Home উপন্যাস ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস গন্ধ-পাগল জুবায়ের হুসাইন

গন্ধ-পাগল জুবায়ের হুসাইন

[গত সংখ্যার পর]

‘চি…’ শুরুতেই আটকে গেল সুমির গলা।
‘কিছু না স্যার,’ বলল বিপ্লব, সুমির কথা শেষ করতে না দিয়ে। ‘ওটা ওর একটা মুদ্রাদোষ। কথা বলতে বলতেই অমন শব্দ করে।’ আড় চোখে সুমির দিকে তাকাল একবার ও। দেখল, সুমি রেগে টং হয়ে আছে। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। আশ্বস্ত হলো বিপ্লব, যাক, মেয়েটা আর হয়তো উলটো-পালটা কিছু বলে পরিবেশটাকে ঘোলাটে করবে না।
‘তাই নাকি খুকি?’ লোকটার পাশে আর একটি লোক বেরিয়ে এসেছে। সে বলল কথাটা।
বিপ্লব খেয়াল করল দু’জনের কথাই একই রকম। গলার স্বরে অপূর্ব মিল। দুই ভাই নাতো? ভাবল ও।
‘কী জন্য এসেছ তোমরা খোকা এখানে?’ প্রথম লোকটা জিজ্ঞেস করল।
‘আগে আমার ওই বন্ধুকে বাঁচান, ও হয়ত পানিতে পড়ে গেছে। এতক্ষণ ডুবে গেছে কি না কে জানে!’ নদীর দিকে ইঙ্গিত করে বলল বিপ্লব। অবশ্য অন্য একটি উদ্দেশ্যে প্রসঙ্গ পালটানো। তা ছাড়া এই মুহূর্তে আবিদের খোঁজ নেয়া জরুরি। পানিতে পড়ার শব্দ শোনা যায়নি। তার মানে কোথায় কী অবস্থায় আছে তা বোঝা যাচ্ছে না।
‘চলো চলো,’ বলে প্রথম লোকটা হারিকেন হাতে এগিয়ে চলল নদীর দিকে। পিছনে বিপ্লব আর সুমি।
‘চিক, তাড়াতাড়ি আসবে।’ প্রথম লোকটাকে উদ্দেশ্য করে দ্বিতীয় লোকটা বলল।
‘আসব, পিক।’ জবাব দিল প্রথম লোকটা, চিক। তারপর হারিকেন আগে নিয়ে এগিয়ে চলল নদীর দিকে।
বিপ্লব ও সুমিও তাকে অনুসরণ করল। চলার সময় সাবধান রইল। সুমিকে ধরে নিয়ে চলল। আবিদের মতো হোঁচট খেয়ে পড়ে বিপদ আর বাড়াতে চায় না।
নদীতে পাওয়া গেল না আবিদকে। অন্তত কিনারে কোথাও দেখা গেল না।
প্রচণ্ড ভয় এসে গ্রাস করল বিপ্লবের মনে। কোনো ক্ষতি হলো না তো আবিদের? পানিতে পড়ে ডুবে যায়নি তো? ডুবে চলে গেছে অনেক দূরে, গভীর পানিতে? অজানা আশঙ্কা এসে মনের ওপর ভর করে রইল।
সিঁড়ি থেকে যেখানে নৌকা বাঁধা হয়েছে সে জায়গাটা ৭ ফুট মতো দূরে হবে, আন্দাজ করল বিপ্লব। এর মধ্যে পানির কিনারে হারিকেনের আলো ফেলে খোঁজা হলো আবিদকে। কিন্তু কোথায় আবিদ? সত্যিই এবার ভীষণ ভাবনায় পড়ল বিপ্লব, আবিদের কিছু হলে তার মা-বাবাকে কী জবাব দেবে ও?
‘মিথ্যা কথা বলছ নাতো?’ আবিদ নামের কোনো ছেলেকে কোথাও দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল অদ্ভুত নামের লোকটা।
‘না স্যার, মিথ্যা কথা বলিনি। ওকে পড়তে দেখলাম। এই সুমি, তুমিও দেখেছ না?’ বলে সমর্থনের আশায় সুমির দিকে তাকাল বিপ্লব।
‘কী করছিলে তোমরা এখানে?’ গলার স্বর একটুও নরম হলো না চিকের।
‘ভূত দেখছিলাম।’ বিপ্লবকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আবারও আগ বাড়িয়ে বলে বসল সুমি।
‘ভূত!’ ভ্রƒ কুঁচকে গেছে চিকের, হারিকেনের আলোতেও সেটা স্পষ্ট দেখতে পেল বিপু।
‘জি স্যার, আপনারা যে ভূত, তাই দেখছিলাম,’ হঠাৎ করে এই কথাটাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল বিপ্লবের। বলেই ভাবতে লাগল এরপর চিক কী বলতে পারে আর ও কী জবাব দেবে। এতে একটা সুবিধা হয়, পরিস্থিতিটা সহজেই সামাল দেওয়া যায়।
চিক হয়ত ভাবল ওদের সঙ্গী হারিয়ে যাওয়ায় ওদের মাথা-টাতা খারাপ হয়ে গেছে। তাই সে বলল, ‘কী নাম তোমাদের বন্ধুটির?’
‘আবিদ।’ সংক্ষেপে জবাব দিল বিপ্লব।
‘ফিক’ করে হেসে দিল সুমি। অবাক চোখে সেদিকে তাকাল বিপ্লব। বুঝতে চেষ্টা করল এই পরিবেশে ছোট বোনটার এভাবে হাসার কারণ। কিন্তু কিছু বুঝতে পারল না। তবে পরে জিজ্ঞেস করে জেনেছিল লোক দুটোর অদ্ভুত নামের বিষয়টা মনে আসাতেই হেসে ফেলেছিল সুমি।
বিপ্লবের বুকটা ঢুকপুক করে উঠল। ভারী নিঃশ্বাস পড়তে লাগল। বুকটা ভারী হয়ে উঠছে। কোথায় গিয়ে পড়েছে আবিদ? কী হয়েছে ওর? কেমন আছে ও?
যেখানে যেভাবেই থাক, উদ্ধার করতে হবে বন্ধুকে। তাই ওর নাম ধরে ডাক দিল, ‘আবিইইইদ্…, কোথায় তুমিইই…?’
দূরে কোথাও বাধা পেয়ে ফিরে এলো সে ডাক, অর্থাৎ প্রতিধ্বনিত হলো। কিন্তু সাড়া মিলল না আবিদের।
এবার গলা-মুখ শুকিয়ে এলো বিপ্লবের। গলার কাছটা নিউজপ্রিন্ট কাগজের মতো শুষ্ক হয়ে গেছে। প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেয়েছে। ডাকার জন্য মুখ হাঁ করল। কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না গলা দিয়ে।
সুমি ডাকল, ‘আবিদ ভাইয়া, তুমি কোথায়? আমরা তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিনে।’
এবার চিকও গলা চড়াল, ‘এই যে ছেলে আবিদ, তুমি কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছো? কোথায় তুমি?’
চিকের গলাটা বোধ হয় একটু জোরে আওয়াজ করেছিল, ধমকে উঠল পিক, ‘এই গাধা, আস্তে চিল্লাও। লোকজন জড়ো করে ফেলবে নাকি?’
এতক্ষণের চেষ্টায় গলায় জোর ফিরে পেল বিপ্লব। আবারও ডাকল আবিদের নাম ধরে।
এবার সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া মিলল, ‘বিপ্লব আমি এইখানে!’ পাশেই কোথাও থেকে চাপা আওয়াজ বের হলো। জোর নেই সে আওয়াজে। তবে এটা যে আবিদের গলা, তা বুঝতে বিপ্লব বা সুমি কারোরই কষ্ট হলো না।
শব্দটা যেদিক থেকে এসেছে, সেদিকে ঘুরল বিপ্লব।
সিঁড়িটা আবছা দেখা গেল। ‘ধক্’ করে উঠল ওর বুকের মধ্যে। ‘স্যার, আলোটা এদিকে ধরুন!’ বলেই সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল ও।
‘এই আবিদ, কী হয়েছে তোমার? ব্যথা পাওনি তো?’ হাঁটু মুড়ে আবিদের পাশে বসল বিপ্লব। পরীক্ষা করতে লাগল হাড়গোড় কিছু ভেঙেছে কি-না।
‘ডান পা’টা, খুব ব্যথা। বোধ হয় ভেঙেই গেছে!’ গুঙিয়ে উঠল আবিদ।
নদীর কিনারে ঠিক পানির কাছটায় এখানে একটা শাল গাছ আছে। ঢেউয়ের আঘাতে আঘাতে মাটি ক্ষয়ে গিয়ে কয়েকটা শিকড় বেরিয়ে পড়েছে। তারই একটাতে আবিদের ডান পা’টা বেকায়দাভাবে ঢুকে গেছে।
‘দেখি দেখি।’ চিক আবিদের পাশে বসল। ডান পা’টা বিপ্লবের সহযোগিতায় শিকড়দের মাঝ থেকে সাবধানে বের করল। পরীক্ষা করতে লাগল।
‘আউ!’ করে তীব্র ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল আবিদ। দিনের বেলা হলে ব্যথায় নীল হয়ে যেতে দেখা যেত হয়তো।
‘খোকা,’ বিপ্লবকে বলল চিক। ‘হারিকেনটা ধরো তো। ওকে বাংলোতে নিয়ে যেতে হবে।’ বলে আবিদকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নিলো।
বাংলোতে ঢুকেই যে রুমটা, সেখানেই রয়েছে এখন ওরা। খাট-পালঙ্ক কিছুই নেই, তাই মেঝেতেই বসেছে ওরা।
এতক্ষণে দলের তিন নম্বর লোকটার দেখা পেল ওরা। তবে আবিদকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তার চেহারা ভালো করে দেখার সময় পেল না বিপ্লব।
ডান পায়ে ভালোই আঘাত পেয়েছে আবিদ। হাঁটুর নিচে চামড়া ছড়ে গেছে। মচকেও গেছে বোধ হয়। মাটিতে পা ফেলে দাঁড়াতে পারছে না। বসতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। তাই একপ্রকার শুয়েই আছে ও।
চিক ওর পায়ে আঘাতের জায়গাটাতে কী একটা লাগিয়ে দিয়ে ছেঁড়া কাপড় দিয়ে বেঁধে দিয়েছে।
‘তা বিচ্ছুরা, এবার বলে ফেল তো এখানে কেন এসেছ?’ জিজ্ঞেস করল তিন নম্বর লোকটা।
এই প্রথমবার তার দিকে ভালো করে তাকাল কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া। বিদঘুটে চেহারা লোকটার। পিটপিটে লম্বা চোখ, তেমনি বড় ও খাড়া নাক। যেন প্রত্যেক দিনই দাড়ি গোঁফ ছাঁটে, তেমনই সমান ও চকচকে সমস্ত মুখমণ্ডল। গায়ে একটা টকটকে লাল শার্ট, মাথায় সবুজ রংয়ের কানঢাকা হ্যাট। পরনে হলদে মোটা কাপড়ের ফুলপ্যান্ট।
বিপ্লব আগে থেকেই আন্দাজ করেছিল এমন একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হবে তাদেরকে। তাই ও মনে মনে একটা গল্প তৈরি করেই রেখেছিল। বলল, ‘আমরা স্যার বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। নদীর ধার দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে গিয়েছিলাম বহু দূর। ঠাণ্ডা ফুরফুরে বাতাসে সত্যিই খুব ভালো লাগছিল আমাদের নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে। তাইতো ভুলে গেলাম পথ। এদিকে সন্ধ্যেও হয়ে এসেছে। অন্ধকারে পথ চিনতে পারছিলাম না। এদিকেই আসছিলাম আমরা। হঠাৎ চোখে পড়ল আলো, মনে প্রাণের সঞ্চার হলো। আলোর কাছে চলে এলাম। দেখলাম, আলো হাতে নিয়ে একজন লোক এই ঘরে ঢুকল। পেছনে আরো দু’জন। একটু আশ্রয় আর পথ চিনতে সহায়তার আশায় আমরা তিন জনে এখানে উঠতে লাগলাম। তারপর, বুঝতেই তো পারছেন স্যার, আমার বন্ধুটি পা ফসকে পড়ে গেল। আর এখন তো পা’টা মচকেই বসে আছে।’ আড়চোখে আবিদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল বিপ্লব।
ওর গল্প বিশ্বাস করল কি না তা বোঝা গেল না। তৃতীয় লোকটা জিজ্ঞেস করল আবার, ‘তোমাদের বাড়ি কোথায়? মানে কোন্ গ্রামে? বলো আমরা দেখিয়ে দিচ্ছি।’
‘স্বরূপদাহ, মুন্সিবাড়ির দক্ষিণের বড় বাড়িটা আমাদের।’ জবাব দিল সুমি।
লোকটা যেন একটু অবাক হলো। কুঞ্চিত হলো তার কপালের চামড়া। সেখানে স্পষ্ট ভাঁজ পড়ল তিনটা। মাথার হ্যাটটা টেনে চোখের ওপর নামাল।
‘আপনি চেনেন নাকি স্যার স্বরূপদাহ? এখান থেকে কত দূর হবে?’ বলল বিপ্লব।
‘হ্যাঁ, চিনি। কোন্ বাড়িটার কথা বললে যেন খুকি?’ কথাটা বলল পিক।
‘বাড়ির নাম তো নেই আমাদের, বলেছি মুন্সিবাড়ির দক্ষিণের বড় বাড়িটা।’ সুমিই বলল আবার। ওর হাতে চিমটি কেটে ওকে চুপ থাকতে বলল বিপ্লব।
‘চালাকি কোরো না, খোকা!’ বলল চিক। ওদের কথা বোধ হয় বিশ্বাস করেনি। আসল কথা বের করতে চায়।
থমমত খেয়ে গেল বিপ্লব। অন্য দু’জনও। তবে কি ওর চালাকি ধরে ফেলল লোকগুলো? যাই হোক, এখনই হার মেনে নেয়া ঠিক হবে না। শক্ত থাকতে হবে। চেহারা স্বাভাবিক রাখল অনেক কষ্টে।
‘চিকমিক, তুমি চুপ করো। কী যা তা বলছ ওদের সাথে! ওরা তো বাচ্চা ছেলেপেলে। পথ না হারালে কেউ কি এখানে আসে?’ বলল তৃতীয় জন। বিপ্লব ধারণা করছে সে-ই দলটার প্রধান।
‘স্যরি ফিরোজ মামা। ভুল হয়ে গেছে।’ বলল চিকমিক।
‘ফিরোজ মামা, এখন ওদের কী করবে?’ পিক জিজ্ঞেস করল।
‘ভাবছি পিকমিক, সে কথাই ভাবছি আমি। ভাবছি ওদেরকে ওদের বাড়িতেই পৌঁছে দেবো।’ জবাব দিল তৃতীয় লোকটা, মানে ফিরোজ মামা।
বিপ্লব মুহূর্তেই মাথাটা একটু খাটিয়ে নিলো। তিনজনের নামই জানা হয়ে গেছে। নাম তিনটে কয়েকবার মনে মনে উচ্চারণ করে মুখস্থ করে নিলো।
‘শোনো তোমরা, এই জায়গাটাও এনায়েতপুরের মধ্যেই। আর তোমরা তোমাদের বাড়ির খুব বেশি দূরে নেই, কাছেই আছো।’ বলল ফিরোজ মামা।
‘সত্যি বলছেন স্যার? আমরা বাড়ি থেকে বেশি দূরে চলে যাইনি?’ আবিদের মুখে হাসি।
‘দোহাই আপনাদের! আমাদেরকে আমাদের বাড়ি পৌঁছে দিন।’ বলল সুমি। যেন কেঁদেই ফেলবে।
অবাক হলো বিপ্লব। ভালোই অভিনয় জানে দেখা যাচ্ছে পিচ্চি মেয়েটো।
‘দেব খুকি, তোমাদেরকে বাড়িতেই পৌঁছে দেবো, কান্নাকাটি করো না, কেমন?’ বলে পিকমিকের দিকে তাকাল ফিরোজ মামা নামের দলনেতা। বলল, ‘পিকমিক, এদেরকে বাড়ি পৌঁছে দাও। তবে সাবধান, সবাইকেই চোখ বেঁধে নিয়ে যাবে।’

ছয়.

অবাক হলো বিপ্লব। চোখ বেঁধে কিভাবে বাড়ি পৌঁছে দেবে? ও বাড়ি কি তাহলে ওদের চেনা?
আবিদও একই কথা ভাবছিল। বলল, ‘চোখ বেঁধে আমাদেরকে কিভাবে বাড়ি পৌঁছে দেবেন?’
‘বুদ্ধিমানের কথা।’ বলল ফিরোজ। ‘এক কাজ করো,’ দুই সহকারীর দিকে তাকিয়ে বলল। ‘চোখ খোলা রেখেই নিয়ে যাও।’
‘ওকে ফিরোজ মামা।’ বলল চিকমিক।
বাংলো থেকে ওদেরকে বাইরে আনা হলো। বিপ্লব চোখের সামনে বাম হাত উঁচু করে রিস্টওয়াচে চোখ বুলিয়ে নিল, রাত বেশি হয়নি।
বিপ্লবের মনে নানা প্রশ্ন খচখচ করতে লাগল। মনে মনে সেগুলোই আওড়াতে লাগল- কারা এই লোক তিনটে? এখানে কেন এসেছে? কী করতে চায় ওরা? কোনো ব্যবসা? ব্যবসাই যদি হবে, এতো রাতে কিসের ব্যবসা? কিন্তু সুমির কাছে যা শুনলাম, বাংলোর মধ্যে অদ্ভুত সব শব্দ হয়, আর সেই শব্দ এলাকাবাসীর ঘুম নষ্ট করে। সেজন্য পুলিশ তদন্তও চালায় সমস্ত বাংলোর মধ্যে ও চারপাশে। তারপরেও কাউকে পাওয়া যায়নি, কী এর ব্যাখ্যা?’ এসব নানান বিষয় ওর মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায়।
‘আচ্ছা পিকমিক,’ পথিমধ্যে বলল বিপ্লব, ‘ওখানে আপনারা কী করেন? জানতে ইচ্ছা করছে খুব।’
পিকমিক চুপ করে রইল। কোনো কথা বলল না। সমান তালে হেঁটে চলল।
পিকমিককে চুপ থাকতে দেখে বিপ্লব আবার ওই একই প্রশ্ন করল।
এবার কাজ হলো। পিকমিক মুখ খুলল, বলল, ‘ব্যবসা করি, বিজনেস!’
‘ব্যবসা?’ বিপ্লব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। ওর ধারণার সাথে মিলে যাচ্ছে। না, এখনই তালগোল পাকিয়ে ফেললে চলবে না। ব্যাটার কাছ থেকে তথ্য আদায় করতে হবে। ওর কাছে পুরো ব্যাপারটাই রহস্য মনে হচ্ছে। ওকে জানতেই হবে কী সেই রহস্য। তাই কণ্ঠটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখেই বলল, ‘কী ব্যবসা করেন আপনারা?’
‘দেখ ছোকরা, বেশি বকবক করো না।’ ধমকের সুরে বলল পিকমিক। ‘ফিরোজ মামার নির্দেশ আছে বেশি উল্টোপাল্টা করলে সরিয়ে দিতে।’ বলে বিশেষ ভঙ্গিতে বাম হাতটা গলার সামনে দিয়ে সরিয়ে নিলো।
বুঝতে বাকি রইল না বিপ্লবের ‘সরিয়ে দেওয়া’ বলতে কী বুঝাতে চাইছে লোকটা। কোঁৎ করে একটা ঢোক চিপল। শব্দ না করতে চাইলেও বেরিয়ে এলো শব্দটা। কিন্তু ও তো আর যে সে ছেলে নয়। এ রকম ঢের ঘটনার মুখোমুখি ও হয়েছে। তাই দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো। সোজাসুজি পিকমিকের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আসলে আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আপনার নামটাও। দেশের বাড়ি কোথায় আপনার?’
পিকমিকও এবার সরাসরি বিপ্লবের চোখের দিকে তাকাল। বোধ হয় বুঝতে চাইল ছেলেটার মতলব। হয়তো চেহারা থেকে ওর মনের কথাগুলোও পড়তে চাইল। তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘তোমাকে দেখে বেশ বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে। কিন্তু একটা ব্যাপার, আগে তো কখনও এই এলাকায় দেখিনি তোমাকে। বেড়াতে এসেছ বুঝি? বাড়ি কোথায় তোমার?’
বিপ্লব মনে মনে হাসল। না, যতটা ভেবেছিল তার চেয়েও চালাক লোকটা। সহজে তথ্য বের করা যাবে না তার মুখ থেকে। কিন্তু কথা বের করতে ও তো আর কম ওস্তাদ না। সামনেই একটা ভাঙা ইট রাস্তার মধ্যে পড়ে ছিল। তাতে ইচ্ছে করেই ডান পা-টা বাঁধিয়ে দিল। পিকমিক ওর ডান পাশেই হাঁটছিল। টাল সামলানোর ভঙ্গিতে তার গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল। পিকমিক ওকে ধরে ফেলল।
বিপ্লব বলল, ‘স্যরি। আসলে আমি ইটটা দেখতে পাইনি। আমি সত্যিই সো স্যরি।’
‘না ঠিক আছে। তবে একটু দেখে হাঁটা ভালো। পাশে আমি না থাকলে তো রাস্তায় পড়ে যেতে। হাড়গোড় ভেঙে যেতে পারত। কিংবা কেটেকুটেও যেতে পারত।’
নিজেকে ছাড়িয়ে আবারও হাঁটতে লাগল বিপ্লব। এগিয়ে এসেছিল আবিদ ও সুমি। ওদেরকে বলল, ‘আমার কিছু হয়নি। চলো, হাঁটা যাক।’
কিছুক্ষণ নীরবেই হাঁটল ওরা। একসময় পিকমিকই বলল, ‘কী যেন জানতে চাইছিলে তুমি? আমরা কিসের ব্যবসা করি? বিরাট বড় ব্যবসা আমাদের। সাবধান, আর কখনো ওদিকটাতে যাবে না।’
লোকটার চোখে গম্ভীরতার স্পষ্ট ছাপ। ভেতরে ভেতরে একটু চমকে উঠল বিপ্লব। আবিদ তো এবার হোঁচট খেয়ে পড়েই গেল। পিকমিকই ওকে ধরে উঠালো।
‘তোমরা সবাই-ই কি চোখের মাথা খেয়েছ? দেখে হাঁটতে পারো না? যত্তসব!’ নিজের মনে আরও কিছু গজগজ করতে লাগল পিকমিক।
সুমিকে বেশ সাহসীই বলতে হবে। এত কিছুর মধ্যেও ও হাসি থামিয়ে রাখতে পারছে না। পিকমিকের কথা শুনে ও তার চেহারার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিলো।
বিপ্লব ওর বাহু ছুঁয়ে হাসতে নিষেধ করল। থেমে গেল সুমি।
আবিদের হাঁটতে একটু কষ্ট হচ্ছিল। ওর পাশে গিয়ে বিপ্লব ওর একটা হাত নিজের ঘাড়ে পেঁচিয়ে নিলো। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। আগেই একবার পড়েছে। তখন পায়ে কেটেও গেছে। এখন আরও যন্ত্রণা দিচ্ছে। খুব টাটাচ্ছে।
পথটা আগেই চেনা ছিল ওদের। তাই বিপ্লবের ফুফু বাড়ি থেকে কিছু দূরে থাকতেই পিকমিককে বিপ্লব বলল, ‘থ্যাংকিউ মিস্টার পিকমিক। আপনি এবার আসতে পারেন। এ পথটা আমাদের চেনা। আমরা এখন নিজেরাই চিনে যেতে পারব।’
পিকমিক বলল, ‘ঠিক আছে। আমাকে আবার তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। বলেছিই তো বিরাট বড় বিজনেস আমাদের।’ বলে ঘুরে দাঁড়ালো।
বিপ্লব কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই পিকমিক ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘আবারও সাবধান করে দিচ্ছি তোমাদের। খবরদার, ওদিকটাতে আর কখনো যাবে না। রাতের বেলা তো নয়ই, দিনের বেলাও না। বড় ভয়ঙ্কর জায়গা ওটা। ভূতের আনাগোনা আছে। আমরা তাই থাকতে ভয় পাই।’ তারপর গটগট করে চলে গেল।
যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ লোকটার গমনপথের দিকে চেয়ে রইল বিপ্লব।
পেছন থেকে তাড়া দিল সুমি। বলল, ‘অ্যাই বিপু ভাইয়া, চলো। মা নিশ্চয়ই এতক্ষণে রেগে আছে। চিন্তাও করছে বোধ হয়।’
আবিদ বলল, ‘ফুফুকে কী বলবে এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলাম তাই ভাবো।’
সম্বিত ফিরে পেল যেন বিপ্লব। বলল, ‘হ্যাঁ, আমিও সেটাই ভাবছি। কী বলা যায় বলোতো?’
‘আমি কোত্থেকে বলব?’ অবাক হয়ে বলল আবিদ। ‘এই আমার মাথায় বাবা কিছুই আসবে না। পেটের ক্ষিধে আমার মাথায় উঠে গেছে। ক্ষিধে পেলে আমার আবার মাথা কামড়ায়।’
অন্য সময় হলে বিপ্লব হেসে দিত। কিন্তু এখন হাসার সময় নয়। ফুফুকে কী বলবে তা ভেবেই অস্থির। আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে, ফুফু কিছু জানতেই চাইল না। তাহলে তো খালি খালিই এতসব ভাবছে ও, তাই না? দূর, যখন জিজ্ঞেস করে তখন কিছু একটা বলে দিলেই হবে। এত ভাবাভাবির কী আছে?
তবে তেমন কিছুই জানতে চাইলেন না ফুফু। শুধু বললেন, ‘এলাকাটা খুব একটা ভালো না তা তো তোমাদেরকে আগেই বলেছি। তাই এত রাত করা কিছুতেই ঠিক হয়নি। এখন নাও, তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়।’
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন ওরা। যাক বাবা, মিথ্যা কিছু বলে আর কৈফিয়ত দিতে হলো না।
সকালটা ঘুরে ফিরেই কাটাল ওরা। দুপুরে খেয়ে দেয়ে ঘুমাতে চলে গেলো। বিপ্লব বলল, ‘রাত জাগতে হতে পারে। কাজেই, ভালো করে ঘুমিও নাও।’
ঘুমে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখল আবিদ। দেখল- ফিরোজ, পিকমিক আর চিকমিক ওদেরকে তাড়া করছে। প্রাণপণে ছুটছে ওরা, অন্ধকার পথে। ধরা পড়তে চায় না। তারপর এক সময় নিজেদের বাড়ি হাজির হলো আবিদ। তার মাকে পাঁজা করে ধরল সে। ঘুঙিয়ে উঠল অস্ফুট স্বরে।
‘এই আবিদ, আবিদ? কী হয়েছে তোমার? আমাকে অমন করে আঁকড়ে ধরছ কেন?’ বিপ্লবের কথাই ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল আবিদ। দেখল, পাশে বসে বিপু আর সুমি। ঘুমের ঘোরে সে বিপ্লবের হাত মুঠো করে ধরেছে। নিজেকে এ অবস্থায় দেখে খুবই লজ্জা পেল আবিদ। তাড়াতাড়ি বিপ্লবের হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘স্যরি, একটা স্বপ্ন…’
তাকে কথা শেষ করতে দিল না বিপ্লব। বলল, ‘তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নাও। এক্ষুনি বের হতে হবে।’
আবিদ প্রথমে বুঝতে পারছিল না কোথায় যেতে হবে। একটু পর সব কিছুই পরিষ্কার হয়ে এলো। আজ সন্ধ্যার সময় তদন্তে নামতে হবে।
এই ভেবে সে তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠল। হাতমুখ ধুয়ে আবার ঘরে ফিরে এলো। টেবিলে দেখল বিস্কুটের প্যাকেট। তাড়াতাড়ি চেয়ারে বসে সেটা ছিঁড়তে থাকল সে।
খাওয়া শেষ হলো।
আবিদের পা ফোলা অনেকটা কমে গেছে। ব্যথাও বেশ কম। কাজেই এখন হাঁটতে তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।
হাঁটতে হাঁটতেই তদন্তের ওপর আলোচনা চালালো ওরা। বিপ্লব বলল, ‘সাবধানে থাকতে হবে আমাদের। ধরা পড়া চলবে না কোন প্রকারেই।’
‘আমার খুব ভয় করছে।’ সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল আবিদ। ভিতু কণ্ঠ। দাঁড়িয়ে গেছে সে। এই সময় তীক্ষè চিৎকারে পিলে চমকে গেল ওদের।
চিৎকারটা খান খান করে দিলো রাতের নীরবতাকে। রাস্তার মাঝেই দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। দৃষ্টি সামনের বাংলোটার ওপর। আলো জ্বলে উঠেছে ওটার সামনে। আর সেই আলোয় দাঁড়িয়ে রয়েছে দু’জন লোক। এত দূর থেকেও ওদেরকে চিনতে অসুবিধা হলো না- চিকমিক আর পিকমিক। কিন্তু শব্দটা এলো কোত্থেকে? বাংলোটার চারদিকে একবার চোখ বুলালো বিপ্লব। অন্য কিছুই চোখে পড়ল না। তাহলে কি ওরা ভুল শুনল?
বাংলো থেকে ওরা ত্রিশ ফুট মত দূরে দাঁড়িয়ে।
‘এখন কী করবে?’ আবিদের প্রশ্ন। উত্তেজনায় কাঁপছে সে।
সুমিও।
বিপ্লব কিছুই বলল না।
‘আমি বাড়ি যাব, খুব ভয় করছে।’ এই প্রথম ভয় পাওয়া কণ্ঠ সুমির।
এই সময় আবার চিৎকারটা শোনা গেল। এবং পর পর ঘটে গেল ঘটনাগুলো। চিকমিক এবং পিকমিক দৌড়ে বাংলোর খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। আর তখনই একটু আগে যেখানে লোক দুটো দাঁড়িয়েছিল, সেখানে হাজির হলো আরও দু’জন লোক। তবে এদের খারাপ বলে মনে হলো না। খাকি ড্রেস পরা, মাথায় খাকি রঙের গোল টুপি, কাঁধে রইফেল ঝুলানো। আইনের লোক ওরা, পুলিশ।
পুলিশ দু’জনের সঙ্গে আরও একজন পুলিশ যোগ দিলেন। সম্ভবত উনি ইন্সপেক্টর। হাতের ওয়ারলেসটা তাই-ই প্রমাণ করে। তিনি অন্য পুলিশ দু’জনকে কিছু বললেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা তা পালন করল, অর্থাৎ বাংলোর ভেতরে ঢুকে গেল। পেছনে ঢুকল আরও দু’জন পুলিশ।
বিপ্লব আরেকবার বাংলোটার চারিদিকে চোখ বুলালো। চোখ দুটো গোল্লাগোল্লা হয়ে গেছে তার। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। চোখ মিটমিট করল কিছুক্ষণ। সমস্ত বাংলোটাকে ঘিরে রেখেছে পুলিশে। ভাবল বিপ্লব, এত পুলিশ একসময়ে কোত্থেকে এলো? গাড়িতে করে? তাহলে তো শব্দ পাওয়া যেতো। কিন্তু আশ্চর্য! একটুও শব্দ শোনেনি ও। সঙ্গীরাও শুনেছে কি-না সন্দেহ। তারা যদি শুনে থাকে, সে শুনবে না কেন?
সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করতেই ওরা জানিয়ে দিলো, না, কোন শব্দ শোনেনি তারা। তাহলে? হ্যাঁ, একটাই সম্ভাবনা আছে। আগে থেকেই এখানে ছিল ওরা। লুকিয়ে ছিল কোথাও। তারপর সুযোগ বুঝে এসে চড়াও হয়েছে। (চলবে)

SHARE

Leave a Reply