Home স্মরণ মহাকবি কায়কোবাদ তাহসিন ফারজাদ

মহাকবি কায়কোবাদ তাহসিন ফারজাদ

কায়কোবাদ তাঁর লেখক নাম। আসল নাম কাজেম আল কোরায়শী। তিনি একজন কবি। তিনি মহাকবি। তিনি বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম সনেট রচনা করেন। রচনা করেন প্রথম মহাকাব্য। এটি মজার বিষয় বটে। তার জন্ম ১৮৫৭ সালে। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানায়। গ্রামের নাম আগলা-পূর্বাপাড়া।
কায়কোবাদ লেখাপড়া করেন সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। খুব অল্প বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর তিনি ঢাকা মাদরাসায় ভর্তি হন। যা এখন কবি নজরুল সরকারি কলেজ। এখানে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষা পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। কিন্তু পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ তাঁর হয়নি। কিংবা দিতে পারেননি। যেহেতু অল্প বয়সে পিতা মারা গেছেন ফলে জীবনে অভাবের মুখোমুখি হন। প্রবেশিকা পরীক্ষা না দিয়ে একটি চাকরিতে যোগ দেন তিনি। চাকরিটি ছিল পোস্ট মাস্টারের। তাঁর গ্রামেই ছিলো এর অফিস। তিনি লেখাপড়া ছেড়ে পোস্ট মাস্টারের চাকরি নিয়ে ফিরলেন তাঁর নিজ গ্রামেই। এই চাকরি থেকেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
কায়কোবাদ মুসলিম কবিদের মধ্যে মেধাবী কবি ছিলেন। ছিলেন অগ্রগণ্য একজন। তাঁর সময়কার মুসলিম কবি ও লেখক ছিলেন- মীর মর্শারফ হোসেন, মোজাম্মেল হক। তাঁর পরবর্তী কয়জন মুসলিম কবি ও সাহিত্যিক হলেন- শেখ ফজলুল করিম (১৮৮২-১৯৩৬), শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮), কাজী আব্দুল ওয়াদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), আবুল মনসুর আহমেদ (১৮৯৮-১৯৭৮), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), মোহাম্মদ নজিবর রহমান (১৮৭৮-১৯২৩), মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ (১৮৯৮-১৯৭৬), আবুল ফজল (১৯০৫-১৯৮১), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৫)। এসব কবি সাহিত্যিকগণ প্রত্যেকেই তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী সাহিত্য রচনা করেন। এদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম সকলকে ছাপিয়ে হয়ে যান সেরা থেকে আরও সেরা।
যে নামগুলো আমরা জানলাম এদের কেউ মহাকাব্য রচনা করেননি। কায়কোবাদ রচনা করেছেন বলেই তিনি মহাকবি। তাঁর মহাকাব্যের নাম- ‘মহাশ্মশান।’ আরেকটি কাব্যগ্রন্থ তাঁর। নাম- ‘মহররম শরীফ’। এটিকে বলা হয় কাহিনী কাব্য। মূলত এটিও একটি মহাকাব্য।
কায়কোবাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ- ‘বিরহ বিলাপ।’ এটি প্রকাশিত হয় ১৮৭০ সালে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৩ বছর। এত কম বয়সে বের হয় তাঁর কবিতার বই। তাঁর বাকি গ্রন্থগুলোর নাম- কুসুম কানন, অশ্রুমালা, শিব মন্দির, অমিয় ধারা, শ্মশান ভস্ম, শ্মশান ভসন, প্রেমের রাণী, প্রেম পারিজাত ইত্যাদি। এই মেধাবী কবি তার সময়ে বেশ সুনাম কুড়ান। তাঁর খ্যাতি তাঁকে দিয়েছে অনেক সম্মান। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও মুসলিম কবি যাঁকে ১৯২৫ সালে নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ’, ও ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি দেন। খুব মজার এবং অসাধারণ কিছু কবিতা রচনা করেন তিনি। তাঁর কবিতায় মুসলমানদের বিশ্বাস ধ্বনিত হয়েছে। আছে মুসলমানদের ঐতিহ্য। আছে চেতনা। জীবনের নানান সৌন্দর্যের চিত্র আছে তাঁর কবিতায়। প্রকৃতির বর্ণনা আছে দারুণভাবে। তিনি মানুষের জীবনের সুখ দুঃখ নিয়ে লিখেছেন। লিখেছেন মানুষের সম্পর্ক নিয়ে। সত্য ও ন্যায়ের কথা আছে তাঁর কবিতায়।
তাঁর একটি কবিতার নাম- ‘প্রার্থনা’। এই কবিতায় তিনি মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেন।
তোমার দুয়ারে আজি রিক্ত হস্তে দাঁড়ায়েছি প্রভু
সঁপিতে তোমারে শুধু আঁখি জল
দেহ হৃদে বল।
একজন বিশ্বাসী মানুষ রবের কাছে নিজেকে সঁপে দেন। বলেন- আমি নিঃস্ব, আমি অসহায়। আমাকে সাহায্য করো। আমাকে দয়া করো। তেমনি কায়কোবাদ তাঁর প্রার্থনা কবিতায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালার দরবারে। চোখের অশ্রু দিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেন তিনি।
কায়কোবাদ আমাদের কাছে সব থেকে বেশি পরিচিত একটি কবিতা দিয়ে। কবিতাটির নাম- ‘আযান’। এটি কায়কোবাদের বিপুল পরিচিত কবিতা। সবচেয়ে বেশি পঠিত কবিতা। কায়কোবাদ নামের সাথে জড়িয়ে আছে আযান কবিতাটি। আযান নিয়ে কায়কোবাদের মতো এমন আনন্দময় ও প্রাণস্পর্শী কবিতা আর কোনো কবি লেখেননি। কায়কোবাদের এ কবিতাটি পাঠ করলেই বোঝা যায় কী মধুময় বাণী আছে কবিতায়। প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়ার মতো কথামালা। হৃদয় আলোড়িত হয়। মন নেচে ওঠে। বিশ্বাস দৃঢ় হয়। পাঠ করা যাক কবিতাটি-
কে ওই শোনালো মোরে আযানের ধ্বনি
মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কী সুমধুর
আকুল হইলো প্রাণ নাচিলো ধমনি
কী মধুর আযানের ধ্বনি।

আমি তো পাগল হয়ে সে মধুর তানে
কী যে এক আকর্ষণে, ছুটে যাই মুগ্ধ মনে
কী নিশিথে কী দিবসে মসজিদের পানে।

হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত ধারে
কী যে এক ঢেউ ওঠে ভক্তির তুফানে
কত সুধা আছে সেই মধুর আযানে।

নদী ও পাখির গানে, তারই প্রতিধ্বনি
ভ্রমরের গুণগানে, সেই সুর আসে কানে
কী এক আবেশে মুগ্ধ নিখিল ধরণী।

ভূধরে, সাগরে জলে নির্ঝরণী কলকলে
আমি যেনো শুনি সেই আযানের ধ্বনি।
আহা যবে সেই সুর সুমধুর স্বরে
ভাসে দূরে সায়াহ্নের নিথর অম্বরে।
প্রাণ করে আনচান, কি মধুর সে আযান
তারি প্রতিধ্বনি শুনি আত্মার ভেতরে।

নীরব নিঝুম ধরা, বিশ্বে যেনো সবই মরা
এতটুকু শব্দ যবে নাহি কোনো স্থানে
মুয়ায্যিন উচ্চঃস্বরে দাঁড়ায়ে মিনার পরে
কি সুধা ছড়িয়ে দেয় ঊষার আযানে।
জাগাইতে মোহমুগ্ধ মানব সন্তানে
আহা কি মধুর সেই আযানের ধ্বনি।

কী যে মায়াবী শব্দ দিয়ে কবিতাটি লিখেছেন তিনি। লিখেছেন হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে। হ

SHARE

Leave a Reply