Home খেলার চমক ক্রিকেটের আত্মীয়রা -আবু আবদুল্লাহ

ক্রিকেটের আত্মীয়রা -আবু আবদুল্লাহ

ক্রিকেটে একই দলের হয়ে ভাই-ভাই, বাবা-ছেলে কিংবা চাচা-ভাতিজা টাইপের আত্মীয়দের খেলা নিয়ে সবারই কমবেশি ধারণা আছে। অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ ওয়াহ-মার্ক ওয়াহ, জিম্বাবুয়ের অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার-গ্রান্ড ফ্লাওয়ার, ভারতের ইউসুফ পাঠান-ইরফান পাঠান, নিউজিল্যান্ডের ব্রেন্ডন ম্যাককালাম-নাথান ম্যাককালামসহ আরো বেশ কয়েক জোড়া ভাই একই সাথে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন। এমনকি একই ম্যাচে তিন জোড়া ভাই খেলেছে এমন নজিরও আছে। আবার অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার জিওফ মার্শের দুই ছেলে মিচেল মার্শ ও শন মার্শ এখন খেলছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। আমাদের আইসিসি ট্রফিজয়ী অধিনায়ক আকরাম খানের ভাতিজা নাফিস ইকবাল এক সময় খেলেছেন জাতীয় দলের হয়ে। আর নাফিসের ছোটভাই বর্তমান ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবাল। ক্রিকেট জগতে এমন পারিবারিক সম্পর্ক খুঁজলে অনেক পাওয়া যাবে; কিন্তু এবার তোমাদের জানাবো ভিন্ন কিছু আত্মীয়তার কথা।
মিচেল স্টার্ক-অ্যালিসা হিলি-
ইয়ান হিলি
স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই বিশ্বকাপ জিতেছেন এমন নজির ক্রিকেটে একটি মাত্রই আছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত মহিলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে স্বাগতিকরাই। ভারতকে ফাইনালে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে পঞ্চমবারের মতো মহিলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতে অস্ট্রেলিয়া।
ফাইনালে অজিদের হয়ে ইনিংস ওপেন করতে নেমে ৩৯ বলে ৭৫ রানের বিধ্বংসী এক ইনিংস খেলেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান এলিসা হিলি। হয়েছেন ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়। এলিসা হিলির স্বামী অস্ট্রেলিয়া পুরুষ দলের বামহাতি পেসার মিচেল স্টার্ক। অস্ট্রেলিয়া দলের হয়ে ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছেন স্টার্ক। সেবার টুর্নামেন্ট সেরা ক্রিকেটার হয়েছিলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়াকে চ্যাম্পিয়ন করার পথে নিয়েছিলেন ২২ উইকেট। অর্থাৎ স্টার্ক ও এলিসা- দুজনেই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে জিতেছেন বিশ্বকাপ শিরোপা। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই এখন পরিচয়- বিশ্বকাপ জয়ী ক্রিকেটার হিসেবে।একই এলাকায় বসবাসের সুবাদে এলিসা-স্টার্ক পরস্পরকে চেনেন ৯ বছর বয়স থেকে। দু’জনেরই জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক ২০১০ সালে। আর বিয়ে করেছেন ২০১৬ সালে। উভয়ই অস্ট্রেলিয়াকে জিতিয়েছেন বিশ্বকাপ শিরোপা। সেটিও আবার একই মাঠে- মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এমসিজি)। দু’জনের জন্মও একই বছর- ১৯৯০ সালে (স্টার্কের ৩০ জানুয়ারি, এলিসার ২৪ মার্চ)। তবে এত মিলের পরও একটি জায়গায় অমিল আছে। স্টার্ক পেস বোলার, বল করেন ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে। আর তার স্ত্রী ব্যাট হাতে নামেন ইনিংস ওপেন করতে। বিধ্বংসী ব্যাটিং করে তুলোতুনো করেন প্রতিপক্ষের বোলারদের।
এলিসার আরেকটি পরিচয় আছে- তিনি অস্ট্রেলিয়ার এক সময়ের বিখ্যাত ক্রিকেটার ইয়ান হিলির ভাতিজি। চাচার মতো এলিসাও হয়েছেন উইকেটরক্ষক। ইয়ান হিলি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১১৯টি টেস্ট ও ১৬৮টি ওয়ানডে খেলেছেন (১৯৮৮-১৯৯৯)। তার সময়ে তিনি ছিলেন বিশ্বসেরা উইকেটরক্ষকদের একজন। আর এলিসা এখন পর্যন্ত অজিদের হয়ে খেলেছেন ৪ টেস্ট, ৭৪ ওয়ানডে ও ১১১টি টি-২০ ম্যাচ। ওয়ানডেতে ৩টি ও টি-২০তে একটি সেঞ্চুরি আছে তার। ইয়ান হিলির ছেলে অর্থাৎ এলিসার চাচাতো ভাই টম হিলি অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন। অবশ্য জাতীয় দলে জায়গা হয়নি তার।
আর স্টার্ক খেলেছেন ৫৭টি টেস্ট, ৯০ ওয়ানডে ও ৩১টি আন্তর্জাতিক টি-২০ ম্যাচ। উইকেট নিয়েছেন যথাক্রমে ২৪৪, ১৭৮ ও ৪৩টি। এবারের মহিলা টি-২০ বিশ্বকাপ চলাকালে স্টার্ক ছিলেন অস্ট্রেলিয়া পুরুষ দলের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে; কিন্তু মহিলা দল ফাইনালে ওঠার পর ছুটি নিয়ে দেশে ফিরেছেন মাঠে উপস্থিত থেকে স্ত্রীকে উৎসাহ দিতে।

বাবর আজম-আকমল ব্রাদার্স-
কাদির অ্যান্ড কোং
পাকিস্তানের আকমল ভাইয়েরা এই সময়ের দর্শকদের কাছে বেশ পরিচিত। তিনজনই পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলেছেন। তিনজনই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। কামরান আকমল সবার বড়, এরপর আদনান আকমল ও সবার ছোট ওমর আকমল। এর মধ্যে কামরান ও ওমর তুলনামূলক বেশি সুযোগ পেয়েছেন জাতীয় দলে। কামরান-ওমর, কামরান-আদনান, ওমর-আদনান এভাবে দুই ভাই এক সাথে খেললেও তিনজন একসাথে কখনোই অবশ্য জাতীয় দলে খেলতে পারেননি একই ম্যাচে। এমনও হয়েছে যে, একজন দল থেকে বাদ পড়েছেন তার জায়গায় সুযোগ পেয়েছেন অন্যজন। এদের মধ্যে বড় ও ছোটজন বেশ দাপটের সাথেই খেলেছেন অনেকদিন। মেজো ভাই আদনান অবশ্য ২১টি টেস্ট ও ৫টি ওডিআইয়ের বেশি খেলতে পারেননি পাকিস্তান দলের হয়ে।
লাহোরের একই বাড়িতে বেড়ে ওঠা এই তিনজনের চাচাতো ভাই বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান বাবর আজম। একই সাথে বড় হয়েছেন চারজন। ছোটবেলায় বাড়ির উঠানে খেলেছেন একই সাথে। সেই চারজনই খেলেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। এখানেই শেষ নয়। ওমর আকমলের শ্বশুর আবার পাকিস্তানের কিংবদন্তি লেগ স্পিনার আবদুল কাদির। (১৯৭৭-৯৩) পাকিস্তান দলের হয়ে খেলা কাদিরের হাতেই লেগস্পিনটা শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে। টার্ন, গুগলি, ফ্লিপারে ব্যাটসম্যানদের ঘুম হারাম করে দিতেন তিনি।
আবদুল কাদিরের তিন ছেলেই হয়েছেন বাবার মতো লেগস্পিনার। তবে বাবার সুনামের ধারে কাছেও যেতে পারেননি কেউ। বড় ছেলে রেহমান কাদির মাত্র ৬টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন। মেজো সুলামান কাদির পাকিস্তানের ২০০৪ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন তবে, জাতীয় দলে সুযোগ হয়নি। ছোট ছেলে উসমান কাদিরকে বিবেচনা করা হয় সেরা প্রতিভা হিসেবে। এখন পর্যন্ত পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৫, ১৯ ও ২৩ দলে খেলেছেন। খেলেছেন পিএসএল ও অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশেও। তাকে হয়তো ভবিষ্যতে পাকিস্তানের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেখা যেতে পারে। এদের চাচা অর্থাৎ আবদুল কাদিরের ভাই আলী বাহাদুরও খেলেছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট।

অ্যালেক স্টুয়ার্ট-মিকি স্টুয়ার্ট-
মার্ক বুচার
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যালেক স্টুয়ার্টের (১৯৮৯-২০০৩) বোন জামাই দেশটির আরেক সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার মার্ক বুচার (১৯৯৭-২০০৪)। ইংল্যান্ড জাতীয় দল ও কাউন্টি দল সারে’তে একসাথে বহু ম্যাচ খেলেছেন দু’জনে। অ্যালেকের বোন জুডিকে বিয়ে করেন বুচার। অবশ্য কয়েক বছর পর বিচ্ছেদ হয়ে যায় তাদের।
ইংল্যান্ডের হয়ে ১৩৩ টেস্টে ১৫ সেঞ্চুরিতে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার রান করেন অ্যালেক স্টুয়ার্ট। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দেওয়া এই ডানহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ১৭০ ওয়ানডেতে ৪ সেঞ্চুরিতে করেছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার রান। সে তুলনায় বুচারের ক্যারিয়ার ততটা সমৃদ্ধ ছিলো না। ৭১ টেস্টে ৪ সেঞ্চুরিতে করেছেন চার হাজারের বেশি রান।

বুচারের শ্বশুর অর্থাৎ অ্যালেক স্টুয়ার্টের বাবা মিকি স্টুয়ার্টও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন ইংল্যান্ড দলের হয়ে (১৯৬২-৬৪)। ৮টি টেস্ট খেলেছেন তিনি। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ক্যারিয়ার বেশ সমৃদ্ধ তার। ৫৩০ ম্যাচে ৪৯ সেঞ্চুরিতে করেছেন ২৬ হাজারের বেশি রান।
এখানেই শেষ নয়। মিকি স্টুয়ার্টের বেয়াই অর্থাৎ মার্ক বুচারের বাবা অ্যালান বুচারও খেলেছেন ইংল্যান্ডের হয়ে। অবশ্য একটি করে টেস্ট ও ওয়ানডেতেই থেমে গেছে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ১৯৭৯ সালে ভারতের বিপক্ষে ওভালে টেস্ট ও পরের বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একই মাঠে ওয়ানডে খেলেছেন এই বামহাতি ব্যাটসম্যান। টেস্টের দুই ইনিংস মিলিয়ে ৩৪ ও ওয়ানডেতে ১৪ রান করেন। যে কারণে আর ডাক পাননি জাতীয় দলে। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট তারও সেঞ্চুরি আছে ৪৬টি। অ্যালান বুচারে দুই ভাই ইয়ান ও মার্টিন বুচারও খেলেছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট। তার ছেলে অর্থাৎ মার্ক বুচারের ছোট ভাই গ্যারি বুচারও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন কাউন্টি দল সারে ও গ্ল্যামারগনের হয়ে। আর তাদের বোন ব্রিয়নি বুচার খেলেছেন কাউন্টি দল এসেক্স ও ডেভনের মহিলা দলের হয়ে (২০১৫)।
তার মানে এই দুই পরিবারের চারজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও আরো চারজন খেলেছেন ঘরোয়া পেশাদার ক্রিকেট।

ব্রায়ান লারা-ডোয়াইন ব্রাভো-
ড্যারেন ব্রাভো
২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বামহাতি টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান ড্যারেন ব্রাভোর অভিষেকের পর অনেকেই বলতে শুরু করেন এই ছেলে ব্রায়ান লারার কার্বন কপি। বিশেষ করে কাট, ব্যাকলিফট ইত্যাদি শটে হুবহু কিংবদন্তি ব্রায়ান লারার ছায়া দেখা যায় তার মাঝে। কিছুদিন পর ত্রিনিদাদের সংবাদমাধ্যম জানালো ছেলেটার সাথে ব্রায়ান লারার রক্তের সম্পর্ক আছে। লারার মামাতো বোন ইয়ার্লিনির ছেলে ড্যারেন।বিশ্ব ক্রিকেটের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানদের তালিকা করতে গেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক অধিনায়ক ব্রায়ান লারার নাম ওপরের দিকেই রাখতে হবে। টেস্টে এক ইনিংসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ অপরাজিত ৪০০ রানের রেকর্ড তার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের সর্বোচ্চ অপরাজিত ৫০১ রানের ইনিংস খেলার রেকর্ডও তার দখলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টেস্টে ৩৪ ও ওয়ানডেতে ১৯ সেঞ্চুরির মালিক লারা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ড্যারেনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের আগেই ক্যারিবীয় রাজপুত্র লারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলে দেন। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দুজনে এক সাথে খেলেছেন বেশ কিছু ম্যাচ। ড্যারেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দুজনেই বামহাতি এবং ব্যাটিং স্টাইল একই ধরনের হওয়ায় ভাষ্যকাররা প্রায়ই ভুল করতেন কে খেলেছে সেটি বলতে।
ড্যারেন ব্রাভোর সৎভাই নামকরার টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডার ডোয়াইন ব্রাভো। ড্যারেনের বাবার প্রথম স্ত্রীর সন্তান ডোয়াইন ব্রাভো। টি-টোয়েন্টির দর্শকদের সবাই এক নামেই যাকে চেনে।

মুশফিকুর রহিম-মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ
বাংলাদেশ দলের দুই তারকা ক্রিকেটার যে ভায়রা ভাই সেটি তোমাদের অনেকেরই অবশ্য জানা। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের শ্যালিকাকে বিয়ে করেছেন মুশফিক। তার মানে মুশফিকের স্ত্রী জান্নাতুল কিফাইয়াত মন্ডির বড় বোন জান্নাতুল কাওসার মিষ্টি রিয়াদের স্ত্রী। ২০১১ সালের ২৫ জুন ময়মনসিংহের ছেলে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ বিয়ে করেন মানিকগঞ্জের জান্নাতুল কাওসার মিষ্টিকে।
আর ২০১৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মিষ্টির ছোট বোন মন্ডির সাথে বিয়ে হয় বগুড়ার ছেলে মুশফিকের। মানিকগঞ্জ শহরের সেওতা এলাকার ফজলুল রহমান ফারুক ভূঁইয়া সাহেব এই দুই ক্রিকেটারের শ্বশুর।

SHARE

Leave a Reply