Home খেলার চমক টেস্ট ক্রিকেট আবু আবদুল্লাহ

টেস্ট ক্রিকেট আবু আবদুল্লাহ

ক্রিকেটের সবচেয়ে অভিজাত ফরম্যাট টেস্ট ক্রিকেট। যদিও টি-টোয়েন্টি নামক ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেটের এই যুগে তোমাদের মতো কিশোর-তরুণদের অনেকের কাছে কথাটি বেখাপ্পা লাগতে পারে। কারণ, বেশির ভাগ দর্শকের কাছেই টেস্ট ক্রিকেট মানে ধীরগতির খেলা, কেউ বলেন ঘুমপাড়ানি ক্রিকেট; কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেট দিয়েই কোন দলের সত্যিকারের মান বিবেচনা করা যায়। ইংরেজি ঞঊঝঞ শব্দের অর্থই হচ্ছে পরীক্ষা।
আক্ষরিক অর্থেই তাই টেস্ট ক্রিকেটের মাধ্যমে পরীক্ষা হয়ে যায় ক্রিকেটের মাঠে কে কতটা যোগ্য। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে একজন ব্যাটসম্যানকে ধৈর্য ধরে দলের স্কোর সমৃদ্ধ করতে হয়, আবার একজন বোলারকে ওভারের পর ওভার বল করে যেতে হয় একটি উইকেট নেওয়ার জন্য। এভাবে টানা ৫ দিন ধৈর্য আর দক্ষতার পরীক্ষা দিয়ে ফল আদায় করতে হয় নিজেদের অনুকূলে। টানা ৫ দিন মাঠে কাটানোর মাধ্যমে একজন ক্রিকেটারের ফিটনেসের পরীক্ষাও হয়ে যায় এর মাধ্যমে।
টেস্ট ক্রিকেটকে যারা উত্তেজনাহীন খেলা বলে তারা অবশ্য না বুঝেই বলে। সত্যি কথা বলতে ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টির চেয়েও টেস্ট ক্রিকেট অনেক বেশি উত্তেজনাময়। এখানে প্রতি ঘণ্টায় ম্যাচের রং বদলাতে পারে। এক সেশনে এক দলের দিকে ঝুঁকে থাকে, তো পরের সেশনেই অন্য দল বসে যায় চালকের আসনে। নিশ্চিত ড্র কিংবা জয়ের সামনে থেকেও এক ঘণ্টায় ১০ উইকেট হারিয়ে হেরে বসার নজির টেস্টে প্রচুর আছে। একজন বোলারের একটি স্পেলে পাল্টে যেতে পারে ম্যাচের চিত্র।
এসব কথা বললে লেখা অনেক বড় হয়ে যাবে। এবার লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের নিয়মগুলো সম্পর্কে তোমাদের একটু ধারণা দেওয়া। তার আগে জানিয়ে রাখি- ১৮৭৭ সালের ১৫ থেকে ১৯ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এমসিজি) আনুষ্ঠানিকভাবে ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচটি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যে।
টেস্ট ম্যাচ সাধারণত ৫ দিনের হয়। তবে একসময় নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ছিল না। অর্থাৎ চার ইনিংস শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলতো ম্যাচ। এমনি করে ১৯৩৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডের একটি ম্যাচ দশ দিন ধরে চলেও শেষ হচ্ছিল না। এরপর ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা দেশে ফেরার জাহাজ ধরতে ম্যাচ শেষ করে দেয়। এর আগে-পরে তিন, চার ও ছয় দিনের টেস্টও হয়েছে। ১৯৪৮ সালে এসে এটি ৫ দিনে নির্ধারিত হয়।
নিয়ম :
টেস্ট ক্রিকেটে উভয় দল পর্যায়ক্রমে দু’বার করে ব্যাটিং করবে, দুই ইনিংস মিলিয়ে যাদের রান বেশি হবে তারাই জিতবে। একদল অলআউট হলে কিংবা ইনিংস ঘোষণা করলে অন্য দল ব্যাটিংয়ে নামবে। ইনিংস ঘোষণা বলতে বোঝায়- কোন দল পর্যাপ্ত রান হয়েছে মনে করলে আর ব্যাটিং না করে প্রতিপক্ষকে ব্যাটিং করার সুযোগ দেয়। সাধারণত ৫০০-৬০০ রান হলে একটি দল ইনিংস ঘোষণা করে।
ধরো টস জিতে ‘ক’ দল আগে ব্যাটিং করে ৫০০ রানে অলআউট হয়ে গেল; কিংবা ৬ উইকেটে ৫০০ রান করে ইনিংস ঘোষণা করলো। এরপর ‘খ’ দল ব্যাটিং করতে নামবে। ‘খ’ দল যদি ‘ক’ দলের রান টপকে যেতে পারে তাহলে সেটিকে বলা হয় লিড। যেমন ‘খ’ দল যদি ৫৩০ রান করে অলআউট হয় বা ইনিংস ঘোষণা করে তাহলে তারা পাবে ৩০ রানের লিড। আর যদি ‘খ’ দল ৪৫০ রান করে অলআউট হয় তাহলে ‘ক’ দল পাবে ৫০ রানের লিড।
এরপর ‘ক’ দল আবার তাদের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করবে। তারা দ্বিতীয় ইনিংসে যা করবে সেটি হবে ‘খ’ দলের দ্বিতীয় ইনিংসে জয়ের টার্গেট। তবে প্রথম ইনিংসে লিড পেলে সেটি দ্বিতীয় ইনিংসের সাথে যোগ হবে। আবার প্রথম ইনিংসে পিছিয়ে থাকলে সেটিও দ্বিতীয় ইনিংস থেকে বাদ যাবে। যেমন ‘ক’ দল প্রথম ইনিংসে ৫০ রানের লিড নিয়ে যদি দ্বিতীয় ইনিংসে ২৩০ রান করে, তবে ‘খ’ দলের জয়ের জন্য দ্বিতীয় ইনিংসে টার্গেট হবে ২৮১ রান। আবার ‘খ’ দল যদি প্রথম ইনিংসে ৩০ রানের লিড পায়, এবং ‘ক’ দল যদি তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ২৩০ রান করে তবে ‘খ’ দলের টার্গেট হবে ২০১ রান।
ফলোঅন :
টেস্ট ক্রিকেটে ফলোঅন কথাটি খুব প্রচলিত। ইংরেজি ফলোঅন শব্দের বাংলা করলে দাঁড়ায় অনুসরণ করা। প্রথম ইনিংসে একদল ব্যাটিং করে যে রান সংগ্রহ করে, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করা দল যদি তার চেয়ে ২০০ বা তার চেয়েও বেশি ব্যবধানে অলআউট হয় তাহলে প্রথম ইনিংসে ব্যাট করা দলের অধিনায়ক ইচ্ছে করলে প্রতিপক্ষকে সাথে সাথেই তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে বাধ্য করতে পারেন। অর্থাৎ একই দল পরপর দুই ইনিংস ব্যাটিং করবে। টেস্ট ক্রিকেটে ফলোঅন একটি লজ্জাজনক বিষয়।
মনে কর, ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং করে ৪২০ রান করে অলআউট হলো বা ইনিংস ঘোষণা করলো। এরপর অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিং করতে নেমে যদি ২২০ বা তার চেয়েও কম রান করে অলআউট হয়- তখন ইংল্যান্ড ইচ্ছে করলে অস্ট্রেলিয়াকে ফলোঅন করাতে পারবে। এখানে তাই ফলোঅন এড়াতে হলে অস্ট্রেলিয়াকে কমপক্ষে ২২১ রান করতে হবে প্রথম ইনিংসে। না পারলে ফলোঅন। অর্থাৎ স্বাভাবিক নিয়মে তখন ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর কথা থাকলেও অস্ট্রেলিয়া আবার তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করবে।
আর ফলোঅন করতে নেমে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করে এই দুইশো রানের ব্যবধান টপকে অস্ট্রেলিয়া যে রান বাড়তি করতে পারবে, সেটি হবে ইংল্যান্ডের জন্য চতুর্থ ইনিংসে জয়ের টার্গেট। আর দ্বিতীয় ইনিংসেও যদি ফলোঅনের ওই ব্যবধানটুকু টপকাতে না পারে তাহলে ইংল্যান্ডকে আর তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করতেই হবে না। এটিকে বলে ইনিংস পরাজয়। এখানে অস্ট্রেলিয়া যদি দ্বিতীয় ইনিংসে ১৯০ রানে অলআউট হয় তাহলে তারা হারবে এক ইনিংস ও ১০ রানে। আর দ্বিতীয় ইনিংসে যদি তারা ৩০০ রান করতে পারে, তাহলে তাদের লিড হবে একশ রানের। ইংল্যান্ড তখন জয়ের জন্য ১০১ রানের টার্গেট পাবে।
তবে টেস্টের প্রথম দিনটি যদি বৃষ্টি বা অন্য কোন কারণে পরিত্যক্ত হয় তাহলে ১৫০ রানের ব্যবধান থাকলেই ফলোঅন করানো যাবে। আর ঘরোয়া চার দিনের ক্রিকেটে ফলোঅনের জন্য ব্যবধান ধরা হয় ১০০ রানের। আরেকটি কথা- ২০০ বা তার বেশি রানের ব্যবধান রেখে প্রতিপক্ষ অলআউট হলেও অনেক সময় আগে ব্যাটিং করা দলের অধিনায়ক তাদের ফলোঅনে বাধ্য না করে আবার নিজেরাই ব্যাটিং করতে নামে। এর পেছনে প্রধানত দু’টি কারণ থাকে, প্রথমত- পরপর দুই ইনিংস বোলিং করলে বোলারদের ওপর বেশি চাপ পড়বে, দ্বিতীয়ত-টানা ৫ দিন খেলার কারণে পিচ ভেঙে যায়, তাই চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিং করা কঠিন বিধায় অনেকেই এখন প্রতিপক্ষকে ফলোঅন না করিয়ে নিজেরাই দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং শুরু করে প্রতিপক্ষের জন্য বিশাল রানের টার্গেট দাঁড় করাতে চেষ্টা করে।
জয়-পরাজয়-ড্র :
সাধারণ নিয়মে দুই ইনিংস মিলে যে দল রান বেশি করবে তারাই জিতবে। ইনিংস পরাজয় বলতে একটি কথা আছে, সেটি ওপরের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। তবে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটের মধ্যে টেস্টই একমাত্র যেখানে ফলাফল ড্রও হতে পারে। সাধারণত নির্ধারিত ৫ দিনে উভয় দলের দু’টি করে ইনিংস শেষ না হলে খেলা ড্র হয়ে যায়। যেমন ধরো, ম্যাচের চতুর্থ আর নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার দেওয়া ৩৮০ রানের টার্গেটে জয়ের লক্ষ্যে খেলছে শ্রীলঙ্কা, তাদের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ২৭০ রান হতেই ম্যাচের সময় শেষ হয়ে গেল। তাহলে ম্যাচটি ড্র হবে। আবার অনেক সময় যদি বোঝা যায় ম্যাচ ড্রই হচ্ছে, তাহলে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেও দুই দল ড্র মেনে নেয়। টেস্টে অবশ্য ফলাফল টাইও হতে পারে।
সেশন :
ওভার নয়, টেস্ট খেলা হয় সময়ের হিসাবে। ৫ দিন- প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা করে খেলা হবে। এই ছয় ঘণ্টাকে আবার ৩ ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ভাগকে বলা হয় একটি সেশন। অর্থাৎ প্রতিটি সেশন হয় দুই ঘণ্টার। দিনের প্রথম সেশন শেষে থাকে ৪০ মিনিটের মধ্যাহ্ন বিরতি (লাঞ্চ ব্রেক)। আর দ্বিতীয় সেশন শেষে হয় ২০ মিনিটের চা বিরতি (টি ব্রেক)। প্রতিটি সেশনের মাঝখানে অবশ্য পানি পানের বিরতি থাকে। আর দিবা-রাত্রির টেস্টে প্রথম সেশন শেষে থাকে চা বিরতি আর দ্বিতীয় সেশন শেষে হয় নৈশভোজ বা ডিনার ব্রেক। সেশনের সময় কখনো ম্যাচের কন্ডিশন অনুযায়ী কম বেশি হয়। হয়তো ১৫ মিনিট বাকি থাকতে একটি দল অলআউট হয়ে গেল, তখন আম্পায়াররা সেশন সমাপ্তি ঘোষণা করেন। আবার ৫-৭ মিনিট বাকি থাকতে উইকেট পড়ে গেলেও এমনটি করা হয়। আবার এমন হয় যে, একদিন বৃষ্টিতে খেলায় বিঘœ ঘটলে পরদিন ম্যাচ রেফারি সাড়ে ছয় বা সাত ঘণ্টা খেলা চালাতে পারেন।

SHARE

Leave a Reply