Home জাতীয় কিশোরকণ্ঠ পাঠ প্রতিযোগিতা তিতুমীরের শেষ যুদ্ধ -জুলফিকার আলী

তিতুমীরের শেষ যুদ্ধ -জুলফিকার আলী

কিশোরকণ্ঠ জাতীয় গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০২০-এর খ-গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী গল্প

গগনবিদারী শব্দে কামানের গোলা আঘাত করছে বাঁশেরকেল্লায়। কামানের আঘাত দুর্ভেদ্য বাঁশেরকেল্লাকে আহত করতে সক্ষম হলেও আহত করতে পারেনি তিতুমীরের সৈন্যদলের সাহসকে। আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত জমিদার ও ইংরেজদের সমন্বিত বাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে তিতুমীরের সেনাবাহিনী। তাদের মনে ভয় নেই, সংশয় নেই, আক্ষেপ নেই, নেই গোলামির জীবনে বেঁচে থাকার ইচ্ছা। তারা ন্যায়ের জন্য মৃত্যুকে পরম বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে। অশ্বারোহী ইংরেজ ও তাদের সাথে কৃষ্ণদেব রায়, কালিপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, গৌরি প্রসাদ চৌধুরী ও দেবনাথ রায়ের মতো জমিদারদের সমন্বিত বাহিনী লড়াই করছে তিতুমীরের বিপক্ষে।
লেফটেন্যান্ট স্টুয়ার্ট ঘোড়ার ওপর বসে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত, তার সাথে আছে বারাসাতের কালেক্টর আলেক্সান্ডার।
“আলেক্সান্ডার, তুমি তো আগেও এদের সাথে যুদ্ধ করেছো?”
“জি, স্যার।”
“তারা লড়াইয়ে কী ব্যবহার করছে?”
“স্যার, তারা মূলত লাঠিয়াল কিন্তু কারো কারো কাছে বর্শা ও তলোয়ারও আছে।”
“আমি যতই দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। উইলিয়াম বেটিঙ্ক বলেছিল বাঙালিরা কাপুরুষ। কিন্তু এমন লড়াকু সৈন্য গ্রেট ব্রিটেনে ও আছে বলে আমার মনে হয় না।”
“আমার ও তাই-ই মনে হয়।”
“তাদের নেতার নামটা কী বলেছিলে যেন?”
“তিতুমীর”
“তিতুমীর……..তিতুমীর”
“তাদের দুর্গটা ও ওদের প্রধান অস্ত্র বাঁশের তৈরি”
“সত্যিই, বিস্ময়কর। আমি অভিভূত।”

হাতের তালু ঘষতে ঘষতে গোবরা-গোবিন্দপুরের জমিদার দেবনাথ রায় এর আগমন, তার মুখে বিনয়ী ও চাতুরতা মিশ্রিত হাসি, মাথা ইংরেজ লেফটেন্যান্ট স্টুয়ার্টের কাছে নত।
“স্যার, কেমন দেখছেন? জিতব তো।”
“আপনাকে আপাতত এই বিষয়ে চিন্তা করতে হবে না। আপনি এখন চলে গেলেই আমি খুশি হব।”
“আহা! রাগ করছেন কেন। আমরা তো আপনারই লোক। আমাদের ভালো মানেই আপনাদের ভালো। সবই স্বার্থের ব্যাপার। আপনার স্বার্থ আছে বলেই তিতুমীর দমনে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছেন। স্বার্থ না থাকলে দিতেন না।”
“আপনার উপস্থিতি পরিবেশটাকে জঘন্য করে তুলেছে। আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি না।”
“রাগ করবেন না, স্যার। আপনি মালিক, আমি ভৃত্য। চলে যেতে বলেছেন, চলে যাব। তবে আপনার সম্মানে ছোট একটা অনুষ্ঠান রেখেছি আজ রাতে। যদি উপস্থিত থাকেন অনেক ভালো লাগবে।”
কুর্নিশ অবস্থায় চলে গেল দেবনাথ রায়। ব্যক্তিত্বহীন জমিদারের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলো না লেফটেন্যান্ট স্টুয়ার্ট।
যেখানে একদল সেনা তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে লড়াই করছে অপরদিকে একদল যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়েও যাচ্ছে। তিতুমীরের লাঠির আঘাতে ধরাশায়ী অশ্বারোহী এক ইংরেজ সৈন্য। সৈন্যের তরবারি ছিনিয়ে নিয়ে লাফ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসল তিতুমীর। কামানের গোলা মুহুর্মুহু আঘাত করছে বাঁশেরকেল্লাকে। হঠাৎ গর্জে উঠল তিতুমীর। তার কণ্ঠ আজ কামানের গর্জন থেকেও শক্তিশালী।
“প্রিয় ভাইয়েরা! আজ বাংলার মাটি সাহসী, এই মাটি থেকে ফসল ফলানো চাষিরা সাহসী, আজ বাংলার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই সাহসী। আমাদের ক্ষুদ্র জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত মৃত্যুবরণ করেছি। গোলামি করেছি নরপশু জমিদার ও ইংরেজদের। মৃত্যু আমাদের কাছে নতুন নয়। আজ নারিকেলবাড়িয়ার মাটি এই পিশাচদের রক্তে সিক্ত করবো। সবাই এগিয়ে যাও। আল্লাহু আকবার।”
তিতুমীর ঘোড়ার লাগাম হাতে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হলো। দাবানলের মতো তার শব্দ হতে নিঃসৃত আগুন সকল যোদ্ধার হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ক্ষুধার্ত সিংহের মতো তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল শত্রুপক্ষের ওপর। সৈয়দ মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীরের সাথে গোলাম মাসুম এসে দাঁড়ায়।

তিতুমীরের ভাগ্নে, প্রিয় অনুচর এবং সেনাবাহিনীর অধিনায়ক গোলাম মাসুম ক্লান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে, “মামা, আমরা কী পারব?”
“মৃত্যুর আগে যদি পরাজয়ের ভয় আমাদের হৃদয় আকাশকে আচ্ছন্ন করে, তবে পারবো না। মনে রেখো গোলাম মাসুম, যখন তোমার হৃদয়ে বজ্রপাতের জন্য মেঘ দ্বারা সত্যের সূর্যকে ঢাকার প্রয়োজন হবে না তখন তুমি অজেয় হবে। জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হলো নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যে এই যুদ্ধে সফল হবে, দুনিয়াও তার আখিরাতও তার।”
তিতুমীর ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত গতিতে শত্রুর দিকে ছুটে যায়। গোলাম মাসুম হাতের তরবারিকে আরো মজবুত করে ধরে। তরবারি শত্রুর শরীর থেকে মাথাকে আলাদা করে দেয়। গোলাম মাসুম কেন যেন মৃত্যুর সংজ্ঞা ভুলে যায়। এই যুদ্ধ তার প্রথম যুদ্ধ নয়, কিন্তু এই যুদ্ধে সে নবজাগরণ খটুজে পাচ্ছে। তার এখনও মনে পড়ে জমিদারদের বিরুদ্ধে তার প্রথম যুদ্ধের কথা। তখন সৈন্যসংখ্যা এতো বেশি ছিল না। যুদ্ধটা ছিল মুসলিমদের ওপর অনৈতিকভাবে কর চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে। আজকের যুদ্ধ শুধু ন্যায় অন্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আজকের যুদ্ধ নিজের আত্মাকে ওই জমিদার ও ইংরেজদের হাত থেকে মুক্ত করার। আজকের যুদ্ধ শুধু মুসলমানদের নয়, আজকের যুদ্ধ এই বাংলার, ভারতবর্ষে বসবাসকারী হিন্দু-মুসলিম সকলের। গোলাম মাসুম একবার বীরদর্পে যুদ্ধ করা তিতুমীরের দিকে তাকালো। সে যুদ্ধে মনোযোগী হয়।

তিতুমীরের জীবন সহজ নয়, কখনোই ছিল না। শৈশবে রোগাক্রান্ত দুর্বল শিশু থেকে বাংলার বিখ্যাত কুস্তিগির। হজ্জব্রত পালনে মক্কা গিয়ে নিজের জীবনকে পুনরায় আবিষ্কার থেকে ২৪ পরগনা, নদীয়া, ফরিদপুর দখল করে নিজেকে বাদশা ঘোষণা। জীবন ও মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখা হয়ে গেছে। তার চোখের সামনে এখনও ভেসে ওঠে বাঁশের কেল্লা তৈরির সময়কার কথা। এতদিন বাঁশ ও কাদামাটি দিয়ে তৈরি দুর্গটি সুরক্ষাকবজ হিসাবে কাজ করেছে, আজও কি পারবে? প্রশ্নটির উত্তর জানা নেই তিতুমীরের। যখন মোল্লাহাটির কুঠিয়াল ডেভিস ও জমিদারদের সম্মিলিত আক্রমণ করেছিল তখন সে পেরেছিল, যখন বারাসাতের কালেক্টর ও জমিদার বাহিনী আক্রমণ করেছিল তখন পেরেছিল, আজ কেন পারবে না। তাকে পারতেই হবে, তাদেরকে পারতেই হবে। তিতুমীর আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলে ওঠে, “হে সর্বশক্তিমান, সাহায্য করুন, সাহায্য করুন, সাহায্য করুন।”

তিতুমীরের পক্ষে যুদ্ধ করছে গোপাল দাস। তিতুমীর মানুষটা তার খুবই প্রিয়। জমিদারের কর পরিশোধ না করার কারণে যখন জমিদারের লোকজন তাকে মারধর করছিলো। তিতুমীর তাকে সাহায্য করে। একজন আরেকজনের ভাই হতে যে রক্তের এবং ধর্মের সম্পর্কের প্রয়োজন নেই তা তিতুমীরের কাছ থেকেই শিখেছে সে। তিতুমীর নিজেকে বাদশা হিসাবে ঘোষণা করার পর ও এতোটা বিনয়ীভাবে কথা বলে যে তাকে নিজের পরিবারের কেউ মনে হয়। গোপালের মতো হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই তিতুমীরের হয়ে যুদ্ধ করছে। তিতুমীর প্রায়ই বলে, “এই দেশের হিন্দু-মুসলিমতো একই জমিতে জন্মানো দুইটি ফুল। গন্ধ হয়তো ভিন্ন, রঙ হয়তো ভিন্ন, কিন্তু একে অপরের সাথী এবং দুইটি ফুলের মিলিত সৌরভ সারা বিশ্বের কাছে ভ্রাতৃত্বের উদাহরণ সৃষ্টি করবে।”

লেফটেন্যান্ট স্টুয়ার্ট গম্ভীর মুখে যুদ্ধ অবলোকন করছে। সে চিন্তা করেনি এই যুদ্ধ এতোক্ষণ পর্যন্ত চলবে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। এতো সুসজ্জিত দক্ষ বাহিনী নিয়ে এসেও কি তাকে পরাজিত হতে হবে। তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে। বাঁশের কেল্লা এতো মজবুত হতে পারে তা ভেবে সে বারবারই অবাক হচ্ছে। নিজের অজান্তেই শত্রুকে বাদশা হিসাবে মেনে নেয় সে। এতো উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সাহস, শক্তিসম্পন্ন বাঙালি যে ইংরেজ উপনিবেশবাদকে ভোগাবে তা সে আন্দাজ করতে পারে। আলেক্সান্ডার তার পিছনে এসে দাঁড়ায়।
“স্যার, যুদ্ধে তিতুমীর মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। পরিস্থিতি আমাদের দিকে।”
“ভালো।”
“স্যার, আপনি কি খুশি নন?”
“তিতুমীরকে কি জীবিত আনা যাবে?”
“বলতে পারছি না, স্যার। যদি অনুমতি পাই একটি কথা বলতে চাই।”
“বলো”
“তিতুমীরকে মৃত দেখাই ইংরেজ উপনিবেশবাদের জন্য মঙ্গলজনক। তিতুমীর এবং গোলাম মাসুম কেউ যদি এইখান থেকে বেঁচে যায় তা আমাদেরকে ভোগাবে।”
“আমারও তাই-ই মনে হয়। আগুনকে দাবানলে পরিণত হওয়ার আগেই নিভিয়ে দেওয়া উচিত। এখন যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধে ইতি টানো।”
আলেক্সান্ডার প্রস্থান করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য অস্ত যাবে। লেফটেন্যান্ট স্টুয়ার্ট ক্লান্ত লাল আকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাঁশের কেল্লার ভেতর রক্তাক্ত তিতুমীরকে শোয়ানো হয়েছে। তার পাশে ক্রন্দনরত গোলাম মাসুম এবং অন্যান্য অনুসারী। একজন আহত গোপাল দাসকে কাঁধে করে বাঁশের কেল্লার ভিতরে নিয়ে আসল। সে আর বেঁচে নেই। তিতুমীরের কাছে সবকিছুই ঘোলাটে লাগছে। তার কান্না পাচ্ছে। সে শুনতে পাচ্ছে তার দাদী তাকে ডাকছে।
“তিতামীর, তিতুমীর, কিভাবে কতকত করে তিতা ঔষধ খেয়ে ফেললি। এই তিতামীর, এই আমার তিতুমীর।”
তিতুমীর তার মাকে দেখতে পাচ্ছে, সে মুচকি হাসছে।
তিতুমীর তাকে বলছে, “মা, একবার মাথায় বিলি কেটে দাও না। একবার……আর একবার।”
সে তার বাবাকে দেখতে পাচ্ছে। তার বাবা তাকে বলছে, “ভয় পাচ্ছিস রে বোকা। ভয় পেতে হয় না, আমাদের রক্তে হযরত আলী (রা.) এর রক্ত। আমরা ভয় পাই না রে।”
গোলাম মাসুম তিতুমীরকে জড়িয়ে ধরে শুধু কাঁদছে। তার ভেতর শূন্যতা বিরাজ করছে, সে কিছু চিন্তা করতে পারছে না। সে অস্ফুট স্বরে তিতুমীরের কণ্ঠে কালিমা শুনতে পেল। এই কি ছিল তিতুমীরের শেষ কালিমা? গোলাম মাসুম নির্বাক, প্রকৃতি নির্বাক। আজ সকলেই যেন পাথরের মূর্তি, যাদের চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরছে। এই অশ্রু হয়তো থেমে যাবে কিন্তু তিতুমীর কি ফিরে আসবে?

গ্রেফতার করা হয়েছে গোলাম মাসুম এবং বাঁশের কেল্লায় অবস্থান করা অন্যান্য সৈন্যদের। লেফটেন্যান্ট স্টুয়ার্ট তাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তাদের অশ্রুসিক্ত চোখে পরাজয়ের কথা লেখা নেই। তারা বীরত্বের প্রতীক, তাদের চোখ বীরত্বের প্রতীক। এই চোখের আগুন ঝলসে দিতে পারে এই রুঢ় পৃথিবীকে। মৃত্যু তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু আজ ফাঁসির মঞ্চ যে ভীত।

SHARE

Leave a Reply