Home সায়েন্স ফিকশন শ্যাডোক্রাফট -আব্দুর রহমান মাজিদ

শ্যাডোক্রাফট -আব্দুর রহমান মাজিদ

দরজাটা এক ধাক্কায় খুলে রুমে ঢুকলাম। ভিজে গেছি পুরোপুরি। বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে ঝড়ো বাতাস। এই অবস্থায় বাইরে থাকা বিপজ্জনক। আমি একা থাকি দুই রুমের একটা বাসায়। চাকরবাকর নেই। দরকারও হয় না। আমার পুরো বাসাটা অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি দিয়ে ঘেরা। ডিজিটাল বাসা বুঝি একেই বলে। আমার দৈনন্দিন জীবনের সকল কর্মকাণ্ড প্রযুক্তিনির্ভর। এইতো বাইরে একটা কাজ সেরে নিজের এক্সপান্ডেবল টু হুইলার মোটরবাইক নিয়ে গন্তব্যে ফিরেছি। এই মোটরবাইক সাধারণ মোটরযান নয়। এতে ফুয়েল হিসেবে ব্যবহার করা যায় সাধারণ খাবার জল। শুধু ডাঙায় নয়, জলে এবং আকাশ উভয় জায়গায় সমানতালে ছুটতে পারে আমার ব্ল্যাক ড্রাগন-৫০ বাইকটি। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এই বাইককে ভাঁজ করে আকারে ছোট বানিয়ে ফেলা যায়। তখন একদম হাতের মুঠোয় রাখা যায় ওটাকে। ভাঁজ করা অবস্থায় বাইকের ওজনও কমে যায়। ফলে পকেটে করে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়। রুমে ঢোকার আগে বাইককে ছোট করে টেবিলের ওপর রেখে দিলাম। এখন ওটাকে একটা খেলনা শো-পিসের মত দেখাচ্ছে।
তারপর ভয়েস কমান্ড দিয়ে ফায়ারপ্লেসের আগুনটা জ্বালিয়ে দিলাম। সাথে সাথেই দপদপ করে জ্বলে উঠলো আগুন। প্রকৃত আগুন নয়। ঘর গরম করার জন্য এক ধরনের হিট ওয়েভ ছড়ায় ওটা থেকে। আর ডেকোরেশন এর জন্য মনে হয় সত্যিকারের আগুন জ্বলছে।
ভেজা কাপড় পালটে ফায়ারপ্লেসের কৃত্রিম আগুনের পাশে চেয়ার পেতে বসলাম। সামনে রাখা স্টাডি টেবিলটা কাছে টেনে নিলাম। ওতে আমার দৈনন্দিন সকল কাজ লিপিবদ্ধ করার জন্য একটা ডায়েরি রাখা হয়েছে। প্রতিদিনের ঘটনাগুলো ওটাতে লিখে ফেলি আমি। ইচ্ছা করলে ডিজিটাল ভয়েস কমান্ডিং ডায়েরিতে মুখে বলেই রেকর্ডিং এর মাধ্যমে সব লিপিবদ্ধ করে ফেলা যায়। কিন্তু ওতে মনে শান্তি পাই না। কাগজের ডায়েরিতে ফাউন্টেনপেন দিয়ে লেখার সময় যে খসখস শব্দ হয় তা আমার খুব ভালো লাগে। আজ ঘরে ফেরামাত্র ডায়েরি নিয়ে বসার একটা বিশেষ কারণ আছে। কাজ করতে করতে পশ্চিমের আকাশে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেয়েছি আমি। কী দেখেছি সেটা বলার আগে আমার পরিচয়টা দিয়ে নিচ্ছি।

আমি রিক মরগ্যান। সবাই আমাকে পাগল বিজ্ঞানী রিক বলে ডাকে। আমার সহকর্মী এবং এই শহর অথবা এই ঐঞজঅঊ গ্রহের বাসিন্দারা সবাই আমার এই নাম জানে। তাদের ধারণা আমি অপ্রকৃতিস্থ। তবুও গ্রহের নামকরা রোবোটিসিস্ট কোম্পানি ‘ফিউশন’ এর প্রধান রোবোটিসিস্ট হিসেবে আমাকে কাজ দেওয়া হয়েছে। কারণ আমি যেকোন ধরনের রোবট বানাতে পারি। শুধু একটু সময় আর শ্রম দিলেই আমার উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে আসে নানারকম রোবট বানানোর পরিকল্পনা। আর সেটা শুধু পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাস্তবায়নও হয় খুব দ্রুত। আমার খ্যাতি পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই নিন্দুকরা আমায় পাগল বলে। আমি ব্যাপারটা আমলে নেইনি কোন দিন। এমনিতেই আত্মভোলা মানুষ আমি। কারো কথা কানে নিই না। নিজের মতো চলি। আমাদের গ্রহের লোকসংখ্যা ঝজঅগ বা ঘজটঞঅঝ গ্রহের তুলনায় নেহাত কম। এই অল্পসংখ্যক লোকের মধ্যেও হিংসা জিনিসটা সশরীরে বিদ্যমান। ভাবতেই খারাপ লাগে।
যাই হোক আজ যা দেখেছি সেটা বলে ফেলি। রোজকার অভ্যেস মত আমার ট্রিপল টেলিফটো লেন্সে তৈরি টেলিস্কোপে করে ঝজঅগ আর ঘজটঞঅঝ গ্রহে চলমান সহিংসতা সরাসরি দেখছিলাম। সিসিডিতে কফি খাওয়ার সময় আমি রোজ এই কাজটা করি। আমার টেলিস্কোপটাও বাইকের মতই পোর্টেবল। পকেটে করে নিয়ে চলাফেরা করা যায়। কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে আমি লেন্সে চোখ রাখলাম। টেলিভিশনে খবর দেখার চেয়ে সরাসরি দেখা অনেক আনন্দদায়ক। যদিও যুদ্ধ আমার ভালো লাগে না। তবুও দুই প্রতিবেশী গ্রহের বেকুবদের মধ্যকার অনর্থক মারামারি দেখতে ভালোই লাগে। বেশ কিছুক্ষণ ওদের হানাহানি দেখে লেন্সটা গুটিয়ে নিতে যাবো তখন হঠাৎ আমার দৃষ্টি চলে গেলো ঝজঅগ গ্রহের ডানদিকে। একটা বিরাট গোলাকার বস্তু ভাসছে ওখানে। প্রায় নীল রঙের বস্তুটাতে সবুজ আর আকাশি রঙের বাহার আছে। প্রবলবেগে ঘুরছে বস্তুটা। ওটা কি নতুন কোন গ্রহ? নাকি অন্য কিছু? কোন প্রাণী নয়তো? আমার জানা মতে সৌরজগতে মোট তিনটে গ্রহ রয়েছে যেটাতে প্রাণী বসবাস করে। আমাদের গ্রহ ঐঞজঅঊ, ঝজঅগ এবং ঘজটঞঅঝ। “এওল্কিমি” ছায়াপথে আরো হাজার হাজার গ্রহ থাকলেও সেগুলোতে প্রাণের অস্তিত্ব নেই। তবুও মাঝে মধ্যে অদ্ভুত আকৃতির সব প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে অজানা কোন মাধ্যম থেকে। দেখা যায় পুরো গ্রহটাই আসলে বিশাল কোন প্রাণী! তারা নীলতিমির মত নিরীহ নয়, হিংস্র! আশপাশে থাকা গ্রহগুলোকে ব্ল্যাকহোলের মত গ্রাস করে একসময় নিজেই ধ্বংস হয়ে যায়। যেন কোন পেটুক লোক বেশি খেতে খেতে পেট ফেটে মরে যাচ্ছে।
এটা অমন গ্রাহিক প্রাণী হতে পারে। আকার দেখে মনে হচ্ছে প্রথম হামলাটা ঝজঅগ গ্রহের ওপর করবে ও। তারপর ধীরে ধীরে ঘজটঞঅঝ-কে খতম করে আমাদের গ্রহের দিকে আসবে। আমি আর কাউকে ব্যাপারটা বললাম না। কারণ আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেবে। তাই নিজের তৈরি প্ল্যানেট মনিটরিং রোবটগুলোকে সঙ্কেত পাঠালাম ওরা যেন ঐ বস্তু বা প্রাণীটা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসতে পারে। আশপাশের গ্রহগুলোতে যুদ্ধ না চললে আমি নিজেই আমার স্পেসক্রাফটে করে যেতাম ঐ গ্রহে। কিন্তু এখন গেলে দুই গ্রহের প্রধান এর ক্ষোভানলে পড়তে হবে আমাকে। তাছাড়া আমার মনিটরিং রোবটগুলো এত বেশি দ্রুত উড়তে পারে যে আলোর গতি তাদের গতির কাছে কিছুই নয়। তারা ওড়ার সময় অতিরিক্ত গতির কারণে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলে কোন গ্রহের রাডার তাদের ধরতে পারবে না। ঘরে বসে একদম গোপনে ঐ বস্তুটা সম্পর্কে জানতে পারবো আমি। স্পেসক্রাফট দিয়ে যা সম্ভব না। অন্তত এই পরিস্থিতিতে না।

সারাদিন ফিউশনের মেইন ল্যাবে কাজ সেরে আমি যখন ঘরে ফিরবো তখন মনিটরিং রোবটগুলো এসে একটা অদ্ভুত খবর জানালো আমায়। ওরা নাকি ঝজঅগ গ্রহের চারপাশ তন্নতন্ন করে খুঁজেও নতুন কিছুই দেখতে পায়নি। আমার হিসাবে কি কোন ভুল হলো? আমি তো স্পষ্ট দেখেছি নীলাভ গোলাকার বস্তুটিকে। ওদের প্রোগ্রামিংয়ে নিশ্চয়ই কোন বাগ ঢুকেছে। নইলে যন্ত্রমানবের তো কোন ভুল হবার কথা নয়। আমাকে এক্ষুনি ছাদে গিয়ে দেখতে হবে ব্যাপারটা। ছাদে পৌঁছে টেলিস্কোপ আবার তাক করলাম ঝজঅগ গ্রহের দিকে।
কিন্তু তাকিয়ে যা দেখলাম তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। দেখি ঝজঅগ গ্রহটাই বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে। তার বদলে ওখানে শোভা পাচ্ছে নীলাভ গোলাকার বস্তুটি। ওটার আয়তন বেড়ে গিয়েছে দ্বিগুণ। তার মানে ঝজঅগ-কে এরই মধ্যে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে বস্তুটা। কিন্তু এত দ্রুত কিভাবে সম্ভব? কোন সংবাদমাধ্যমে তো এই ভয়াবহ আকস্মিক আক্রমণের কথা বলা হচ্ছে না। শুধু দুই গ্রহের যুদ্ধের খবরগুলো সম্প্রচার করা হচ্ছে। তার মানে ঐ নীলাভ বস্তুটা আমাদের গ্রহের স্যাটেলাইটে কোন প্রভাব ফেলেছে। হয়তো সাংবাদিক রোবটগুলোকেও হ্যাক করেছে অশুভ বস্তুটা। নইলে এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রাণীসুদ্ধ এতবড় একটা গ্রহ লোপাট হয়ে যাবার ঘটনা চাপা থাকে কিভাবে?
মনিটরিং রোবটগুলোকে টেলিস্কোপে চোখ রাখতে বললাম। জিজ্ঞেস করলাম ওরা কী দেখছে। ওরা উত্তরে যা বললো তাতে বোঝা গেলো যে ওদের নিয়ন্ত্রণ এখন আমার হাতে নয় অন্য কারো হাতে। কারণ ওরা বলছে ঝজঅগ আর ঘজটঞঅঝ গ্রহ ছাড়া ওরা আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আমি রাগান্বিত স্বরে বললাম ঝজঅগ তো হাওয়া হয়ে গেছে, দেখতে পাচ্ছোনা টিনের বাক্সের দল? ওরা জবাবে আগের কথাটাই পুনরাবৃত্তি করলো।
আমি বুঝলাম ঐঞজঅঊ গ্রহের কপালে খারাবি আছে। একটা অতিকায় ভয়াল প্রাণী এগিয়ে আসছে আমাদের ছোট্ট গ্রহটার দিকে। যার অস্তিত্ব আমি ছাড়া কেউ টের পাচ্ছে না। আর পুরো গ্রহবাসী জানে যে আমি পাগল। তাই আমি যদি গ্রহের প্রধানকে যা দেখেছি তা জানাই সে ব্যাপারটা মিথ্যা মনে করে পাত্তাই দেবে না। তাছাড়া যা প্রযুক্তিতে ধরা পড়েনি তা তুচ্ছ মানুষের মস্তিষ্কে ধরা পড়ে কিভাবে সেটা ভেবে হাসাহাসি করবে।
ফিউশনের ল্যাব থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে দেখি আকাশের অবস্থা ভালো নয়। মোটরবাইকে উঠতেই বৃষ্টি নেমে পড়লো ঝমঝম করে। মিটার হাইপারস্পিডে সেট করে মোটরবাইকে করে উড়ে এলাম নিজের ঘরে। তবুও ভিজে গেছি। ডায়েরিতে সব ঘটনা গুছিয়ে লিখে ফেললাম এই ফাঁকে। একটা বিভীষিকার অপেক্ষা করছি। এই গ্রহে আমি একা অসহায় অবস্থায় ভাবছি গ্রহ বিলীন হয়ে যাবার কথা। আর কেউ তো জানে না। সবাই যার যার মতো ব্যস্ত। ওরা কল্পনাও করতে পারবে না যে কতবড় সঙ্কট অপেক্ষা করছে ওদের জন্য। একটা গ্রহাকৃতির প্রাণী ওদের ভক্ষণ করার জন্য ছুটে আসছে!
ঘড়িতে দেখলাম কাঁটায় কাঁটায় রাত ১২টা বাজে। আবার টেলিস্কোপ নিয়ে নীলাভ আগ্রাসী প্রাণীটার অগ্রগতি দেখতে হবে। হাতে সময় খুব কম। স্বাভাবিক সময়গুলোতে বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা এত প্রবল হয় না। কিন্তু আপনি যখন জানতে পারবেন আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আপনি মরতে যাচ্ছেন, তখন বাঁচার আকুতি শেলের মত বিঁধতে থাকে বুকে। মনে হয় আর কিছু মুহূর্ত কেন পেলাম না। আরো বাঁচতে চাই। এই গ্রহে আমি একা এই কষ্ট বুকে নিয়ে হারিয়ে যাবো প্রাণীটার মুখগহ্বরে। যেন বিশাল একটা পাথর আমার বুকের ওপর এনে ফেলেছে কেউ। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। খুব ভালো হয় যদি ঐ শয়তানটা আক্রমণ করার আগেই আমি হার্ট অ্যাটাকে মারা যাই। কিন্তু সেটাও সম্ভব না। আমি অসহায়। চরম অসহায়। কারো সাথে কষ্টটা ভাগাভাগি করে নিতেও পারছি না। এতটা নিঃসঙ্গ আমি। এখন মনে হচ্ছে আমার যদি দু’ একজন বন্ধু থাকতো তাহলে হয়তো তাদের সাথে শেষবারের মত আড্ডায় বসতাম। পেগের পর পেগ হুইস্কি গিলতাম। মাতাল অবস্থাতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যেতো।
আমার মত হতভাগার সেই ভাগ্য হয় কী করে? জানালার কাছে এসে দাঁড়িয়েছি। কাঁপা কাঁপা হাতে টেলিস্কোপটার স্লাইডিং লেন্স চোখ বরাবর তুলে ধরলাম। দেখতে ইচ্ছে করছে না। চোখের জলে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। জীবনে এই প্রথম কাঁদছি আমি! কিন্তু এখন কেঁদে কী হবে? তাই চোখ রগড়ে মুছে নিলাম। তারপর ইচ্ছার বিরুদ্ধে লেন্সে চোখ রাখলাম। জুম কমিয়ে বাড়িয়ে ঝজঅগ গ্রহের দিকে তাক করতেই দেখলাম জায়গাটা খালি। শুধু এওল্কিমি ছায়াপথ দেখা যাচ্ছে। প্রাণীটা তাহলে গেলো কোথায়? লেন্স ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলাম চারপাশ। অনেক চেষ্টায় পাওয়া গেলো ওটাকে। ঐ হিংস্র জন্তুটা ঘজটঞঅঝ গ্রহকে প্রায় সম্পূর্ণটাই গ্রাস করে ফেলেছে। এখন আমাদের গ্রহের পালা সেটা বলাই বাহুল্য। চোখের পলক পড়তে না পড়তেই ঘজটঞঅঝ গ্রহটা ঐ প্রাণীটার মুখের মত কালো খোলা গহ্বরের মধ্যে হারিয়ে গেলো। আর কিছু সময় পর আমাদের গ্রহেরও একই দশা হবে। কেউ জানবে না। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে চিরতরে হারিয়ে যাবো আমি। ঐতো প্রাণীটা আক্রমণ করেছে। থরথর করে কেঁপে উঠছে সমস্ত গ্রহ। আর নিস্তার নেই। তুমুল কোলাহল আর আর্তনাদের মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হচ্ছে ঐঞজঅঊ গ্রহ! বড় নিষ্ঠুর এই নিয়তি!
“প্রফেসর রিক? আপনি কি আমার কথা শুনতে পারছেন? প্রফেসর?” আমি বোধ হয় নরম তুলতুলে একটা বিছানায় শুয়ে আছি। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই বুঝতে পারছি ঘরে উজ্জ্বল আলো জ্বলছে। কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে আর মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে। চোখ খুলতে ইচ্ছা করছে না। তবুও কৌতূহলী মন চোখ খুলতে বাধ্য করলো। চোখ খুলে যারপরনাই অবাক হলাম। কোথায় আছি আমি? সম্ভবত আমার নিজের ঘরেই। কিন্তু ঘরটা কেমন ওলট-পালট করে সাজানো। আমার সামনে ঝুঁকে পড়ে যে লোকটা ডাকছে ও আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট জ্যাক। কিন্তু আমি তো একা থাকতাম তাহলে অ্যাসিস্ট্যান্ট জ্যাকের আবির্ভাব হলো কোথা থেকে? ওর নামটা এতো স্পষ্ট করে বলতে পারছি কিভাবে? আমার গ্রহটা তো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিলো। তাহলে কি গ্রহটা কোন কারণে ধ্বংস হয়নি? নাকি পুরো ব্যাপারটা একটা স্বপ্ন ছিলো? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে জ্যাক।
ওকে জিজ্ঞেস করে যা জানলাম তাতে চোখ কপালে উঠে গেলো। ও যা বললো তা অনেকটা এরকম। আমি নাসায় কর্মরত বিজ্ঞানী রিক মরগ্যান। জ্যাককে সঙ্গে নিয়ে একটা বিষয়ে গোপনে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছি। বিষয়টা আর কিছু নয় “প্যারালাল ওয়ার্ল্ড।”
যেকোন বিষয়ের মিরর ইমেজ বা আয়নার প্রতিবিম্ব-কে বাস্তবে রূপ দান করলেই “প্যারালাল ওয়ার্ল্ড” এর সন্ধান পাওয়া সম্ভব। সেই জন্য আমি একটা যন্ত্র আবিষ্কার করি। নাম নেই “প্যারামিরর”! এই যন্ত্রের ভেতরে একটা বিশাল আয়না রয়েছে। যার সামনে কোন বস্তু রাখলে তার ভেতরের প্রতিফলিত বস্তুটিকে বাইরে আনা যায়। যেমন ধরা যাক প্যারামিররের সামনে একটা আপেল রাখা হলো। আপেলের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখা গেলেই আয়নার ভেতর থেকে আরেকটি আপেল বের করে নিয়ে আসা যাবে। যেই আপেলটি প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের। দুটো আপেলের মধ্যকার রঙ আর স্বাদ সম্পূর্ণ বিপরীত হবে আয়না থেকে বের করার সাথে সাথেই।

জ্যাকের কথা অনুযায়ী আমি নাকি সাহস দেখাতে গিয়ে নিজেই প্যারামিররের আয়নার ভেতরে ঢুকে পড়েছিলাম। এই পরীক্ষার নাম দিয়েছিলাম ‘শ্যাডোক্রাফট’! তাই অন্য ডাইমেনশনে পৌঁছে গিয়েছিলাম। যে ডাইমেনশনে বাস্তব পৃথিবীর ছায়া পড়ে প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে।
যেখানে সুস্থ স্বাভাবিক আমি পাগল হয়ে গেছি, বন্ধুপাগল আমি নিঃসঙ্গ হয়েছি, মিল্কিওয়ে ছায়াপথ হয়ে গেছে “এওল্কিমি”, ঝঅঞটজঘ (শনি গ্রহ) হয়ে গেছে ঘজটঞঅঝ আর গঅজঝ (মঙ্গল গ্রহ) হয়ে গেছে ঝজঅগ! আমি নিজেকে প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের যে গ্রহে কল্পনা করেছি সেটাও আর কিছু নয় ঊঅজঞঐ এর আয়নার প্রতিবিম্ব ঐঞজঅঊ! আমি বোধ হয় শ্যাডোক্রাফটের অনেক গভীরে পৌঁছে গিয়েছিলাম তাই বাস্তবে ফিরে আসার আগে মনে হয়েছে নীলাভ গোলাকার কোন বস্তু আমাদের গ্রাস করতে আসছে। বুঝতেই পারছি নীল, সবুজ ও আকাশি ছোপযুক্ত ঐ গোলাকার বস্তুটি আসলে আর কিছুই নয় আমাদের বাসস্থান ঊঅজঞঐ বা পৃথিবী।
আমি নাকি সর্বমোট নয় ঘণ্টা ছিলাম প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে! এই নয় ঘণ্টায় কত কিছু ঘটে গেছে। নিজের আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে। জ্যাক ভেবেছিলো আমি আর প্যারালাল ওয়ার্ল্ড থেকে ফিরতেই পারবো না। রবের কৃপায় সেটা পেরেছি।
পরদিন সকাল। নাসার হেডকোয়ার্টার থেকে একটা খবর শুনে চিন্তায় পড়ে যেতে হলো। পৃথিবীর আয়তন নাকি দিন দিন বাড়ছে! তাহলে কি শ্যাডোক্রাফটের ঘটনা সত্যি হতে চলেছে? সবার অজান্তে পৃথিবী গ্রাস করে চলেছে তার চাইতে ছোট সব গ্রহগুলোকে?

SHARE

Leave a Reply