Home জাতীয় কিশোরকণ্ঠ পাঠ প্রতিযোগিতা সোনালি অভিরুচি -আতিয়া তাসনিম প্রমা

সোনালি অভিরুচি -আতিয়া তাসনিম প্রমা

কিশোরকণ্ঠ জাতীয় গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০২০-এর ক-গ্রুপে
দ্বিতীয় স্থান অধিকারী গল্প

আজ সময়টা শুক্লা দশমী। জমাটবাঁধা অসিত বর্ণের আকাশে আজ অর্ধবৃত্তাকার রূপবতী চাঁদ। তার নরম আলো কালো রঙা লোহার গ্রিল গলে ইরার মুখ স্পর্শ করছে। বাইরে মৃদুমন্দ শীতল বাতাসে অবগাহনে ব্যস্ত বাড়ির সামনের মেহগনি গাছের সবুজ পাতাগুলি। দূরে কোথাও মিটমিট করে জ্বলছে সোডিয়াম লাইটের হলুদ আলো। সেই সাথে আসছে নিশাচর পোকাদের উপস্থিতির প্রমাণস্বরূপ সূক্ষ্ম ঝিঁঝিঁ শব্দ। জানালার পাশের ছোট টেবিলে রাখা পিল সুজের মোমবাতির আগুন দপদপ করে জ্বলছিল কিছুক্ষণ আগে। হঠাৎই দমকা হাওয়া এসে তাকে নিভিয়ে দিল।
ইরার খাটের পাশে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে কুসুম। সে মুখ হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। তার নাক থেকে আসছে কেমন এক বিদঘুটে শব্দ। ইরা জানে এটাকে বলে “নাক ডাকার শব্দ”। কিন্তু শব্দখানা বড্ড ভয়ংকর! এই মাঝ রাতে কুসুমের নাক ডাকার আওয়াজে ইরার কেন জানি খুব ভয় লাগতে শুরু করল! অথচ সে এই শব্দটির সাথে গোটা আট বছর ধরে পরিচিত!
ইরার খেয়াল হয় আর দিন পাঁচেক পর পূর্ণিমা। সেদিন আকাশে এমন আধা খাওয়া বিস্কিটের মতন চাঁদ থাকবে না। অর্ধ-বৃত্তাকার চাঁদ ইরার কাছে দু-কামড় খাওয়া মেরি বিস্কিটের মতন। পূর্ণিমার দিন আকাশে খুব সুন্দর একখানা চাঁদ ওঠে। বাবার ঘরের জানালা দিয়ে সে চাঁদ আরো সুন্দর দেখা যায়। বাবার কোলে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থেকে ইরা পূর্ণিমার চাঁদ দেখে। বাবা তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চাঁদের বুড়ির গল্প শোনায়। কিন্তু এবার পূর্ণিমায় তার কিছুই হবে না। বাবা যে এবার বাড়িতেই থাকবে না। বাবার কথা মনে পড়তেই ইরা চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করলো।

“বাবা, আমিও যাব তোমার সাথে। তুমি একা চলে গেলে আমি তোমাকে ছাড়া একা একা থাকব কী করে !”
“কে বলেছে তুই একা থাকবি? কুসুম থাকবে তো তোর সাথে। ইরা, মারে! তুইতো আর অবুঝ না। পাশের জেলা শহরের অবস্থা খুব খারাপ। আমাকে দিনরাত ডিউটিতে থাকতে হবে। আমি চাইলেও তোর কাছে আসতে পারবো না। শুধু শুধু তুই ওই জায়গায় গেলে তোর জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে আমি দুশ্চিন্তায় কাজে মন দিতে পারব না। তার চেয়ে তুই এখানে থাক। আমি কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ত থাকব। আর কয়েক দিন পরইতো রোজা শুরু। তারপর ঈদ। ঈদের ছুটি পেলেই আমি চলে আসব।”
ইরা ভাবে তার বাবাটার সবদিক ভালো। সৎ, দায়িত্ববান পুলিশ অফিসার। শুধু একটা দিকই খারাপ। খুব খারাপ। তার বাবাটা কথা দিয়ে কথা রাখে না। না হলে সেই মাস তিনেক আগে আসবে বলে সেই যে চলে গেল আর আসছেই না। দিন দিন তার বাবা যত বলছে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা ততই যেন চারপাশের পরিবেশ আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। তার বাবারও বাড়িতে খুব জলদি ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা ভিত্তিহীন হয়ে পড়ছে।
অভিমানী ইরা ডান হাতের তালুর ওপর পিঠ দিয়ে তার অশ্রুসিক্ত চোখ দুবার ঘষে নেয়।

সেই রাতটার কথা ইরার খুব করে মনে পড়ে। মা তাকে দু’হাতে জড়িয়ে রেখেছিল। জানালার পাশের সিটে সে সেবার প্রথমবার বসেছিল। রাস্তার ধারের গাছপালা, বাড়িঘর, দোকান, মানুষগুলো সাই সাই করে পিছনের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। আর সে বাসের মধ্যে চুপচাপ বসে থেকে তা দেখছিল। সে যে কী ভালো লাগছিল ইরার! পাশের সিটের অ্যান্টি ইরাকে দুটো ললিপপ দিয়েছিল। ইরা তার মধ্যে থেকে একটার খোসা মাত্র ছাড়িয়ে মুখে দিয়ে তার স্বাদ অনুভব করতে শুরু করেছে। এমন সময় তীব্র আলোতে তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের জন্যে সে কেবল উজ্জ্বল সাদা বর্ণ দেখে। সেই সাথে তীব্র এক ভয়ঙ্কর শব্দ। যেন কোনো কিছু দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তীব্র আলো কেটে গেলে ইরা গাঢ় ধূসর বর্ণের ধোঁয়া দেখতে পায়। ইরা তার হাতে থাকা ললিপপটা আবার মুখে দিলে বুঝতে পারে ললিপপটার স্বাদ বদলে গেছে। ঈষৎ ক্ষারীয় স্বাদের সাথে সে সেবার প্রথম পরিচিত হয়। ইরা দেখে তার হাতের ওপর টপটপ করে পড়ছে চিটচিটে লাল তরল। হঠাৎ ও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে। শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে উষ্ণ তরল গড়িয়ে পড়ছে। ইরা আর কিছু ভাবতে পারে না। হঠাৎই সে সব কিছু অন্ধকার দেখতে শুরু করল।
মায়ের রক্তাক্ত কোলে মাথা রেখে ইরা গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। তবে ও যদি ওর মায়ের বুকে মাথা রাখত তাহলে হয়ত বুঝতে পারত ইরার মায়ের হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়া আর তার মায়ের কোলে মাথা রাখার মাঝে সময়ের ব্যবধান মাত্র কয়েক ন্যানো সেকেন্ড!
সেই রাতের পর ইরা আর কোনও দিন তার মাকে দেখতে পায়নি।
বাবা সেদিন বাসে ছিলেন না। বাবার সাথে ইরার কথা হয় সপ্তাহ খানেক পরে। বাবা বিমর্ষ চেহারায় তার সামনে বসেছিল। তার চোখে মুখে ছিল ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তার প্রগাঢ় ছাপ। ইরা চোখ খুলেই বাবাকে বলে,
“বাবা মা কই?”
থমথমে মুখে বাবা বলেন, “মা চলে গেছে।”
“কই গেছে? নানুবাড়ি? সেখান থেকেই তো আসলাম। কিন্তু কখন যে বাস থেকে নামলাম মনেই পড়ছে না!”
“আল্লাহ তোমার মাকে নিয়ে গেছে মা। ও আর আসবে না।”
“কেন আসবে না?”
“আল্লাহ আর আসতে দেবেন না।”
ইরা আর প্রশ্ন করেনি। তার মনে আছে, মা একদিন তাকে বলেছিল, “ আল্লাহ যদি কাউকে কিছু দেন তা উনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ তাকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। আর যদি কারও কাছ থেকে কিছু নিয়ে নেন, তবে উনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেটা কেউ ফিরে পেতে পারে না।”

তার দুদিন পর বাবা ইরাকে একটা সুনসান নীরব জায়গায় নিয়ে যান।
চারিদিকে স্তূপাকার মাটি ছাড়া ইরা আর কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। বাবাকে দেখে মনে হচ্ছিল বাবা উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে। কিছুক্ষণ পর বাবা এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ায়। ভগ্নকণ্ঠে বলে, “ এখানে তোমার মা শুয়ে আছে ইরা। মাকে সালাম দাও।”
ইরা দেখল চারপাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট একটা জায়গা। তবে ও যদি পরিমাপ করতে জানত তবে বুঝত এ জায়গাখানা সাড়ে তিন হাতের সমান। ছোট্ট ইরার মনে এ প্রশ্ন একবারও আসেনি যে তার মা এখানে কেন শুয়ে আছে? বাবার বাধ্য মেয়ের মতো সে মাকে সালাম দিল। তারপর থেকে বাবা মাঝে মাঝেই ইরাকে ওখানে নিয়ে যায়। ইরা এখন জানে এটা হলো তার মায়ের কবর। ইদানীং তার মায়ের কবরের সামনে গেলে তার কান্না পায়। অতীতে এমনটা হতো না। মাকে নিয়ে তার মনে অনেক অভিযোগ। সেসব অভিযোগগুলো কাউকে বলতে পারে না ইরা। সে অভিযোগের কথাগুলো জমে জমে ধোঁয়াশা হয়ে উড়ে যায়।
ইরা তার চার বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের শরীরের ঘ্রাণ পেয়েছে। এরপর আর কোনো দিন সে মায়ের হাতের স্পর্শ পায়নি। মায়ের পরে সে কুসুমের কোলেই মাথা রেখে ঘুমিয়েছে তার জীবনের অধিকাংশের চাইতেও বেশি সময়। কুসুম ইরার দূর সম্পর্কের খালাতো বোন। ইরার মায়ের বাবার বাড়ির দিকের কেউ একজন। কুসুম ইরাকে অ আ ক খ শিখিয়েছে। নিজের হাতে খাওয়া শিখিয়েছে। নামাজ পড়তে শিখিয়েছে। সারাটা দিন যেন তার ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকে। ইরা কুসুমকে তার মা মারা যাওয়ার ছয় মাস পর তাদের বাড়িতে আবিষ্কার করে।
দূরে কোথাও নেড়ি কুকুরের চাপা গোঙানির আওয়াজ উঠলে ইরা চমকে ওঠে। সারা ঘর জুড়ে জমাটবাঁধা অন্ধকার। চাঁদের ম্লান আলোয় অন্ধকার যেন আরো স্পষ্টই হয়। হঠাৎই ইরার মনে প্রশ্ন জাগে, আজ যদি তার মা থাকত তবে এই মাঝরাতে হয়তো এতটা শূন্যতা তার অনুভূত হতো না। মা হয়তো তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রাখত। ইরার খুব ইচ্ছে হচ্ছে মায়ের শরীরের সেই ওম, সেই ঘ্রাণ, সেই হৃদস্পন্দন আরেকটি বার অনুভব করার। ইরা দেয়ালে হেলান দিয়ে অর্ধবৃত্তকার চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“দূরে আছ আজ বলেই;
শূন্যতায় আমি ভুগছি ভালোই!
প্রতিক্ষণ, প্রতি নিশায়;
অমানিশার চন্দ্রমায়।
মাখছে শরীর, ভিজছে চোখ।
ঢালেনি আদর ওই মুখ;
তুমি বড্ড অবুঝ!”
বেশ কিছুক্ষণ পর ইরার ক্লান্ত চোখ জোড়া ঘুমের আবেশে তলিয়ে যায়।
“ ইরাবু, তুমি একটু উইঠা খাইয়া নাও। খালু যদি জানতে পারে আমি তোমারে দেরি করে খাওন দিসি হেয় খুব রাগ করব।”
“উফ! কুসুম আপা তুমি যাওতো আমায় একটু ঘুমাতে দাও। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।”
থমথমে কণ্ঠে কুসুম বলে, “ তুমি কাইল সারা রাত্র ঘুমাওনি, তাই না?”
কুসুমের কথা শুনে ইরা চমকে চোখ মেলে তাকায়। “খালু, খালাম্মার কথা ভাইবা মনে কান্দন আসতেছিল? আমারে ডাকলেই পারতা।”
ইরা ধড়ফড় করে উঠে বসে।
“ তুমি বড্ড চাপা স্বভাবের মাইয়া ইরাবু। হেইডা কিন্তু ঠিক না। এতে কইরা মনের দুঃখ বেদনা আরো বাড়ে।”
নিশ্চুপ ইরার মাঝে কুসুমের কথার প্রেক্ষিতে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হলো না।
“ ক্ষুধা লেগেছে কুসুম আপা। খেতে দেবে না?”
“তুমি উইঠা হাত-মুখ ধুইয়া নাও। আমি রুটি-ডিমভাজি দিতাসি।”
“কালকের সেই তেলের পিঠা ফুরিয়ে গেছে?”
“না আছে। ক্যান?”
“আজ সকালে আমি ওটাই খাব।”
“হায় আল্লাহ! মাইয়া কয় কি! চারদিকে রোগ জীবাণু নাচতে সে আর তুমি এহন বাসি পিঠা খাইবা? খালু জানলে আমারে হাজতে রাইখা দিব!”
“মোটেও না! আর বাবা জানবে কী করে? হুম? তুমি জানো না, পিঠা বাসি হলেই আমার বেশি ভালো লাগে? তুমি নিয়ে আসো। বাবা জানতে পারবে না।”
“তুমি না ইরাবু, আমার একটা কথাও শুনো না। তোমারে আমি একটুও বুঝবার পারি না। আধা পয়সারও পাত্তা পাই না আমি তোমার কাছে।”
“এতবড় একটা অবাস্তব কথা তুমি ভাবলে কী করে কুসুম আপা! তুমি জানো, আমি তোমার সব কথা না শুনতে চাইলেও তুমি আমার সব কথা শুনতে পাও। এই আমি মানুষটা মনে মনে যা ভাবি সবই বুঝে যাও। আমার চোখ দেখলেই তুমি বুঝে যাও আমার কী লাগবে! আচ্ছা কুসুম আপা, তুমি কি জানো কেন আমাদের জীবনে রক্তের সম্পর্কের মানুষ ছাড়াও এমন মানুষ থাকে যাদের সাথে আমাদের অন্তরাত্মার সম্পর্ক থাকে? কেন এই মানুষগুলোর ছায়া অবলোকন করার আগেই তার উপস্থিতি অনুভব করা যায়? তুমি কি জানো কুসুম আপা, তুমি আমার জীবনে ঠিক তেমনি একটা মানুষ?”
ইরার গম্ভীর উক্তিতে কুসুম যারপরনাই অবাক হয়। এ ধরনের অভিজ্ঞতার সাথে সে যদিও বা পূর্ব পরিচিত। তবুও প্রতিবার সে ভীষণ অবাক হয়। কতই আর বয়স হবে মেয়েটার? বারো কি তের? এই বয়সের মেয়েরা সাধারণত এত কঠিন কথা বোঝে না। কিন্তু ইরা বোঝে। শুধু বুঝেই ক্ষান্ত থাকে না, প্রতিনিয়ত সে নতুন নতুন দর্শন আবিষ্কার করে। যার সবটাই শুনতে হয় কুসুমকে। ইরার ভাবগাম্ভীর্য কথামালার কিছু কুসুম বোঝে, কিছু বোঝে না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কুসুম জানে, চার বছর বয়স থেকেই মাকে কাছে না পাওয়াতে ইরা তার চারপাশের জগৎটাকে অন্যরকম করে দেখতে শিখেছে। যে জগতের সাধারণ বিষয়গুলোও তার কাছে অসাধারণ বলে গণ্য হয়। যুক্তিহীন অনুভূতি, স্পন্দন, শিহরণের যুক্তি খুঁজতে চাওয়াতে তার মন আকুল হয়ে থাকে। কুসুম শান্ত স্বরে বলে,
“তোমার কথার ভাব বেশি ইরাবু। অত ভাবের কথা আমি ঠাওর করতে পারি না। তুমি হাত – মুখ ধুইয়া বাইরের ঘরে আসো। আমি খাবার দিতেসি।
ইরা লক্ষ করলো জানালার বাইরে যে মেহগনি গাছটা দেখা যায় তার দিকে। গাছের ডাল পাতার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে মাঝারি আকারের কাকের বাসাটা। ইরা দেখল, মা কাক সযতেœ তার শরীর দিয়ে আগলে রেখেছে কোকিলের ডিমটাকে। নিঃস্বার্থভাবে নিজের অজান্তেই নিজের শরীরের ওম বিলিয়ে দিচ্ছে কোকিলের ডিমটাকে।

মা, তুমি জানো? বাবা কেমন আছে? যদিওবা বাবা ভিডিও কলে কথা বলার সময় বলে যে বাবা ভালো আছে। কিন্তু আমি জানি মা, বাবা ভালো নেই। আমাকে ছাড়া বাবা কী করে ভালো থাকবে বলো? রাতে আমার লেখা কবিতা না শুনলে বাবার ঘুমই আসে না! জানো মা, বাবা না পাশের ওই জেলা শহরে যাওয়ার সময় আমার কবিতা লেখার খাতাটা নিয়ে গেছে। যাতে আমার কথা মনে পড়লে বাবা ওই কবিতাগুলো পড়তে পারে! আমাকে না জানিয়েই নিয়ে গেছে। ভেবেছে আমি যদি রাগ করে না দিতে চাই। বাবা কি বোকা! তাই না মা?
তুমি হয়তো ভাবছো আমি জানলাম কী করে? আমি সব বুঝি মা। জানো, বাবার সাথে আমার সপ্তাহে তিনবার ভিডিও কলে কথা হয়। বাবা তখন কালো রঙের রোদচশমা পরে। তোমার বরটা কত্ত বোকা! তাই না মা? ভাবে কালো চশমা পরলে বাবার চোখের পানি আমি দেখতে পারবো না!
মা জানো, কুসুম আপা না আমার আরেকটা মা। সৃষ্টিকর্তা বোধ হয় চাননি আমার জীবনে মায়ের শূন্যস্থান থাকুক। তাই না মা? শূন্যস্থান পূরণের জন্য তিনি হয়তো তাই কুসুম আপাকে পাঠিয়েছেন। না হলে কুসুম আপা আমাদের বাড়িতে কেন আসবে বলো? সেদিন যখন কুসুম আপাকে প্রথম দেখেছিলাম খুব রাগ হয়েছিল। কেন অচেনা অজানা একটা মেয়েকে বাবা আমাকে আগলে রাখার জন্য এ বাড়িতে আনবেন? তুমিতো জানোই বাড়িতে অপরিচিত মানুষ আসা আমার বড্ড অপছন্দের। আমি কুসুম আপাকে চিমটি দিতাম, ওর হাত কামড়ে দিতাম। ও তাও আমার পিছন পিছন খাবার নিয়ে দৌড়াতো। সারাদিন আমি ওর সাথে খারাপ আচরণ করা সত্ত্বেও বাবা রাতে বাড়িতে ফিরলে আমার নামে একটা অভিযোগও করেনি কখনো! তারপর কবে থেকে ওকে যে আপন ভেবে বসলাম মনে নেই! মাঝে মাঝে মনে হয় এগুলো এইতো সেদিনের ঘটনা। অথচ এর মাঝেই আটটা বছর চলে গেছে !
মা, মাগো! তুমি জানো। আমার এস্ট্রফোবিয়া আছে। বাজ পড়ার শব্দ শুনলে আমার বুকে বড্ড কষ্ট হয় মা। মনে হয় বাজ যেন আমার হৃদপিণ্ডটাকে খুবলে খাচ্ছে। আমার শরীর ঘামে। আমি শ্বাস নিতে পারি না। বড্ড কষ্ট হয় আমার। জানো মা, যখনই আকাশ কালো করে আসে কুসুম আপা সব কাজ ফেলে রেখে আমার সাথে সাথে থাকে। যদি বাজ পড়ে!
যেদিন যেদিন বাজ পড়ে, কুসুম আপা ওর ওড়না আমার মাথার দুপাশে পেঁচিয়ে দিয়ে আমাকে শক্ত করে ওর বুকের সাথে চেপে রাখে। যেন আমার কানে ও বাজ পড়ার সেই ভয়ানক আওয়াজকে আসতেই দেবে না! আমি যখন গত বছর বৃত্তি পরীক্ষা দিলাম, কুসুম আপা সারারাত জেগে থাকত। আমার ঘুম এসে গেলে ও কড়া করে চা বানিয়ে আনতো।
আচ্ছা মা, তুমি কি জানো, কুসুম আপা আমায় কেন এত আগলে রাখে? কেন এতো ভালোবাসে আমায়? জগতে রক্তের সম্পর্ক ব্যতিরেকে এমন মমতার সম্পর্ক কী করে হয়? আমি তো…“এইটুকু লিখার পর ইরা আর লিখতে পারল না। নিচ থেকে রানু আর দিমুর গলার আওয়াজ আসছে। ওরা চড়া গলায় ইরাকে ডাকছে নিচে নামার জন্য। ইরা ওর হালকা বেগুনি রঙের নরম মলাটের ডায়েরিটা বন্ধ করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো।
বাড়ির কাঠের দরজার ছিটকিনিটা স্পর্শ করতেই কুসুম যেন এক প্রকার দৌড়ে এলো। তার হাতে একখানা সার্জিক্যাল মাস্ক।
“ইরাবু, বাইরে যাও ক্যান? আওয়াজ শুনে তো মনে হইল রানু আর দিমু আইসে।”
“হুম। অনেক দিন ব্যাডমিন্টন খেলতে যাই না তাই হয়তো…”
“তুমি খেলতে যাবা? খালু জানলে খুব কষ্ট পাইব।”
“চিন্তা করো না কুসুম আপা। বাবাকে আমি কথা দিয়েছি এই কটা মাস আমি বাইরে খেলতে যাব না। আমি আমার দেওয়া কথা রাখি।”
কুসুম ইরার মুখে মাস্ক পরিয়ে দেয়।
“আজ কালতো তোর দেখাই পাওয়া যায় না। খেলতে আসিস না কেন ইরা?
“বাবা বারণ করেছে যেন আমি বাইরে না যাই।”
“আঙ্কেলতো এখন বাড়িতে নেই। তুই খেলতে আসলেও তো জানতে পারবে না।”
“আমি বাবার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি দিমু।”
ভ্রুযুগল সংকুচিত করে রানু বলে, “তাতে কী? আর তুই এমন দূরে দাঁড়িয়ে কেন? এদিকে এসে কথা বল।”
“বাবা বলেছে বাইরের কারো সাথে দেখা করার সময় এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে।”
“আরে হ! আঙ্কেলতো আর জানতে পারছে না!”
“আমি যাব না রানু। আর তোরাও খেলিস না। চারদিকের অবস্থা ভালো না।”
“কিসের কথা বলছিস? ও, ভাইরাসের! ধুর, সে তো শহরে ছড়িয়েছে। এখানে কোনো সমস্যা নেই। তুই আয়। আর মুখে কী পরেছিস ওটা?”
“মাস্ক।”
রানু আর দিমু শব্দ করে হেসে উঠলে।
“আমি যাব না। বাবা কষ্ট পাবে।”
রানু আর দিমু মুখে ভেঙচি কেটে পিছনের দিকে হাঁটা দিলো। ইরার বুক চিরে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।
প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যা বেলা ইরা আজও পড়তে বসেছে। পাশে বসে কুসুম হালকা নীল রঙের কাপড়ের ওপর হেমফোড় তুলে প্রজাপতির নকশা আঁকছে। হঠাৎ কুসুম খেয়াল করল, ইরা নিঃশব্দে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
“পড়া থামায় দিলা যে?”
কুসুমের প্রশ্নে ইরা কোনো জবাব দিল না।
কুসুম জানে ইরা যখন গভীরভাবে কোনও কিছু চিন্তা করে তখন উদ্দেশ্যহীনভাবে তাকিয়ে থাকে। যেমনটা এখন রয়েছে।
বেশ খানিকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে ইরা বলে, প্রেম কাকে বলে, জানো কুসুম আপা?”
“জানবো না ক্যান! ওই টিভি সিনেমায় দেখ নাই? হা হা হা!”
“উঁহু, ওই প্রেম না। দেশপ্রেম।”
কুসুম জিজ্ঞাসা সূচক দৃষ্টিতে তাকাল। ইরা তার হাতে থাকা বাংলা রচনার বইটা কুসুমের হাতে ধরিয়ে দিলো। কুসুম সিক্স পাস মেয়ে। বাংলা পড়তে জানে। ভাঙা ভাঙা স্বরে সে পড়তে শুরু করলো।
“দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি মায়া ভালোবাসা ও মমত্ববোধের সম্পর্ককে দেশপ্রেম বলে। যে দেশকে ভালোবাসে সে দেশের মানুষকে ভালোবাসে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক স্বার্থত্যাগী হয়। দেশপ্রেমিক দেশের কল্যাণের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠিত হয় না।
দেশপ্রেম সম্পর্কে মহানবি (সা) বলেছেন, “দেশ রক্ষায় একদিন, এক রাতের প্রহরা (রিবাত) ক্রমাগত এক মাস এর রোযা রাখা এবং সারারাত ইবাদাত করে কাটিয়ে দেওয়া অপেক্ষা উত্তম।” (মুসলিম)

কিছুক্ষণ থেমে কুসুম বললো, “এই কথা আমারে ক্যান পড়তে দিলা?”
“উফ! কুসুম আপা তুমি কি এই হাদিসটা বুঝলে না? শুনো, কেউ যদি দেশ রক্ষার জন্য একদিন, একরাত পাহারা দেয় তবে সে এক মাস রোযা রাখা এবং সারারাত ইবাদাত করার চাইতেও ভালো কাজ করলো।”
“ওহ। এইবার বুঝসি।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে ইরা আবার বলতে শুরু করলো, “আচ্ছা কুসুম আপা, বাবাও তো এখন একরকম দেশ পাহারা দিচ্ছে তাই না? ওই যে ওই দিন টিভিতে দেখালো বাবার মতো পুলিশরা শহরের বিভিন্ন জায়গায় থেকে পাহারা দিচ্ছে, গরিব মানুষদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। এটাও তো দেশসেবা, দেশ পাহারা দেওয়া যাতে মানুষের ক্ষতি না হয় তাই না?”
“হওয়ারই তো কথা!”
“আচ্ছা কুসুম আপা তাই যদি হয় তবে কি বাবাও অনেক ভালো কাজ করছে? বাবারও কি অনেক সওয়াব হচ্ছে?”
“হ। আল্লাহই ভালো জানেন। খালুতো অনেক সওয়াবের কাম করতেছেন।”
“আমিও এমন ভালো কাজ করতে চাই কুসুম আপা!”
“পুলিশ হইবা?”
“পুলিশ না হলে করা যায় না?”
“হয়তো যায়।”
“কিভাবে?”
কুসুম ইরার প্রশ্নে কিছু একটা উত্তর দিতে যাবে, এমন সময় রান্নাঘর থেকে প্রেসার কুকারের হুইসেলের আওয়াজ আসলে সে রান্নাঘরে ছুটে যায়।
আষাঢ় মাসের পাঁচ তারিখ। ইরা বারান্দার রেলিং ধরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের পিচঢালা রাস্তায় শাবু, টুকুন, জিতু, মনুরা ক্রিকেট খেলছে। ইদানীং এই রাস্তায় গাড়ি আসে না বললেই চলে। ইরার যদিও বা ভয় লাগছে এই সময়ে ওরা খেলছে, রোগ-বালাইয়ের শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও। তবুও অনেক দিন পর ওদের ক্রিকেট খেলা দেখতে ইরার বেশ লাগছে।
ব্যাট আছে জিতুর হাতে। সে চার, ছয় মেরেই যাচ্ছে। ইরা যেন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পায়, জিতু বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপ জিতে তাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, “ দেখ ইরা আমি পেরেছি!”

“ইরা, ইরা? এই ইরা! ইরা…”
নিচ থেকে মনুর আওয়াজ পেয়ে ইরা মাথা ঝুঁকালো।
“কী হয়েছে মনু ভাই?”
“আরে হ! এই জিতুটা এমন একটা ছক্কা মারলো! আমরাতো বলই খুঁজে পাচ্ছি না!”
“সেকি কথা!”
“বলটা মনে হয় তোদের বাড়ির পিছনে ওই জমির চাচাদের বাগানে পড়েছে। একটু এনে দিতে পারবি?”
“পারি, কিন্তু চাচির বাগানে ঢুকলেই তো চাচি রেগে যাবে। তার সাধের ফুলের বাগানে যে সে কাউকেই ঢুকতে দেয় না।”
শাবু কিছুটা সামনে এগিয়ে এসে বলে, “ইরা একবার গিয়ে দেখ না। তুই গিয়ে বলটা নিয়ে আসলে আমার দুরবিনটা তোকে দিয়ে দেবো।”
শাবুর দুরবিনের প্রতি ইরার লোভ নয়; আছে আগ্রহ। শাবুর প্রস্তাবটা ইরা ফেলতে পারে না। আলমারি থেকে মাস্কটা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পিছনের দিকটায় গেল। কুসুম নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে।
পরদিন শাবু ইরার কাছে দুরবিন পাঠালো টুকুনকে দিয়ে। দুরবিনটা প্রথমে হাতে নিল কুসুম। তারপর একটা কাপড় সেভলন পানিতে ভিজিয়ে দুরবিনটা ভালো করে মুছে ঘরের এককোণে রেখে দেয়।
“ইরাবু এই দুরবিনখানা কিন্তু তিনদিনের আগে ধরবা না। না হলে খালু রাগ করবো।”
কুসুম তার কথায় ইরার মধ্যে তেমন কোনও ভাবান্তর লক্ষ করলো না।
ইদানীং ধরে কুসুম একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করছে। রান্নাঘরের চাল-ডাল, আলু তেল সব কেমন যেনো উবে যাচ্ছে। গতকাল সকালেই বাজার থেকে গোটা দশেক আলু কিনে এনেছিল। তারপর তিনটে আলু রান্না করার পরও সাতটা আলু বাকি ছিল। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় রান্নাঘরে এসে দেখে আর তিনটে আলু আছে ! সেদিন আবার কৌটোতে যতটা না ডাল থাকার কথা, তার চাইতে কম ছিল। সকালে ফ্রিজে বেগুন দেখলো পাঁচটা। এখন দেখছে চারটা। কুসুম একবার ভেবেছিল ইরাকে জিজ্ঞেস করবে, যদিও কিছু জানে। কিন্তু ইরাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করার কথা ভাবলে কুসুমের অস্বস্তিবোধ অনুভূত হয়। তাই আর ইরাকে জিজ্ঞেস করা হয় না।
“কিছু খুঁজছো?”
“হ। ওই তোমার বৃত্তির কাগজ। খালু আইজ সকালে ফোন দিয়া কইলেন ওই কাগজ পত্তরগুলান থেকে কিসের একটা নম্বর উনার জানতে হইব। তা আমিতো সেগুলান খুঁজে পাইতেসি না!”
কুসুমের কণ্ঠে অস্থিরতা স্পষ্ট।
“দরকার কি অনেক বেশি?”
“খালুর কথা শুনে এমনইতো মনে হইতেসে।”
ইরা কিছুক্ষণ নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
গত দুদিন ধরে ইরার আচরণ কুসুমের কাছে বেশ অদ্ভুত ঠেকছে। মেয়েটা হঠাৎই যেন চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। বিষয়টা এমন না যে ইরা স্বভাবে বাচাল প্রকৃতির। কিন্তু যেটুকু কথা ও কুসুমের সাথে বলতো, দিন দুই ধরে তাও বলছে না। উপরন্তু ওকে সবসময় কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখায়। উদাস দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। তবে কুসুম আরেকটা বিষয়ও লক্ষ করেছে। সপ্তাহখানেক ধরে জমির চাচাদের বাড়ির প্রতি ইরার নজর, কৌতূহল, আগ্রহ আগের চাইতে বেশি বলে পরিলক্ষিত হয়।
এইতো পরশুই ইরা কুসুমকে বলে,
“আচ্ছা, কুসুম আপা জমির চাচাতো টিউশনি করে আয় করেন তাই না?”
“কোন জমির চাচা? ও, বাড়ির পিছনে যে জমির চাচা?”
“হুম।”
“তেমনটাই তো লোকমুখে শুনসি।”
“এই লকডাউনে তো কেউই আর টিউশনি করতে পারছে না। জমির চাচাও না। তাহলে চাচা-চাচিরা খাচ্ছে কিভাবে?”
“তা আমি কেমনে জানবো! তয় তাগোর একটা পোলা আছে। হেয় ইনকাম কইরা খাওয়াইবো।”
“কিন্তু মামুন ভাইতো ঢাকায় কলেজে পড়ে। লকডাউন তাই ওখানে আটকে গিয়েছে।”
“তাই কি? আমিও তো সিক্স পাস মাইয়া। সেই বারো বছর বয়স থেইকা এইহানে পইড়া আছি!”
“কিন্তু কুসুম আপা…”
“কী?”
“কিছু না। তোমার ভাত বোধহয় উতলে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি যাও।”
সেদিনের ঘটনাটা কুসুম একদম ফেলেও দিতে পারে না। আবার খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করে না। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে জমির চাচাদের প্রতি ইরার ততটা আগ্রহ ছিল না। তাই বলে যে অনীহা ছিল এমনটাও তো নয়। তাই কুসুম বিষয়টাকে ততটা আমলে নেয় না।
আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা কুসুম লক্ষ করেছিল দিন পাঁচেক আগে। দুপুরে ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে দেখে ইরা জমির চাচাদের বাড়ির দিকটায় নিস্পৃহ দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। মাথার ওপরে সূর্য দপদপ করে জ্বলছে। আকাশে কাঠফাটা রোদ। রোদ যে ইরার বড্ড অপছন্দের জিনিস তা যে কুসুমের জ্ঞানসীমার বাইরে নয়। তাই ইরাকে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কুসুম যারপরনাই অবাক না হয়ে পারে না।
“এই খাখা রোদের মাঝে খাড়ায় আছো যে ! ঘাড়ে জিন ভর করছে নাকি!”
ইরা চিকন স্বরে বলে, “কুসুম আপা এদিকটায় আসো। তোমার সাথে কথা বলি…”
কুসুম ইরার পাশে এসে দাঁড়ায়।
“একটা জিনিস দেখেছো কুসুম আপা?”
“কী?”
“জমির চাচাদের বাগানটা?”
“হ, দেখতাসি তো।”
“চাচাদের বাগানটা কিন্তু আর আগের মতো সবুজ সতেজ নেই। গাছগুলো সব মারা যাচ্ছে!”
“তাইতো দেখতাসি।”
“ঘটনাটা কিন্তু স্বাভাবিক না।”
“ক্যান?”
“চাচি যে এই বাগানের প্রতি কতটা যত্নশীল, তুমি কি তা ভুলে গেলে?”
“ভুলবো মানে! তার বাগানের পাশ দিয়াও সে কাউরে যাইতে দেয় না। বাগানে ঢুকা মাত্র চিক্কুর তোলে। যেই দজ্জাল মহিলা!”
“বাগানের এই অবস্থা কেন তা কি একবারও ভেবেছো?”
“ওতো ভাবা-ভাবির কী আছে? চাচির এহন আর বাগানের শোভা বাড়াইতে মন চায় না তাই খেয়াল করে না। সহজ হিসাব। আর তুমি এই রোদ্দুরের মাঝে থাইকো না। শেষে জ্বর, ব্যাধি হইলে আমি শেষ!”
কুসুম ভেবেছিল বৃত্তি পরীক্ষার কাগজগুলো পাওয়া যাচ্ছে না জেনে ইরা হয়তো তাকে কাগজগুলো খুঁজতে সাহায্য করবে। কিন্তু ইরা কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল দেখে কুসুম বেশ অবাক হলো।
মিনিট দশেক পর কুসুমকে অবাক করে ঘরে আসলো ইরা। তার হাতে একটা সবুজ রঙের ফাইল। তার চোখ লাল হয়ে আছে। চাহনিতে তার অপরাধবোধ। যেনো ও কোনো এক অমার্জনীয় অপরাধ করেছে। ইরাকে এরকম অবস্থায় দেখে কুসুম ভড়কে যায়। অস্ফুট স্বরে কুসুম জিজ্ঞেস করে।
“তুমি কাঁদতেসিলা! ইরাবু! তোমার চোখ-মুখের এই অবস্থা ক্যান?”
আলমারির সামনে থেকে সরে কুসুম ইরার দিকে এগিয়ে যায়।
ভগ্নকণ্ঠে ইরা বলে, “আমি সরি, কুসুম আপা। তুমি যেই কাগজগুলো খুঁজছিলে সেগুলো এই ফাইলে আছে।”
ইরার হাতের ফাইলটা দেখে কুসুমের মনে পড়ে খালুতো তাকে সবুজ রঙেরই একটা ফাইলের কথা বলেছিলেন। ইরার হাতে ফাইলটা দেখে কুসুমের মনের দুয়ারে হাজারটা প্রশ্ন কড়া নাড়তে লাগলো। কিন্তু সে সব প্রশ্ন ইরাকে করার কথা ভাবতেই তার মনে অস্বস্তিবোধ অনুভূত হয়। যত যাই হোক ইরার বয়স অল্প, চাপা স্বভাবের মেয়ে। তাছাড়া এ বাড়িতে কুসুম খুব প্রয়োজনীয় একজন মানুষ হলেও যে সে এ বাড়ির বাইরের মানুষ, তা যে কুসুমের বোধগম্য সীমার বাইরে নয়।
“তুমি কান্নাকাটি করছো নাকি?“”
“আমি সরি!”
“কী হইছে তোমার ? এমন করতাসো ক্যান? আমারেও কইবা না?”
ইরা আর কুসুমের অবস্থানের মাঝে খুবই সামান্য দূরত্ব। ইরা যেন কুসুমের শরীরের ওপর এক প্রকার আছড়ে পড়লো। কুসুমের শরীরের সবটুকু ওম যেনো ও শুষে নিতে চাইছে। ইরার এ আচরণে কুসুম যদিও বা ভীষণভাবে চমকিয়েছে; তবুও নিজেকে যতটা সম্ভব সামলে নিয়ে কুসুম ইরাকে দুহাতে জড়িয়ে রাখে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
“কী হইসে ইরাবু!”
“আমি কি খুব খারাপ?”
“না, তুমি অনেক ভালো মাইয়া।”
“আমি খুব খারাপ। খুব খারাপ একটা কাজ করেছি। তুমি কি আমাকে অনেক পচা মেয়ে ভাববে?”
“না, আমি জানি তুমি কোনো খারাপ কাজ করো নাই। আর যদিও বা ভুল কিছু কইরা ফেলাও তার জন্যও ভালো কোনো কারণ থাকবো।”
কিছুক্ষণ নীরবে থেকে ভগ্নস্বরে ইরা বলতে শুরু করে,
“কাগজগুলো আমি নিয়েছিলাম ব্যাংক থেকে টাকা তুলবো বলে। দিন তিনেক আগে আমি আলমারি থেকে কাগজগুলো নিই। তুমি তখন রান্নাঘরে ছিলে তাই জানতে পারোনি। আমি সে দিনই কাগজগুলো নিয়ে ব্যাংকে যাই। দুপুরবেলা। তুমি ঘুমাচ্ছিলে। কিন্তু…কিন্তু আমি টাকা কিভাবে তুলতে হয় তাতো জানি না! ওখানে গিয়ে আমি খুব ঘাবড়ে যাই। একটা আন্টিকে জিজ্ঞেস করলে উনি বলেন বাবার সাইন লাগবে।”
“তারপর?”
“আমি বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। আমি টাকা তুলতে পারিনি। আচ্ছা কুসুম আপা, তুমি আমাকে অনেক বাজে মেয়ে ভাবছো তাই না? তুমি কি আমায় চোর ভাবছো?”
কুসুম ইরাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
“না, ইরাবু! আমি একথা কখনোই ভাবুম না। ওইগুলান তো তোমারই ট্যাকা। তুমি যখনই মন চায় তুলবার পারো। তয় আমারে একখান কথা কও তো। তুমি হঠাৎ ট্যাকা পয়সা তুলবা ক্যান?”
মাথা নিচু করে ইরা বলে, “জমির চাচাদের দিতাম।”
ইরার কথায় কুসুম বিস্ফারিত চোখে তাকায়।
“জমির চাচা!”
“হুম।”
“হঠাৎই?”
“জমির চাচারা ভালো নেই কুসুম আপা। চাচা-চাচি ভালো করে খেতে পায় না অনেক দিন। ওরা খুব কষ্টে আছে।”
“কিন্তু তাগোর তো আলহামদুলিল্লাহ ভালো অবস্থা ছিল। আর তুমিই বা এ কথা জানলা ক্যামনে?”
শান্ত স্বরে ইরা বলে,
“চাচার টিউশনি করা ছাড়া আয় -রোজগারের আর কোনো উপায় নেই। এই লকডাউন এরপর উনার কাছে কেউ এখন আর পড়ছে না কুসুম আপা! উনি উনার সব টিউশনি হারিয়ে ফেলেছেন। টাকা আসবে কোথা থেকে বলো? বয়স্ক মানুষ! মামুন ভাইতো ঢাকায় থাকে। তাকেও কিছু টাকা পাঠাতে হয় মাস শেষে। যেটুকু সঞ্চয় ছিল তাই অল্প অল্প করে মামুন ভাইকে দিচ্ছে বোধ হয়।
সেদিন যখন টুকুন ভাইরা আমাদের বাসার সামনের রাস্তায় ক্রিকেট খেলছিল। বল আমাদের বাসার পিছনে জমির চাচাদের ওদিকে পরে। আমি বল তুলতে গিয়ে দেখি…
“কী?”
“কুসুম আপা, চাচির শখের বাগানের যে কি ভয়াবহ অবস্থা! ফুলগাছের লাল ফুলগুলো শুকিয়ে বাদামি হয়ে গিয়েছে! টবের গাছগুলোতে কোনো পাতা নেই! আছে শুধু শুকনো মরা ডালপালা! আম্পান ঝড়ে ওদের চিলেকোঠা ঘরের টিনের চাল উড়ে গিয়েছিল। তাও এখনও ঠিক করা হয়নি! উঠোন ঝরাপাতায় অপরিষ্কার হয়েছিল! যে বাগানে চাচি কাউকে ঢুকতে দেয় না, সে বাগানের কী যে করুণ অবস্থা! চাচি যত্ন করবেই বা কিভাবে বলো? বাসায় টাকা-পয়সা নেই, তিনবেলা খাওয়ার জন্যে খাবারও ঠিক মতো পায় না। বাগানের যত্ন করা কি সম্ভব!
আমি বলটা মনু ভাইকে দিয়ে আবার বাগানে ফিরে আসি। চাচাদের বাড়ির চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই চাপাকান্নার আওয়াজ পাই। আওয়াজটা আসছিল চাচিদের ঘরের ভেতর থেকে। ঘরের জানালা কিছুটা খোলা ছিল। আমি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে কথা শুনে বুঝতে পারি, চাচি মানসিকভাবে খুব নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। খুব কান্নাকাটি করছিল। চাচা যদিও বা চাচিকে সান্ত¡না দিচ্ছিল কিন্তু তারও যে বড্ড দুশ্চিন্তা হচ্ছে আমি বুঝতে পারছিলাম।
আমার খুব খারাপ লাগছিলো। আমাদের পিছনেই থাকে ওরা। ভালোভাবে না খেতে পেরে কতই না দুঃখে আছে! আর আমরা প্রতিদিনই ভালো খাবার খেতে পারছি! জানো কুসুম আপা আমি ইসলাম শিক্ষা বইয়ে একটা হাদিস পড়েছিলাম। তোমাকে বলি, শুনো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ ঐ ব্যক্তি মুমিন নয় যে পেটপুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।” (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস ২৬৯৯; আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস ১১২)
কুসুম আপা, জমির চাচারাতো আমাদেরই প্রতিবেশী। তাই না বলো? আমরা ভালো খাবার খাব কিন্তু ওরা না খেয়ে থাকলে আল্লাহ তো আমাদের ওপর খুব রাগ করবেন! আমি তাই ওদেরকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম।
তাছাড়া ওরা তো এ দেশেরই মানুষ। ওদের প্রতি প্রেম না দেখালে আমিতো আর দেশপ্রেমিক হতে পারলাম না! তাই আমি ওদের বাসার সামনে মাঝেমাঝে ব্যাগে করে শুকনো খাবার দিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আমি চাইছিলাম ওদেরকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে। কিন্তু তা আর পারলাম কই!
আমি আর এ কথাগুলো নিজের মনের ভিতরে চেপে রাখতে পারছিলাম না। দমবন্ধ হয়ে আসছিল আমার। তাই আজ না পেরে তোমাকে সব বলে দিলাম।
আমাকে তুমি মাফ করে দাও কুসুম আপা। আমার ঠিক হয়নি তোমাকে না জানিয়ে এগুলো করার। আসলে আমি ভয় পেয়েছিলাম যদি তুমি রাগ করো তাই…”
কুসুম হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে আছে। ইরা কুসুমের শরীরের সাথে লেপ্টে রয়েছে। হঠাৎই ইরা অনুভব করে ওর কাঁধের দিকের জামার অংশ কিছুটা ভিজে আছে। ইরা মাথা তুলে তাকিয়ে কুসুমের অশ্রুসিক্ত চোখ জোড়া দেখে ভীষণভাবে চমকে যায়। ইরা খেয়াল করলো, কুসুমের চোখজোড়া ছলছল করছে। যেনো পলক পড়লেই তার কোমল গাল বেয়ে লবণাক্ত অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়বে।
বিস্ময়ের স্বরে ইরা বলে,
“কুসুম আপা! তুমি কাঁদছো!”
কুসুম ইরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে, “আমি খুশিতে কান্দতেসি ইরাবু! খালু যে তোমারে লেখাপড়া শিখাইসেন, তা সার্থক হইসে! তুমি ওই দিন আমারে জিগাইসিলে না যে পুলিশ না হইলে দেশসেবা করন যায় কি না? ইরাবু তুমিতো পুলিশ মানুষ না হইয়াও তা করে দেখাইসো!”
ইরা উজ্জ্বল দৃষ্টিতে কুসুমের দিকে তাকিয়ে বলে,
“সত্যি বলছো?”
“হ, একদম। তুমি অনেক ভালা কাম করসো ইরাবু!
অনেক সাওয়াবের কাম! ইনশাআল্লাহ তুমি অনেক বড় ভালা মানুষ হইবা।”
কুসুম মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ইরার দু’গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হতে গেলে ইরা বলে, “ কই যাও কুসুম আপা?”
কুসুম তার মুখে রহস্যময় মুচকি হাসির রেখা ফুটিয়ে বলে,
“খালু আমারে প্রতিমাসে যেই বেতন দেন তার থিইক্যা কিছু ট্যাকা আমি আলাদা করে রাইখা দিতাম। একটা সোনার কানের দুলের খুব শখ। কিনব ভাইবা ট্যাকা জমাইতেসিলাম। কিন্তু এহন মনে হইতেসে সোনার দুল গড়ানোর জন্য না, সোনার দেশ গড়ানোর জন্য ট্যাকাগুলান কাজে লাগাইতে হইবো। নাইলে আমি নিজেই নিজেরে ক্ষমা করতে পারুম না ইরাবু! জমির চাচারা আমারও প্রতিবেশী। আমারই দেশের মানুষ। আমিও তোমার মতন দেশের সেবা করতে চাই। তুমি খাড়াও আমি ট্যাকাগুলান আনতাসি।”
কুসুম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে ইরা জানালার দিকে এগিয়ে যায়। কুসুমের কথাগুলো শুনে তার নিজের চোখজোড়াই যে কখন নোনা পানিতে ভিজে গিয়েছে তার খেয়ালই নেই!
জানালার বাইরে মেহগনি গাছটার সবুজ পাতাগুলি সূর্যের সোনালি আলোয় চকচক করছে। সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে কাকের বাসাটা। ইরা শাবুর দেওয়া দুরবিনটা হাতে নিয়ে ঝাপসা চোখে দেখতে লাগলো মেহগনি গাছের ওই কাকের বাসাটা।
মা কাক পশমহীন কোকিল ছানার ছোট্ট ঠোঁটদ্বয়ের মাঝখানে তার কুচকুচে কালো শক্ত ঠোঁট দিয়ে খাবার তুলে দিচ্ছে।
ইরার ঠোঁটের কোণে যে নির্ভেজাল প্রশান্তির হাসির রেখা ফুটে উঠেছে তা ওর নিজেরও অজানা!

SHARE

Leave a Reply