Home স্মরণ কবি কাজী কাদের নওয়াজ -তনয় সালেহা

কবি কাজী কাদের নওয়াজ -তনয় সালেহা

একজন কবির জগৎ কেমন? কেমন তার নিজস্ব ভাবনার পৃথিবী। কী ভাবেন কবি? কেমন করে ভাবেন! এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় কবির কবিতা থেকে। যেকোনো কবির কবিতা পাঠ করলেই তার ভাবনার চেহারা দেখে যাই আমরা। তার জগতের সাথে পরিচয় ঘটে আমাদের। আমরা জেনে যাই কবির নিজস্ব পৃথিবীর খবর।

মা কথাটি ছোট্ট অতি, কিন্তু জেনো ভাই
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর তিন ভুবনে নাই।
সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক, মাথার পরে আজি
অন্তরে ‘মা’ থাকুক মম, ঝরুক স্নেহরাজি।

আহা মাকে নিয়ে এমন মধুর কবিতা কে লিখেছেন? ক’টি লাইন পড়লেই প্রশ্নটি জাগে। জাগে অন্যসব জানার আগেই। কে এই কবি? কী নাম তার? কেমন করে এত চমৎকার ভাবনায় রাখেন মাকে। এমন মধুর ভাষায় মায়ের মমতা লেখার কবি কে তিনি? হ্যাঁ তিনিই কবি কাদের নওয়াজ। তিনিই ভেবেছেন এমন করে। ভাবনাকে দিয়েছেন ভাষা। আর সেই ভাষা কী মায়াবী। কী মধুর! কী মমতার! মুখে উচ্চারণ করলে মন শীতল হয়ে যায়। মনে উচ্চারিত হলে বুক ভরে যায়।
মা তো সকলের আদরণীয়। সম্মানীয়। শ্রদ্ধার। মাকে ভালোবাসে জগতের সকল সন্তান। সব ছেলেমেয়ে মায়ের শ্রদ্ধায় নত হয়। সম্মান করে মাকে। ভীষণ ভালোবাসে কিন্তু কবি কাদের নওয়াজের মতো এ শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও সম্মানকে ভাষা দিতে পেরেছেন কেউ? যদি পেরে থাকেন তার সংখ্যা কত! সাধারণ মানুষ তো নয়ই। কবিরাও সবাই পারেননি। পারছেন না। ভবিষ্যতে কেউ কি পারবেন! সে কথা ভবিষ্যই বলবে। এখন কথা হলো- কবি কাদের নওয়াজ পেরেছেন এটিই সত্য। এটিই আনন্দের! এটিই সম্মানের।
একজন কবির এক দু’টি কবিতা যদি পাঠকের হৃদয়ে গেঁথে যায়, ভাগ্যবান সে কবি। শুধু ভাগ্যবান বলিইবা কেন! একে বলা যায় মহা ভাগ্যবান। এমনই মহাভাগ্যবান কবিদের একজন কবি কাদের নওয়াজ। তার লেখা মায়ের এ কবিতাটি পাঠকদের অন্তরে গাঁথা। কণ্ঠে উচ্চারিত। এবং মনে গুঞ্জরিত। পাঠক তাকে এ একটি কবিতার জন্য ভালোবেসে ফেলেছেন। এই ভালোবাসা উসকে দিয়েছে তার আরেকটি কবিতা। পাঠ করা যাক কবিতাটির ক’টি লাইন-

বাদশাহ আলমগীর
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লির।
একদা প্রভাতে গিয়া
দেখেন বাদশাহ শাহাজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া…

এটি মোটামুটি একটি বড় কবিতা। কবিতার মূল কথা-
বাদশাহ আলমগীরের ছেলেকে পড়াতেন এক মৌলভী। যিনি থাকতেন দিল্লিতে। একদিন সকাল বেলা বাদশাহ দেখেন শিক্ষকটি অজু করছেন। আর অজুর পানি পাত্র থেকে ঢেলে দিচ্ছে তাঁর সন্তান। এই দেখে বাদশাহ শিক্ষককে দরবারে তলব করলেন। বাদশাহ ডেকেছেন শুনে শিক্ষক খুব ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন- আজ বোধ হয় তার গর্দান কাটার নির্দেশ দেবেন বাদশাহ। কারণ বাদশাহর ছেলেকে দিয়ে কাজ করালেন তিনি। অজুর পানি ঢালিয়েছেন তাঁর পায়ে। ভীষণ ভয় চেপে তিনি গেলেন বাদশাহর দরবারে। সম্মানের সাথে দাঁড়ালেন বাদশাহর সামনে।
কিন্তু বাদশাহ অবাক করে দিলেন তাকে। বললেন বাদশাহ- আমার ছেলে আপনার কাছে কোনো আদব শিখছে না। শিক্ষকের মর্যাদা ও সম্মান কিভাবে দিতে হয় শিখছে না তাও। কেন না আমি দেখলাম- আমার ছেলে আপনার পায়ে শুধু পানি ঢেলে দিচ্ছে। কেন সে আপনার পা হাত দিয়ে পরিষ্কার করে দেয়নি!
শিক্ষক যেন বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়লেন। আবার আনন্দে মাটি থেকে আকাশে উড়ছেন। কোথায় তার গর্দান যাওয়ার কথা। সেখানে কি না উল্টো কেন ছাত্র তার হাত দিয়ে পা পরিষ্কার করে দেয়নি তার কৈফিয়ত! আহা এত মহৎ বাদশাহ। এত উচ্চ বাদশাহর মন। সেই আনন্দে শিক্ষকের এক অসাধারণ উচ্চারণ আমরা শুনি-

উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষক তবে দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্নিশ করি বাদশাহর তরে কহেন উচ্চরবে-
‘আজ হতে চির উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির
সত্যিই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।’

শিক্ষার ইতিহাসে এ এক বিস্ময়কর ঘটনা। সে ঘটনাটি কবি কাজী কাদের নওয়াজের কবিতার আশ্রয়ে বেঁচে গেল চিরদিন।
১৯০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি কবি কাজী কাদের নওয়াজ জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মস্থান ভারতের মুর্শিদাবাদ। গ্রামের নাম তালিবপুর। তার বাবার নাম কাজী আল্লাহ নওয়াজ। মায়ের নাম ফাতেমাতুন্নেসা। তার নানা সৈয়দ জিল্লুর রহমান ছিলেন একজন জমিদার। বাবা আল্লাহ নওয়াজও জমিদার ছিলেন। জমিদার বংশে জন্ম এ কবির ভাই বোন ছিল দশজন। তিনি সবার বড়। কিন্তু কাদের নওয়াজের কোনো সন্তান হয়নি। কাদের নওয়াজের বাবাও লেখক ছিলেন। বেশ ক’টি ভাষার পণ্ডিত ছিলেন তিনি। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু এই পাঁচটি ভাষার পণ্ডিতের সন্তান কবি কাজী কাদের নওয়াজ।
কবি কাজী কাদের নওয়াজ ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমএ-তে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু নানান সমস্যায় পড়ে পরীক্ষা দিতে পারেননি। পেশা হিসেবে শিক্ষকতা বেছে নেন তিনি। কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় ইংরেজি পড়াতেন তিনি। ১৯৪৭ সালে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনে যোগ দেন শিক্ষক হিসেবে। তারপর নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে যোগ দেন। এখান থেকে চলে যান- ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে। এ স্কুলে যোগ দেন প্রধান শিক্ষক হিসেবে। ১৯৫১ সালে চলে যান দিনাজপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে। এখানে একটানা ছিলেন ১৯৬৬ পর্যন্ত পনেরো বছর। সর্বশেষ তিনি মাগুরায় মহেশচন্দ্র পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।
কাজী কাদের নওয়াজ তাঁর পিতার মতোই বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তার স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। অনেক কবিতা অনেক গান স্মৃতিতে ধরে রাখতেন। বলতেন। শোনাতেন।
শিক্ষার বাইরে তার ছাত্ররা তার কাছে ছুটে আসতেন কবিতা শুনতে। ক্লাসেও বায়না ধরতো ছাত্রছাত্রীরা। তিনি তাদের শোনাতেন কবিতা। ছাত্রছাত্রী ছাড়াও সাধারণ শিক্ষিতজনেরা তার কাছ থেকে কবিতা শুনতে চাইতেন। তিনি অন্য কবিদের কবিতা শোনাতেন। শোনাতেন নিজের কবিতা।
তার কবিতা-ওস্তাদের কদর, মা, প্রায়শ্চিত্ত, চাঁদদিঘি, হারানো টুপি এ কবিতাগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আজো জনপ্রিয় এসব কবিতা।
কাদের নওয়াজের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর নাম জেনে নেওয়া যাক-
মরাল, দাদুর বৈঠক, নীল কুমুদী, দু’টি পাখি দু’টি তীরে, উতলা সন্ধ্যা, দস্যু লাল মোহন (এটি গোয়েন্দা কাহিনী)।
কবি কাজী কাদের নওয়াজ একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী এবং উদার। রুচিশীল একজন কবি। প্রকৃতি, দেশপ্রেম ও জীবনের সুন্দর প্রকাশ পেয়েছে তার কবিতায়।
একজন কবি বেঁচে থাকেন তার কবিতার ভেতর। কবি কাজী কাদের নওয়াজও বেঁচে আছেন তারই রচিত কবিতায়। এবং কবিতাই বেঁচে থাকবেন তিনি।

SHARE

Leave a Reply