Home তোমাদের গল্প মায়ের শাড়ি -আনোয়ার আল ফারুক

মায়ের শাড়ি -আনোয়ার আল ফারুক

জামিলের বাবা মারা গেছে সেই ছোটকালে। জামিলের বয়স তখন দু’বছর কয়েক মাস হবে। মা জামিলকে নিয়েই জামিলের বাপের ভিটায় থেকে যান। শিক্ষিত মহিলা। গ্রামের আট দশ জন ছেলে মেয়েকে সকাল আর বিকাল দু’বেলা পড়ান। বিনিময়ে যা পান তাতেই তাদের সংসার চলে যায়। জামিলের মামাদের আর্থিক অবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়। তারাও খুব একটা খোঁজ নিতে পারেন না। জামিল এবার পঞ্চম শ্রেণি সমাপনী পরীক্ষার্থী। এইতো সেই প্রাতঃসকালে স্কুলের কোচিং ক্লাসে চলে যায়। দুপুরের বিরতিতে এসে চারটা খেয়েই আবার স্কুলে দৌড়। ফিরতে ফিরতে সে সন্ধ্যেবেলা। জামিলের মা প্রতিদিন দু’চার টাকা দেন বিরতির ফাঁকে কিছু যেন কিনে খেতে পারে। অন্য ছেলেদের মত জামিল বায়না ধরে না। যা পায় তাতেই সন্তুষ্ট। জামিলের মা ভাবছেন এবার ঈদে বাচ্চাকে কী কিনে দেবেন? জামিল বলল মা তোমাকে ভালো ডাক্তার দেখানো দরকার। তুমি আগে ডাক্তার দেখাও। আমি গত বছরের মামার দেওয়া পাঞ্জাবিটা ইস্ত্রি করে ঈদের দিন পরব। জামিলের কথায় মা আঁচল টেনে চোখ মুছেন। আর দু’ দিন পর ঈদুল ফিতরের ঈদ। বিকালে জামিল খেলার মাঠে গিয়েছে। ফিরতে দেরি দেখে মা তাকে খুঁজতে যায় পাশের স্কুল মাঠে। সন্ধ্যা নামছে কতো আগে কিন্তু জামিল বাসায় ফেরেনি। মা ভাবছেন হয়ত মসজিদে নামাজ পড়ছে। নামাজ শেষে সবাই বের হল। কিন্তু জামিলের খোঁজ নেই। পাড়ার আশপাশের কয়জন ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে ওরাও বলে- কই জামিলতো আজ স্কুল মাঠে খেলতে আসেনি। মায়ের চিন্তা আরো বেড়ে গেল। ভাবছেন বাড়ির কারো একটা ছেলেকে হাতে নিয়ে স্থানীয় বাজারে খুঁজতে যাবেন। বাড়ি এসে দেখলেন ঘরে জামিল নামাজ পড়ছে।
– কিরে বাবা এতক্ষণ কই ছিলি?
– কেন, আম্মু তোমাকে না বলে গেছি বাজারে যাচ্ছি। মামার দেওয়া পাঞ্জাবিটা ইস্ত্রি করার জন্য।
– আহ! আমি ভুলে গেছি। কিযে পেরেশান হয়ে তোকে খুঁজতে বের হয়েছি আর কতজনকে জিজ্ঞেস করছি।
– আম্মু আমি কখনো লেখাপড়ার প্রয়োজনে শহরে গেলে তুমি থাকবে কেমনে?
মা, কোন কথা না বলে শুধু কাপড় আঁচলে মুখ ঢাকলেন। জামিল বুঝছে মা কাঁদছেন।
– আম্মু তুমি কাঁদছ কেন? কাল সকালে ঈদ।
– নারে বাবা, কাঁদছি না। চাঁদ কি উঠছে?
– আম্মু শুনছ না, চাচ্চুর বাসায় টেলিভিশনে গান গাইছে- ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…।
– ও তাইতো।
খুব ভোরে মা ছেলে উঠে নামাজ পড়ল। মা, সেমাই পায়েশ রান্না করে জামিলকে খাবার জন্য ডাকেন। ততক্ষণে জামিলও ঈদের নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে। জামিল একটি প্যাকেটে কী যেন একটা নিয়ে মায়ের কাছে আসল।
– আম্মু, দেখ এটা তোমার জন্য ঈদের উপহার। কত দিনতো দেখছি তুমি একটা নতুন কাপড় কেনোনি।
– কী বলছ তুমি? এই শাড়ি তুমি কোত্থেকে এনেছ?
– বাজার থেকে। কাল বিকালে কিনছি। তুমি আমাকে প্রতিদিন যে টিফিনের টাকা দিতে তা আমি একদিনও খরচ করিনি। তোমাকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দেবো বলে সাতশত টাকা জমিয়েছি। সে টাকায় এই শাড়ি কিনলাম।
জামিলের মা সম্পূর্ণ নির্বাক। অঝোরে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে জামিলকে বুকে টেনে ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন।
– আম্মু, আজ না ঈদের দিন। আজ কোন কান্না নয়। আমি প্রথমে আব্বুর কবর জিয়ারত করে ঈদের নামাজে যাবো। তুমি গোসল করে এই কাপড় পরে নেবে। জামিল ঈদগাহের দিকে যাচ্ছে আর মা ছেলের দিকে তাকিয়ে আবেগে কাঁদছেন।

SHARE

Leave a Reply