Home তোমাদের গল্প কথা কেনা মুহাম্মদ বরকত আলী

কথা কেনা মুহাম্মদ বরকত আলী

সে অনেক দিন আগের কথা। তোমাদের যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ের মানুষেরা লেখাপড়া জানতো না। লেখাপড়া করবে কী করে, সবাইতো আর পাঠশালায় পড়ার সুযোগ পেত না। শুধুমাত্র রাজার পুত্র আর রাজকর্মচারীর ছেলেমেয়েরা পাঠশালায় পড়ার অনুমতি ছিল। কিছু সংখ্যক প্রজা ছিল যারা অন্য রাজ্যে ব্যবসা বাণিজ্য করতে যেত। সেই রাজ্যের ব্যবসায়ী, পণ্ডিত, আর কিছু কিছু জ্ঞানীলোকদের সাথে চলফেরা করে শিখে আসতো কিছু পণ্ডিতি কথা-বার্তা আর কলাকৌশল। লেখাপড়ার এই আকালের জন্য সে সময় পণ্ডিত লোকের খুব কদর ছিল। পণ্ডিত মহাশয়েরা সাধারণ প্রজাদের কাছে কথা বিক্রি করত। পণ্ডিত মশাইয়ের ধারণা এই ছিল যে, কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়া লোকেদের জ্ঞান দিলে তারা পণ্ডিত মশাইয়ের কদর করবে না এবং সেই কথার কোনো মূল্যায়ন করবে না। তাই টাকার বিনিময়ে পণ্ডিত মহাশয় কথা বিক্রি করতেন আর অনেকেই কথা কিনতো। তোমরা নিশ্চয় ভাবছো, কথা আবার কেনা যায় নাকি? হ্যাঁ, অবশ্যই কথা কেনা যায়। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে শোন এক জোলার ছেলের কথা কেনার গল্প বলছি, যে দেশের কথা বলছিলাম সেই দেশে এক জোলা বাস করত। জোলার একটিমাত্র ছেলে ছিল। জোলা ছিল বোকা লোক। তার ছেলেও বাবার মত বোকা ছিল। লেখাপড়া জানে না। জোলার মৃত্যুর পর ছেলেটা তার মায়ের কাছে বায়না ধরল, ‘মা, ওমা, লোকেরা আমার বাবাকে জোলা বলে ডাকতো, আমি বাবার মত জোলা হয়ে থাকতে চাই না। আমি পণ্ডিত মশাইয়ের কাছ থেকে কথা শিখতে চাই। তুমি আমায় পয়সা দাও।’ জোলার বৌ কিছুতেই কথা কিনতে পয়সা দিবে না। পয়সা দিবে কিভাবে, জোলা তো গরিব মানুষ ছিল। জোলার ছেলে অনেক কষ্টে তার মায়ের জমানো কিছু পয়সা আদায় করে ছাড়ল। তারপর যেই কথা সেই কাজ। মায়ের অনুমতি নিয়ে গেল এক নামকরা পণ্ডিত মশাইয়ের ছায়াতলে। পণ্ডিত মহাশয় বললেন, ‘শোন বাবা, কোনো বিনিময় ছাড়া কাউকে কিছু দিতে নেই। বিনিময় ছাড়া কাউকে কিছু দিলে তার কদর থাকে না। তাই তোকে ফাউ ফাউ কথা শেখালে তুই কথাগুলো মনে রাখতে পারবি না, কথাগুলো মনে রাখতে না পারলে আমার ইজ্জতও থাকে না। কথা শেখাতে পারি তা আমার শর্ত আছে।’ জোলার ছেলে কথা শিখবেই। তা নাহলে তার বাবার মতো তাকেও লোকজনে জোলা বলে ডাকবে আর সবাই তাকে ঠকাবে। পণ্ডিতের হাত ধরে বলল, ‘পণ্ডিতজি আপনি যে শর্ত দিবেন আমি সেই শর্তই পালন করব। আমাকে কথা শিখতেই হবে।’ পণ্ডিত মশায় বললেন, ‘প্রত্যেকটি কথার জন্য আমাকে পয়সা দিতে হবে।’ জোলার ছেলে তাতেই রাজি। পণ্ডিত মশাই হাতের তালুতে পয়সা দিতেই পণ্ডিত মশাইয়ের বুদ্ধির ঝুলি থেকে কথা বের করে বললেন, ‘মনে রাখবি এটা তোর জন্য আমার দেওয়া প্রথম শিক্ষা,
‘‘দেখবি, শুনবি, বলবি না,
যাচির কাথা ফেলবি না।’’
আজ এই একটাই শিক্ষা দিলাম।’ জোলার ছেলে পণ্ডিতের কথাগুলো একটা কাগজে কোনো রকম নিজে বুঝতে পারে এমন ভাবে কাঁপা কাঁপা হাতে লিখে নিলো। খুব কষ্টে কেনা কথা। ভুলে গেলে চলবে না।
পরের দিন জোলার ছেলে মায়ের কাছে আবার পয়সা চাইল। জোলার বৌ এবার পয়সা দিতে রাজি হলো না। একমাত্র ছেলে রাগ করে কোথাও চলে যাবে এই ভয়ে জোলার বৌ আবারও একবার পয়সা দিল। পয়সা নিয়ে আবার ছুটল পণ্ডিত মশাইয়ের বাড়ি।
পণ্ডিতের হাতে পয়সা পড়তেই বুদ্ধির ঝুলি খুলে বললেন, এইটা তোকে দেওয়া আমার দ্বিতীয় শিক্ষা,
‘যা খাবি দেখে খাবি।’
এতটুকু বলেই শেষ। জোলার ছেলে কাগজে লিখে নিলো। পরের দিন মায়ের কাছে পয়সা চাইতে গেলে একটি পয়সাও দিলো না। কী করে দিবে? এত পয়সা পাবে কোথায়? জোলার ছেলেতো খাটাখাটুনি করে না, শুধু বসে বসে খায়।
জোলার ছেলের মাথায় এখন একটা-ই চিন্তা, কী করে সে পয়সা জোগাড় করে কথা কিনবে। তাকে কথা কিনতেই হবে। তা নাহলে বাপের মত তাকেও লোকজনে জোলার ছেলে জোলা বলবে আর ঠকাবে। পণ্ডিতের কাছ থেকে কথা কিনলে তাকে আর কেউ ঠকাতে পারবে না। জোলার এক খণ্ড আবাদি জমি ছিল। ওর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। বাড়ি থেকে জমির দলিল চুরি করে জমি বিক্রি করে দিলো। জমি বিক্রি করা টাকা নিয়ে আবার গেল পণ্ডিত মশাইয়ের কাছে। পণ্ডিত মশাইয়ের হাতে পয়সা দিতেই তিনি বললেন, এটা তোর জন্য আমার তৃতীয় শিক্ষা,
‘যা ফেলবি দেখে ফেলবি।’
এই কথাটাও সেই কগজে লিখে রাখল।
আপাতত কথা কেনা শেষ। জোলার ছেলে কথা কিনে আর বাড়ির দিকে ফিরলো না। জমি বিক্রি করেছে তাই মায়ের ভয়ে আর বাড়িতে ফেরা যাবে না। এবার তার পরীক্ষা করে দেখার পালা, কথা কিনে সে জিতেছে না ঠকেছে। জমি বিক্রি করা টাকাগুলো নিয়ে বের হলো অজানার উদ্দেশ্যে, হাঁটতে হাঁটতে এক রাজ্য ছেড়ে আরেক রাজ্যে। এভাবে যেতে যেতে পৌঁছাল অজানা কোনো এক রাজ্যে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এমন সময় একটা নির্জন জায়গায় দেখতে পেল একটা চমৎকার ঝকঝকে চকচকে বাড়ি। এই বাড়ির মালিক মায়া মাসি। এই বাড়িটা তাদের জন্য, যারা ভ্রমণে এসে রাতের বেলা এখানেই কিছুটা বিশ্রাম নিতে পারবে। তবে কিছু অর্থের বিনিময়ে এখানে থাকতে পারবে। কিন্তু লোকমুখে এটাও দুর্নাম আছে যে, এই বাড়ি থেকে অনেকেই রাতে খুন হয়েছে। আবার কারো কারো অর্থও চুরি হয়ে গেছে। বাড়ির বাইরের চাকচিক্য আর খাবারের গন্ধে জোলার ছেলে সিদ্ধান্ত নিলো আজ রাতটা এখানেই পার করবে। জোলার ছেলেতো আর জানে না এখানে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। মায়া মাসির কাছে গিয়ে থাকার বন্দোবস্ত করল। রাতের বেলা খাবার দেওয়া হলো দারুণ সুস্বাদু ঘ্রাণযুক্ত। খাবারে হাত লাগিয়ে যেই না খাবে তখনি মনে পড়ল তার শিক্ষা কেমন হয়েছে পরীক্ষা করে দেখা দরকার। পকেট থেকে কাগজটা বের করে কোনো মতে বানান করে পড়তে লাগল। দ্বিতীয় শিক্ষাটা ছিলো, ‘যা খাবি দেখে খাবি।’
পাশেই একটা কুকুর দাঁড়িয়ে লেজ দোলাচ্ছিল। খাবারের এক মুষ্টি কুকুরের সামনে ফেলে দিলো। কুকুরটা সে খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ পর মাটিতে ঢলে পড়ল। আঁতকে উঠল জোলার ছেলে। বুঝতে আর বাকি রইল না যে, এই খাবারে বিষ মাখানো আছে। ভয়ের মধ্যেও কিছুটা শান্তি পেল এই ভেবে যে, কথা কেনা তার সার্থক হয়েছে। কথা কেনার জন্য আজ সে প্রাণে বেঁচে গেল। মনে মনে পণ্ডিত মশায়কে ধন্যবাদ দিলো এই ভেবে যে, পয়সার বিনিময়ে হলেও তাকে এমন একটা মূল্যবান কথা শেখানো হয়েছে। খাবার না খেয়ে গোপনে তা ফেলে দিলো। মায়া মাসিকে কিছুই জানালো না। এমন ভান করল যে সে কিছুই জানে না। মায়া মাসি জোলার ছেলের হাবভাব দেখে নিশ্চয় বুঝেছিল তার কাছে অনেক টাকা পয়সা পাওয়া যাবে। কোনো রকমে জেগে জেগে মধ্য রাতটা পার করে সবার অলক্ষ্যে পালিয়ে গেল সেখান থেকে। সকাল হতে না হতেই অন্য রাজ্যে পৌঁছাল।
মাঠ ঘাট পেরিয়ে এসে ঠেকল এক নদীর ঘাটে। নদীর পাড়ে কিছু লোকের জটলা দেখতে পেল। কিছ্টুা এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেল শশ্মানে একটা লাশ পোড়ানো হচ্ছে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল লাশ কিভাবে পোড়ানো হয়। লাশটা পোড়ানোর পর সমস্ত ছাই নদীর জলে ভাসিয়ে দিল। শুধু কি তাই? যে মানুষটা মারা গেছে তার ব্যবহারের লেপ, কাঁথা, বালিশ সবকিছুই নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে সবাই চলে গেল। ওরা চলে যেতেই জোলার ছেলে হাজির। পকেট থেকে কাগজের টুকরাটা বের করে পূর্বের মত বানান করে পড়তে লাগল, তৃতীয় শিক্ষাটা ছিল, ‘যা ফেলবি দেখে ফেলবি।’
পড়া শেষ করেই পোঁটলাটা রেখে নদীর জলে দিল ঝাঁপ। সাঁতরিয়ে সাঁতরিয়ে টেনে নিয়ে এলো লেপ, কাঁথা, বালিশ। কোনো মতে ডাঙায় নিয়ে এলো। একটু কেমন যেন মোটা মোটা মনে হচ্ছে সব কিছু। বালিশের কভারটা খুলে দেখতেই জোলার ছেলের চোখ চড়ক গাছ। একি দেখছে সে? সত্যি তো? গায়ে একটা চিমটি দিয়ে দেখে সব সত্যি। বালিশের ভেতরে টাকা আর টাকা। লেপটা ছিঁড়ে ভেতরে দেখে একি কাণ্ড! এত এত টাকা? মৃত ব্যক্তিটি তার সব জমানো টাকা লেপ আর বালিশের ভেতর রেখে ছিল সে কথা ছেলেরা জানতো না। মৃত লোকটি কাউকে বলেও যায়নি। জোলার ছেলে আর বিলম্ব করতে চায় না। টাকাগুলো পোঁটলা করে বেঁধে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
বাড়িতে গিয়ে তার মাকে ছাড়া আর কাউকে এই ঘটনাগুলো বলল না। কারণ, তার প্রথম কথা কেনা ছিল, ‘দেখবি, শুনবি বলবি না। যাচি কথা ফেলবি না।’ জোলার ছেলে যে জমি বিক্রি করে কথা কিনেছিলো সেই জমি আবার অনেক টাকা দিয়ে কিনে নিলো। সেই জমিতে মস্ত বড়ো একটা দালান করল। এরপর থেকে জোলার ছেলেকে গ্রামের সবাই সম্মান দিতো। কেউ তাকে আর জোলার ছেলে জোলা বলে ডাকত না। সেই দিন থেকেই তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।
* শিক্ষা : শিক্ষিত মানুষকে কেউ ঠকাতে পারে না। উন্নত জীবনের জন্য প্রধান শর্ত হলো শিক্ষা অর্জন করা।

SHARE

Leave a Reply