Home প্রচ্ছদ রচনা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ -ড. মোজাফফর হোসেন

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ -ড. মোজাফফর হোসেন

ভাষা ছাড়াও মানুষ বাঁচে। কিন্তু ভাষা ছাড়া মানুষের পরিচয় বাঁচে না। সে জন্য প্রত্যেক সুস্থ মানুষের ভাষা থাকে। মানুষ তাদের নিজ নিজ ভাষা চর্চা করে। পৃথিবীতে প্রায় সাত হাজারের মতো ভাষা আছে। বাংলা ভাষার স্থান পঞ্চম। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মাতৃভাষা মানে মায়ের ভাষা। ভাইয়েরা যে ভাষায় সাবলীল ও সহজ করে সবসময় কথা বলে সে ভাষাটাই মাতৃভাষা। ছেলে-মেয়েরা মায়ের কাছ থেকে যে ভাষায় কথা বলতে শেখে সে ভাষা ছেলে-মেয়েদের মাতৃভাষা।
অবাক করা ব্যাপার হলো বাংলাদেশের সব মায়েদের ভাষা কিন্তু একরকম নয়। যেমন- ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মায়েদের ভাষার সাথে রংপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় অঞ্চলের মায়েদের ভাষার মিল নেই। আবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাজশাহী অঞ্চলের মায়েদের ভাষার সাথে সুনামগঞ্জ সিলেট অঞ্চলের মায়েদের ভাষার মিল নেই। পুরাতন ঢাকার মায়েদের ভাষার সাথে ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলের মায়েদের ভাষার মিল নেই। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে; সব মানুষের মাতৃভাষা এক নয়। আর একটি মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মায়েরাই বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তাহলে বাংলাদেশের সব মায়েদের ভাষা একরকম হলো না কেন? কেন হলো না তার একটা কারণ আছে। কারণটা হলো ধ্বনি। বাংলা ভাষায় যেটা ধ্বনি; ইংরেজিতে তা ংড়ঁহফ; ফারসিতে সেটা আওয়াজ। আমরা জানি প্রতিটি ভাষার একক হচ্ছে ধ্বনি। অর্থাৎ মানুষ যা বলে তা ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি। যখন এক বা একাধিক ধ্বনি একত্রে কোনো অর্থ বোঝায় তখন সেই ধ্বনি সমষ্টিই ভাষা হয়ে ওঠে। সংক্ষেপে বলা যায়- অর্থবোধক ধ্বনিসমষ্টিই ভাষা। এক একটি ধ্বনি এক এক মানুষ এক এক রকম উচ্চারণ করে। এই উচ্চারণ ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের মায়েদের ভাষাও ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণের এই ভাষাগুলোকে বলা হয় আঞ্চলিক ভাষা। ভাষার দুটি রূপ রয়েছে। একটা আঞ্চলিক, অন্যটা প্রমিত। প্রমিত অর্থ হলো যা প্রমাণ করা হয়েছে এমন বা প্রমাণস্বরূপ। ভাষার প্রমিত রূপ না থাকলে সময়ের ব্যবধানে ভাষার সঠিক রূপ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না। তা ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের বাংলা ভাষা ভিন্ন ভিন্ন রকম। ভাষার ভিন্ন ভিন্ন রূপ সমস্যা সৃষ্টি করে। সেজন্য ভাষার সব রূপ মিলে একটি রূপের প্রয়োজন পড়ে। প্রয়োজনীয় সেই রূপটিই হচ্ছে প্রমিত বাংলা। অনেক মায়েরা প্রমিত বাংলা ভাষাতে কথা বলেন। তাহলে আঞ্চলিক বাংলা ভাষা যেমন মাতৃভাষা, তেমন প্রমিত বাংলা ভাষাও মাতৃভাষা। তবে প্রমিত বাংলা ভাষার গুরুত্ব বেশি।
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। নতুন বছরে ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ভাষা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা, সভা-সেমিনার। পত্রপত্রিকাগুলো ছাপে প্রবন্ধ-নিবন্ধ। রেডিও টেলিভিশনে বাজানো হয় ভাষার গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’……। ঢাকাতে বসে ভাষাবিষয়ক সবচেয়ে বড় আসর ‘একুশে গ্রন্থমেলা’। দেশের আনাচেকানাচে শুরু হয় বইমেলা। ফেব্রুয়ারি মাস যেন ভাষার আনন্দ জোয়ারে ভাসে। ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ পায় সেই আনন্দের পূর্ণতা। এ দিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
একুশে ফেব্রুয়ারি কেন ভাষা দিবস হলো! তার রয়েছে বিস্তর ইতিহাস। সে ইতিহাসের সাথে রাজনীতিও জড়িয়ে আছে। এ দিনে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ আরও অনেকেই। মাতৃভাষার দাবি নিয়ে শহীদ হওয়া ইতিহাসে বিরল। ভারত উপমহাদেশে তামিলনাড়– রাজ্যে তামিলরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল প্রথম। তাদের আন্দোলন মাতৃভাষার জন্য ছিল না। তারা হিন্দি ভাষার বিরোধিতা করেছিল। তামিলনাড়–র মানুষের মাতৃভাষা তামিল। কিন্তু তারা হিন্দির পরিবর্তে দাফতরিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি চেয়েছিল। তখন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন। এ সময় হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত হলো। ছাত্ররা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলো। ভারত উপমহাদেশে ভাষার জন্য এটিই প্রথম প্রতিবাদ। ১৯৩৭ সাল। শত শত ছাত্র-জনতা আন্দোলনে যোগ দিলো। মিছিল-মিটিং, আন্দোলন, বিক্ষোভ চলতে থাকল। সরকার বিক্ষোভ প্রতিরোধ করতে গেলে দু’জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হলো। তামিলদের এ আন্দোলন ১৯৬৫ সালে এসে শেষ হলো। এ ছাড়াও পৃথিবীর আরো কয়েকটি দেশে ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু শুধু মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করেছে বাঙালি।
বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হয়। জন্ম হয় পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’টি দেশের। বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চল তখন পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তান দু’ভাগে পরিচিত ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর রাষ্ট্রের দাফতরিক ভাষা কী হবে এ নিয়ে চলে আলাপ-আলোচনা। পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের মাতৃভাষা ছিল উর্দু। পূর্ব পাকিস্তানের বেশির ভাগ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। তখন পাকিস্তানের রাজধানী ছিল করাচি। করাচি থেকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এ সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লিয়াকত আলী খান। পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দীন। প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীসহ উর্দুভাষী বুদ্ধিজীবীরা উর্দুভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার প্রস্তাব করলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে দাবি করা হলো; বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করা হোক। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের দাবি উপেক্ষা করল। ঘোষণা করা হলো; উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলেন ঢাকার ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘তমদ্দুন মজলিস’ নামে একটি সংগঠন। আন্দোলন চলতে থাকল। প্রতিবাদ জোরালো করতে ১৯৫০ সালে ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠন করা হলো ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।
ভাষা আন্দোলনে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কাগজে-কলমে রাষ্ট্রভাষা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়ার দিন। এ দিন ঢাকাতে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে পালিত হলো সাধারণ ধর্মঘট। ধর্মঘট চলার সময় ছাত্ররা পুলিশের রাইফেল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। ছাত্রদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ বাধল। এর প্রতিবাদে ১২ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ আবার ধর্মঘট চলল। আন্দোলন ধীরে ধীরে গাঢ় হতে থাকল।
আন্দোলন প্রশমনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯ মার্চ ঢাকায় এলেন। তিনি দু’টি বক্তৃতায় ‘উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা’ অভিমত ব্যক্ত করলে জনসাধারণ তার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করল। ১৯৫২ সালের শুরু থেকে ভাষা আন্দোলন পরিণতির দিকে মোড় নিতে থাকল। এর মধ্যে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান মৃত্যুবরণ করলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন খাজা নাজিমুদ্দীন। ’৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন করাচি থেকে ঢাকায় এলেন। তিনি পল্টন মাঠের জনসভায় বললেন- পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবল উর্দু হবে। সঙ্গে সঙ্গে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে পল্টন ময়দান প্রকম্পিত হয়ে উঠল। বক্তব্যের প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হলো। ৩১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে গঠিত হলো ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। ইতোমধ্যে পাকিস্তান সরকার আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রস্তাব করল। এ প্রস্তাবের প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভের ডাক দিলো। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করল। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রসমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশ থেকে ছাত্ররা ৫-৭ জনের ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। ছাত্রদের প্রতিহত করতে মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। লাঠিচার্জে ছাত্ররা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে ঘটনাস্থলে রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার, আবুল বরকত এবং গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আবদুস সালাম শহীদ হন। এসব মৃত্যুর প্রতিবাদে পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি শোকমিছিল বের করলে মিছিলে পুলিশ আবারও গুলি চালায়। শফিউরসহ আরো কয়েকজন এ দিনও শহীদ হন। ১৯৫৬ সাল পর্যন্তু ভাষা আন্দোলন অব্যাহত থাকে। এরপর গণপরিষদ বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য বিল পাস করলে বাংলা এবং উর্দু উভয়ই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৫২ সালের পর থেকেই ২১ ফেব্রুয়ারির দিনটিকে ভাষাদিবস হিসেবে পালন করা হয়। মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগ। এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। তখন থেকে পৃথিবীব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালন করা বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য গর্বের। কেননা এ দিনে বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের বিষয়টি এসে যায় বিশ্ববাসীর কাছে। তখন বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার মর্যাদা বাড়তে থাকে।
যে মাতৃভাষার জন্য দীর্ঘ ইতিহাস, সংগ্রাম, রক্ত, আত্মত্যাগ সেই বাংলা ভাষা আজ সমাজে অবহেলিত। রাষ্ট্রের অনেক বিভাগেই এখনও বাংলা ভাষা গুরুত্বহীন। অথচ ভাষা আন্দোলনের শ্লোগানই ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ভাষা আন্দোলনের প্রায় পঁচাত্তর বছর পার হতে চলল। এখনো আদালতে বিদেশী ভাষা রয়েই গেল। এদেশের করপোরেট অফিসগুলোতে বাংলা ভাষার মর্যাদা নেই। নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে বিদেশী ভাষা শেখার শত শত স্কুল তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাংলা ভাষা গুরুত্বহীন। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান, বিয়ের অনুষ্ঠান, শিক্ষাসফর, হালখাতা, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী ইত্যাদি অনুষ্ঠানে হিন্দি ও ইংরেজি গানের আধিপত্যে বাংলা গান লজ্জায় মরে যেতে চায়। এ-ই যদি চলতে থাকে তাহলে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস টেনে লাভ কী! একুশে ফেব্রুয়ারি এলে এদেশের নেতারা ভাষা আন্দোলনের অতীত উন্মোচন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু বাংলা ভাষার হাড়ের ভেতর যে ক্ষয় ধরেছে সে রোগের চিকিৎসার দায়িত্ব কেউ গ্রহণ করতে চায় না। শুধু বক্তৃতার নাম ভাষাপ্রীতি নয়। বাংলা ভাষা হারিয়ে গেলে বাঙালি জাতির অস্তিত্বও বিলীন হতে পারে; এ কথাটা মনে রেখে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে শিশুরা রাজপথে আবারও নামতে পারে।

SHARE

Leave a Reply