয়েগুলোর কথা মনে পড়ে। ওদের একজনই তো টিউশন করাতে গিয়ে সেই বনশ্রীর এক বাজার থেকে এনে লাগিয়েছিল পুঁইয়ের পিতা, পিতামহদের। আরো দুইজন মিলে মাটি এনে বোতল কেটে তাদের এখানে গোড়াপত্তন করেছিল। তারপর থেকেই এই কাটা পাঁচ লিটারের বোতলের দুই অংশে পুঁইদের বসতি, বড় হওয়া। সবই ওরা শুনেছে মা বাবার কাছে।
সামনের রুমের মানুষগুলোই তাদের যত্ন নিতো। চারজন মেয়ে থাকে রুমটায়। যে যখন সময় পেতো পানি দিতো। এরা সবসময় হাসি খুশি, সবসময়ই এদের রুমে একটা উৎসব উৎসব আমেজ।
সেবার যখন পুঁইয়ের নতুন পাতা হলো, এরা কী খুশিই না হয়েছিল। একজন আরেকজনকে ডেকে এনে দেখায়, মুখগুলো কি হাসি হাসি।
আদর করে পুঁইয়ের পাতায় সন্তর্পণে হাত বুলিয়ে দেয়। পুঁইও লাজুক হেসে দুলে উঠেছিল সেদিন।
আবার যখন বাঁ দিকের লতাটা বড় হয়ে উঠলো, ঠিকমতো কোনো কিছুকে জড়িয়ে ধরতে শেখেনি। তখন তো ওদেরই একজন জড়িয়ে দিয়েছিল বারান্দায় গ্রিলে।
বেলির নতুন কুঁড়ি হওয়ার পর তো এরা আশপাশের রুমের মেয়েদেরও ডেকে এনে দেখাচ্ছিলো। কী পাগলামিই না করতো মেয়েগুলো।
সেসব দিন কি আবার আসবে না?
তাদের কথা খুব মনে পড়ে।
মনে পড়ে যখন উত্তরের জোর বাতাস হতো, পাঁচতলার ওপর সে বাতাস সজোরে আঘাত করতো পুঁই পরিবারসহ অন্য গাছের পরিবারগুলোকে। তখন দুর্বল স্বাস্থ্যের গাছগুলোকে মেয়েগুলো বাতাস থেকে আড়াল করে রাখতো। বাঁচানোর জন্য।
অবশ্য পুঁইও তাদেরকে বেশ কয়েকবার স্বাস্থ্যবান কয়েকটা ডাঁটা উপহার দিয়েছে। অপরাজিতা দিয়েছে গাঢ় নীল ফুল।
আজ তাদের কথা খুব মনে পড়ছে। তারা থাকলে পানি দিতো, যত্ন নিতো। নতুন গজানো চারাগুলোকে আলাদা পাত্রে বাস করতে দিতো, পানির অভাবে মরতে দিতো না।
পাশের বোতলের এলোভেরা দিব্যি ছিল, নিজের শরীরের পানিকেই কাজে লাগিয়ে চলছিল এতদিন। কয়েকটা বাচ্চা চারারও জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু এখন সেও শুকিয়ে যাচ্ছে পানির অভাবে। বাচ্চাগুলোও মরে গেলো পুঁইয়ের বাচ্চাদের মতো।
সামনের রুমের মেয়েগুলো থাকলে এমন হতো না।
মায়াভরা হাত দিয়ে সব ঠিক করে দিতো।
মেয়েগুলো কোন এক রোগের আশঙ্কায় হল ছেড়ে চলে গেছে। শেষের দিকে কেউ তেমন যত্ন নিতো না। পানি দিতে ভুলে যেত।
অজানা আশঙ্কায় থমথম করতো ওদের মুখগুলো। বারবার শোনা যেত মোবাইলে দূরে নিজেদের পরিবারের সাথে কথা বলছে, বলছে ‘সচেতন থাকো, হাত ধোও বারবার, মাস্ক পরে থাকো। পৃথিবীর মানুষ সুস্থ নেই, কোনো কিছু ঠিক নেই।’
একসময় একে একে তারাও চলে গেলো।
যাওয়ার সময় করুণ চোখে পুঁইদের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গেলো।
একজন বেশি করে পানি দিয়ে গেলো। ফিসফিস করে বলে গেলো, ‘জানি না ফিরবো কি না, তোরা ভালো থাকিস।’
বুড়ো যে কড়ইদাদু আছে, সে বললো, এমন দিন কখনো দেখেনি সে। সবসময় মেয়েদের কলকাকলিতে মুখর ছিল এই হলের মাঠ, তার ছায়ায় বসতো, গান গাইতো, হাসির ফোয়ারা ছুটতো।
একরাশ মন খারাপ নিয়ে কিছু কিছু মেয়ে তারই ছায়ায়, স্নিগ্ধ বাতাসে চুপ করে বসে শক্তি সঞ্চয় করতো।
কিন্তু এখন মনে হয় কিছুই ঠিক নেই। শহরের গাছ হয়ে মানুষবিহীন থাকাটা অস্বস্তিকর।
কড়ইদাদুর কথা শুনে আনমনেই ভাবে পুঁই।
মা মারা গেলো গত সপ্তাহে, পানির অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেলো মা। পুঁই ডাঁটা মায়ের কথা ভাবে, যদি মা আরেকটা দিন বেঁচে থাকতো তাহলেই বেঁচে যেতো। কেননা মা মারা যাওয়ার পরের দিনই আকাশ কাঁপিয়ে বৃষ্টি হলো যে।
মনে হয় সৃষ্টিকর্তা অসীম কৃপার হস্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের দিকে।
বিকেলের হলুদ আলোয় পুঁইয়ের মনে হাজারো প্রশ্ন ভিড় করে-
আর কি মেয়েগুলো আসবে না? করুক তারা হইচই।
তবুও ফিরে আসুক তারা। কতদিন পর আসবে? এসে যদি দেখে শুকিয়ে প্রাণহীন আমরা!
এই চারজনের হাসি হাসি মুখ আবার দেখবো না?
পৃথিবীর কী খুব অসুখ করেছে?
কবে ঠিক হবে সব?

SHARE

Leave a Reply