Home খেলার চমক ক্রিকেটের বনেদি এক পরিবার -আবু আবদুল্লাহ

ক্রিকেটের বনেদি এক পরিবার -আবু আবদুল্লাহ

পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চারজন টেস্ট খেলেছেন দেশের হয়ে। আরেকজনও ডাক পেয়েছিলেন জাতীয় দলে; কিন্তু দুর্ভাগ্য একটি ম্যাচে দ্বাদশ খেলোয়াড় হয়েই ছিলেন। একাদশে জায়গা হয়নি। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে আবার একজনের ছেলেও খেলেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। তার ছেলে অর্থাৎ সেই ভাইদের একজনের নাতিও এখন খেলছেন ঘরোয়া ক্রিকেট। আরেক ভাইয়ের তিন ছেলেও খেলেছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট। সেই ভাইদের মা ছিলেন ব্যাডমিন্টনে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। বাবা ছিলেন ক্লাব ক্রিকেটার। এমন একটি পরিবারকে অভিজাত ক্রীড়া পরিবার ছাড়া আর কী বলা যায়।
এবার জানাবো পাকিস্তান ক্রিকেটের সেই অভিজাত পরিবারটিকে নিয়েই। ক্রিকেটে এই পরিবারটির অবস্থান বোঝাতে একটি তথ্যই যথেষ্ট- সেটি হলো পাকিস্তানের প্রথম একশো টেস্টের প্রতিটিতে এই পরিবারের কেউ না কেউ খেলেছেন।

কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান হানিফ মোহাম্মাদের পরিবার বললে- আর কোন পরিচয় দরকার হয় না। বিশ^ ক্রিকেটে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন ছিলেন হানিফ মোহাম্মাদ। ক্রিকেটের প্রথম লিটল মাস্টার খেতাব পেয়েছিলেন তিনিই। ১৯৫০ ও ’৬০ এর দশকে পাকিস্তানের হয়ে খেলা হানিফ ছিলেন পাকিস্তান ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার। ৫৫ টেস্টের ক্যারিয়ারে ১২ সেঞ্চুরিতে প্রায় ৪৪ গড়ে করেছেন ৩ হাজার ৯১৫ রান। সে সময় পাকিস্তান খুব কমই টেস্ট খেলার সুযোগ পেত। যে কারণে ১৭ বছরের ক্যারিয়ারেও তার টেস্ট সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৫টি। ১৯৫২ সালের অক্টোবরে নয়াদিল্লিতে পাকিস্তানের অভিষেক টেস্টে খেলেছেন হানিফ। বড় ভাই ওয়াজিরের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছে তারপরে।

টেস্ট ইতিহাসে সময়ের হিসেবে দীর্ঘতম ইনিংসটি খেলার রেকর্ড হানিফ মোহাম্মদের। ব্রিজটাউন টেস্টে ৯৭০ মিনিট ক্রিজে থেকে ৩৩৭ রানের ইনিংসটি তিনি খেলেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৯৫৮ সালের জানুয়ারিতে। আরেকটি কীর্তি আছে তার। তবে সেটা যতটা কীর্তি, ঠিক ততটাই আফসোস। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে পৌঁছে গিয়েছিলেন ৫০০ রানের দোরগোড়ায়; কিন্তু দুর্ভাগ্য ৫০০তম রানটি নিতে গিয়েই রান আউট হয়ে যান হানিফ মোহাম্মাদ। ঘটনাটি ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে। কায়দে আজম ট্রফির সেমিফাইনালে করাচির হয়ে বাহাওয়ালপুরের বিপক্ষে। তার আগ পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর ছিল ডন ব্রাডম্যানের ৪৫২ রান। হানিফের ৪৯৯ রানের ইনিংস ও এর পেছনের গল্প নিয়েই আলাদা করে বিশাল এক লেখা শেষ করা যায়। সংক্ষেপে জানিয়ে রাখি, চতুর্থ দিন যাতে আর ব্যাট করতে নামতে না হয়, সে জন্য ম্যাচের তৃতীয় দিন শেষ ওভারে তাড়াহুড়ো করে রান নিতে গিয়ে রান আউট হয়ে যান তিনি। ৪৯৯ রানের সেই ইনিংসটির রেকর্ড ব্রায়ান লারা ভেঙেছিলেন ৩৫ বছর পর ৫০১ রানের ইনিংস খেলে। ২০১৬ সালে ৮১ বছর বয়সে মারা যান এই কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান।

হানিফ মোহাম্মাদ ছিলেন ৫ ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। বড় ভাই ওয়াজির মোহাম্মাদ, চতুর্থ মোশতাক মোহাম্মাদ ও পঞ্চম সাদিক মোহাম্মাদ খেলেছেন পাকিস্তানের হয়ে। এই পরিবারের সব ভাইদের জন্ম তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জুনাগাধ এলাকায়। বর্তমানে যেটি ভারতের গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় মোহাম্মাদ ভাইদের নিয়ে তাদের পিতা-মাতা করাচিতে চলে যায়। হানিফ মোহাম্মদের ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান আগেই বলেছি। অন্য ভাইদের মাঝে ওয়াজির ২০ টেস্ট, মোশতাক ৫৭ টেস্ট ও ১০ ওয়ানডে এবং সাদিক ৪১ টেস্টের পাশাপাশি ১৯ ওয়ানডে খেলেছেন পাকিস্তানের হয়ে। পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিয়েছেন হানিফ ও মোশতাক। তিনজন মূলত টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান ছিলেন, মোশতাক ছিলেন অলরাউন্ডার। ওয়াজিরের টেস্ট সেঞ্চুরি ২টি, মোশতাকের ১০টি, সাদিকের ৫টি। তবে কমবেশি বোলিংও করতেন সবাই। এখানে অবশ্য মুশতাক এগিয়ে, তার টেস্ট উইকেট ৭৯টি।

ওয়াজির ও হানিফ এক সাথে ১৮টি টেস্ট খেলেছেন। হানিফ ও মোশতাক খেলেছেন ১৯ টেস্ট। মোশতাক ও সাদিক ২৬ টেস্ট। ওয়াজির ও মোশতাক এক সাথে খেলেছেন একটি টেস্ট। যে কোন দুইভাই খেলেছেন এমন ম্যাচ ৬৪টি। তিনভাই এক সাথে খেলেছেন একবারই। ১৯৬৯ সালের অক্টোবরে করাচি টেস্টে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ক্রিকেট ইতিহাসে তিন ভাইয়ের এক সাথে খেলার তৃতীয় ঘটনা ছিল সেটি। ওই ম্যাচটি ছিল হানিফ মোহাম্মদের শেষ ও সাদিক মোহাম্মদের অভিষেক টেস্ট। ম্যাচে পাকিস্তানের হয়ে ইনিংস ওপেন করেন এই দুই ভাই। বোলিং করেছিলেন তিনজনেই।

এখানে একটি মজার ঘটনা আছে। সাদিক মোহাম্মাদ ছিলেন বামহাতি ব্যাটসম্যান। তবে সেটা প্রকৃতিগত ছিল না। ছোটবেলা থেকে অন্য ভাইদের মতো ডান হাতেই ব্যাট করতেন সাদিক; কিন্তু পাকিস্তান দলে তখন বাম হাতি ব্যাটসম্যান না থাকায় হানিফ তার ছোট ভাইকে অনেকটা জোর করেই বাম হাতে ব্যাট করার অভ্যাস গড়ান। শোনা যায়, সাদিকের ডান হাত পিঠের সাথে বেঁধে রেখে বাম হাত দিয়ে ব্যাট চালানোর অনুশীলন করাতেন হানিফ।

একমাত্র মেজোভাই রাইস মোহাম্মদের খেলা হয়নি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে টেস্টের স্কোয়াডে ছিলেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দারুণ খেলা রাইস। ম্যাচের আগের রাতে অধিনায়ক আবদুল হাফিজ কারদার তাকে বলেন দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ো, কালকের ম্যাচে তুমি খেলবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে একাদশে নেওয়া হয়নি, রাখা হয় দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে। পরবর্তীতেও আর তার সুযোগ হয়নি পাকিস্তানের হয়ে খেলার। সেটি হলে পাঁচ ভাইয়ের পাকিস্তানের হয়ে খেলার এক অনন্য কীর্তি তৈরি হতো। তাদের মা একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, রাইস সবার চেয়ে মেধাবী ব্যাটসম্যান ছিল। তার পাকিস্তানের হয়ে খেলতে না পারা আমাকে কষ্ট দেয়।

পিতা-মাতা দুজনেই ক্রীড়াবিদ ছিলেন। যে কারণে সন্তানদের সবাই নাম লেখান খেলার জগতে। তবে মায়ের ব্যাডমিন্টন কাউকে টানেনি, বাবার মতো ক্রিকেটের মাঠেই নাম লিখিয়েছেন সবাই। তাদের মা আমির বি ছিলেন ভারতের জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন ও ক্যারমের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন। তার উৎসাহেই ছেলেদের ক্রিকেটে আসা। গুজরাটে স্কুলজীবন থেকেই তারা ছিলেন স্কুল ক্রিকেটের সেরা খেলোয়াড়। ছেলেরা পাকিস্তান দলে খেলার সময় তার এই উৎসাহ দেওয়াটা কমেনি। পাকিস্তান দল বিদেশ সফরে থাকলে তিনি ছেলেদের চিঠি লিখে উৎসাহ দিতেন।

এতো গেলো ভাইদের কথা। এরপরের প্রজন্মের গল্পটাও দারুণ। হানিফ মোহাম্মদের ছেলে শোয়েব মোহাম্মাদ পাকিস্তানের হয়ে খেলেছেন ৪৫ টেস্ট ও ৬৩ ওয়ানডে। টেস্টে ৭টি, ওয়ানডেতে একটি সেঞ্চুরি আছে তার। শোয়েবের ছেলে ও হানিফের নাতি শেহজার মোহাম্মাদ এখন পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলছেন। এখন পর্যন্ত ৪৫টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা শেহজারও স্বপ্ন দেখছেন পাকিস্তানের হয়ে ব্যাট হাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার। সেটি হলে তিন পুরুষের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার তৃতীয় নজির হবে। শেহজার সেই রেকর্ড গড়তে পারবেন কি না সেটি সময়ই বলে দেবে, তার আগে অবশ্য আরেকটি কীর্তি গড়েছে এই তিন প্রজন্ম। তিন পুরুষের আছে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরি করার কীর্তি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে করাচির হয়ে ২৬৫ রানের ইনিংস খেলে দাদা ও বাবার পাশে নাম লেখান শেহজার। এর আগে কাউন্টি ক্রিকেটে এমন একটি কীর্তি আছে।

মেজোভাই রাইস মোহাম্মাদের তিন ছেলে শহিদ, আসিফ ও তারিক খেলেছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট। বাবার মতো তাদের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা হয়নি। তবে এক পরিবার থেকে যা হয়েছে তাই বা কম কীসে!
লেখা শেষ করবো মোহাম্মাদ ভাইদের একটি মজার ঘটনা দিয়ে। একবার ঘরোয়া ক্রিকেটে পাকিস্তান এয়ারলাইন্স ও করাচি ব্লুজের মধ্যকার ম্যাচে এয়ারলাইন্সের হয়ে হানিফ ১৮৭ ও মোশতাক ১২৪ রান করেন। ওই ম্যাচে তাদের বিপক্ষে করাচির হয়ে খেলা ছোট ভাই সাদিক ৯৬ রানে আউট হন। যে কারণে একই ম্যাচে তিন ভাইয়ের সেঞ্চুরি হতে হতেও হয়নি। শোনা যায়, ওই ম্যাচের পর তাদের মা বেশ কিছুদিন কথা বলেননি মোশতাকের সাথে। কারণ ৯৬ রানে সাদিকের ক্যাচটি নিয়েছিলেন মোশতাক!

SHARE

Leave a Reply