Home গল্প ঋতুকন্যা এলোরে… রবিউল কমল

ঋতুকন্যা এলোরে… রবিউল কমল

‘সবুজ পাতার খামের ভেতর
হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে,
কোন পাথারের ওপার থেকে
আনল ডেকে হেমন্তকে?’

ওপরের কবিতাটি সুফিয়া কামালের লেখা তা তোমরা অনেকেই জান। হেমন্ত ঋতু নিয়ে এতো চমৎকারভাবে আর কেউ হয়তো লিখতে পারেননি। তাই হেমন্ত এলেই সবার আগে এই কবিতার কথা আগে মনে পড়ে।
পৃথিবীর মানচিত্রে খুবই ছোট একটি দেশ আমাদের। তবে ছোট দেশ হলে কী হবে, আমাদের আছে ছয়টি ঋতু। প্রতি দুই মাস পরপর আমাদের ঋতু পরিবর্তন হয়। প্রকৃতি সেজে ওঠে নতুন নতুন সাজে। এ সবই মহান আল্লাহর নেয়ামত।
হেমন্ত হলো আমাদের ঋতুচক্রের চতুর্থ ঋতু। এই ঋতুকে ঋতুকন্যা হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাংলা পঞ্জিকার সপ্তম মাস হলো হেমন্ত ঋতুর প্রথম মাস। অর্থাৎ শরতের পরবর্তী এবং শীতের পূর্ববর্তী ঋতু। তাই এ ঋতুকে শীতের পূর্বাভাস বলা হয়। হেমন্তের সোনালি আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মাঠ-ঘাট-প্রান্তর। বাংলার জনপদ মুখরিত হয় হেমন্তের পাকা ধানে। কনকনে শীতের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে হেমন্তের হিমবাতাস। বাতাসে উড়ে যায় ঝরা পাতা।
মধ্যযুগে বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। কারণ, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। বর্ষার শেষদিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধান পাকে। অগ্রহায়ণের শুরুতে সেই ধান কেটে মাড়াই করে গোলায় তুলে রাখেন কৃষকরা।
এ সময় ঘরে ঘরে নতুন ধানের পিঠা খাওয়ার উৎসব শুরু হয়, গ্রামের বাড়িতে ভোরে ঢেঁকিতে চিঁড়ে কোটার শব্দ ওঠে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই ফসল তোলার পরদিনই নতুন ধানের নতুন চালের পায়েস, ক্ষীর, পুলি-পিঠে তৈরি করে নিকট-আত্মীয় ও পড়শিদের ঘরে বিতরণ করা হয়। কোনো কোনো গাঁয়ে মেয়ে জামাইসহ দূরের আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করা হয়, মেয়েকে নাইওর আনা হয় বাপের বাড়িতে। আমাদের দেশে প্রতি বছরই হেমন্ত এলে গ্রামে-গঞ্জে মেলা বসে। এসব মেলায় আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালিত হয়।
হেমন্তে পালিত হয় নবান্ন উৎসব। এই নবান্ন শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো নতুন অন্ন বা নতুন ভাত। ধান কাটার পর নতুন চালের পিঠা-পায়েস খাওয়ার উৎসব হলো নবান্ন। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে পাকা আমন ধান কাটার পর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। মূলত হেমন্তের ফসল কাটাকে ঘিরেই নবান্ন উৎসবের সূত্রপাত।
শরতের কাঁচা হলুদের মতো সোনালি রোদ দিগন্তব্যাপী ছড়িয়ে দেয় চিরায়ত রূপের সুধা আর সৌন্দর্য। তাকে অনুসরণ করে ধীরে ধীরে হেমন্ত ঋতুর আবির্ভাব ঘটে। প্রকৃতি সেজে ওঠে আপন মহিমায়। বর্ষার পানি সরে গিয়ে মাটির সোঁদা গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ।
হেমন্তের সকাল আবছা কুয়াশায় ঢাকা থাকে। ঢাকা থাকে চারদিকের মাঠ-ঘাট। সবুজ ঘাস ও ধান গাছের ডগায় জমে থাকে শিশিরবিন্দু। এ সময় হালকা শীত অনুভূত হয়। সূর্য ওঠার পর ধীরে ধীরে কুয়াশামুক্ত হয় চারপাশের মাঠ-ঘাট ও আকাশ। হেমন্ত মানেই শিশিরভেজা মনোমুগ্ধকর ¯িœগ্ধ প্রতিটি ভোর। ফজরের নামাজ শেষে এ দৃশ্য আমাদের মনকে প্রফুল্ল করে তোলে।
এ সময় শরতের কাশফুল একদিকে মাটিতে নুইয়ে পড়ে থাকে। অন্যদিকে মহাসমারোহে নবান্নের আগমন ঘটে। অনেকেই এ ঋতুকে বৈচিত্র্যময় রং ও পাতা ঝরার ঋতুও বলে থাকেন। কারণ, হেমন্তে ঝাউগাছ ছাড়া প্রায় সবগাছের পাতা ঝরে যেতে শুরু করে এবং শীতের আগমনের আগেই অধিকাংশ বৃক্ষ পাতাহীন হয়ে যায়।
এ সময়ে প্রকৃতিতে ফোটে বাহারি রঙের ফুল। অপরাজিতা, ছাতিম, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, হিমঝুরি, মধুমঞ্জরি, দেবকাঞ্চন, বকফুল ও রাজ অশোক এ ফুলগুলো হেমন্তের পরিচয় বহন করে। এগুলো ছাড়াও গ্রাম বাংলার বনে-বাদাড়ে, ঝোপে-ঝাড়ে বিচিত্র সব লতার ভেতরে ফুটে থাকে জানা-অজানা ফুল। শুভ্র রঙিন পুষ্প মঞ্জরির পাশাপাশি সাদা, নীল, সবুজ কিংবা লাল রঙের পাতাবাহারের বিন্যাসও নজর কাড়ার মতো।
রূপে গুণে অপরূপা অপরাজিতা। এ সময়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া এ ফুল প্রকৃতির মাঝে রঙের পেখম মেলে বসে। শিশির ভেজা শুভ্র শিউলি ফুল ঝরে পড়ে ভোরের আলো জ্বলে ওঠার আগেই। দিনের আলোতে উজ্জ্বলতা হারিয়ে সন্ধ্যার বাতাসে সুবাস ছড়িয়ে মাতাল করে তোলে প্রকৃতিকে। গভীর রাতের ফুল ছাতিম। এর পাগল করা গন্ধে মন ভরে ওঠে। প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে থাকা মল্লিকা, হিমঝুরি আর অশোক আড়মোড়া ভেঙে এই ঋতুতেই জানান দেয় তাদের রূপের, সৌন্দর্য ও গন্ধের। এ ছাড়াও আরও অনেক ঘাসজাতীয় বা বনজ ফুল হেমন্তে সুবাস ছড়ায়। এ ঋতুতেই বাহারি রঙের পাতাবাহার মেলে ধরে তাদের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য।
হেমন্তের অন্যতম ফল হলো কামরাঙা ও চালতা। নারিকেল এ ঋতুর প্রধান ফল। এ সময় গ্রামের বাড়িতে পিঠার তালিকায় থাকে নারিকেলের তৈরি নানারকম মুখরোচক খাবার।
বন্ধুরা, মহান আল্লাহ আমাদের জন্য প্রকৃতিকে এতো সুন্দর করে সাজিয়েছেন। তাই তার প্রতি আমাদের অবশ্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমার নেয়ামত পেয়ে যদি শুকরিয়া আদায় করো, তাহলে আমি নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সূরা ইবরাহিম: ৭)

SHARE

Leave a Reply