Home চিত্র-বিচিত্র নয়নাভিরাম ক্লাউন ফিশ -জাহিদ ইকবাল

নয়নাভিরাম ক্লাউন ফিশ -জাহিদ ইকবাল

সাগরতলে বিচিত্র প্রাণীর বাস। সেখানে যেমন চোখজুড়ানো সুন্দর প্রাণী রয়েছে তেমনই রয়েছে ভয়ঙ্কর প্রাণীও। এদের কিছু কিছু এতই অদ্ভুত এবং বৈচিত্র্যময় যে দেখলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। এখানে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির রঙবেরঙের সুন্দর সুন্দর মাছ। তেমনি অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী একটি মাছের নাম ক্লাউন ফিশ। সাগরের সবচেয়ে সুন্দর প্রাণীর একটি হচ্ছে ক্লাউন ফিশ। অসাধারণ সুন্দর এই মাছের নামটি বড় অদ্ভুত, ক্লাউন ফিশ বা জোকার মাছ। ক্লাউন ফিশকে বিশ্বের সব থেকে সুন্দর মাছ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাছগুলো বেশ রংচঙে। দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণে জোকাররা সাধারণত রংচঙে চটকদার পোশাক পরে থাকে। সাগরে মাছের জগতে ক্লাউন ফিশও যেন তা-ই। এ জন্যই মাছটির এমন নাম হয়েছে।
এ পর্যন্ত ২৮ প্রজাতির ক্লাউন ফিশের সন্ধান পাওয়া গেছে। ক্লাউন ফিশ সাধারণত গ্রেট ব্যারিয়ার রিফসহ ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর ও লোহিতসাগরে থাকে। এর সবচেয়ে বড়টি ১৮ সেন্টিমিটার ও সবচেয়ে ছোটটি ১০ সেন্টিমিটারের হয়ে থাকে। ক্লাউন ফিশের অনেক প্রজাতির মধ্যে ঙপবষষধৎরং পষড়হিভরংয সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। সৌন্দর্যের জন্য একে অনেকে অ্যাকুরিয়ামে পালন করে থাকে। ক্লাউন ফিশকে নিয়ে তৈরি হয়েছে হলিউড মুভি। ক্লাউন ফিশের সারা দেহ কমলা, হলুদ এবং লালচে ও কালচে রঙের হয়। এ ছাড়াও এদের দেহে অনেক সাদা সাদা রেখা দেখা যায়। পুরুষদের লেজের মাধ্যমে চেনা যায়। যা শরীরের চেয়ে বড়। মেয়ে মাছের লেজ ছোট এবং পুরুষ মাছের তুলনায় পাতলা হয়।ক্লাউন ফিশের জীবনচক্র বড়ই অদ্ভুত। সবচেয়ে মজার তথ্য হচ্ছে সব ক্লাউন ফিশ জন্মগ্রহণ করে পুরুষ হয়ে। পরবর্তীতে তারা প্রয়োজন অনুসারে তাদের লিঙ্গ পরিবর্তন করে। কোন কারণে যদি একটি দল থেকে স্ত্রী মাছ মারা যায় বা হারিয়ে যায় বা অন্যত্র চলে যায় তাহলে তার স্থানে চলে আসে লিঙ্গ পরিবর্তনকারী একটি পুরুষ মাছ। একটি ঝাঁকের মধ্যে কেবল সবচেয়ে বড়, বলিষ্ঠ এবং শক্তিশালী পুরুষ মাছটি লিঙ্গ পরিবর্তন করে স্ত্রীতে পরিণত হয়।
একটি ঝাঁকে শুধুমাত্র একজোড়া পুরুষ ও স্ত্রী ক্লাউন ফিশ প্রজননে অংশগ্রহণ করে। পুরুষ এবং স্ত্রী ক্লাউন ফিশ জোট বেঁধে বাচ্চা উৎপাদন করে। একবারে একটি ক্লাউন ফিশ একশত থেকে এক হাজারটি পর্যন্ত ডিম দেয়। পুরুষ ক্লাউন ফিশ ডিমগুলো পাহারা দেয়। ৬ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ক্লাউন ফিশের বংশগতির ধারা বজায় থাকে।
এরা উজ্জ্বল আলো পছন্দ করে না। গাছপালা বা পাথরগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে। গর্ত, গুহা এবং অন্যান্য গোপন জায়গায় ঘুমায়। ক্লাউন ফিশ বিচরণ করে অ্যানিমানির জগতে। অ্যানিমানি হচ্ছে এক ধরনের জলজ প্রাণী। এরা গুচ্ছাকারে থাকে। দেখতে আঙুলের আদলে লম্বা লম্বা কর্ষিকার মতো। অ্যানিমানি ও ক্লাউন ফিশের মধ্যে রয়েছে দারুণ বন্ধুত্ব! এরা একে অপরের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অ্যানিমানি সুন্দর এক নীরব প্রাণী হলেও এর কাজ কিন্তু ভয়াবহ। এর কর্ষিকার ডগায় রয়েছে সূক্ষ্ম কাঁটায় ভরা ভয়াবহ বিষাক্ত কোষ। মাছ বা অন্য কোনো জলজ প্রাণী এসব কর্ষিকার সংস্পর্শে এলে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এতে ওই মাছ বা জলজ প্রাণীর শরীর বেশ কিছুক্ষণের জন্য অবশ হয়ে যেতে পারে। বিষ সয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কম হলে মৃত্যুও হতে পারে। কিন্তু অ্যানিমানির কর্ষিকাগুলোর ভেতর হরদম বিচরণ করলেও ক্লাউন ফিশের কিছু হয় না। প্রাকৃতিকভাবেই এসব মাছের শরীরে অ্যানিমানির বিষক্রিয়া প্রতিরোধের ব্যবস্থা রয়েছে। এতে বরং অ্যানিমানি ওদের জন্য আত্মরক্ষার বর্ম হিসেবে কাজ করে।
হাঙর ও ব্যারাকুডার মতো যেসব মাছ বা জলজ প্রাণী ওদের শিকার করতে উদ্গ্রীব, তারা অ্যানিমানির বিষের ভয়ে ক্লাউন ফিশের কাছে পৌঁছাতে পারে না। এতে অ্যানিমানির অভয়াশ্রমে নির্ভয়ে থাকতে পারে ওরা। খাবারের জন্যও কোনো চিন্তা নেই ক্লাউন ফিশের। অ্যানিমানির কর্ষিকাগুলোর ফাঁকফোকরে অনেক খাবার রয়েছে ওদের। কিছু কাঁকড়া ও মাছের বেলায় অ্যানিমানির বিষ কাজ করে না। এরা অ্যানিমানির শত্রু। এসব ছোটখাটো প্রাণী ক্লাউন ফিশের জন্য বেশ মজাদার খাবার। ওরা অ্যানিমানির এসব শত্রু সাবাড় করে একদিকে যেমন নিজেদের পেট ভরায়, অন্যদিকে আশ্রয়দাতা বন্ধুকেও নিরাপদ রাখে। এভাবে ক্লাউন ফিশ ও অ্যানিমানি মিলেমিশে একে অপরের উপকার করে থাকে।
শুধু সাগরতলে নয় ক্লাউন ফিশ দেখা যায় অ্যাকোয়ারিয়ামেও। প্রকৃতিতে, ক্লাউন ফিশগুলো ১০ বছর বেঁচে থাকে। তবে বন্দিদশায় দ্বিগুণ দীর্ঘ। প্রায় প্রতিটি অ্যাকোয়ারিয়ামে দেখা যায় নয়নাভিরাম ক্লাউন ফিশ।

SHARE

Leave a Reply