Home নিয়মিত এলোকেশে এলো হেসে শরৎ এ বঙ্গে -হারুন ইবনে শাহাদাত

এলোকেশে এলো হেসে শরৎ এ বঙ্গে -হারুন ইবনে শাহাদাত

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। অপরূপ সুন্দর এই দেশ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দান। বারো মাস আর ছয় ঋতুর এই দেশ। প্রতিটি ঋতুতেই এ দেশের প্রকৃতি সাজে নতুন নতুন রূপ আর রঙে। বারো মাসের পরিক্রমায় আশ্বিন ও ভাদ্র এই দুই মাস মিলে শরৎকাল। বর্ষা আর শীতের মাঝামাঝি এই ঋতুর উষ্ণতা আর শীতলতার পরশ, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর তীরে কাশফুল, বাড়ির আঙিনা ও বাগানের শিউলি ও বেলি ফুল সবার মনে শুভ্রতার পরশ ছড়ায়। প্রকৃতির এই শুভ্র সুন্দর রূপে মন হয় পুলকিত। এই সৌন্দর্যের ¯্রষ্টার স্মরণে হয় আপ্লুত। কবি শেখ ফজলুল করিমের ভাষায়, ‘ফুলকুল তুলতুল গা ভেজা শিশিরে,/ বুলবুল মশগুল কার গান গাহিরে। / তড়বড় উঠে পড় রাতভোর দেখ না,/ হাত তুলে প্রাণ খুলে স্রষ্টারে ডাক না।/ ঝাঁকঝাঁক মৌমাছি মৌচাকে বিহরে,/ কলিগুলি দুলিদুলি স্বপনেতে শিহরে।/ ঝিকমিক দশদিক নাই পিক পাপিয়া,/সাদা বক চকচক উড়ে যায় ডাকিয়া।/ বিলঝিল খিলখিল লাল নীল বরণে,/ গাছে গাছে ফিঙ্গে নাচে চঞ্চল চরণে।/ ভেজাভেজা তাজাতাজা শেফালীর সুবাসে,/ শিশুদল কোলাহল করে নানা হরষে।/ কাশবন শনশন বেনু বাজে পাথারে,/ লঘুমেঘ ধরি বেশ ভেসে যায় পাহাড়ে।/ টুনটুনি সোনামণি স্ফূর্তির ফোয়ারা,/ মনভাঙ্গা মাছরাঙ্গা দেখ তার চেহারা। / বুটিদার জড়িপাড় শ্যাম-শাড়ী অঙ্গে/এলোকেশে এলো হেসে শরৎ এ বঙ্গে।’
কবি বঙ্গ বা বাংলাদেশের শরতের রূপ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু শুধু বঙ্গদেশে নয় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই শরৎকাল আছে। অনেক দেশেই আমাদের দেশের মতো ছয়টি ঋতু নেই। মাত্র চারটি ঋতু। সেসব দেশেও প্রধান ঋতুর একটি হচ্ছে শরৎ। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘অটাম’। ঈসায়ী বর্ষপঞ্জি অনুসারে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে সেপ্টেম্বর মাসে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে মার্চ মাসে শরৎকাল গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের মধ্যবর্তী ঋতু। উত্তর আমেরিকানরা শরৎকালকে ‘ঋধষষ’ অর্থাৎ “ঝরেপড়া” বা “পতন” বলে ডাকে। কারণ এই সময় গাছপালার পাতা ঝরে পড়ে। আমাদের বাংলাদেশে শরৎকালের আগমন ঘটে ভিন্ন রূপে। শিশির আর কুয়াশার সাথে সকালে রোদের মিতালি এদেশের প্রকৃতিকে আরো অপরূপ করে তোলে। শিউলি ফুল রাতে ফোটে ও সকালে ঝরে পড়ে। জাফরানি বোঁটার দুধসাদা ছয় পাপড়ির শিউলি ফুল সবুজ ঘাসের ওপর পড়ে। তার ওপর ভোরের সূর্যের আলো সত্যি অপরূপ। বর্ষায় ঘ্রাণ ছড়ানো বেলি ফুলের মৌ মৌ সুবাস শরতের রাতেও পাওয়া যায়। বর্ষার ফুল দোলনচাঁপাও শরৎকালে এখনো আছে ঝরে পড়ে না। ফুল, ফল আর ফসলের এই দেশে শরতে আরো অনেক ফুলের মেলা বসে। নদীর তীরে হাসি ছড়ানো কাশবন আর বাড়ির বাগান কিংবা আঙিনায় ফোটা বেলি, জুঁইয়ের কথা তো আগেই বলেছি। এ ছাড়াও শরতে শাপলা, শালুক, পদ্ম, কেয়া, জবা, কামিনী, মালতি, মল্লিকা, মাধবী, ছাতিম ফুল, বরই ফুল ও জারুল, নয়নতারা, ধুতরা, ঝিঙে, জয়ন্ত্রী, শ্বেতকাঝন, সোনালিকা, স্থলপদ্মা, বোগেনভেলিয়াসহ নানা রকমের কত ফুল হেসে ওঠে এই বাংলাদেশে।
খাল-বিল, নদী ভরা মাছ আর মাঠ ভরা ফসলের ঋতু শরৎ। এই ঋতুর পরের ঋতু হেমন্তকালে সোনালি ফসলে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নবান্নের উৎসব হয়। আর ফসলের সবুজ সমারোহ থাকে শরৎকালের মাঠে মাঠে। এ যেন নবান্নের আগমনী বার্তা। কৃষকের যতেœর ছোঁয়ায় বাতাসে মাঠে মাঠে ঢেউ খেলে সবুজ ফসল।
শরতের আগের ঋতু বর্ষা। শরৎ এলে পানি কমতে থাকে। তখন খাল, বিল, নদী-নালায় মাছ ধরার উৎসব চলে। কই, শিং, মাগুর, পাবদা, পুঁটি, বোয়াল, শোল, টেংরা, বৌ, চিংড়ি, খইসা, চাটা, মলা, কানডানা মাছে ভরা থাকে বাংলাদেশের জলাশয়গুলো। ছোট ছোট এই সব মাছের সাথে রুই, কাতলা, আইড়, বাঘাইড়সহ নানান স্বাদের দেশি মাছ তখন পাওয়া যায় খুব সহজেই। প্রকৃতির রূপ-রঙের ছোঁয়া নিবিড় করে পেতে তখন অনেকেই চলে যান গ্রামের বাড়ি। কারণ কাশফুল, সাদা মেঘের ভেলা আর শিশির ভেজা শিউলি-বেলির ঘ্রাণ গাঁয়ের অকৃত্রিম পরিবেশে যেমন করে পাওয়া যায়, ইট-পাথরের নগরে তেমনটা পাওয়া যায় না।
নানান ধর্ম-বর্ণের মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে করছে বসবাস এদেশে। প্রতি শরতে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা মহাধুমধাম করে উদযাপন করে তাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। শরৎকালের আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজাকে বলা হয় শারদীয়া দুর্গাপূজা। অবশ্য এছাড়াও চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা হয়। সেই পূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। কিন্তু শারদীয়া দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তাই বেশি। বাসন্তী দুর্গাপূজা পারিবারিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে তাই শরৎকাল মানে এক নতুন মাত্রা। তারা শুধু সৌন্দর্য নয়, ধর্মীয় উৎসবের ঋতুও মনে করে শরৎকে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলাম ধর্মের অনুসারীর এই দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে খুঁজে পায় মহান আল্লাহর অপার মহিমা। প্রতিটি ঋতুর সৌন্দর্য অবলোকন করে তারা ঈমানের আলোয় দীপ্তমান হয়। তাদের মনে পড়ে পবিত্র কুরআনের এই বাণী, ‘দয়াময় স্রষ্টার সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না। তোমার দৃষ্টি প্রসারিত করে দেখ, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি? আবার দেখ; আবারও। তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে আমারই দিকে ফিরে আসবে।’ (সূরা মুলক ৩-৪) সুনীল আকাশের সাদা মেঘের ভেলা দেখলে মনে পড়ে, ‘তারা কি নভোমণ্ডলের প্রতি দেখে না, কিভাবে তিনি তা বানিয়েছেন, সুশোভিত করেছেন? আর নেই তাতে কোনো স্তম্ভ।’ (সূরা কাহাফ ৬) মনের ভেতর অনুরণন তুলে কবি মতিউর রহমান মল্লিকের গীতিকবিতার এই পঙক্তিমালা, ‘তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর,/ না জানি, তাহলে তুমি,/ কত সুন্দর! কত সুন্দর!/ সেই কথা ভেবে ভেবে/ সেই কথা ভেবে ভেবে/ কেটে যায় লগ্ন,/ ভরে যায় তৃষিত এ অন্তর।/ না জানি, তাহলে তুমি,/কত সুন্দর! কত সুন্দর!’ হ

SHARE

Leave a Reply