Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব নতুন পৃথিবী গ্লিজ ৮৩২সি -মেহেদি হাসান

নতুন পৃথিবী গ্লিজ ৮৩২সি -মেহেদি হাসান

নতুন পৃথিবী ভাবতে একটু রোমাঞ্চকর লাগে তাই না। এতদিন শুনে এসেছি নতুন দেশ, নতুন জায়গা, নতুন গ্রহ এসব তাই না। কিন্তু কখনো কল্পবিজ্ঞানেও কি কেউ ভেবেছি নতুন পৃথিবীর কথা। নতুন পৃথিবী কেমন হবে, সেখানে কি মানুষ বসবাস করতে পারবে। সেখানে কি মানুষ বসবাস উপযোগী ব্যবস্থা রয়েছে। হ্যাঁ বন্ধুরা, এটা সম্ভব। আর এ নতুন পৃথিবী খোঁজার মিশন শুরু করেছে নাসা। এ লক্ষ্যে গত বছর এপ্রিলে নাসা একটি উপগ্রহ পাঠায় যার নাম ছিলো টেস বা ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট স্যাটালাইট। এই মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার বিজ্ঞানীরা দুই লাখের মতো নক্ষত্রের ওপর নজর রাখছেন। আমাদের পৃথিবী থেকে ৪০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে নজর রাখছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। নাসার অর্যাজটোপিজিক্স বিভাগের পরিচালক হর হারটস বলেন, নতুন পৃথিবীর সন্ধানে আমরা সৌরশক্তির আশপাশে ঘুরার জন্য আমাদের নতুন উপগ্রহের মিশন প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, আমি আশাবাদী যে আমাদের মহাবিশ্বের চেয়ে বড় গ্রহ আছে। আমি অদ্ভুত, বিস্ময়কর জগতের প্রত্যাশা করছি যা আমরা আবিষ্কার করবো। আমাদের পৃথিবীর মতোই বৈশিষ্ট্যধারী একটি নতুন গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। বলা হচ্ছে, এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে নিকটবর্তী গ্রহ যেখানে জীবনের বিকাশ ঘটা সম্ভব। এ গ্রহটির আকৃতি পৃথিবীর সমান। এর ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও পৃথিবীর তাপমাত্রার অনেক কাছাকাছি। পৃথিবী থেকে ১১ আলোকবর্ষ দূরে লাল রঙের এক বামন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে গ্রহটি। বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে এ গ্রহে পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় এক লাখ ৪১ হাজার বছর। তবে গবেষকরা এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বলছেন, গ্রহটি পৃথিবীর দিকে সরে আসছে। এ গতিতে পৃথিবীর কাছাকাছি পৌঁছাতে গ্রহটির সময় লাগবে ৭৯ হাজার বছর। ইউরোপিয়ান মহাকাশ পর্যবেক্ষণাগারের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা হার্পস নামে একটি বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্বেষণ যন্ত্রের সাহায্যে লাল বামন নক্ষত্র খুঁজে পান। স্বল্প ভরবিশিষ্ট গ্রহটি প্রায় দশ দিনে এর নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে। হার্পস থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানান, গ্রহটির রেডিয়েশনের মাত্রা পৃথিবীর তুলনায় কম। এর ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাইনাস ৬০ ডিগ্রি থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। লাল বামন নক্ষত্রটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সূর্যের তুলনায় অর্ধেক হওয়ায় গ্রহটিতে সব সময়ই শীতল আবহাওয়া বিরাজ করে। এর আগে নাসার স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আমাদের সৌরজগতের মতোই আরেকটি সৌরজগতের সন্ধান পাওয়া যায়। এ সৌরজগতের সাতটি গ্রহই পৃথিবীর প্রায় সমান আকৃতির। এর মধ্যে তিনটি গ্রহের বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি। পৃথিবীর মতো দেখতে গ্রহটির ভর পৃথিবীর থেকে ৫.৪ গুণ বেশি। জেজি ৫৩৬ নামক একটি লাল বামন নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে সেটি। লাল বামন নক্ষত্রটিকে একবার প্রদক্ষিণ করতে নতুন এই গ্রহটির সময় লাগছে ৮.৭ দিন। এই প্রসঙ্গে স্পেনের এক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন যে, এই ধরনের গ্রহগুলোর ভূ-ত্বক সাধারণত পাথুরে হয়। অবিকল পৃথিবীর মতো দেখতে গ্রহটির সম্পর্কে বিশদে গবেষণা চলছে। যে নক্ষত্রটিকে সেটি প্রদক্ষিণ করছে, সেটি সূর্যের থেকে আকারে ছোট হলেও, সূর্যের থেকে অনেক বেশি উজ্জ্বল। সেটির চৌম্বকীয় ক্ষমতাও সূর্যেরই মতো।
পৃথিবী থেকে ১৬ আলোকবর্ষ দূরে পৃথিবী সদৃশ একটি গ্রহের খোঁজ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। গ্লিজ ৮৩২সি (এষরবংব ৮৩২প) নামের এই গ্রহটি একটি লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, যেটির ব্যাসার্ধ এবং ভর আমাদের সূর্যের অর্ধেক। গ্লিজ ৮৩২সি এর অরবিটাল পিরিয়ড হচ্ছে ৩৫-৩৬ দিন। অর্থাৎ, গ্রহটি তার পুরো কক্ষপথ ঘুরে আসতে প্রায় ৩৫ দিনের মত সময় নেয়। নতুন আবিষ্কৃত এই গ্রহের ভর আমাদের পৃথিবীর ভরের প্রায় পাঁচ গুণ। গবেষকরা আশা করছেন, গ্রহটির তাপমাত্রা পৃথিবীর তাপমাত্রার মতোই হবে। এই প্রকল্পের একজন গবেষক ক্রিস টিনি জানিয়েছেন, গ্লিজ৮৩২সি গ্রহটির পরিবেশ যদি পৃথিবীর মতো হয় তাহলে সেখানে সব প্রাণীর পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হবে। তবে গ্রহটিতে ঋতু পরিবর্তনের বিষয়টি হয়ত প্রতিকূল হতে পারে। গ্রহটির ভর বিবেচনায় ধরলে সেখানকার বায়ুমণ্ডলের ভরও বিশাল হওয়া স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে ঘন বায়ুমণ্ডল অধিক তাপ ধরে রাখার কারণে পরিবেশ অত্যধিক উষ্ণ হয়ে উঠতে পারে যা জীবনধারণের জন্য ঠিক অনুকূল নয়। তবে এখানে জীবের বেঁচে থাকাটি স্বাভাবিক। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জানান যে গ্লিজ ৮৩২সি এর আরেক নাম এলএইচএস ১১৪০বি। এলএইচএস ১১৪০বি নামের গ্লিজ ৮৩২সিকে সুপার আর্থ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। চিলিতে বসান এমআর্থ সাউথ টেলিস্কোপ নেটওয়ার্কে ধরা পড়েছে এলএইচএস ১১৪০বি সুপার আর্থটি। লাল রঙের একটি বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে এই সুপার আর্থটি। এই গ্রহটিতে প্রাণের অস্তিত্ব মেলার ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা বেশ আশাবাদী। এর পেছনে বেশ কিছু জোরালো যুক্তিও উপস্থাপন করেছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের তুলনায় দশ ভাগের এক ভাগ দূরত্ব সুপার আর্থ আর তার নক্ষত্রের মধ্যে অর্থাৎ পৃথিবী থেকে দশগুণ কাছে। নিজ নক্ষত্র থেকে দশগুণ কাছে হওয়ার কারণে এটি বেশি আলো পাওয়ার কথা। আর বেশি আলো পাওয়ার কারণে সুপার আর্থটি প্রাণের বসবাসের জন্য যথেষ্ট উপযোগী বলেও ধারণা করা হচ্ছে। লাল বামন নক্ষত্র সাধারণত শক্তি বিকিরণ করে থাকে, যা প্রাণবান্ধব হয় না। কিন্তু এই বামন নক্ষত্রটি এবং সুপার আর্থের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই ধারণা করছেন যে, এ ক্ষেত্রে প্রাণবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে না বামন নক্ষত্রটি। গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ও সুইজারল্যান্ডের জেনেভা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের নিকোলা আসত দিল্লো দেফোরুর মতে, নতুন গ্রহটি লাল বামন নক্ষত্রটির চারদিকে বেশ ধীরে ধীরে ঘুরছে। অন্যান্য কম ভরের গ্রহের তুলনায় তা থেকে উচ্চশক্তির বিকিরণও কম হচ্ছে।আমাদের সৌরজগৎ থেকে ৩৯ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি সৌরজগতের বাসিন্দা এই সুপার আর্থ এলএইচএস ১১৪০বি /গ্লিজ ৮৩২সি পৃথিবী থেকে এক দশমিক চার গুণ বড়। গবেষকদের ধারণা, এলএইচএস ১১৪০বি/গ্লিজ ৮৩২সি পর্বতময় গ্রহ। এর ভর ও ঘনত্বও বেশি। এটি পাথুরে গ্রহ এবং এর অভ্যন্তরে প্রচুর লোহা রয়েছে। পাথুরে আর খনিজ সমৃদ্ধ হওয়ায় প্রাণের অস্তিত্ব মেলার ব্যাপারে আরো বেশি আশাবাদী হয়েছেন তারা। কারণ যদি এটি বড় এবং ঘনত্ব কম হতো তাহলে এটি গ্যাসীয় প্রকৃতির হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সাধারণত গ্যাসীয় প্রকৃতির গ্রহে স্বাভাবিকভাবেই প্রাণের অস্তিত্ব মেলার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। অ্যাস্ট্রোফিজিকসের গবেষক জেসন ডিটমান বলেন, গত এক দশকে আমার দেখা সবচেয়ে সম্ভাবনাময় গ্রহ এলএইচএস ১১৪০বি/গ্লিজ ৮৩২সি সুপার আর্থ।

পৃথিবীর বাইরে কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে এটি হতে পারে সবচেয়ে ভালো বিকল্প। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এলএইচএস ১১৪০বি/গ্লিজ ৮৩২সি নামক সুপার আর্থ আমাদের পৃথিবীর চেয়ে প্রায় দেড় গুণ ব্যাস এবং সাড়ে ছয় গুণ ভর সমৃদ্ধ। এই গ্রহটির উপরি বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণা করে এতে কঠিন, তরল আর বায়বীয় তিন অবস্থাতেই পানির অস্তিত্ব মেলার আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর মতো চৌম্বকীয় ক্ষেত্র আছে সেখানে। এ কারণে বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর বাইরে যদি কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজতে হয় তাহলে সবার আগে যেতে হবে এলএইচএস ১১৪০বি/গ্লিজ ৮৩২সি সুপার আর্থে। নতুন এই সুপার আর্থটি তার কক্ষপথে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে বিরাজ করছে যার পৃষ্ঠে তরল পানি প্রবাহের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। টেলিস্কোপে ধরা পড়া বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখানে প্রাণের অস্তিত্ব লক্ষণ স্পষ্ট। সুপার-আর্থ নামের নতুন গ্রহটিতে প্রাণের অস্তিত্ব মেলার পেছনে বিজ্ঞানীদের আর একটি বড় যুক্তি হলো এটির বয়স। এলএইচএস ১১৪০বি/গ্লিজ ৮৩২সি গ্রহটির বর্তমান বয়স প্রায় ৫০০ কোটি বছর। এটি যখন তৈরি হয় তখন এটিতে যে পরিমাণ অগ্নিতরঙ্গ ঝুঁকি ছিল ৫০০ কোটি বছরের ব্যবধানে তা অনেকটাই কমে গেছে। প্রথম দিকে ধ্বংসাত্মক অগ্নুৎপাত এবং নানা ধরনের ভয়াবহ পরিবেশের কারণে প্রথম দিকে প্রাণের সঞ্চার হওয়া বেশ কষ্টকর ছিল সেখানে। যা এখন অনেকটাই প্রাণের সহায়ক হয়ে উঠেছে। এতো দিনের গবেষণায় ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যে প্রবল বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে সেই রহস্যের সমীকরণও হয়ত একদিন মিলে যেতে পারে আমাদের এই নতুন সুপার আর্থে-ই।

SHARE

Leave a Reply