Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব রহস্যে মোড়া নিউট্রন তারকা -মোজাম্মেল হক

রহস্যে মোড়া নিউট্রন তারকা -মোজাম্মেল হক

নিউট্রন তারকা বর্তমানে জ্যোতিঃপদার্থবিদদের কাছে এক অতি আকর্ষণীয় বস্তু। এই তারকা নিয়ে এ পর্যন্ত হয়েছে প্রচুর তাত্ত্বিক গবেষণা। তবে সর্বপ্রথম ১৯২০ সালে টমাস এবং ফার্মি একটি মডেল প্রস্তাব করেন।
মহাশূন্যে ব্ল্যাক হোলের পরে সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকর্ষ রয়েছে নিউট্রন স্টারের। যদি নিউট্রন স্টার আরেকটু ঘন হয়, তাহলে এটি নিজেই একটি ব্ল্যাক হোলে রূপ নেবে। এটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১,০০০,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে সূর্যের মাত্র ৬,০০০ ডিগ্রি!
পালসার এক অন্যতম নিউট্রন তারকা। নিউট্রন স্টার নিজের অক্ষের চারপাশে অনেক দ্রুতগতিতে ঘুরতে থাকে। এই ঘূর্ণনের ফলে একটা স্পন্দন বা পালস তৈরি হয়, কারণ তার চুম্বকক্ষেত্র রেডিও তরঙ্গ তৈরি করে, যেটি প্রতি ঘূর্ণনে বিকিরিত হতে থাকে। এই নিউট্রন স্টারগুলো অবিরত রেডিও পালস নির্গত করে যাচ্ছে, তাই এর আর এক নাম পালসার।
এবার জানবো নক্ষত্র কিভাবে গঠিত হয়! আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোর জন্ম হয়েছে আন্তঃমহাকাশীয় গ্যাসীয় বস্তুর সঙ্কোচনের ফলে। এসব গ্যাসীয় বস্তুর প্রধান উপাদান মুলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। এসব গ্যাস এদের নিজ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সঙ্কুচিত হতে থাকে। আর সঙ্কুচিত হতে থাকলে এদের ঘনত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। ফলে উৎপন্ন হয় প্রচণ্ড তাপ। সেটা যখন বেড়ে গিয়ে মোটামুটি দশ মিলিয়ন ডিগ্রি পর্যন্ত হয় তখন শুরু হয় পারমাণবিক ফিউসান বিক্রিয়া।
এ প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন ভেঙে হিলিয়াম ও হিলিয়াম ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি হয়। আর এই দুর্ধর্ষ বিক্রিয়ার ফলে আইনস্টাইনের ঊ=সপ২ সূত্র অনুসারে যে ভর হারিয়ে যায় তা পরিণত হয় বিপুল পরিমাণ শক্তিতে। এভাবেই তৈরি হয় নক্ষত্রগুলো।
এসব নক্ষত্রের মধ্যে দুই ধরনের বল কাজ করে। একটি ভেতরের ফিউসান বিক্রিয়ায় তৈরিকৃত বিপুল পরিমাণ শক্তি নক্ষত্রের ভেতরের সমস্ত পদার্থকে বাইরের দিকে ঠেলছে। আর অন্যটি এই বিশাল বস্তুসম্ভার তাদের নিজের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ভেতরের দিকে সংকুচিত হতে চাচ্ছে। এমতাবস্থায় নক্ষত্রগুলো একটি সাম্যাবস্থায় বিরাজ করে, তার নিজ শক্তি ও আলো বিতরণ করতে থাকে।
আমাদের সূর্যও এমন একটি সাম্যাবস্থায় আছে। এর বয়স ৫০০ বিলিয়ন বছর এবং সে আরও ৫০০ বিলিয়ন বছর এই রকম অবস্থায় থাকতে পারে। তবে সকল নক্ষত্রের সাম্যাবস্থার বয়স এক না। এটি নির্ভর করে তার ভর কত তার ওপর। যদি নক্ষত্রের ভর সূর্যের ভরের ১.৫ গুণ হয় তবে তা একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে তার বহিঃদেশ উড়িয়ে দেবে। এই বিস্ফোরণকে বলা হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণ।
তবে এটি বিস্ফোরণে বাইরের স্তর উড়ে গিয়ে পড়ে থাকে শুধুমাত্র নিউট্রনের তৈরি একটি কেন্দ্রস্থ বস্তু বা কোর। এই কোর কোনো পরমাণু বা অণু দিয়ে গঠিত না, শুধুমাত্র নিউট্রন দিয়ে গঠিত।
এখানে প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে পরমাণুগুলো কোন অণু বা পরমাণু হিসাবে না থেকে, একটি প্রোটন ও একটি ইলেকট্রন যুক্ত হয়ে তৈরি করে একটি নিউট্রন। সাথে উপজাত হিসাবে তৈরি করে একটি ইলেকট্রন এন্ট্রি-নিউট্রিনো। আর শুধুমাত্র নিউট্রনের ঠাসা এই বস্তুটির নামই নিউট্রন স্টার।
১৯৬৭ সালে পালসার আবিষ্কৃত হয় জোসেলিন বেল কর্নেল ও অ্যম্বনি হিউইশ এই দুই বিজ্ঞানীর কল্যাণে। যদিও তখন একে পালসার না ভেবে পৃথিবীর বাইরে অন্য গ্রহ দিয়ে সৃষ্ট রেডিও তরঙ্গ বলে ভেবেছিলেন তারা। পরবর্তীতে তারা আরও গবেষণার মাধ্যমে তারকাটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন।
নিউট্রন স্টারের ভেতরের স্তরগুলো অনেকটা গ্রহের মতো। ভেতরের তরল কেন্দ্রের ওপরে কঠিন আবরণ থাকে। এই আবরণটি প্রচণ্ড শক্ত হয়।
এই স্তরটি সুপারনোভা বিস্ফোরণের পরেও রয়ে যাওয়া আয়রন দিয়ে তৈরি, যেগুলো নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড চাপে স্ফটিকের মতো গঠন তৈরি করে। এদের মাঝ দিয়ে ইলেকট্রনের সাগর প্রবাহিত হয়। যতই গভীরে যাওয়া যায় ততই প্রোটনের সংখ্যা কমে আসে, কারণ বেশির ভাগই নিউট্রনে রূপ নিয়ে নিয়েছে।
কঠিন আবরণের সবচেয়ে গভীর স্তরে পরমাণুর নিউক্লিয়াসগুলো মহাকর্ষের চাপে পরস্পরকে স্পর্শ করে রাখে। এভাবে মিলিয়ন সংখ্যক প্রোটন ও নিউট্রন মিলে বিশালাকারের নিউক্লিয়াস তৈরি করে, যার আকৃতি হয় স্প্যাগেটি বা ল্যাসানিয়ার মতো। পদার্থবিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন নিউক্লিয়ার পাস্তা।
নিউক্লিয়ার পাস্তা সম্ভবত মহাবিশ্বের সবচেয়ে কঠিন পদার্থ, যা ভাঙা সম্ভব নয়। কয়েক সেন্টিমিটার উঁচু পাস্তা হিমালয়ের চেয়ে অনেকগুণ ভারী হতে পারে। এই পাস্তার নিচেই নিউট্রন স্টারের কেন্দ্র।
এই নক্ষত্রের ভেতরে বস্তুর ওজন অস্বাভাবিক বেশি! এর কারণ পরমাণুর গঠন। একটি পরমাণুর প্রায় সব ভরই থাকে তার নিউক্লিয়াসে।
কারণ একটি পরমাণুর যা ভর তা হলো তার প্রোটন আর নিউট্রনের মোট ভর। এখানে ইলেকট্রনের ভর তাদের মোট ভরের তুলনায় এতকম যে তা ধরার দরকার পড়ে না। আর এই পুরো ভরটুকুই থাকে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে।
পরমাণুর প্রায় পুরো জায়গাটাই ফাঁকা। এখন যদি পরমাণুর মধ্যে কোন ফাঁকা না থাকত তাহলে তার ভর প্রায় এক কোটি গুণ বেড়ে যেত। কিন্তু নিউট্রন স্টার আরও বেশি ঘন। কেননা এখানে পরমাণুর মতো ফাঁকা জায়গা তো নেইই বরং পুরো নিউট্রন একটি আর একটির সাথে লেগে আছে।
অণুসমূহ যখন বস্তু গঠন করে তখন প্রচুর পরিমাণে আন্তঃআণবিক ফাঁকা স্থান থাকে। আর নিউট্রন স্টার-এ তো পরমাণুই নেই। তাই আমাদের চেনা জগতের বস্তুর তুলনায় নিউট্রন স্টার এত বেশি ঘন। যার এক চামচ পরিমাণ পদার্থ পৃথিবীতে আনলে তার ওজন হবে দশ কোটি টন।
মিল্কিওয়েতে এরকম দুই হাজারটি নিউট্রন স্টার খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এদের চুম্বকক্ষেত্র মহাকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী, যা পৃথিবীর তুলনায় প্রায় কোয়াড্রিলিয়ন গুণ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই শক্তির প্রভাবে কোনো পরমাণু এর পাশে এলে বেঁকে যায়।
আরেক ধরনের নিউট্রন স্টার রয়েছে, যারা জোড়ায় থেকে নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকে। এভাবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে শক্তি বিকিরণ করে তারা স্পেসটাইমকে তরঙ্গায়িত করে। ধীরে ধীরে তাদের কক্ষপথ ছোট হয়ে আসে এবং শেষে পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এভাবে যে বিস্ফোরণটি হয় তার নাম দেওয়া হয়েছে কিলোনোভা।
২০১৫ সালে লিগো অবজারভেটরিতে এরকমই একজোড়া নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ থেকে প্রথমবারের মতো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।
কিলোনাভা বিস্ফোরণের সময়ে পদার্থের অবস্থা এতটাই চরম হয় যে, তারা আরো ভারী পরমাণু তৈরি করতে পারে। বিপুল পরিমাণ নিউট্রনে ভরা পদার্থ ছিটকে যেতে থাকে এবং নিজেদের মধ্যে পুনর্বিন্যস্ত হয়। এই প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম, প্লাটিনামের মতো মহাবিশ্বের বেশির ভাগ ভারী পরমাণুর জন্ম হয়েছে।
এরকম ভারী পরমাণু তৈরি করতে সুপারজায়ান্ট নক্ষত্রকে দুবার মৃত্যুবরণ করতে হয়। দুটি নিউট্রন স্টার একত্রিত হয়ে পরে ব্ল্যাক হোল তৈরি করে।
সুপারনোভা ও কিলোনোভা বিস্ফোরণে নিউট্রন স্টার থেকে ছিটকে বের হওয়া পরমাণুগুলো অনেক মিলিয়ন বছর ধরে গ্যালাক্সির মধ্যে ভেসে বেড়ায়। এদের কেউ হয়তো ধীরে ধীরে মেঘের মতো একটা আস্তরণ তৈরি করে, যেটি মহাকর্ষের প্রভাবে নিজেদের মধ্যে একত্রিত হয়ে নতুন কোনো নক্ষত্রের জন্ম দেয়। এর আশপাশে অনেকগুলো গ্রহ তৈরি হয়ে সে নক্ষত্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকে। আমাদের সৌরজগৎ এমনই একটি উদাহরণ।
আমাদের আশপাশে যত চমৎকার ও জটিল মৌল দেখা যায় তার সবই সুদূর অতীতে কোনো এক নিউট্রন স্টারের মৃত্যুর সময়ে তৈরি হয়েছিল।
সম্প্রতি এক গবেষণায় ঘঅঝঅ পালসারের কোরে সুপার ফ্লুইডের অস্তিত্বের প্রমাণ পায়। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, চীনারা ১০৫৪ সালে পালসারের দেখা পেয়েছিল, আর তা লিপিবদ্ধ করে গেছে বলে ধারণা করা হয়। আবার অনেকে এক কথায় পালসারের ব্যাখ্যা শেষ করেছেন, সেই মহান বাক্য হলো, নিউট্রনে ঠাসা এক তারকা।
পালসারের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে এখনও অনেক অনেক রোমাঞ্চকর রহস্য, যা অবিরাম খুঁজে চলেছেন পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা। হয়তো একদিন উন্মোচিত হবে সকল রহস্য।

SHARE

Leave a Reply