Home প্রবন্ধ সীমাহীন স্মৃতির সীমিত বুদ্বুদ মোশাররফ হোসেন খান

সীমাহীন স্মৃতির সীমিত বুদ্বুদ মোশাররফ হোসেন খান

সাজজাদ ভাই, প্রখ্যাত ছড়াকার এবং শিশুসাহিত্যিক সাজজাদ হোসাইন খানকে যতটা দেখেছি, জেনেছি এবং বুঝেছি- তার পরিমাণ এত বেশি যে, সামান্য কথায় বা লেখায় বর্ণনা করার মতো নয়। খুব ছোট্ট দাগে বলতে গেলেও রীতিমত ঘেমে নেয়ে উঠতে হবে। তার সাথে আমার সম্পর্কটা এমনই- বহুবর্ণিল, বহুস্তরে ¯ূÍপীকৃত।
সাজজাদ ভাই অত্যন্ত রুচিশীল মার্জিত ও ভদ্রজনিত ব্যক্তিত্ব। এটা তার অভিজাত পরিবার থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। রুচি ও ভদ্রতা শিক্ষার সূতিকাগার প্রধানত পরিবারই। সেখান থেকেই তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
আমার সাহিত্যপথে হাঁটার বয়সও নেহাত কম নয়। অন্তত আয়ুর তুলনায়। সেই কৈশোর থেকেই তো শুরু। প্রথমত এবং শেষ পর্যন্ত আব্বাজানই (ডা. এম. এ. ওয়াজেদ খান) ছিলেন আমার শিক্ষক, পাঠক, সমালোচক- সব, সবই।
কৈশোর না পেরুতেই ঘর ছাড়া। বাড়ি ছাড়া। সেই থেকে আজ অবধি। তবু আব্বাজান যতদিন ছিলেন, ততদিনই তাঁর ভূমিকা রেখে গেছেন।
কবি মাত্রই একা, নিঃসঙ্গ। তবু আমার মতো নিঃসঙ্গ কবি আর আছেন কি না, অন্তত আমার জানা নেই। তখন মোবাইল ছিল না। কুরিয়ার সার্ভিস ছিল না। যানবাহনেও ছিল খরার ভাটা। তবুও, দূর থেকে আব্বাজানের ভেসে আসা উপদেশ, প্রেরণা উৎসাহ কিংবা আমার সদ্য প্রকাশিত বইপাঠের পর কী চুলচেরা বিশ্লেষণ- আমাকে আলোড়িত এবং শিহরিত করতো। ডাক বিভাগের কল্যাণেই চলতো আমাদের সকল কিছু আদান-প্রদান। আব্বাজানের দেওয়া সাহস দোয়া আর আল্লাহর রহমত এই মহা মূল্যবান সম্পদই কেবল আমার পাথেয়। আমি আমার মতো হতে চেয়েছিলাম। আমার মতো করে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। আমার মতো করে লিখতে চেয়েছিলাম। সবই এ পর্যন্ত তো পেরেছি। আল্লাহর শুকরিয়া।
সাহিত্যের পথে হাঁটতে গিয়ে দেখা পেলাম একের পর এক বহু যাত্রীর। প্রথম দিকের অনেকেই আজ ছিটকে পড়েছেন। দু’একজন আছেন অর্ধমৃত। আমার সময়ের প্রায় এক যুগের চাষ করা যশোর শহর তো সেই তরতাজা প্রাণগুলোর নাম চিহ্নই মুছে ফেলেছে। সাহিত্য যে বেলুন নিয়ে ছেলেখেলার কাজ নয় কালে কালে এই নির্মম সত্য আরও বেশি করে উপলব্ধি করলাম।
যশোর শহর থেকে ঢাকায় এলাম ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। এর আগে একবারমাত্র ঢাকায় এসেছিলাম। আর এবার এলাম যশোরের পাঠ চুকিয়ে। সে তো শুরু ঢাকার প্রান্তরে সাহিত্য এবং জীবনযুদ্ধের। যে যুদ্ধের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। মৃত্যু আছে, পতন আছে, ঝুঁকি আছে, নাভিশ্বাস ওঠা শ্রম আছে, কিন্তু বিশ্রাম নেই। কবিজীবন যে এত কষ্টের, এত নির্মম নিষ্ঠুর, তা যদি কৈশোরে জানতাম- তাহলে এ পথে কে আর আসে? এর চেয়ে চৈত্রের পথের সমান শক্তমাটিতে কষে লাঙল চষতাম সারাদিন, সারাজীবন। কবিজীবনে যে এত রক্তক্ষরণ, এত যন্ত্রণা, এত বিড়ম্বনা, এত লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, এত গ্লানি- আব্বাজান তেমন করে বলেননি সেই তৃতীয় শ্রেণীতে পাঠরত ছেলেটিকে। শুধু বলেছিলেন- এপথ কষ্টের, বড় কষ্টের, বাবা!…’
সত্যিই যে পথটা কত কষ্টের কিংবা আসলেই যে এটা কোনো পথই নয় বরং দাউ দাউ আগুনের দরিয়া- তিলে তিলে সেটা উপভোগ করছি বটে!
মগবাজার আমতলা থেকে এলিফ্যান্ট রোডের দৈনিক সংগ্রাম অফিস তো কাছেই। সাজজাদ ভাই সংগ্রামের সাহিত্য সম্পাদক। প্রতিটি বিকেল আমার কাটতো সংগ্রামে, তার কাছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি অফিসে থাকতেন। তখন তো চলছে আমার কবিতার জোয়ার। শুধু কলম দিয়ে লেখা নয়- মাথা ভরা ঝাঁকড়া চুলের প্রতিটি কেশাগ্রই যেন একেকটি কলম। ডায়েরি, টুকরো কাগজ, হাতের তালু- তখন সব, সবই আমার কবিতার খাতা। অফিস করি নয়টা-পাঁচটা। সেও কবিতাকে বাঁচানোর জন্য। আমার সুখ-সমৃদ্ধি বা আরামের জন্য নয়। অফিস শেষ হলেই আমার সংগ্রাম অফিস। সাজজাদ ভাইয়ের টেবিল। রাত দশটা-এগারোটা নয়, কোনো দিকেই ভ্রুক্ষেপ থাকতো না।
সাজজাদ ভাই! এই এক মানুষ বলে! সর্বদাই নির্মোহ, স্থির, কম্পনহীন, নিরাবেগ। আমার তরতাজা কবিতার শ্রোতা তিনিই প্রথম। অর্ধেক লেখা দু’লাইন লেখা এমনকি কোনো অলিখিত কবিতার ভাবনারও তিনি শ্রোতা।
আমি সাজজাদ ভাইয়ের সদ্য হাসি আর তীক্ষè দৃষ্টির ভাষা পড়তে পারতাম। এখনো পারি। আমাকে নিয়ে তার যে স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষা সেটা বুঝে উঠতে হয়েছে আমাকে। ধাপে ধাপে। ক্রমশ।
আমি তো আমার গোটা জীবনকেই কেবল সাহিত্যের জন্য নিঃশেষ করে দিলাম। সাজজাদ ভাই আমাকে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। যখন যা-ই লিখেছি, প্রথমত তার হাতে তুলে দিয়েই স্বস্তিবোধ করেছি। এখনো তাই করি। একটি কবিতা কিংবা গদ্য লিখতে পারলেই সেটা চলে যায় প্রথমে সাজজাদ ভাইয়ের হাতে।
কবিতার তুমুল তুফানে তখন ভেসে চলেছি। ব্যাগে, পকেটে- কবিতা, অগ্রজ কবিদের কবিতা বই, লেখার খাতা, দুই-তিনটা কলম এসবই আমার চব্বিশ ঘণ্টার সঙ্গীসাথী। কি অফিস, কি বাসা, কি রাস্তা সবই ছিল যেন আমার কবিতা লেখার টেবিল। অথচ বিশ্বাসযোগ্য না হলেও সত্য যে, আমি কখনো টেবিলের ওপর কাগজ রেখে কবিতা লিখিনি।
রাতের পর রাত, দিনের পর দিন লেখাপড়া করেই কাটিয়ে দিয়েছি এক ভয়ঙ্কর ঘোরের মধ্যে। জীবনের কত যে ঘুম কাজা হয়ে গেছে, তার কোনো হিসাব রাখিনি। বুকে বালিশ দিয়ে লিখে গেছি ক্রমাগত। কখনো বা খাবার মতো সময়ও পাইনি। সেই চিন্তা করার মতো ফুরসতও ছিল না।
এত লেখা কি শুধু সংগ্রাম সাহিত্য বিভাগ ছেপে কূল পায়? ঢাকার অন্য কাগজেও লেখা পাঠানো শুরু হলো। শুরু হলো লেখা প্রকাশের আর এক অধ্যায়। প্রতি সপ্তাহে ঢাকার দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক বাংলা, দৈনিক দেশ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক মিল্লাতসহ প্রতিটি দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে কবিতা ছাপা হচ্ছে নিয়মিত। সাপ্তাহিক স্বদেশ, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সাপ্তাহিক বিপ্লব, সাপ্তাহিক রোববারসহ কত যে সাপ্তাহিকে লিখেছি। পাক্ষিক সচিত্র বাংলাদেশ, মাসিক নবারুণ, মাসিক শিশু, মাসিক সপ্তডিঙ্গা, মাসিক সবুজপাতা, অগ্রপথিক, ঐতিহ্য, নতুন চাঁদসহ আরও বহু পত্রপত্রিকায় লিখতাম। তখন অবশ্য আজকের মতো সাহিত্যাঙ্গনে একচোখা মাতালের প্রবেশ ঘটেনি।
আমার লেখা প্রকাশের বহর দেখে হতচকিত কবি আহমদ মতিউর রহমান হেসে বলতেন ‘আপনার এত লেখা ছাপা হয় যে, পড়ে শেষ করতে পারি না!’ আর মল্লিকভাই তো আমাকে আখ্যায়িত করতেন ‘জ্বিন’ হিসাবে! প্রকৃত অর্থে, লেখার জন্য যে কত পরিশ্রম করেছি, সেটা যারা দেখেছেন, তারাই কেবল সাক্ষী হয়ে রইলেন।
সাজজাদ ভাই গুলবাগের ৩৬০ নং বাসা ছেড়ে চলে এলেন মালিবাগ বাজারস্থ ১০৬১-এর একটি বাসায়। ঐ একই বাড়িওয়ালার পাশের বাসায় উঠে গেলাম আমি, আলীম [কবি হাসান আলীম], কাজী ভাই ও তার জামাতা মোতালেব গবেষক অলি সৈয়দ এবং সালাহ উদ্দিন আহমেদ জহুরী ভাই। বাড়িওয়ালার পাঁচিলঘেরা পুরো ঘরগুলো তখন কবি-সাংবাদিকের দখলে। সে ছিল দারুণ এক সময় বটে! আমাদের সময়গুলো কাটতো এক ঘোরতর বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে।
ওখান থেকেই আমি আর সাজজাদ ভাই হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম পশ্চিম রামপুরাস্থ আজরফ চাচার বাসায় [দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ] লেখা আনতে। সংগ্রামে তখন তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখতেন ‘যে কালটা পেরিয়ে এলাম’। তাঁর লেখা নিতে কখনো বা আমি একাই চলে যেতাম। সেই স্মৃতিও বেশ দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ।
মালিবাগের ১০৬১ বাসা ছেড়ে আমি চলে গেলাম গুলবাগের ৩৬০ নং সেই বাসায়, যে বাসায় থাকতেন সাজজাদ ভাই। ওখানে পেলাম মতি ভাইকে। পাশের বাসায় মসউদ ভাই।
কবি মসউদ-উদ-শহীদ। তখন ফাউন্ডেশনে চাকরি করতেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত। ক’দিন পর আমাদের কাজীভাইও গিয়ে উঠলেন। জমে উঠলো সেখানেও আবার তারার মেলা।
কিন্তু সাজজাদ ভাইয়ের সাথে যোগাযোগে আমার কোনো ক্লান্তি নেই। সকল দূরত্বই হার মেনেছে।
আমার অফিস তখন মতিঝিলে। পাঁচটায় অফিস শেষ করে সোজা সংগ্রাম অফিস। সেখান থেকে রাত দশটা-এগারোটায় সাজজাদ ভাইকে মালিবাগ ১০৬১ বাসায় রেখে আমি গুলবাগ বাসায় ফিরতাম। তারপর সারা রাত বুকে বালিশ দিয়ে লেখাপড়া।
সাজজাদ ভাইয়ের এতটুকু আস্থা অর্জন করতে পেরেছি যে, অন্তত আমাকে দিয়ে তিনি দ্রুততম সময়ে যে কোনো বিষয়ের ওপর লেখাতে পারেন। আমি তাঁর সেই আস্থার মর্যাদা রাখার জন্য মুখে রক্ত ঝরিয়েও চেষ্টা করে যাচ্ছি। সারা রাত লিখে ঠিকই সকাল সাতটায় তার বাসায় লেখাটি দিয়ে দিব্যি অফিসে চলে গেছি।
সাজজাদ ভাই এমনি, নির্মোহ কিন্তু তীক্ষèদৃষ্টিসম্পন্ন। কাকে দিয়ে কী করানো যায়- সেটা তিনি জানেন।
ওপর দৃষ্টিতে দেখলে সাজজাদ ভাইকে যতটা রসহীন মনে হয়, বাস্তব কিন্তু তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈকালীন হাঁটতে হাঁটতে আড্ডার সেই স্মৃতিবাহী দিনগুলোর কথা কি ভোলা যায়? এক সময় আমি সাজজাদ ভাই ও মল্লিকভাই প্রতি শুক্রবার সকালে বেরিয়ে পড়তাম এক এক দিকে। রাতে ঘরে ফিরতাম। বহুদূর পর্যন্ত চলে যেতাম। বুড়িগঙ্গার ওপার, মিরপুর, বাড্ডার চারপাশ- কত জায়গায়। এছাড়াও প্রতি বিকালে আমার ও সাজজাদ ভাইয়ের ভ্রমণটা ছিল নিয়মিত। এর ব্যতিক্রম ঘটাই ছিল অস্বাভাবিক।
১৯৯০ সাল থেকে সংগ্রাম সাহিত্য বিভাগে সান্ধ্যকালীন আমাদের আড্ডাটা দারুণ জমে উঠলো। সাজজাদ ভাই ও আমি তো ছিলামই। সাথে যুক্ত হতেন কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, কথাশিল্পী জামেদ আলী, কবি মতিউর রহমান মল্লিক, কবি তমিজউদ্দিন লোদী, কবি হাসান আলীম, কবি মুকুল চৌধুরী, কবি গোলাম মোহাম্মদসহ অনেকেই। মাঝে মাঝে আফজাল চৌধুরীকেও পাওয়া যেত। কবি আল মাহমুদ ভাই চাকরিসূত্রে সংগ্রামে বসতেন সাজজাদ ভাইসহ একই রুমে। তিনিও আমাদের আড্ডায় সাথী থাকতেন প্রায়ই। আর শিল্পী মোস্তফা আজিজ এসে হঠাৎ করে তাক লাগিয়ে দিতেন। বসে থেকেই তিনি পেন্সিল দিয়ে দুর্দান্ত স্কেচ করতেন। সে রকম প্রাণখোলা নির্মল আড্ডার পরিবেশ এখন সত্যিই দুর্লভ। আমাদের সাহিত্য আড্ডায় পুরো সংগ্রাম অফিসটাই সরগরম হয়ে উঠতো। সপ্তাহের মঙ্গলবারই আড্ডাটা জমতো বেশি।
সাজজাদ ভাই মিরপুর নিজের বাড়িতে ওঠার পর অবশ্য আমাদের ভ্রমণ বিলাসে ভাটা নেমে এলো। কারণ সঙ্গত। তার বাড়ি মিরপুর। আমার বাসা শাহজাহানপুর। মিরপুর যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সাজজাদ ভাইয়ের ও আমার পরিবারের মধ্যে বন্ধনটাও ছিল আলাদা পারিবারিকের মতো। সাজজাদ ভাই দারুণ এক মজার মানুষ। কৌতুক, গল্প চুটকিতে ওস্তাদ। আর চমচম কিংবা উজ্জ্বল হোটেলের খাবার ও চা সবই ছিল দুজনের নিত্যদিনের প্রিয়। অনিবার্য অনুষঙ্গ।
সাজজাদ ভাই যে কতটা মজার মানুষ, কতটা উজ্জ্বল প্রাণবন্ত তার পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
সাজজাদ ভাইয়ের সাহিত্যকর্ম নিয়ে এ পর্যন্ত কিছুই বলা হলো না। এই পরিসরে হয়তো সেটা সম্ভবও নয়। কারণ, তার ব্যক্তি প্রসঙ্গটাই আমার কাছে এত বড় যে কোন্ দিকে স্পর্শ করবো, কোথায় শেষ করবো বুঝে ওঠাই দুঃসাধ্য ব্যাপার।
সাজজাদ ভাইয়ের ছড়ার সাথে যশোর থাকতেই তো পরিচিত ছিলাম। ঢাকায় এসে পরিচিত হলাম তার অসাধারণ গদ্যের সাথে। ‘সোনালী শাহজাদা’ পড়তে গিয়ে আমি তো হতবাক। এ কোন্ সাজজাদ খান। এত ঝরঝরে উপমাশোভিত কিশোরতোষ গদ্য এর আগে আর কখনো পড়িনি। খুব ভালো লাগলো। এত ভালো লাগলো যে, এখনো যেন তার সেই স্বাদটা মুখে লেগে আছে। ‘সোনালী শাহজাদা’র একটি দীর্ঘ আলোচনা লিখেছিলাম। প্রকাশও হয়েছিল। কিন্তু সেটাও এখন আর হাতের কাছে পাচ্ছিনে।
সাজজাদ ভাইয়ের সাহিত্যজীবন এখন দীর্ঘতরই বলা চলে। আমাদের শিশুসাহিত্যে তার যে অবদান, সেই তুলনায় তিনি তেমন কিছুই পাননি। অনেক কাছের মানুষকে না চেনার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেনি সমাজ।
সাজজাদ ভাই যেমন সাহিত্যে, তেমনি ব্যক্তি জীবনে মার্জিত, বিনয়ী, ভদ্র, শালীন এক কথায় অসাধারণ। উগ্রতা, কুটিলতা তার স্বভাববিরুদ্ধ। সাহিত্যের জন্য ত্যাগ, ধৈর্য, অপেক্ষা, সাহস, সংযম- এসবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাজজাদ ভাইয়ের কাছে থেকে এগুলো আরও ভালো করে জেনেছি। পরে কালের কাছ থেকে ক্রমশ শিক্ষা গ্রহণ করেছি। একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হয়তো অনেকেরই জানা নেই যে এই নিরীহ প্রাণ সাজজাদ ভাই ছিলেন ১৯৭১ এর স্বাধীনতাযুদ্ধের উত্তাল দিনের সক্রিয় একজন মুক্তিযোদ্ধা!
সাজজাদ ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক দীর্ঘ কালের। তার সম্পর্কে এতো অল্প সময় গুছিয়ে প্রবন্ধ লেখা আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়। অন্তত এই মুহূর্তে প্রচণ্ড অসুস্থার মধ্যে। এখানে কিছু ছিন্ন ভিন্ন বিক্ষিপ্ত কথা বলা হলো মাত্র। অবশিষ্ট তো রয়েই গেলো আমার হৃদয়পটে, স্মৃতির পকেটে এবং ডায়েরির বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে। কালক্রমে সেসবই উঠে আসবে বলে আশা করি।সাজজাদ ভাই, প্রখ্যাত ছড়াকার এবং শিশুসাহিত্যিক সাজজাদ হোসাইন খানকে যতটা দেখেছি, জেনেছি এবং বুঝেছি- তার পরিমাণ এত বেশি যে, সামান্য কথায় বা লেখায় বর্ণনা করার মতো নয়। খুব ছোট্ট দাগে বলতে গেলেও রীতিমত ঘেমে নেয়ে উঠতে হবে। তার সাথে আমার সম্পর্কটা এমনই- বহুবর্ণিল, বহুস্তরে ¯ূÍপীকৃত।
সাজজাদ ভাই অত্যন্ত রুচিশীল মার্জিত ও ভদ্রজনিত ব্যক্তিত্ব। এটা তার অভিজাত পরিবার থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। রুচি ও ভদ্রতা শিক্ষার সূতিকাগার প্রধানত পরিবারই। সেখান থেকেই তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
আমার সাহিত্যপথে হাঁটার বয়সও নেহাত কম নয়। অন্তত আয়ুর তুলনায়। সেই কৈশোর থেকেই তো শুরু। প্রথমত এবং শেষ পর্যন্ত আব্বাজানই (ডা. এম. এ. ওয়াজেদ খান) ছিলেন আমার শিক্ষক, পাঠক, সমালোচক- সব, সবই।
কৈশোর না পেরুতেই ঘর ছাড়া। বাড়ি ছাড়া। সেই থেকে আজ অবধি। তবু আব্বাজান যতদিন ছিলেন, ততদিনই তাঁর ভূমিকা রেখে গেছেন।
কবি মাত্রই একা, নিঃসঙ্গ। তবু আমার মতো নিঃসঙ্গ কবি আর আছেন কি না, অন্তত আমার জানা নেই। তখন মোবাইল ছিল না। কুরিয়ার সার্ভিস ছিল না। যানবাহনেও ছিল খরার ভাটা। তবুও, দূর থেকে আব্বাজানের ভেসে আসা উপদেশ, প্রেরণা উৎসাহ কিংবা আমার সদ্য প্রকাশিত বইপাঠের পর কী চুলচেরা বিশ্লেষণ- আমাকে আলোড়িত এবং শিহরিত করতো। ডাক বিভাগের কল্যাণেই চলতো আমাদের সকল কিছু আদান-প্রদান। আব্বাজানের দেওয়া সাহস দোয়া আর আল্লাহর রহমত এই মহা মূল্যবান সম্পদই কেবল আমার পাথেয়। আমি আমার মতো হতে চেয়েছিলাম। আমার মতো করে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। আমার মতো করে লিখতে চেয়েছিলাম। সবই এ পর্যন্ত তো পেরেছি। আল্লাহর শুকরিয়া।
সাহিত্যের পথে হাঁটতে গিয়ে দেখা পেলাম একের পর এক বহু যাত্রীর। প্রথম দিকের অনেকেই আজ ছিটকে পড়েছেন। দু’একজন আছেন অর্ধমৃত। আমার সময়ের প্রায় এক যুগের চাষ করা যশোর শহর তো সেই তরতাজা প্রাণগুলোর নাম চিহ্নই মুছে ফেলেছে। সাহিত্য যে বেলুন নিয়ে ছেলেখেলার কাজ নয় কালে কালে এই নির্মম সত্য আরও বেশি করে উপলব্ধি করলাম।
যশোর শহর থেকে ঢাকায় এলাম ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। এর আগে একবারমাত্র ঢাকায় এসেছিলাম। আর এবার এলাম যশোরের পাঠ চুকিয়ে। সে তো শুরু ঢাকার প্রান্তরে সাহিত্য এবং জীবনযুদ্ধের। যে যুদ্ধের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। মৃত্যু আছে, পতন আছে, ঝুঁকি আছে, নাভিশ্বাস ওঠা শ্রম আছে, কিন্তু বিশ্রাম নেই। কবিজীবন যে এত কষ্টের, এত নির্মম নিষ্ঠুর, তা যদি কৈশোরে জানতাম- তাহলে এ পথে কে আর আসে? এর চেয়ে চৈত্রের পথের সমান শক্তমাটিতে কষে লাঙল চষতাম সারাদিন, সারাজীবন। কবিজীবনে যে এত রক্তক্ষরণ, এত যন্ত্রণা, এত বিড়ম্বনা, এত লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, এত গ্লানি- আব্বাজান তেমন করে বলেননি সেই তৃতীয় শ্রেণীতে পাঠরত ছেলেটিকে। শুধু বলেছিলেন- এপথ কষ্টের, বড় কষ্টের, বাবা!…’
সত্যিই যে পথটা কত কষ্টের কিংবা আসলেই যে এটা কোনো পথই নয় বরং দাউ দাউ আগুনের দরিয়া- তিলে তিলে সেটা উপভোগ করছি বটে!
মগবাজার আমতলা থেকে এলিফ্যান্ট রোডের দৈনিক সংগ্রাম অফিস তো কাছেই। সাজজাদ ভাই সংগ্রামের সাহিত্য সম্পাদক। প্রতিটি বিকেল আমার কাটতো সংগ্রামে, তার কাছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি অফিসে থাকতেন। তখন তো চলছে আমার কবিতার জোয়ার। শুধু কলম দিয়ে লেখা নয়- মাথা ভরা ঝাঁকড়া চুলের প্রতিটি কেশাগ্রই যেন একেকটি কলম। ডায়েরি, টুকরো কাগজ, হাতের তালু- তখন সব, সবই আমার কবিতার খাতা। অফিস করি নয়টা-পাঁচটা। সেও কবিতাকে বাঁচানোর জন্য। আমার সুখ-সমৃদ্ধি বা আরামের জন্য নয়। অফিস শেষ হলেই আমার সংগ্রাম অফিস। সাজজাদ ভাইয়ের টেবিল। রাত দশটা-এগারোটা নয়, কোনো দিকেই ভ্রুক্ষেপ থাকতো না।
সাজজাদ ভাই! এই এক মানুষ বলে! সর্বদাই নির্মোহ, স্থির, কম্পনহীন, নিরাবেগ। আমার তরতাজা কবিতার শ্রোতা তিনিই প্রথম। অর্ধেক লেখা দু’লাইন লেখা এমনকি কোনো অলিখিত কবিতার ভাবনারও তিনি শ্রোতা।
আমি সাজজাদ ভাইয়ের সদ্য হাসি আর তীক্ষè দৃষ্টির ভাষা পড়তে পারতাম। এখনো পারি। আমাকে নিয়ে তার যে স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষা সেটা বুঝে উঠতে হয়েছে আমাকে। ধাপে ধাপে। ক্রমশ।
আমি তো আমার গোটা জীবনকেই কেবল সাহিত্যের জন্য নিঃশেষ করে দিলাম। সাজজাদ ভাই আমাকে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। যখন যা-ই লিখেছি, প্রথমত তার হাতে তুলে দিয়েই স্বস্তিবোধ করেছি। এখনো তাই করি। একটি কবিতা কিংবা গদ্য লিখতে পারলেই সেটা চলে যায় প্রথমে সাজজাদ ভাইয়ের হাতে।
কবিতার তুমুল তুফানে তখন ভেসে চলেছি। ব্যাগে, পকেটে- কবিতা, অগ্রজ কবিদের কবিতা বই, লেখার খাতা, দুই-তিনটা কলম এসবই আমার চব্বিশ ঘণ্টার সঙ্গীসাথী। কি অফিস, কি বাসা, কি রাস্তা সবই ছিল যেন আমার কবিতা লেখার টেবিল। অথচ বিশ্বাসযোগ্য না হলেও সত্য যে, আমি কখনো টেবিলের ওপর কাগজ রেখে কবিতা লিখিনি।
রাতের পর রাত, দিনের পর দিন লেখাপড়া করেই কাটিয়ে দিয়েছি এক ভয়ঙ্কর ঘোরের মধ্যে। জীবনের কত যে ঘুম কাজা হয়ে গেছে, তার কোনো হিসাব রাখিনি। বুকে বালিশ দিয়ে লিখে গেছি ক্রমাগত। কখনো বা খাবার মতো সময়ও পাইনি। সেই চিন্তা করার মতো ফুরসতও ছিল না।
এত লেখা কি শুধু সংগ্রাম সাহিত্য বিভাগ ছেপে কূল পায়? ঢাকার অন্য কাগজেও লেখা পাঠানো শুরু হলো। শুরু হলো লেখা প্রকাশের আর এক অধ্যায়। প্রতি সপ্তাহে ঢাকার দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক বাংলা, দৈনিক দেশ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক মিল্লাতসহ প্রতিটি দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে কবিতা ছাপা হচ্ছে নিয়মিত। সাপ্তাহিক স্বদেশ, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সাপ্তাহিক বিপ্লব, সাপ্তাহিক রোববারসহ কত যে সাপ্তাহিকে লিখেছি। পাক্ষিক সচিত্র বাংলাদেশ, মাসিক নবারুণ, মাসিক শিশু, মাসিক সপ্তডিঙ্গা, মাসিক সবুজপাতা, অগ্রপথিক, ঐতিহ্য, নতুন চাঁদসহ আরও বহু পত্রপত্রিকায় লিখতাম। তখন অবশ্য আজকের মতো সাহিত্যাঙ্গনে একচোখা মাতালের প্রবেশ ঘটেনি।
আমার লেখা প্রকাশের বহর দেখে হতচকিত কবি আহমদ মতিউর রহমান হেসে বলতেন ‘আপনার এত লেখা ছাপা হয় যে, পড়ে শেষ করতে পারি না!’ আর মল্লিকভাই তো আমাকে আখ্যায়িত করতেন ‘জ্বিন’ হিসাবে! প্রকৃত অর্থে, লেখার জন্য যে কত পরিশ্রম করেছি, সেটা যারা দেখেছেন, তারাই কেবল সাক্ষী হয়ে রইলেন।
সাজজাদ ভাই গুলবাগের ৩৬০ নং বাসা ছেড়ে চলে এলেন মালিবাগ বাজারস্থ ১০৬১-এর একটি বাসায়। ঐ একই বাড়িওয়ালার পাশের বাসায় উঠে গেলাম আমি, আলীম [কবি হাসান আলীম], কাজী ভাই ও তার জামাতা মোতালেব গবেষক অলি সৈয়দ এবং সালাহ উদ্দিন আহমেদ জহুরী ভাই। বাড়িওয়ালার পাঁচিলঘেরা পুরো ঘরগুলো তখন কবি-সাংবাদিকের দখলে। সে ছিল দারুণ এক সময় বটে! আমাদের সময়গুলো কাটতো এক ঘোরতর বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে।
ওখান থেকেই আমি আর সাজজাদ ভাই হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম পশ্চিম রামপুরাস্থ আজরফ চাচার বাসায় [দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ] লেখা আনতে। সংগ্রামে তখন তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখতেন ‘যে কালটা পেরিয়ে এলাম’। তাঁর লেখা নিতে কখনো বা আমি একাই চলে যেতাম। সেই স্মৃতিও বেশ দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ।
মালিবাগের ১০৬১ বাসা ছেড়ে আমি চলে গেলাম গুলবাগের ৩৬০ নং সেই বাসায়, যে বাসায় থাকতেন সাজজাদ ভাই। ওখানে পেলাম মতি ভাইকে। পাশের বাসায় মসউদ ভাই।
কবি মসউদ-উদ-শহীদ। তখন ফাউন্ডেশনে চাকরি করতেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত। ক’দিন পর আমাদের কাজীভাইও গিয়ে উঠলেন। জমে উঠলো সেখানেও আবার তারার মেলা।
কিন্তু সাজজাদ ভাইয়ের সাথে যোগাযোগে আমার কোনো ক্লান্তি নেই। সকল দূরত্বই হার মেনেছে।
আমার অফিস তখন মতিঝিলে। পাঁচটায় অফিস শেষ করে সোজা সংগ্রাম অফিস। সেখান থেকে রাত দশটা-এগারোটায় সাজজাদ ভাইকে মালিবাগ ১০৬১ বাসায় রেখে আমি গুলবাগ বাসায় ফিরতাম। তারপর সারা রাত বুকে বালিশ দিয়ে লেখাপড়া।
সাজজাদ ভাইয়ের এতটুকু আস্থা অর্জন করতে পেরেছি যে, অন্তত আমাকে দিয়ে তিনি দ্রুততম সময়ে যে কোনো বিষয়ের ওপর লেখাতে পারেন। আমি তাঁর সেই আস্থার মর্যাদা রাখার জন্য মুখে রক্ত ঝরিয়েও চেষ্টা করে যাচ্ছি। সারা রাত লিখে ঠিকই সকাল সাতটায় তার বাসায় লেখাটি দিয়ে দিব্যি অফিসে চলে গেছি।
সাজজাদ ভাই এমনি, নির্মোহ কিন্তু তীক্ষèদৃষ্টিসম্পন্ন। কাকে দিয়ে কী করানো যায়- সেটা তিনি জানেন।
ওপর দৃষ্টিতে দেখলে সাজজাদ ভাইকে যতটা রসহীন মনে হয়, বাস্তব কিন্তু তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈকালীন হাঁটতে হাঁটতে আড্ডার সেই স্মৃতিবাহী দিনগুলোর কথা কি ভোলা যায়? এক সময় আমি সাজজাদ ভাই ও মল্লিকভাই প্রতি শুক্রবার সকালে বেরিয়ে পড়তাম এক এক দিকে। রাতে ঘরে ফিরতাম। বহুদূর পর্যন্ত চলে যেতাম। বুড়িগঙ্গার ওপার, মিরপুর, বাড্ডার চারপাশ- কত জায়গায়। এছাড়াও প্রতি বিকালে আমার ও সাজজাদ ভাইয়ের ভ্রমণটা ছিল নিয়মিত। এর ব্যতিক্রম ঘটাই ছিল অস্বাভাবিক।
১৯৯০ সাল থেকে সংগ্রাম সাহিত্য বিভাগে সান্ধ্যকালীন আমাদের আড্ডাটা দারুণ জমে উঠলো। সাজজাদ ভাই ও আমি তো ছিলামই। সাথে যুক্ত হতেন কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, কথাশিল্পী জামেদ আলী, কবি মতিউর রহমান মল্লিক, কবি তমিজউদ্দিন লোদী, কবি হাসান আলীম, কবি মুকুল চৌধুরী, কবি গোলাম মোহাম্মদসহ অনেকেই। মাঝে মাঝে আফজাল চৌধুরীকেও পাওয়া যেত। কবি আল মাহমুদ ভাই চাকরিসূত্রে সংগ্রামে বসতেন সাজজাদ ভাইসহ একই রুমে। তিনিও আমাদের আড্ডায় সাথী থাকতেন প্রায়ই। আর শিল্পী মোস্তফা আজিজ এসে হঠাৎ করে তাক লাগিয়ে দিতেন। বসে থেকেই তিনি পেন্সিল দিয়ে দুর্দান্ত স্কেচ করতেন। সে রকম প্রাণখোলা নির্মল আড্ডার পরিবেশ এখন সত্যিই দুর্লভ। আমাদের সাহিত্য আড্ডায় পুরো সংগ্রাম অফিসটাই সরগরম হয়ে উঠতো। সপ্তাহের মঙ্গলবারই আড্ডাটা জমতো বেশি।
সাজজাদ ভাই মিরপুর নিজের বাড়িতে ওঠার পর অবশ্য আমাদের ভ্রমণ বিলাসে ভাটা নেমে এলো। কারণ সঙ্গত। তার বাড়ি মিরপুর। আমার বাসা শাহজাহানপুর। মিরপুর যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সাজজাদ ভাইয়ের ও আমার পরিবারের মধ্যে বন্ধনটাও ছিল আলাদা পারিবারিকের মতো। সাজজাদ ভাই দারুণ এক মজার মানুষ। কৌতুক, গল্প চুটকিতে ওস্তাদ। আর চমচম কিংবা উজ্জ্বল হোটেলের খাবার ও চা সবই ছিল দুজনের নিত্যদিনের প্রিয়। অনিবার্য অনুষঙ্গ।
সাজজাদ ভাই যে কতটা মজার মানুষ, কতটা উজ্জ্বল প্রাণবন্ত তার পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
সাজজাদ ভাইয়ের সাহিত্যকর্ম নিয়ে এ পর্যন্ত কিছুই বলা হলো না। এই পরিসরে হয়তো সেটা সম্ভবও নয়। কারণ, তার ব্যক্তি প্রসঙ্গটাই আমার কাছে এত বড় যে কোন্ দিকে স্পর্শ করবো, কোথায় শেষ করবো বুঝে ওঠাই দুঃসাধ্য ব্যাপার।
সাজজাদ ভাইয়ের ছড়ার সাথে যশোর থাকতেই তো পরিচিত ছিলাম। ঢাকায় এসে পরিচিত হলাম তার অসাধারণ গদ্যের সাথে। ‘সোনালী শাহজাদা’ পড়তে গিয়ে আমি তো হতবাক। এ কোন্ সাজজাদ খান। এত ঝরঝরে উপমাশোভিত কিশোরতোষ গদ্য এর আগে আর কখনো পড়িনি। খুব ভালো লাগলো। এত ভালো লাগলো যে, এখনো যেন তার সেই স্বাদটা মুখে লেগে আছে। ‘সোনালী শাহজাদা’র একটি দীর্ঘ আলোচনা লিখেছিলাম। প্রকাশও হয়েছিল। কিন্তু সেটাও এখন আর হাতের কাছে পাচ্ছিনে।
সাজজাদ ভাইয়ের সাহিত্যজীবন এখন দীর্ঘতরই বলা চলে। আমাদের শিশুসাহিত্যে তার যে অবদান, সেই তুলনায় তিনি তেমন কিছুই পাননি। অনেক কাছের মানুষকে না চেনার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেনি সমাজ।
সাজজাদ ভাই যেমন সাহিত্যে, তেমনি ব্যক্তি জীবনে মার্জিত, বিনয়ী, ভদ্র, শালীন এক কথায় অসাধারণ। উগ্রতা, কুটিলতা তার স্বভাববিরুদ্ধ। সাহিত্যের জন্য ত্যাগ, ধৈর্য, অপেক্ষা, সাহস, সংযম- এসবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাজজাদ ভাইয়ের কাছে থেকে এগুলো আরও ভালো করে জেনেছি। পরে কালের কাছ থেকে ক্রমশ শিক্ষা গ্রহণ করেছি। একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হয়তো অনেকেরই জানা নেই যে এই নিরীহ প্রাণ সাজজাদ ভাই ছিলেন ১৯৭১ এর স্বাধীনতাযুদ্ধের উত্তাল দিনের সক্রিয় একজন মুক্তিযোদ্ধা!
সাজজাদ ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক দীর্ঘ কালের। তার সম্পর্কে এতো অল্প সময় গুছিয়ে প্রবন্ধ লেখা আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়। অন্তত এই মুহূর্তে প্রচণ্ড অসুস্থার মধ্যে। এখানে কিছু ছিন্ন ভিন্ন বিক্ষিপ্ত কথা বলা হলো মাত্র। অবশিষ্ট তো রয়েই গেলো আমার হৃদয়পটে, স্মৃতির পকেটে এবং ডায়েরির বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে। কালক্রমে সেসবই উঠে আসবে বলে আশা করি।

SHARE

Leave a Reply