Home গল্প মেহমান -মহিউদ্দিন বিন জুবায়েদ

মেহমান -মহিউদ্দিন বিন জুবায়েদ

গা শিউরে ওঠে।
ছম ছম করে। তারা কেমন মানুষ?
কী মহত্ত্ব লুকিয়ে আছে ওদের ভিতর।
কেন এত মর্যাদা?
ও, পরশ পাথরের সংশ্রবে থেকে থেকে উহার গুণ লুফে নিয়েছে তাই না?
আসলে, আলোই অন্ধকারকে দূর করতে পারে।
তেমনি অন্ধকার থেকে ওঠে এলেন এক যুবক। আলোর মানুষের সং¯পর্শে। ইসলামের আলোয় আলোকিত করলেন জীবন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে।

এ ঘটনা!
হিজরতের ৩০ বছর আগে যার জন্ম বনু যুহরাহ গোত্রে। পিতা মালিক ইবনে ওয়াহিব।
ইসলামের পতাকার তলে আশ্রয় নেয়ার পর অনেক যুদ্ধে জীবন বাজি রেখেছেন। সেনাপতিও ছিলেন কোন কোন যুদ্ধে।
তার দক্ষ ও কৌশলী পরিচালনায় মুসলিম সৈন্যরা অনেক বিজয় এনেছে। প্রিয় নবীজির (সা) একান্ত প্রিয়ভাজন। নবীজি (সা) তাকে খুব ভালবাসতেন। জীবিত থাকাকালেই মহানবী (সা) তাকে বেহেস্তের সুসংবাদ দেন।
এ স্বর্গীয় মেহমান কে জানো?
আরবি ভাষায় যাদেরকে ‘আশারা-ই-মুবাশশারা’ বলা হয়। নবীজির (সা) প্রিয়ভাজন হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা)।

সাদ!
মহানবী (সা)-এর মায়ের চাচাতো ভাই। অর্থাৎ মহানবী (সা)-এর স¤পর্কে মামা। প্রিয় সাহাবী হযরত আবু বকর (রা) ইসলাম গ্রহণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর সাদ ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় নেন। কিন্তু সাদের ইসলাম গ্রহণ তার মা মেনে নেয়নি। অনুরোধ করে ইসলাম ধর্ম ছেড়ে দেয়ার। শপথ করে বসে, খানাপিনা করবে না ইসলাম ছেড়ে না দিলে।

শুধু কি তাই?
ছেলে সাদকে মা মরে যাবারও ভয় দেখায়। তবুও যদি…..। কিন্তু সাদ অটল অবিচল। কোন কিছুই তাকে ইসলাম থেকে একচুল বিচ্যুত করতে পারে না।
মা কেন, নিজের গর্দান গেলেও ইসলাম ছাড়তে পারে না এ যুবক। সে জানে রাসূল (সা) এর ভালোবাসা, কোমল বচন, অপরিসীম অনুগ্রহ।
মা সাদকে শেষটায় বললেন,
তোমাদের ধর্ম তো মাকে মান্য করার কথা বলা হয়েছে। তবে কেন আমার কথা শুনছো না?
সাদের মা!
তিন দিন কোন কিছু খাননি, এমনকি পানিও পান করেননি। এতে অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

মায়ের প্রতি ছিল সাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা। অমেয় করুণা। একদিকে ইসলাম অপর দিকে মা।
কোন দিকে যাবে সে। কাকে প্রাধান্য দিবে। সৃষ্টির আনুগত্য করে তো স্রষ্টার নাফরমানি করা যাবে না।
তাই ইসলাম ছাড়তে রাজি হননি।

কত ¯পষ্ট আওয়াজ।
পর্বতসম দৃঢ়।
বলে দেন, মা তুমি আমার প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়, কিন্তু তোমার মতো হাজার মা তাকিদ দিয়ে থাকলেও আমি পূর্ব ধর্মে ফিরে যাবো না।

বয়কট করে মক্কাবাসী বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে।
অপরাধ!
তা তো আর কিছু নয়, ইসলাম।
ইসলাম ধর্ম ছেড়ে দিলেই খালাশ।
বয়কটের চুক্তিনামা কাবার দেয়ালে শোভা পায়। মহানবী (সা)কে হত্যার জন্য তাদের কাছে সোপর্দ করতে হবে নইলে এ বয়কট।

দিনের পর দিন গাছের লতা-পাতা, গাছের ছাল-বাকল খেয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে মক্কা থেকে ৩ মাইল দূরে একটি গিরিপথে।

এক রাতে সাদ এক টুকরো শুকনো চামড়া পেলেন। সেটিকে সিদ্ধ করে খেলেন। কষ্টের জীবন!
নামায অবস্থায় সাদকে কতিপয় কাফের ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করলে সাদ একাই তাদের সাথে লড়াই করেন। সামান্যতম ভয় ছিল না অন্তরে। ভয় ছিল শুধু আল্লাহর। আর এমনটিই হওয়া দরকার। যাকে বলে ঈমানী শক্তি।
৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে বয়কটের অবসান ঘটে।
ফলে মুসলমানরা আবার তাদের বাড়ি-ঘরে ফিরে আসার সুযোগ পায়।
কিন্তু! নির্যাতনের স্টিম রোলার চরমে ওঠে।
হুকুম হয় মুসলমানদের মদিনায় হিজরত করার। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা)-ও এ সময় হিজরত করেন। সে সময় সাদ এর বড় ভাই উতবা মদিনায় বসবাস করতেন। উতবা ওহুদের যুদ্ধে মহানবী (সা)-এর মুখে পাথর ছুঁড়ে মারছিলেন। এতে মহানবী (সা) আহত হওয়ায় সাদ বড় ভাইকে ক্ষমা করেননি। শপথ করে বলেছেন, ইসলামের অন্য যে কোন দুশমনের চেয়ে উতবাকে আমি বেশি ঘৃণা করি।
দ্বিতীয় হিজরি। শাওয়াল মাস।
মক্কার কাফিরেরা ৩ হাজার পদাতিক সৈন্য ও ২ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে মদিনায় হামলা করে। মহানবী (সা) ৭শত মুসলিম যোদ্ধা নিয়ে ওহুদ পর্বতের পাদদেশে উপস্থিত হয়ে মোতায়েনকৃত সৈন্যদের বাম পাশে সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা)-কে দায়িত্ব দিলেন। তুমুল লড়াইয়ের এক পর্যায়ে মুসলমানরা যখন বেকায়দায় পড়ছিল তখন তালহা ও সাদই মহানবী (সা)-কে রক্ষার জন্য পাশে দাঁড়িয়ে শত্রুর মোকাবিলা করছিলেন। রাসূল (সা) এ সময় তীর রাখার থলি সাদের কাছেই রেখেছিলেন। রাসূল (সা)-এর ভালোবাসা থেকে ক্ষণিক সময়ও বিচ্ছিন্ন হতে চাননি সাদ। ভালোবাসার টানে নবীজি (সা) এর সাথে গিয়েছিলেন খন্দক, খায়বার, হুনাইন, তাইফ ও তাবুক যুদ্ধসহ অনেক যুদ্ধে।
হুদায়বিয়ার সন্ধিতে রাসূল (সা) এর পক্ষে যারা সই করেছেন সাদ তাদের একজন।
শুধু কি তাই? হযরত আবু বকর (রা)-এর আমলে ইসলামী সরকারের যাকাত কালেক্টরের কাজও করেছেন।
হযরত ওমর (রা)-এর আমলে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। হযরত ওসমান (রা)-এর আমলে কুফার গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন।
অসাধারণ বীর যোদ্ধা। বিনয়ী, কোমল। অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারী। রাসূল (সা)-এর ভালোবাসা তাকে নিয়ে গিয়েছিল এক সোনালি চত্বরে। ঈমানী শক্তি তাকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি। সাহস জুগিয়েছে। সত্যের পথে সদা প্রস্তুত থেকে রাসূল (সা)-এর বাহবা পেয়েছেন। দুনিয়ায় বসেই রাসূল (সা)-এর মুখ থেকে শুনেছেন সুসংবাদ। এটাই তো শ্রেষ্ঠ পাওয়া। রাসূল (সা)-এর মুখ থেকে জান্নাতের ঘোষণা!
আশারা-ই-মুবাশশারা?
সে এক চরম পাওয়া সংগ্রামী জীবনে। তেজস্বী পুরুষ। জান্নাতি মেহমান।

SHARE

Leave a Reply