Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস ঝঁঝিঁ বাড়ির ছায়া -জাকির আবু জাফর

ঝঁঝিঁ বাড়ির ছায়া -জাকির আবু জাফর

ঝরে পড়া বাঁশপাতার ওপর দাঁড়িয়ে মানুষটা। চোখ দুটো বাঁশগাছের মাথায়। যেখানে দুটি কানিবক। প্রায় মুখোমুখি। বেশ পুষ্ট। তেলতেলে। ডোবা পুকুরের মাছ ও গুগলি খেয়ে তেল জমিয়েছে দেহে। গুলতি তাক করে নিশানা নির্ধারণ করলো সম্রাট। তেলতেলে দুটি বকের লোভ করা যাবে না। দুটির লোভে হয়তো মিলবে না একটিও। তবুও দুটি বকেরই লোভ চকচক করছে মনের ভেতর। কিন্তু এক গুলতিতে কি দুটি ঝরে পড়বে। মনই জবাব দেয় নাহ্। কিছুতেই না। এক গুলতিতে দুই বক শিকার অকল্পনীয়। বুলেট দিয়েও সম্ভব হবে না। সুতরাং মনের লোভ মনে চেপেই একটিকে নিশানা করল ও। বক দুটি যেন একজন একটি দেখছিল আরেকটিকে। মাঝে মাঝে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে শূন্যতার দিকে। আবার দুটি দুটির দিকে। হঠাৎ বাতাস এসে দুটিকে দুদিকে সামান্য সরিয়ে নেয়। তখন নিশানা নড়ে যায় সম্রাটের। বাতাস সরে গেলে বক দুটো ফেরে আগের জায়গায়। আবার নিশানা ঠিক করতে হয়। গুলতি ছুঁড়বে ঠিক তখন বাতাস নাড়িয়ে দেয় বকের অবস্থান। যেন দুটিকে ঠেলে দেয় দুদিকে।
মনে বিরক্তির ফোটা পড়ে সম্রাটের। কিন্তু বিরক্ত হওয়া চলবে না। কোনো শিকারকে বিরক্তির হাত স্পর্শ করলে শিকার হবে না তার। সম্রাট বেশ করে জানে এ কথা। তাই বিরক্তি নয় নিজেকে নিজেই বললো। বললো- হে সম্রাট ধৈর্য সঙ্গে রাখো। নইলে শিকার পালাবে এখনি। ঝিম খিচে থাকো। চোখ রাখো শিকারের ওপর। বাতাস আসবে। আবার চলেও যাবে। কিন্তু ঠিক ঠিক নিশানায় ছুঁড়তে হবে গুলতি। মনে মনে বলছে এইসব। সেই সাথে পা দুটো ডানে বাঁয়ে সরিয়ে নিশানা নিখুঁত করে চেষ্টা করলো। ঝনঝন করে উঠলো শুকনো ঝরা পাতা। মুহূর্ত সাবধান হলো সম্রাট। খুব ধীরে পা তুলে ঠিক জায়গায় রাখলো। তারপর তাকালো বাঁশগাছের মাথায়। বাতাস এইমাত্র দুটি বককে দূরে সরিয়ে আবার ঠিক করে দিল। একটি আরেকটির দিকে চেয়ে আছে এখন। বকের চোখে কি যে মায়া ভাসছে। বক কি মানুষের মতো ভালোবাসে নিজেদের- ভাবছে সম্রাট।
ধুর এসব ভাবার সময় নয় এখন, নিজেকে নিজেই বললো সে। এখন শুধু নিশানা। কোন বকটি চাই তার। ডানেরটি? নাকি বাঁয়েরটি? দুটি বকই নাদুস নুদুস। যেকোনটি হবে আনন্দের! তবুও দেখে শুধু ডানেরটির দিকেই স্থির করলো চোখ। আত্মবিশ্বাস তো আছেই ওর। গুলতি টার্গেট মিস হয় না প্রায়। কালেভদ্রে দু’একটি ছাড়া। প্রথম দিকে তো প্রায়ই মিস হতো। ধীরে ধীরে পাকা হলো হাত। সেই সাথে বেড়ে গেল আত্মবিশ্বাস। এখন বলতে গেলে মিসই হয় না। গুলতির নিশানা পাকাপোক্ত এতটাই হলো- সবাই তাকে গুলতি বাবা ডাকে। গুলতি বাবার চোখ এখন স্থির ডানের বকের ওপর। অপেক্ষা বাতাস যেন স্থির থাকে। বাতাসের দুলুনিকে জ্বালা ধরিয়ে দিলেও জ্বলছে না ও। যেভাবে হোক একটি বক চাই তার। আহা তেলওয়ালা বক লোভ চাগিয়ে ওঠে মনে। হ্যাঁ বাতাস স্থির এখন। মাছের মতো খোলা। সাপের মতো ঠাণ্ডা ওর টার্গেট। এখনি তীব্র বেগে উড়ে যাবে বকের জীবন হরণকারী গুলতিটি। দম বন্ধ হয়ে গেলো সম্রাটের। ঠিক গুলতি ছোড়ার সময়টাতে আপনাতেই বন্ধ হয়ে যায় দম। দম বন্ধ করেই সে ছুঁড়লো গুলতিটি। ঠিক তখনি একটি পিঁপড়ে দাঁত খিঁচে কামড় বসিয়ে দিলো সম্রাটের বাঁ পায়ে। মনের অজান্তেই পা সরে এগোলো। সেই সাথে টলে গেলো গুলতির নিশানা। দুটি বকের মাঝখান দিয়ে ঘূর্ণির বেগে গুলতিটি উঠে গেল শূন্যের দিকে। এক সাথে কক্ শব্দে দ্রুত উড়ে গেল বক দুটি। চক্কর খেতে খেতে শূন্য থেকে বাঁশতলার খানিক দূরে অসহায়ের মতো পড়ে আছে গুলতিটি। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল সম্রাটের। কিন্তু মনের দিকে নজর দিতে পারছে না ও। ততক্ষণে আরো কটি পিঁপড়ার দাঁত বসে গেছে ওর পায়ে। বিষে ফুলে ফুলে উঠেছে চামড়া। লাল হয়ে উঠেছে চামড়া। মনে হলো মাংস ঠেলে রক্ত উঠে এলো চামড়ার নিচে। চেয়ে দেখলো প্রায় ডজন খানেক পিঁপড়া হাঁটুর নিচের মাংস দাঁত খিঁচে ঝুলে আছে। আর পাতার নিচে শত শত পিঁপড়া ব্যস্ত হয়ে ছুটছে। যাচ্ছে একদল। আরেক দল আসছে। যেতে আসতে একটি আরেকটির মুখ ছুঁয়ে দিচ্ছে। এ ছোঁয়াছুঁয়ির ভেতর কি সংবাদ আদান প্রদান করে- এ কথা মনে জাগলো সম্রাটের। কিন্তু শিকার হাতছাড়া হওয়ার দুঃখ আর পিঁপড়ার যন্ত্রণাদায়ক কামড়ে ক্ষোভ জন্ম নিল মনে। ফলে ঝোলা ট্রাউজারটি গুটিয়ে বাম হাতের তালু মইয়ের মতো লেপটে টেনে নিল পিঁপড়াগুলোর ওপর। কামড় বসিয়ে রেগে থাকা পিঁপড়েগুলো মুহূর্তে একটি বর্তার দলায় পরিণত হলো। কিন্তু ক্ষোভ একটুও কমলো না সম্রাটের। সারিবদ্ধ চলমান শত শত পিঁপড়ের ওপর রাবারের স্যান্ডেল চালিয়ে দিলো বুল্ডোজারের মতো। চোখের পলকে পিষে গেল পিঁপড়ের সারি। এর ভেতর বেঁচে গেল কিছু পিঁপড়ে। প্রাণের ভয়ে তাদের পথ ছেড়ে বেপরোয়া পালাতে থাকলো ওরা। যারা স্যান্ডেল বুলডোজারের আওতায় আসেনি মুহূর্তে তারা পথ বদল করে নিলো। প্রাণ বাঁচানোর সেকি আকুতি এবং প্রাণান্তকর চেষ্টা- দেখছে সম্রাট। শত শত পিঁপড়ের মৃত্যুর করুণ দশা দেখে রাগ ঠাণ্ডা হয়ে গেল সম্রাটের। হঠাৎ ওর মনে হলো অপরাধী পিঁপড়েরা তো শাস্তি পেলোই। হাতের তালুর পেষণে মরে ঝরে গেল সব। কিন্তু পায়ে পেষা পিঁপড়েরা তো দোষ করেনি! নিরপরাধ শত শত পিঁপড়েদের নির্মমভাবে মেরে ফেলবি চিন্তাটি ছিল নৃশংস। ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল সম্রাটের। ধপ করে ঝরা বাঁশের পাতার ওপর বসে পড়ল ও। বসে মৃত পিঁপড়ের দলগুলো দেখছিল। দেখতে দেখতে খুব বিস্মৃত হলো ও। অল্প কিছুক্ষণের ব্যবধানে শত শত পিঁপড়ে ছুটে চললো সেই পথে। দুদিক থেকে ছুটে এসে দুদিকে ছুটে যাচ্ছে পিঁপড়ের সারি। অবাক হয়ে দেখলো সম্রাট ছুটে চলা প্রতিটি পিঁপড়া মৃত পিঁপড়েদের শুঁকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে গভীর মায়ার পরশ দিয়ে আদর করে যাচ্ছে ওদের। যেনো শোক প্রকাশ করে যাচ্ছে প্রতিটি জীবিত পিঁপড়া। মন জ্বালা করছে সম্রাটের। খুব ভারী হয়ে গেল মন। এত এত পিঁপড়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী ও। কেনো এতটা নির্মম হতে গেল ভাবে ও। ভাবতে ভাবতে একটি অবাক বিষয় দেখলো ও। স্যান্ডেলের দলনে যে পিঁপড়েগুলো আহত হলো- এদের মুখে কী যেন ফুঁকে দিচ্ছে জীবিত পিঁপড়েদের কেউ কেউ। দেওয়ার সাথে সাথে আহত কিংবা অর্ধমৃত পিঁপড়েগুলো ঠিক ঠিক ফিরে পাচ্ছে প্রাণ। তারা ধীরে ধীরে ছুটতে শুরু করলো অন্যদের সঙ্গে। এরা কি পিঁপড়েদের ডাক্তার? ভাবে সম্রাট। এই দৃশ্য তো দেখেনি এর আগে। নির্দোষ পিঁপড়েদের পিষে মারার কাহিনী ওর জানা নয়। এর আগেও দু’চারবার পিঁপড়েদের এমন হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ও। কিন্তু আজকের মতো মন খারাপ হয়নি। কিংবা এমন করে ভাবেওনি কখনো।
আজ হঠাৎ কী হলো ওর। কেন পিঁপড়ের মৃত্যুতে এতটা দুঃখ জেগে উঠলো ওর। মৃত পিঁপড়ের দল যেখানে পড়ে আছে পথের ওপর সেখানে নতুন করে পথ করে নিলো ওরা। আহত সব পিঁপড়েরা যোগ দিলো চলমান পিঁপড়ের মিছিলে। এ মিছিল দু’দিকে কতদূর গেছে কে জানে!
সম্রাট আনমনে পিঁপড়ের দিকে চেয়ে থাকলো আরো কিছুক্ষণ। এর মধ্যে বাঁশঝাড়ের ছায়া সরে গেছে কখন। দুপুরের খাড়া সূর্যের তেজ ওর গায়ে মাথায়। সারা শরীর থেকে ঘাম ঝরে পড়ছে শুকনো পাতার ওপর। বৈশাখের সূর্য থেকে খাড়া রোদ পুড়িয়ে দিচ্ছে ওকে। অথচ ও বুঝতেই পারেনি এতক্ষণ। হাত দিয়ে দেখলো-মাথার চুল আগুন প্রায়। খানিক দূরে আকাবা থেকে ফিরে আসা গুলতি কুড়িয়ে নিলো। হাতে তুলে ফিরে এলো আগের জায়গার পাশে। ছায়াটি ওকে ছেড়ে সরে এলো যেখানে। দাঁড়িয়ে খানিকটা শরীর শীতল করে নেবার চেষ্টা করলো। খুব ঝিরি বাতাস শরীর বুলিয়ে যাচ্ছে ঠিক। কিন্তু ভীষণ গরম বাতাস। মনে হলো আগুনের কুণ্ডলী ছুঁয়ে নেমে আসছে বাতাসেরা। তবুও ছায়ার আরাম আছে কিছুটা। সে আরামটা কুড়িয়ে নিচ্ছে সম্রাট।
ছায়ায় নিজেকে ভিজিয়ে পিঁপড়েদের ওপর নিষ্ঠুর আক্রমণ চালানোর অপরাধের কথা মনে হলো আবার। অনেকটা ঝুঁকে পিঁপড়েদের রাজপথ দেখছিলো। এ সময় নবী সোলায়মানের কথা মনে পড়লো ওর। মনে পড়লো দাদুর গল্পের কথা। একদিন দাদু এমন একটি গল্পই বলেছিলেন। বলেছিলেন- নবী সোলায়মান পশুপাখিদের ভাষা বুঝতেন। বুঝতেন এইসব ক্ষুদে প্রাণী পিঁপড়ের ভাষাও। ওর সামনেই ছুটে চলা পিঁপড়েরা কী কথা বলছিল একজন আরেকজনকে – জানতে খুব ইচ্ছে করছে ওর। নবী সোলায়মানের মতো যদি বোঝা যেতো পিঁপড়ের ভাষা আহা কী মজাই না হতো! এই মুহূর্তে এই পিঁপড়েরা তাদের সঙ্গীদের মৃত্যুতে কেমন শোক প্রকাশ করছে বুঝতে পারতো ও। বুঝলে ওর মন আরো খারাপ হতো হয়তো। হলে হতো! তবুও পিঁপড়েদের শোক প্রকাশের ধরন জানতো ও। এ সময় একটি বুনো শেয়াল ওর পেছনের পথে দ্রুত ছুটে গেলো। বাঁশঝাড় পেরিয়ে খানিকটা গেলেই ঘনবন। হুড়মুড় করে শেয়ালটি ঢুকে গেলো বনের ভেতর। বনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ভয় জেগে উঠলো সম্রাটের মনে। ভরদুপুর এখন একদম নিঝুম চারিদিক। যে পথে শেয়ালটি ঢুকে গেলো বনের ভেতর দু’চারটি পাতা-লতা নড়ছিলো তখনো। গভীর বনের দিকে তাকালো সম্রাট। পাতার ফাঁকগুলো যেনো ভূতের চোখের মতো চেপে আছে ওর দিকে। হঠাৎ ভয়ে গায়ের পশম কাঁটা হয়ে হয়ে গেলো ওর। ঠিক তখন একটি বনঘুঘু উড়ে এসে বসলো বাঁশগাছের মাথায়। যেখানে বসা ছিলো বক দুটি। কী সুন্দর পাখিটি। কোত্থেকে উড়ে এসে বসে পড়লো বাঁশগাছের মাথায়। শিকারের নেশা জেগে উঠলো সম্রাটের।
খুব করে দেখছিলো ঘুঘুর পজিশন। ঘুঘুর চোখ তখন সম্রাটের দিকে। সম্রাটের চোখও উড়ে গেলো ঘুঘুর চোখে। ঘুঘুর দৃষ্টি যেনো কামড় বসিয়ে দিলো সম্রাটের বুকে। ওর মনে হচ্ছিল ঘুঘুর চোখও হয়ে উঠলো ভূতের চোখ। মুহূর্তে মন থেকে উড়ে গেলো শিকারের নেশা। গোটা মনে এখন ছেয়ে গেছে ভয়ের ডানা। বৈশাখের খা খা দুপুরে একাকী ঘন জংগলের পাশে বাঁশঝাড়ে ভয় চেপে ধরলো ওকে। মনে পড়লো নানা রকম ভূতের গল্প। এই বাঁশঝাড় এবং জঙ্গল নিয়েও অনেক গল্প আছে ওর কাছে। ওর মনে হচ্ছিলো গল্পের সব ভূতগুলো এখন চতুর্দিক থেকে চেয়ে আছে ওর দিকে। ফলে সামান্য বাতাসে ঝরা বাঁশপাতার শব্দও এখন ভূতের শব্দ বলে মনে হচ্ছে ওর।
দ্রুত বাড়ির দিকে পা বাড়ালো ও। ডানে বাঁয়ে না তাকিয়ে কেবলি সামনে চোখ। দ্রুত হাঁটার জন্য পা বাড়াচ্ছে ও। কিন্তু পা যেনো ভারী ভারী। যেনো এই বুঝি পেছন থেকে গেঞ্জিটি টেনে ধরে হ্যাঁচকা টানে বাঁশ গাছের মাথায় তুলে নেবে ভূত। মনের অজান্তেই দৌড় দিলো ও।
দুই.

দুপুর বেলা খেয়ে কমপক্ষে ত্রিশ মিনিট বিশ্রাম নিতে হবে। মায়ের কড়া নির্দেশ এটি। এ নির্দেশ খুব করে পালন করে সম্রাট। অবশ্য এ নির্দেশটি স্কুল ছুটি থাকলেই কেবল কার্যকর। এখন গ্রীষ্মের ছুটি। এ ছুটিতে বেড়ানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু এবার সে সুযোগ মিলছে না। মিলছে না কারণ সম্রাটের মা অসুস্থ। এতে অবশ্য সম্রাটের মন মোটেও খারাপ নয়। খারাপ কেনো হবে? পাখি খোঁজা। পাখি ধরার এবং পাখির পিছু নিতে নিতে দিন কেটে যায়। ওর গুলতি মেরে পাখি ধরার কাহিনী গাঁয়ের সব লোক জানে। জানে নারী পুরুষ শিশু সকলেই। তার এ গুলতির উচ্ছ্বাসের ফলে সবাই তাকে ডাকে গুলতি বাবা।
সেই গুলতি বাবা এখন বিশ্রাম নিচ্ছে নিজের কক্ষে। সটান শুয়ে আছে বিছানায়। চোখ দুুটি ছাদের নিচে খোলা। চোখ ছাদের নিচে থাকলেও মন ছুটে গেছে বাঁশঝাড়ের বনের ভেতর। পুকুর পাড়ে।
বিশ্রাম শেষ হলেই ও চলে যায় পুকুর পাড়ের হিজল তলায়। হিজল গাছটি অসম্ভব প্রিয় ওর। বর্ষায় যখন হিজল ফুল ফোটে কী যে আনন্দে নেচে ওঠে ওর মন। গ্রীষ্মে হিজলের পাতা ছোঁয়া বাতাস গায়ে মাখার খুশিও আলোড়িত করে ওকে।
আজ যখন হিজল তলায় এসে দাঁড়ালো হঠাৎ মনে হলো হিজল গাছটি আগের মতো নেই। কেন এমন হচ্ছে? কী হলো হিজল বৃক্ষটির। সবসময় মনে হতো ওকে দেখে হিজল গাছটি যেনো আনন্দে পাতা নাড়তো। দুলে উঠতো হিজলের ডাল। আজ গাছটি নীরব। নিঝুম। একটি পাতাও দুলছে না। ডালগুলো চুপচাপ। কেমন মৌন হয়ে আছে গাছটি। গ্রীষ্মের দুপুর বলেই কি। কিন্তু কাল দুপুরেও গাছটি সতেজ ছিলো। গাছের পাতায় পাতায় দুলছিলো আনন্দের সবুজ। সব ডালে উঁকি দিলো সম্রাট। না দুটি শালিকও নেই কোনো ডালে। শালিক দুটি এ সময় হিজলের ডালেই কাটায়। সম্ভবত ওর মতো বিশ্রাম নেয় পাখি দুটিও। ভাবে সম্রাট। কিন্তু কী হলো আজ? খুব করে দেখলো গাছটির চারপাশ। দেখলো যে ডালটি এসে পুকুরের দিকে ঝুঁকলো- সে ডালটি নেই। নির্মমভাবে কেটে নিলো কেউ! কে করলো কাজটি? পেলে আচ্ছামতো শায়েস্তা করতো সম্রাট। ভেতরে ক্ষোভ জন্ম নিলো ওর। সেই সাথে কষ্টের দলা বসে পড়লো বুকের ভেতর। মনটাই খারাপ হয়ে গেলো ওর। গাছের ডাল নেই। পাখি নেই। তাই আনন্দও নেই। গাছের প্রাণ আছে এ কথা জানে সম্রাট। জানে বলেই গাছটির কষ্ট অনুভব করছে। ওর চোখ দেখছে- কেমন নিষ্প্রাণ হয়ে আছে গাছটি।
জোড়া শালিক দুটিও ওর খুব প্রিয়। ওর জীবনে এ দুটি পাখির দিকেই শুধু গুলতি তাক করেনি। পাখি দুটিও যেনো ওকে আপন করে নিয়েছিলো। ডালে বসে মাঝে মাঝে গান করতো পাখি দুটি। সম্রাটের মনে হতো ওর জন্যই গান করছে পাখিরা।
মন খারাপ করেই বসে আছে সম্রাট। বাঁ পাশে গুলতিটি রাখা। হিজল তলা থেকে সামনে তাকালেই একটি কলা বাগান। মাঝখানে একটি পাট ক্ষেত পার হলেই কলা বাগানটি। সাগর কলা। দেশি বাংলা কলা এবং বিচি কলা। বিচি কলাকে আঁইট্টা কলাও বলে লোকেরা। কলার থোড় ঝুলছে অনেক গাছে। কোনো কোনো গাছে কলার ফানা বেশ বড় সড় হয়ে ঝুলছে। ঝোলা ফানায় কোনো কোনোটাই পাকা কলাও যেন লুকিয়ে আছে। গাছ পাকা কলার একটি ঘ্রাণ আছে। ঘ্রাণটি খুব ভালো লাগে সম্রাটের। মাঝে মাঝে পাকা কলার ঘ্রাণ নিতে ঢুকে পড়ে কলা বাগানে। বাগানটি ওদেরই। ফলে যখন তখন ঢুকে পড়ায় মানা নেই। কোনো কোনোদিন কাঁদি থেকে পাকা কলা ছিঁড়ে নেয়। কলার নিচের অংশ থেকে ছিলে কামড় বসায় কলার দেহে। একেবারে পাকা কলা কাঁদি থেকে ছিঁড়ে খাওয়ার মজা সম্রাটকে অভিভূত করে। পুরোপুরি না পাকলে খানিকটা কষ লাগে। কিন্তু মিষ্টি স্বাদটি অপূর্ব।
বেশ কদিন কলা বাগানে ঢুকেনি সম্রাট। হিজল তলা থেকে নেমে এলো পাট ক্ষেতের আলে। হিজল গাছ ও শালিক দুটির বেদনা বুকে নিয়ে হাঁটছে ও। হাঁটছে আনমনে। হাঁটতে হাঁটতে হাঠাৎ মনে ভেসে উঠলো একটি মুখ। মুখটি ওর চাচার। চাচা ওর পাখি শিকার এবং হিজল তলায় বসার ঘোর বিরোধী। ওর নিশ্চিত মনে হচ্ছে হিজলের ডালটি ওর চাচাই কেটেছে। যদি তা-ই হয় চাচাকে কখনো ক্ষমা করবে না- মনে মনে এই প্রতিজ্ঞাই করলো ও।
কলা বাগানটি বেশ বড়। বাগানটিকে খুব যত্ন করে সম্রাটের বাবা। ফলে কলাগাছগুলো খুব নাদুস নুদুস। বেশ তাজা। কলাগুলোও বেশ পরিপুষ্ট। বাগানে ঢুকতেই পাকা কলার ঘ্রাণ পেলো সম্রাট। ডানে বাঁয়ে খুঁজলো। দেখলো সামনের দিকে। একটু এগুলো। না সামনে দেখা যাচ্ছে না। ডানেও না। বাঁয়ের একটি জোড়া গাছের দিকে হাঁটলো। হ্যাঁ জোড়া গাছের একটিতে কলার বিশাল ছড়া ঝুলছে। অর্ধেকের বেশি কলাই পাকা। একদম কাঁচা হলুদের চকচকে রঙ। দেখেই খানিকটা ভালো হয়ে গেলো সম্রাটের মন। আজ কলা খাবে না- এমন চিন্তা নিয়েই ঢুকলো বাগানে। কিন্তু কলার ঘ্রাণ আর চেহারা দেখে লোভ হচ্ছে। বাংলা কলা এটি। বাংলা কলার গাছগুলো বেশ লম্বা। কলার ছড়াও লম্বা। তবুও বেশ উঁচুতেই ঝুলছে ছড়াটি। সাগর কলাগাছ বেশি উঁচু হয় না। আবার ছড়াটিও অনেক বড়। প্রায় গাছের সমান হয় ছড়া। স্বাভাবিকভাবে কলা ছিঁড়ে নেওয়ার সুযোগ হচ্ছে না। ফলে দু’পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে টানটান হাতে ছিঁড়ে নিলো দুটি কলা। কলা ছিঁড়ে প্রায় উপুড় হয়ে পড়তে পড়তে দাঁড়িয়ে গেলো। কলা ছেঁড়ার পরিশ্রমে কিছুটা হাঁপিয়ে উঠলো ও। একটি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ছাড়লো। এতে খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠলো দম। একটি কলা বোগলের নিচে ধরলো আরেকটি ছিলে এক কামড়ে মুখে তুললো বেশ খানিক। আহা কী যে স্বাদ! কী যে ঘ্রাণ! মিষ্টি কী! অথচ শহরের মানুষেরা কি কলা খায়-ভাবতে অবাক লাগে সম্রাটের। কাল রাতেই ফেসবুকে দেখলো শহরের কলা নিয়ে একটি স্ট্যাটাস। কাঁচাকলা পাকিয়ে বিক্রি করছে দেদারসে। স্বাদ নেই। গন্ধ নেই। চেহারাও নেই! তবু কিনে নিয়ে যাচ্ছে মানুষ। হাসি পায় সম্রাটের। এমন কলাও খায় মানুষ। ফেসবুক বন্ধুটি শহরেই থাকে। একেবারে রাজধানী ঢাকা শহরে। সম্রাটের মায়া হলো বন্ধুটির জন্য। আহা বেচারা শহরের মায়ায় পড়ে খাচ্ছে কী অখাদ্য! তিন কামড়েই সাবাড় করে দিলো কলাটি। এবার দ্বিতীয় কলা। ছিললো যত্ন করে। মুখের অংশ ধরে বড় একটি কামড় নিলো মুখে। ঠিক তখনই একটি পাখির অস্বাভাবিক ডাক ভেসে এলো কানে। সেই সাথে পাখির পাখার দাপানি। কলা চিবানো থামিয়ে কান খাড়া করলো। বুঝতে চেষ্টা করছে কোনদিক থেকে ভেসে আসছে চিৎকারটি। হ্যাঁ ডান দিক থেকে। কলাটি দ্রুত চিবিয়ে গিলে নিলো। বাকি কলাটিও খেয়ে নিলো দ্রুততার সাথে। খেতে খেতেই ডান দিকে এগুলো। কয়েক কদম এগুতেই দেখলো একটি সাগর কলার নিচে দাপাদাপি করছে একটি দোয়েল। ভয়ে যেন চোখ ফেটে যাবে দোয়েলটির। বাঁচার জন্য ডানা ঝাপটাচ্ছে ভীষণ রকম। খুব সতর্কতার সাথে আরো কাছে গেলো পাখির। ঠিক গাছের আড়াল থেকে উঁকি দিলো সম্রাট। দেখলো একটি বিশাল গোখরোর মুখে দোয়েলের একটি পা। পাখিটি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গায়ের সমস্ত শক্তি জড়ো করে ডানা ঝাপটাচ্ছে। সাপটিও প্রচণ্ড কামড়ে ধরে আছে পাখির পা। যেভাবেই হোক পাখিটি নিজেকে বাঁচাতে চায়। সাপটিও কোনোভাবেই ছাড়বে না তাকে। পাখির দাপানিতে কলাপাতা ঘাস নড়ে নড়ে যাচ্ছে। ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছে পাখিটি। পাখিটি বেঁচে থাকার আকুতি দেখে কী যে মায়া অনুভব করছে সম্রাট। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো ও। হাতের গুলতি তাক করলো দ্রুত। ঠিক ঘাড় নিশানা করলো সাপটির। টার্গেট মিস করা যাবে না। এক নিশানায় কাবু করতে হবে সাপকে। তাই করলো ও। তীব্র গতিতে গুলতি আঘাত করলো সাপটির ঘাড়। আচমকা আঘাতের ধাক্কা সামলাতে পারেনি সাপটি। গুলতির আঘাত একদিক থেকে আরেক দিকের মাটিতে বাড়ি দিলো ভীষণভাবে। আঘাতের সাথে সাথে পাখির পা থেকে আলগা হয়ে গেলো কামড়। পাখিটি এক ঝাপটায় বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে পড়লো। পড়েই উড়াল তোলার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। এত দাপানির ফলে শেষ প্রায় পাখির শক্তি। ঘাসের ওপর প্রায় তড়পাচ্ছে পাখিটি। সাপটিও রাগে প্রচণ্ড রকম ফুঁসছে। অকস্মাৎ ঘাড়ের আঘাত কিছুতেই সামাল দিতে পারছে না। ফলে ফুঁসলেও ফণা তোলার সাধ্য নেই তার। ফুঁসতে ফুঁসতেই দেখলো সম্রাটকে। সম্রাটের দিকে তেড়ে আসার কিংবা আক্রমণ করার সাহস করলো না। নিজের জীবন বাঁচানোর চেষ্টায় প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পালিয়ে গেলো বাগানের ভেতর।
পাখিটির ডানা ঝাপটানো বন্ধ এখন। কিন্তু কাঁপছে প্রচণ্ড। তবে চোখ ফেটে যেমন হৃদয় বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা ছিলো সেটি কমে গেছে। সম্রাট কাছে গেলো পাখিটির। না সম্রাটকে দেখে দোয়েলটি ভয় পেলো না। বুঝে গেছে তাকে সাপের মুখ থেকে বাঁচিয়েছে এ লোকটি। দোয়েলটিকে একটি নিরাপদ জায়গায় রাখার চিন্তা করলো সম্রাট। এখানে এভাবে পড়ে থাকলে সাপটি ফিরে আসতে পারে। কিংবা আরো কোনো সাপ অথবা হিং¯্র প্রাণীর শিকার হতে পারে। পাশের বাড়ির কালো বিড়ালটিও হাজির হয়ে যেতে পারে। বিড়ালের শ্রবণশক্তি অন্য সব প্রাণীর চেয়ে বেশি। পাখির অসহায় দাপাদাপিও হয়তো পৌঁছে যাবে বিড়ালের কানে। এখানে গুই সাপের বিচরণও আছে খুব। পেলে তো এক লোকমা বানিয়ে দোয়েলটিকে চালান করে দেবে উদরে। এসব ভেবে দোয়েলটিকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। সেইভাবে আদর মাখা হাত বাড়ালো দোয়েলটির দিকে। ভীষণ ক্লান্ত দোয়েলটি ভয় পেলো এবার। সর্বশক্তি দিয়ে উড়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু জায়গা বদল ছাড়া আর তেমন কিছু হলো না। ওড়ার শক্তি তার ডানায় ফেরেনি এখনো। বেশ হাঁফাচ্ছে আবার। দাপানিও শুরু হলো ফের। পাখির ভাবনা হয়তো নতুন বিপদে পড়তে যাচ্ছে ও। সেই ভাবনা থেকে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছে পাখিটি। সম্রাট একটু এগিয়ে গেলো পাখির দিকে। পাখিটিও আবার একই চেষ্টায় সরে গেলো। এভাবে বার কয়েক চেষ্টা করলো সম্রাট। প্রতিবারই পাখিটি সরে গেলো আগের জায়গা থেকে। সম্রাট দাঁড়িয়ে রইলো এবার। চোখ দুটি পাখির ওপর। হঠাৎ ওর মনে হলো- দোয়েলটির চোখে আগের মতো মৃত্যু ভয় নেই। সাপের মুখে যেমন চোখ ফেটে যাচ্ছিলো প্রায়। এখন তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কেন? দাঁড়িয়ে ভাবছে সম্রাট। খুব করে দেখছিলো দোয়েলটিকে। দোয়েলের চোখও সম্রাটের দিকে খাড়া। সম্রাট দাঁড়িয়ে আছে। পাখিটিও ঘাসে বুক মিশিয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ঘনঘন। কিন্তু আগের চেয়ে আরও ক্লান্ত লাগছে পাখিটিকে।
আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলো সম্রাট। পাখিটি তখন খানিকটা স্থির। ধীরে উপুড় হচ্ছে সম্রাট। ওর লক্ষ্য হঠাৎ হাতের মুঠোয় তুলে নেবে পাখিটি। কিন্তু দেখলো ও পাখিটি আরও দুর্বল। আরও নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। এইবার বোধহয় ধরে নেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু হলো না সম্ভব। উপুড় হতে দেখে পাখিটি বুঝে ফেললো- কী করতে যাচ্ছে ও। আগের মতোই সরে গেলো দোয়েলটি। সে সাথে নেতিয়ে পড়ছে আরও। দাঁড়িয়ে গেলো সম্রাট। হঠাৎ ওর মনে জাগলো বিষধর সাপের কামড় খেয়েছে পাখিটি! সেই বিষের ভয়াবহতায় নেতিয়ে পড়ছে দোয়েল। ভাবনাটি মনে জাগতেই গা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো ওর। যদি পাখিটিকে ধরতো ও। পাখির ঠোঁটের কামড় কিংবা নখের আঁচড় যদি হাতে গায়ে লাগতো! আর ভাবতে পারে না সম্রাট! ওর অবস্থাটি ও এই নেতিয়ে পড়া দোয়েলটির মতোই হতো।
উপুড় হয়ে ছিলো দোয়েলটি। এখন মাথাটি কাত করে ঘাসের ওপর এলিয়ে দিলো। দুটি ঠোঁট কিছুটা ফাঁক হয়ে পড়ে আছে। দুঠোঁটের মাঝখান থেকে লালা ঝরে পড়ছে। চোখ দুটি ধীরে ধীরে ভাঁজ হয়ে আসছে। নিভে যাচ্ছে চোখের আলো। সারা শরীর স্থির। নড়াচড়া নেই একদম। কী যে মায়া লাগছে সম্রাটের। দৃষ্টি স্থির করে তাকিয়ে আছে ও। এত কাছ থেকে কোনো প্রাণীর মৃত্যু এর আগে দেখেনি ও।
চোখ দুটি জোড়া লেগে গেছে পাখিটির। দুটি ঠোঁট আরও কিছুটা ফাঁক হয়ে গেছে। শরীরের কোথাও নড়াচড়া একদম নেই। সম্রাট ভাবলো মরেই গেছে পাখিটি। বেশ ঝুঁকে এসে দেখছে নিঃশ্বাস পড়ছে নাকি শেষ। না শরীরে কোথাও বেঁচে থাকার লক্ষণ নেই। কিন্তু সম্রাট সোজা হলো না। ঝুঁকে থাকলো আরও কিছুক্ষণ। হঠাৎ কেঁপে উঠলো পাখিটি। কেঁপে ওঠার সাথে একটি প্রবল ঝাঁকুনি দিলো। ঝাঁকুনির সাথে সাথে চিত হয়ে গেলো পাখিটি। দুটি পা ওপরে। নিচে পিঠ। ঘাসের ওপর মাথাটিও উল্টো হয়ে আছে। নিজেকে নিজেই বলছে সম্রাট- ভয়াবহ ঝাঁকুনি দিয়েই পাখির প্রাণ বেরিয়ে গেলো তার দেহ থেকে। মনের অজান্তেই চোখ ভিজে উঠলো সম্রাটের। দু’চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো ওর গালের ওপর। চোখের পাতা না ফেলে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো দোয়েলটির দিকে। মৃত পাখি আর জীবিত পাখির মধ্যে কত তফাত- ভাবছে সম্রাট। দেখতে দেখতে ভাবনাটি হঠাৎ এলো মাথায়। দোয়েলটিকে কবর দিলে কেমন হয়?
ওর ভেতরের মন বললো খুব ভালো হয়। কিন্তু কিভাবে? মাটি খোঁড়ার কিছুতো সঙ্গে নেই। তবে? তবে আর কী। কলাবাগান থেকে দ্রুত বের হলো ও। বেরিয়েই দৌড়। এক দৌড়ে পৌঁছে গেলো ঘরে। ঘর থেকে একটি ছোট কোদাল তুলে নিলো হাতে। নিয়েই আবার দৌড়। ওর মা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেরিয়ে গেলো বাড়ির আঙিনা। পুকুর পাড় ধরে দৌড়ে পৌঁছে গেলো বাগানে। ওর ভয়- যদি গুইসাপ এসে মৃত দোয়েলটি পুরে নেয় মুখে! এই চিন্তা থেকে কোথাও কমেনি ওর দৌড়ের গতি। এক দৌড়ে পৌঁছে গেল দোয়েলটির কাছে। এসে দেখলো দোয়েলটি আর নেই! কী হলো? এ সামান্য সময়ের মধ্যে কী ঘটে গেলো! আশপাশে খুঁজতে থাকে ও। না কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু করছে। বাগানে তখন ছায়া ঘন হয়ে উঠেছে। তবু খুঁজছে সম্রাট। ডানে বাঁয়ে সামনে করে দেখলো। ডানে একটু এগিয়ে গেলো। ঠিক তখনি চোখ বড় হয়ে উঠলো সম্রাটের। দেখলো-সেই সাপটি। দোয়েলটির লেজের অংশ ছাড়া বাকি সবটাই গিলে নিয়েছে। কী যে ক্ষোভ জন্ম নিলো সম্রাটের! সাপটাকে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
সম্রাটকে দেখেই চোখের পলকে পালিয়ে গেলো সাপটি। সম্ভবত সে সম্রাটের রোষানলে পড়তে চাইলো না। তাছাড়া একবার শিকার হারিয়েছে। আবার যদি হারায়! এ ভয় থেকে সাপটি পালিয়ে গেলো দ্রুত! সম্রাট এখানে থাকা আর নিরাপদ মনে করলো না। ওর মনেও কুট কুট কাটছে ভয়! সাপটি যদি ফিরে এসে আক্রমণ করে ওকে? ও জানে গোখরো সাপ ফণা তুললে সহজে নামায় না সে ফণা। ওর গুলতিটা কুড়িয়ে দ্রুত ছুটে চললো বাড়ির দিকে।

তিন.

রাতে কোনভাবেই ঘুম নামছে না সম্রাটের চোখে। দোয়েলের চোখের আকুতি বারবার ভেসে উঠছে ওর মনের চোখে। দাপানি। তড়পানি আর বাঁচার আকুতি সবই যেনো দেখছে ও। সেই সাথে দুপুর বেলার পিঁপড়েদের মেরে ফেলার দৃশ্য ওর মনকে ছেয়ে ফেললো। আকস্মিক ভেসে উঠলো বন ঘুঘুর চোখ। পাতার ফাঁকে ভূতের চোখের মতো দৃশ্যটিও জেগে উঠলো। একদিকে পিঁপড়ে আর দোয়েলের জন্য মায়া। অন্য দিকে ভূতের ভয়। ঘুম পালিয়ে গেছে চোখ থেকে। এ পাশ ওপাশ করে বিছানায়। কখনো ডান কাত। কখনো বাম কাত। কিন্তু চিৎ হয়ে শোয়ার সাহস করছে না ওর। কেন যেনো কোনোদিন গভীর রাতে ঘুমের ভেতর বোবায় ধরে ওকে। নড়াচড়া একদম করা যায় না এসময়। বেশ খানিক সময় এভাবে নড়াচড়াহীন শুয়ে থেকে কাটাতে হয়। অনেক চেষ্টার পর আকস্মিক ঠিক হয় শরীরটি। মনে হয় কিছু চেপে ধরার পর হঠাৎ ছেড়ে গেছে। ছেড়ে গেলে তখন দেখে সে চিৎ হয়ে শোয়া। এই ভাবনা থেকে চিৎ হয়ে শোয় না ও। মনে পড়লো আরও দুটি ভয়ের চোখ। তিনদিন আগের কথা। মধ্য রাতে প্রায়। প্রশ্রাব করার প্রয়োজনে উঠোনে বের হলো ও। উঠোনের এক কোনায় প্রস্রাবখানা। প্রস্রাব করে যখন উঠলো চোখ পড়লো মেহেদি গাছটির ওপর। হঠাৎ দেখলো মেহেদির একটা ডালে ভয়ঙ্কর রকম জ্বলছে হুতুম পেচার চোখ। আকস্মিক ভয়ে কেপে উঠলো সারা শরীর। দুটি চোখ থেকে যেনো ভয়ের ফলা গেঁথে গেলো বুকের ভেতর। দ্রুত ঘরে উঠে দরজার ছিটকিনি তুলে দিলো। সেদিন রাত ঘুম হয়নি ভয়ে। সেই সাথে চোখ দুটিও আজ জেগে উঠলো। নানারকম ভয় চেপে ধরলো ওকে। নিজেকে বেশ সাহসীই ভাবে সম্রাট। ও নিজে ভাবে তাই নয়। লোকেও বলে সম্রাট খুব সাহসী। সেই সাহসী ছেলেটি আজ কল্পিত ভয়ে কাবু। ভয়ের চোটে চোখ থেকে পালিয়ে গেছে ঘুম। এখন ঘুমহীন এপাশ ওপাশ গড়াগড়ি।
এভাবে গড়াগড়ি দিতে দিতে কোন ফাঁকে ঘুম এসে চোখের পাতা জোড়া করে দিলো। ঘুমিয়ে পড়লো সম্রাট। ঘুমের ঘোরে নেমে এলো ভয়ঙ্কর সব স্বপ্ন। ও দেখলো ভর দুপুর। সূর্যের আলো বেশি তেজি নয়। গরমও তেমন নেই। গুলতি হাতে পাখি শিকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও। ঘুরতে ঘুরতে এলো সেই বাঁশতলায়। যেখানে পাতা ঝরে কার্পেট হয়ে উঠেছে।
বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়ালো ও। দাঁড়িয়ে দেখছিলো আছে কি কোনো পাখি। না কোনো পাখি নেই। কিন্তু একটি সাদা-কালো বানর লাফালাফি করছে বাঁশগাছের মাথায়। এক সময় বাঁশের কাঁচা পাতা ছিঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে সম্রাটের দিকে। দৃশ্যটি ভালোই লাগছিলো সম্রাটের। গুলতি কাঁধে ঝুলিয়ে সম্রাট দু’হাত বাড়ালো বানরের দিকে। বানরটি আরও বেশি পাতা ছুঁড়ে দিচ্ছে। অনেক পাতা ছুঁড়ে দিলো ওকে। শুকনো বাদামি পাতার ওপর কাঁচা সবুজ পাতা ছড়িয়ে দিলো ও। দেখতে বেশ লাগছে এখন। বাদামি সাদা পাতার ওপর সবুজ পাতার ছিটানো দেখে মনের ভেতর বেশ পুলক জাগলো। দৃশ্যটি দেখছিলো খুব মনোযোগে। দেখতে দেখতে আবার তাকালো বাঁশগাছের মাথায়। তাকিয়েই খুব অবাক ও দেখলো বানরের মুখের ওপর বসে আছে একটি শিশুর মুখ। মুখটি খুবই সুন্দর। বাকি সবটুকু বানর। শুধু মুখটি শিশুর। এটি কী করে সম্ভব! ভাবতে ভাবতে দেখলো শিশুটি ওকে ইশারা দিচ্ছে। ইশারায় বলছে- তুমিও উঠে এসো বাঁশগাছের মাথায়। খুব বিস্মিত হচ্ছে ও। বাঁশগাছের মাথায় উঠবো কী করে! কিন্তু বারবার ইশারা দিচ্ছে শিশুটি। সম্রাটের ইচ্ছে করছে বাঁশগাছের মাথায় ওঠার। কিন্তু ওঠা কি সম্ভব! হয় তো খুব করে কিছু দূর ওঠা যাবে। কিন্তু মাথায় কি ওঠা যাবে! মোটেই না। এ দিকে শিশুটি খুব করে ইশারা দিচ্ছে।
সম্রাট সিদ্ধান্ত নিলো উঠবে। বাঁশঝাড়ের ঝরা পাতার আরাম থেকে পা বাড়ালো বাঁশের মূলির দিকে। একটি মোটা বাঁশ চিহ্নিত করলো ও। বিসমিল্লাহ বলে বাঁশটি ধরলো। হাঁটু ভাঁজ করে এক পা ওপরে তুলে দ্বিতীয় পা টানতেই ঘটলো ঘটনাটি। নিচের দিকে থেকে যেনো উপচানো বাতাস এক ঝটকায় ওকে পৌঁছে দিলো বাঁশগাছের মাথায়। পৌঁছে দেখলো শিশুমুখ বানরটি নেই। সেখানে বসে আছে বিশাল এক স্বর্ণ ঈগল। বাঁশঝাড়ের মাথায় পৌঁছা মাত্র সম্রাটকে ইঁদুর ধরার মতো দুপায়ে ধরলো ঈগলটি। ধরেই বিরাট দুটি পাখা খুলে উড়তে শুরু করলো। এক সময় ও দেখলো বিশাল এক সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ঈগলটি। সমুদ্রের পানি কোথাও নীল। কোথাও সবুজ। কোথাও রূপালি। ভীষণ ভালো লাগলো ওর সমুদ্রকে। ও অবাক হয়ে ভাবছে- ঈগলের নখর কোনো আঘাত করছে না ওকে। আঁচড়ও লাগছে না। ভয় ডর কিছুই অনুভূত হচ্ছে না। বরং একটি অন্যরকম ভালোলাগা জড়িয়ে আছে। সমুদ্র পেরিয়ে এখন মেঘের ওপর ঈগলটি। তুলোর মতো মেঘগুলো সম্রাটের পায়ের নিচে উড়ে উড়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে খানিক নেমে এলো ঈগল ডানা। নিচে তাকিয়ে অবাক সম্রাট-যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। তারপর কেবলি সবুজ গাছ গাছালি। বিশাল বন পেরিয়ে এবার উড়ছে একটি খোলা প্রান্তরে। ওপরে নীল শূন্যতা। নিচে মাঠ মাঠ আর মাঠ। এরপর ফসলের ভূমি। দেখতে দেখতে আকস্মিক সাঁই করে ঈগলটি নেমে এলো সেই বাঁশঝাড়ের মাথায়। ওকে মাথায় রেখেই উড়ে গেলো পাখিটি। সম্রাটের দুটি হাত তখন ধরে আছে সেই বানর। প্রথম দেখেছিলো যেটি। বাঁশঝাড়ের ভেতর একরকম শূন্যে ঝুলিয়ে রাখলো ওকে। ভীষণ ভয় লাগছে ওর। চিৎকার দিয়ে বানরকে অনুরোধ করছে- আমাকে বাঁশগাছ ধরতে দাও। ধরতে দাও।
শুনে দাঁত কেলিয়ে হাসলো বানর। এ সময় প্রচণ্ড এক ঝটকা বাতাস এলো। বাতাসের চাপ এতটাই প্রবল ছিলো বাঁশঝাড় প্রায় মাটির কাছাকাছি নুয়ে গেলো। সম্রাট আর বানরও নুয়ে পড়লো ঝাড়ের সাথে। মুহূর্তে বাতাস আবার খাড়া করে দিলো বাঁশগাছ। খাড়া করার সাথে সাথেই বানর ছেড়ে দিলো সম্রাটের দু’হাত। বাঁশগাছের মাথা থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে সম্রাট। চিৎকার দিলো ভয়ে। সেই চিৎকারেই ঘুম ভেঙে গেলো ওর। ঘুম ভেঙে দেখলো ওর বুক প্রচণ্ড রকম ধড়ফড় করছে। সারা শরীর ঘামে চুবচুবে। বিছানাও ভিজে গেছে একদম। বিস্ময়কর এ স্বপ্নে ওর সব চিন্তা এলোমেলো। ওর রুম ভর্তি অন্ধকার যেনো ভয়ের রঙ। বুকও ভরে আছে ভয়ের হাপরে। ডানে বাঁয়ে নড়ার সাহসও নেই ওর। উঠে লাইট জ¦ালাবে তাও পারলো না। মা বাবাকে ডাকবে- শব্দ বের হচ্ছে না গলা থেকে। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এক সময় মনে হলো আজই ওর জীবনের শেষ দিন। এত ভয় ও সারা জীবনে কখনো পায়নি। ঠিক এসময় ওর মনে পড়লো গুলতি মেরে ঘাড় কাত করে দেওয়া সাপটির কথা। সাপটি যদি প্রতিশোধ নিতে আসে। যদি অন্ধকারে ঢুকে পড়ে এখানে। ওর এক খালাই তো বলেছিলো- গোখরা সাপকে আঘাত দিলে সে সাপ প্রতিশোধ নিতে আসে। একথা সম্রাট বিশ্বাস করেনি কখনো। আজ যেনো ওর মনের ওপর চেপে বসেছে এ বিশ্বাস। ভয়ের ওপর আরও ভয়- একদম নাস্তানাবুদ ও। মনে মনে ভাবলো- যদি মরে যাই! হঠাৎ ভেতরের মন এক ধরনের সাহস জাগিয়ে দিলো। বললো- আরে মানুষের জীবনে মৃত্যু একবারই হয়। বারবার মরে না মানুষ। তাছাড়া ওর দাদুই তো গল্প বলেছিলেন বীর পুরুষ এবং সাহসীরা কখনো মৃত্যুকে ভয় পায় না। তারা ভয় করে মৃত্যুর ¯্রষ্টাকে। এ ভাবনা জেগে ওঠার পর আকস্মিক ওর মন হালকা হতে থাকলো। মন থেকে সরে যাচ্ছিলো ভয়। এতক্ষণে পাশ ফিরে শুলো ও। এখন মনে হচ্ছে ভয়শূন্য মন। একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে নিজেকে। ভয়ের জায়গায় জন্ম নিয়েছে নতুন সাহস। ওর মনে হচ্ছে ও নতুন কিছু করবে। নতুন করে করবে। মনের ভেতর ভেসে উঠলো বাঁশঝাড়টি। বাঁশঝাড়ের সাথে ওর কী সম্পর্ক! কী হলো বাঁশঝাড়ের ছায়ায় ছায়ায়। ভোর হলেই যাবে সেখানে। দেখবে বাঁশঝাড়ের বুকের ভেতর কী আছে নতুন! ঘুম আর চোখে ধরা দেবে বলে মনে হচ্ছে না। উঠে যাবে শোয়া থেকে? নিজেকে নিজেই জিজ্ঞেস করে। কটা বাজে? ভোর হতে আর কতক্ষণ? ভাবতে ভাবতে সুর ভেসে এলো ভোরের আজান। সম্রাটের পরিচিত মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।

চার.

সকাল সকাল বাঁশঝাড়ে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হয়নি। হয়নি কারণ- স্কুল ছুটি বলে নাস্তা খেয়েই পড়ার টেবিলে বসতে হয়। মায়ের কড়া নির্দেশ- সকাল ১১টা পর্যন্ত একটানা পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে হবে না। হলে পাখি ধরা, গুলতি মারা, ঘুরে বেড়ানো সবই বন্ধ। ভয় থেকে সময়মত হাজির পড়ার টেবিলে। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতেও ওকে ভালো ফল দেখাতে হবে। ও বরাবরই ভালো করে পরীক্ষায়। ভালো ছেলে হিসেবে সবাই জানে ওকে। সুতরাং সুনামটি ধরে রাখার ব্যাপার ওর নিজেরও একটি সিদ্ধান্ত আছে।
ঠিক ১১টা। সকাল। বের হবার ছাড়পত্র পেয়ে গেছে মায়ের কাছ থেকে। বইপত্র ঠিক করে টেবিলটি গুছিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লো ঘর থেকে। বের হলো খালি হাতে। এই প্রথম এ সময় গুলতি না নিয়েই বের হলো ও। গুলতির কথা মনেও পড়লো না আজ। ওর গোটা মনের ওপর বসে আছে বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড় ঘিরে রাতের স্বপ্ন। সেই বানর সেই শিশুমুখ বানর। সেই স্বর্ণ ঈগল। সেই সমুদ্র মেঘ পাহাড় আর তেপান্তর। মুহূর্তে মন ছুটে যাচ্ছে কত দিকে কত জায়গায়। কত কী ভেসে উঠছে মনের আয়নাতে! বাঁশ ঝাড়ের নিচে দাঁড়ালো ও। দাঁড়িয়েই দৃষ্টি দিলো মাথায়। ওর চোখ খুঁজছে বানরটি- ঈগলটি। স্বপ্ন স্বপ্নই। স্বপ্নের বিষয় হুবহু সত্য কি আর হয়? হয় না। তবু স্বপ্নে দেখা বিষয়গুলো খুঁজছে ওর দুটি চোখ। ওর মন। খুঁজছে ঝড়ের কোনো চিহ্ন। না নেই তার কোনো চিহ্ন।
কিন্তু বাঁশগাছগুলোকে আজ কেমন অন্যরকম লাগছে সম্রাটের। যেনো প্রতিদিন দেখা সেই বাঁশঝাড় এটি নয়। কেন এমন লাগছে? কেন? খুব করে দেখলো ও। দৃষ্টি খুলে দেখলো। দেখে মনে হচ্ছে ঠিকই কোথাও একটু ছন্দপতন ঘটেছে। কোথায়? কী ঘটেছে? খুঁজছে ও। দেখছে খুঁটিয়ে। দেখছে কিন্তু বুঝতে পারছে না চোখ। তবু তাকিয়ে আছে সে। তাকাতে তাকাতে ঘাড় ব্যথা হয়ে গেলো। তবুও বুঝলো না কোথায় কী ঘটেছে। হঠাৎ মনে হলো স্বপ্নের ঘোর থেকে দেখছে ও। স্বপ্নের ঘোর ওর দৃষ্টিকে কিছুটা অন্যরকম করে দিয়েছে।
এসময় দেখলো সাঁই করে উড়ে এলো এক ঝাঁক বুনো শালিক বাঁশঝাড়ের মাথায়। মাথায় গায়ে শরীরে বসে পড়লো পাখি। ছুটছে এ গাছ থেকে ও গাছে। লাফাচ্ছে আপন মনে। কিচির কিচির। মিচির মিচির। নানারকম শব্দে প্রকাশ করছে আনন্দ। খুব মজা করে দেখছে সম্রাট। কোনোটির ঠোঁট হলুদ। কোনোটির লাল। কোনোটির লাল-হলুদ মেশানো। বাদামি ডানায় সাদার রেখা। কোথাও কালো রেখার দাগ। কী যে মায়াবী এসব পাখি। দেখতে দেখতে উড়ে এলো বিশাল এক ঝাঁক চড়–ই। চড়–ইগুলো বাঁশঝাড়ের মাথায় বসার সুযোগ পেলো না। শালিক পাখির অধিকার করা জায়গায় বসলোও না চড়–ইগুলো। ওরা বাঁশের মাথার একটু নিচ থেকে মধ্যখানে জায়গা নিলো। এ বাঁশ ও বাঁশ লাফিয়ে ছুটছে। ছুটছে মহানন্দে। ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। ডাকাডাকির শব্দ খুব ভালো লাগছে সম্রাটের। শালিক আর চড়–ইয়ের মিলিত শব্দের আনন্দে বিভোর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সম্রাট।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পা ধরে এলো ওর। পায়ের নিচে তাকিয়ে দেখলো গতকালের কাঁচা পাতাগুলোও শুকিয়ে মিশে গেছে ঝরা পাতার সাথে। ঝরাপাতার যে স্তর বেশ মোটা। ঠিক যেনো পাতার কার্পেট। ঝুপ করে কার্পেটে বসে পড়লো সম্রাট। বসে খুব আরাম বোধ হচ্ছে। ছায়া ছড়িয়ে আছে পাতার ওপর। গা ছুঁয়ে যাচ্ছে ঝিরি বাতাস। শালিক চড়–ইয়ের মিশ্রিত স্বর। এক অন্যরকম মনে হচ্ছে ওর। এত শালিক বাঁশগাছের শিরায় শিরায়। অথচ পাখি শিকার করার কথা মনেই হচ্ছে না ওর।
হাত দুটি পেছনে ঠেক দিয়ে আয়েশ করে বসলো ও। চোখ দুটি শালিক চড়–ইয়ের লাফালাফির তামাশার দিকে। এভাবে দেখতে দেখতে মনের অজান্তেই শুয়ে পড়লো পাতার ওপর। শুয়ে গান শুনছে পাখির। বাঁশঝাড়ের ওপর উপুড় হয়ে আছে নীল আকাশ। ভরদুপুরের এই আকাশে আনমনে উড়ছে কটি চিল। চিলের ওড়াউড়ি দেখে ভাবছে ও- আহা কী স্বাধীন পাখির ডানা। কী শান্ত তার ঘুরে বেড়ানো। কী আনন্দ তার উড়ে যাওয়া। এভাবে দেখতে দেখতে কখন দু চোখে নেমে এলো ঘুম। রাতের অপূর্ণ ঘুম জোড়া করে দিলো চোখের পাতা। ঝিরি বাতাসের আরাম বুলিয়ে দিচ্ছিলো ওর শরীর। ঝরাপাতার বিছানায় আরামের ঘুম ওকে বুনো মানুষের মতো করে তুললো। ঘুমের জগৎ থেকে ও পৌঁছে গেলো স্বপ্নের জগতে।
ও দেখছে- হাজার হাজার পিঁপড়া ঘিরে ধরেছে ওকে। ওর চারপাশ পিঁপড়া আর পিঁপড়া। গতকাল যে পিঁপড়াগুলো হাত ও দলনে মারা গেছে সেসব পিঁপড়া সবাই এখন জীবিত। সে পিঁপড়াগুলো প্রতিশোধ নিতে চায়। ওরা চায় ওর সারা গায়ে কামড় বসিয়ে লালে লাল করে দেবে। অন্য পিঁপড়ারা ওদের উৎসাহ জোগাচ্ছে খুব। বলছে নাও নাও প্রতিশোধ নাও। প্রতিশোধ নেবার এইতো সুযোগ। হঠাৎ দেখলো ও পিঁপড়াদের চারপাশে জমায়েত হলো হাজার হাজার কেঁচো। কিলবিল করছে কেঁচোরা। বলছে ওরা- আমাদের বাঁচাও তোমরা। তোমাদের কৃষকগোষ্ঠী প্রয়োজনের অনেক বেশি কীটনাশক ছিটায়। ফলে আমাদের বংশ নির্মূল হয়ে যাচ্ছে। আকস্মিক দেখছেও- কেঁচোর চারপাশে জমজমাট ঝিঁঝিঁ পোকার দল। ঝিঁঝিরাও বেশ প্রতিবাদী। বললো- তোমরা মানুষ-পরিবেশ নষ্ট করছো। আমাদের বসবাসের জায়গায় নানারকম ময়লা আবর্জনা ফেলছো। আমরা আগের মতো ডাকতে পারি না। আমাদের শরীর ভালো থাকছে না। থাকছে না তোমাদের কারণে। এরপরই দেখলো ও- জোনাকির দল। জোনাকিরা বললো- সমস্ত বন বনানী তরুলতা এবং গাছগাছালি কেটে কুটে শেষ করছো তোমরা। এখন আমাদের বসবাসের জায়গা নেই। আমরা কোথায় থাকবো। কিভাবে মনোরম আলো জ্বালবে রাতের শরীরে। তোমরা আমাদের জীবন শেষ করে দিচ্ছো। জোনাকিদের কথা শেষ হতে না হতে ও দেখলো- হাজার হাজার ফড়িং। ফড়িংগুলোর নেতা বললো- তোমাদের অত্যাচারে আমরা আর বাঁচতে পারছি না। রাসায়নিক ব্যবহার এত বেশি করছো তোমরা, কী করে বাঁচবো আমরা বলো!
ফড়িং এর চারপাশে হাজার হাজার প্রজাপতি। তাদেরও একই কথা- গাছগাছালি কেটে সাফ করে দিচ্ছো সব। আমাদের বসবাসের কোনো আয়োজন ঠিক থাকছে না। তোমরা যদি এভাবে পরিবেশ ধ্বংস কর এবং করতে থাকো তবে আামাদের মতো তোমরাও ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপরই দেখলো সম্রাট- হাজার হাজার পাখি। নানা রঙের নানা জাতের। পরিচিত। অপরিচিত কত রকম পাখি। পাখিরাও তীব্র প্রতিবাদ করলো। বললো- আমাদের অভয়ারণ্য নেই। বন-বনানী নেই আগের মতো। বৃক্ষ কেটে আমাদের তাড়িয়ে দিচ্ছো। তবে মনে রেখো- আমরা শেষ হয়ে গেলে শেষ হয়ে যাবে তোমরাও। কেউ বাঁচবে না। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব কিন্তু তোমাদের। তোমরা মানুষ। তোমাদের ক্ষমতা আছে ধ্বংস করার। আবার রক্ষা করার। তোমরা রক্ষা না করে যদি শুধু ধ্বংস করতে থাকো তবে তোমরাও ধ্বংস হয়ে যাবে। বলেই পাখিগুলো ঝা করে এক সাথে উড়াল দিলো। পাখির পাখার বাতাস যেনো ওর সারা গায়ে চোখে মুখে বুলিয়ে দিলো। বাতাসের বোলানিতে মুখে খানিকটা চুলকানির মতো অনুভূতি হলো। চোখে হলো আরও খানিকটা বেশ। দু’হাত টেনে দু চোখ কচলানোর চেষ্টা করতেই হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো ওর। চোখ খুলেই দ্রুত চারপাশ দেখলো! দেখলো চারপাশে অনেক পিঁপড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর সারা গায়েও পিঁপড়ার বিচরণ। বাঁশগাছের ছায়া সরে গেছে অনেকটুকু। পা থেকে বুক পর্যন্ত রোদের বিস্তার। রৌদ্র এবং ছায়ার সবখানেই পিঁপড়েরা খুশি মনে ঘুরছে। হয় তো তাদের বিচরণের নতুন ক্ষেত্র পেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আনন্দে। ধড়মড় করে উঠে বসলো। দ্রুত কানে হাত দিয়ে দেখলো- কানে পিঁপড়া আছে কি না। হ্যাঁ ঠিকই কানের চারপাশেও পিঁপড়া ঘুরছে। চুলের ভেতরও ছড়িয়ে আছে পিঁপড়ার দল। গেঞ্জির ভেতর পেটে পিঠে বুকে পিঁপড়ে আর পিঁপড়ে। দাঁড়িয়ে সব ঝেড়ে ঝুড়ে পিঁপড়ে তাড়ানোর চেষ্টা করলো। কোনো পিঁপড়ে যেনো না মরে তার জন্য খুব সাবধানে ঝাড়লো গা। ফলে অনেকক্ষণ সময় লেগে গেলো- পিঁপড়ে ঝাড়তে। ঝাড়া শেষ হলো কোমরে দু’হাত রেখে বাঁশঝাড়ের ছায়ায় দাঁড়ালো। চারপাশ খুব করে দেখে নিলো। দেখলো কোথাও পাখি, কেঁচো, ঝিঁঝিঁ, জোনাকি কিংবা ফড়িং আছে কি না। কিছু পিঁপড়ে ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লো না। দেখতে দেখতে বাঁশঝাড়ের একটু দূরে একটি মরা মান্দার গাছে চোখ পড়লো ওর। চোখ পড়তেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেলো। সেই গোখরোটি। সাপটি মান্দার গাছের খোড়ল থেকে পিঁপড়ের ডিম খাচ্ছে। গুলতির আঘাতে ঘাড়ের অংশটি এখনো ফুলে আছে। দেখেই ভোঁ দৌড় দিলো সম্রাট। ওর মনে ভয়ের হাঙর হাঁ করে উঠলো- যদি ছোবল দিতো! আর ভাবতে পারে না ও। এক দৌড়ে ঘরে পৌঁছে গেলো। এত ভিতু ও কখনো ছিলো না। এখন কেন এত ভয় পাচ্ছে নিজেই ভাবছে ও।

পাঁচ.

একটি নতুন পরিকল্পনা এলো ওর মাথায়। পরিবেশ রক্ষার কাজ করবে ও। কিন্তু কিভাবে! ভাবছে খুব। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মাথায় এলো একটি নতুন আইডিয়া। আইডিয়াটি হলো- যে সব প্রাণী স্বপ্নে ওর চারপাশে ছিলো তাদের প্রত্যেক প্রজাতির নামে নামে এক একটি এলাকা সংরক্ষণ করবে। যেখানে যে প্রাণী বেশি সেখানে সে প্রাণীর নামে অঞ্চল হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। আজ বিকেলেই নেমপ্লেট ঝুলিয়ে দেবে ও। কিন্তু নেমপ্লেট বানাতেও সময়ের ব্যাপার! নিজেকে নিজেই জবাব দিলো ফের। আপাতত মোটা আর্ট কার্ড, মোটা কলম দিয়ে লেখা হবে। যখন নেমপ্লেট আসবে এগুলো নামিয়ে নেমপ্লেট ঝোলানো হবে।
দুপুরে খেয়ে নিজের কক্ষে শুয়ে পড়লো সম্রাট। মাথায় এখন কিলবিল করছে পোকামাকড়ের অঞ্চল। কোন জায়গায় কোন পাখির লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি। এসব ভাবতে ভাবতে একেবারে আনমনা। ছাদের তলায় দৃষ্টি ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঝে ডানে বাঁয়ে করছে। আবার চিৎ হয়ে শুয়ে স্থির চেয়ে রইলো ছাদের তলায়। মনে চিন্তার ঝড়। কখনো পুকুর পাড়ে। কখনো কলাবাগানে। কখনো বাঁশঝাড়ে। আবার কখনো মেহেদি তলায়। মন এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে জায়গায় জায়গায়। খুঁজে ফিরছে পোকামাকড়ের বসতি। হঠাৎ দরজা ঠেলে রুমে ঢুকলেন সম্রাটের মা। ঢুকে দেখলেন- ভীষণ আনমনা সম্রাট ছাদের তলার দিকে চেয়ে আছে। সম্রাটের মাথার পাশে বসলেন তিনি। ওকে নিয়ে খুব চিন্তিত এ কথা বললেন সম্রাটকে। খুব আদর মাখা হাত সম্রাটের মাথায় রাখলেন তিনি। বললেন- কী হলো তোমার বাবা? আজ দুদিন তোমাকে খুব আনমনা দেখছি। কেমন ঝিমিয়ে আছিস। আজ গুলতি না নিয়েই বেরিয়ে গেলি! এমন তো হয়নি কখনো! বলতো আমাকে কী সমস্যা তোর?
মায়ের হাতের পরশ পেয়ে বেশ আরাম লাগছে সম্রাটের। মাথায় হাত বোলানোর আরামে চোখ বুজে আসতে চাইছে। নরম স্বরে মাকে বললো- আমার কিছু হয়নি মা। তুমি শুধু শুধু টেনশন করছো। আমি দিব্যি ভালো আছি!
ওর কথা বিশ্বাস হলো না মায়ের। বললেন- দেখ আমি তোর মা। আমার কাছে না বলে কার কাছে বলবি! আমাকেই বল। সব খুলে বল।
খানিকটা আমতা আমতা করছে সম্রাট।অকারণ মাথা চুলকাচ্ছে। বললো- না মা তেমন কিছু না। কী বলবো তোমাকে তবে…।
থামলে কেনো? বল- তবে কী?
আবার মাথা চুলকালো সম্রাট। দম নিয়ে বললো-
আমার একটি আইডিয়া এলো মাথায়।
বল বল কী আইডিয়াটা- আগ্রহ নিয়ে বললেন মা।
শোয়া থেকে উঠে বসলো সম্রাট। বললো- আইডিয়াটি পোকামাকড় নিয়ে। পাখি নিয়ে। এবং পরিবেশ নিয়ে।
মা অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন ছেলের দিকে! পোকামাকড়, পাখি, পরিবেশ এসব আবার কী বুঝিয়ে বল।
মা তুমি আগে বলো অমত করবে না।
মা বললেন- আগে বল না শুনি! তারপরই তো মত অমত।
বাম হাতে আরও একবার মাথা চুলকিয়ে নিচের দিকে মুখ নিয়ে বললো- আমাদের একেকটি জায়গা একেক পোকামাকড়ের নামে সংরক্ষণ করবো।
মাথামুণ্ডু কিছুই না বুঝে চেয়ে থাকলেন মা।
সম্রাট বললো- আগে আমাকে কাজটি করতে দাও। তারপর পরিষ্কার হবে সব।
ছেলের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেন মা। বলার ভঙ্গি থেকে হো হো করে হেসে উঠলেন মা। বললেন- কী মজার কথা। আমার পাখি শিকারি গুলতি বাবার পোকামাকড় এত প্রিয় হয়ে উঠলো। আমি তো অবাক হচ্ছি। সেই সাথে আনন্দ পাচ্ছি খুব। এতসব চিন্তা কী করে এলো তোর মাথায়! বাহ্ বাহ্ আমার সোনার ছেলে। বলেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে।
সম্রাট অবাক আনন্দে ওর চোখে অশ্রু জমে উঠলো। ও ভেবেছিলো ওর মা সাথে সাথেই না শব্দটি জোরের সাথে বলে উঠবে। পরিবর্তে মা এখন উৎসাহ দিচ্ছে ওকে। কী আনন্দ! কী আনন্দ।
দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে গেলো সম্রাট। উঠেই যথারীতি কাজ শুরু। পরিকল্পনা মতো সাজিয়ে নিলো সব। জন্মদিন উপলক্ষে কেনা আর্ট কার্ডগুলো এখন ওর টেবিলে। আর্ট লাইন কলম নিলো হাতে। তারপর একে একে লিখলো- জোনাকি বাগান। পিঁপড়ে তলা। ঝিঁঝি বাড়ি। কেঁচো কুঠির। প্রজাপতি বাসর। ফড়িং আলয়। পাখি অরণ্য। জলপিপি নীড়। সর্প নীলয়। লিখে বিছানায় ছড়িয়ে রাখলো একে একে।
ফুরফুরে হয়ে উঠলো সম্রাটের মন। লিখিত নামগুলো একে একে পড়লো আবার। পড়ে নিজেই আনন্দ পাচ্ছে খুব। আনন্দ শেয়ার করার জন্য প্রায় চেঁচিয়ে ডাকলো- মা… মা।
দ্রুত ছুটে এলেন মা। বললেন- কী হলোরে বাপ! এতো চেঁচিয়ে ডাকছিস কেন। কোনো সমস্যা?
ততক্ষণে মায়ের চোখ পড়লো বিছানায় ছড়ানো নামগুলোর ওপর। পড়লেন প্রতিটি নাম। আনন্দে জড়িয়ে নিলেন ছেলেকে। কপালে চুমু এঁকে বললেন- বাহ আমার সোনা! এত চমৎকার নামগুলো কিভাবে ভাবলি! একদম কাব্যিক নাম। খুব সুন্দর বাবা। আমি খুব খুশি। আমার বাবাটি এত গভীর এবং সুন্দর মনের। বলে আবার মাথাটা বুকের সাথে জড়িয়ে রাখলেন। মায়ের উষ্ণ আদর এবং প্রশংসায় খুশিতে ভরে উঠলো সম্রাটের মন। আনন্দে অশ্রু এসে গেলো চোখে। বললো- মা যাই। এগুলো লাগিয়ে দিয়ে আসি।
পরম আদরে মাথায় হাত বুলিয়ে মা বললেন- যাও বাবা। যাও।
প্রথমেই গেলো বাঁশঝাড়ে। এখানে লাগালো পিঁপড়ে তলা। কাঁঠাল গাছের কাছে গেলো তারপর এখানে টাঙিয়ে দিলো- জোনাকিবাগান। হিজল বনে লাগিয়ে দিলো- পাখির অরণ্য। মেহেদি ও পেয়ারা গাছের এলাকা হলো- ঝিঁঝিঁবাড়ি। কলাবাগানের নাম কেঁচো কুটির। পাট ক্ষেতে টাঙিয়ে দিলো- ফড়িং আলয়। হাসনাহেনা ঝোপ ও বেলিফুল গাছের সাথে লাগালো- প্রজাপতির বাসর। পুকুর পাড়ে করঞ্চা গাছে টাঙালো- জলপিপি নীড়। বাঁশঝাড়ের পাশের বনে ঝুলিয়ে দিলো- সর্প নীলয়।
লাগানো শেষ হলে আবার প্রতিটি সাইনবোর্ড দেখে এলো। তখন প্রায় সন্ধ্যা পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে দেখলো চারপাশ। আহা কী নিঝুম প্রকৃতি। পুকুর পাড়ের ওপারে বিশাল ধানের প্রান্তর। প্রান্তর ভরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে ধীরে। দূরে গাছগুলো কখনো পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ভাবছে ও অন্ধকার নেমে এলো। দিনের পাখিরা ঘুমিয়ে যায়। জেগে ওঠে রাতের পাখি। জেগে ওঠে জোনাকির দল। আর জাগে আকাশের কোটি কোটি তারকার চোখ।
এসব ভাবতে ভাবতে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। দেখলো- নিমগাছ থেকে কটি বাদুর উড়ে যাচ্ছে। একটি হুতুম পাখিও উড়ে গেলো ডুমুর গাছ থেকে। এতসব পাখপাখালি প্রতিদিনই দেখতো ও। কিন্তু আজ এদের সবাইকে খুব আপন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এসব পাখি প্রাণী ওর হৃদয়ের সাথে জড়ানো। হঠাৎ ওর মনে পড়লো- পাঠ্য বিষয় সমাজে প্রাকৃতিক পরিবেশ পড়েছে ও। সেখানেই তো বলা আছে- পশু-পাখি-প্রাণী এসব নিয়েই মানুষের প্রকৃতি। মানুষের জীবন। ঘরে ঢুকেই এলিয়ে দিলো গা। প্রকৃতির সাথে আজ মিশে গেলো ও। মনে হচ্ছে ও নিজেই বিশাল প্রকৃতিরই একজন। বুকের ভেতর হেসে উঠলো অন্যরকম আনন্দ। হঅকারণ মাথা চুলকাচ্ছে। বললো- না মা তেমন কিছু না। কী বলবো তোমাকে তবে…।
থামলে কেনো? বল- তবে কী?
আবার মাথা চুলকালো সম্রাট। দম নিয়ে বললো-
আমার একটি আইডিয়া এলো মাথায়।
বল বল কী আইডিয়াটা- আগ্রহ নিয়ে বললেন মা।
শোয়া থেকে উঠে বসলো সম্রাট। বললো- আইডিয়াটি পোকামাকড় নিয়ে। পাখি নিয়ে। এবং পরিবেশ নিয়ে।
মা অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন ছেলের দিকে! পোকামাকড়, পাখি, পরিবেশ এসব আবার কী বুঝিয়ে বল।
মা তুমি আগে বলো অমত করবে না।
মা বললেন- আগে বল না শুনি! তারপরই তো মত অমত।
বাম হাতে আরও একবার মাথা চুলকিয়ে নিচের দিকে মুখ নিয়ে বললো- আমাদের একেকটি জায়গা একেক পোকামাকড়ের নামে সংরক্ষণ করবো।
মাথামুণ্ডু কিছুই না বুঝে চেয়ে থাকলেন মা।
সম্রাট বললো- আগে আমাকে কাজটি করতে দাও। তারপর পরিষ্কার হবে সব।
ছেলের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেন মা। বলার ভঙ্গি থেকে হো হো করে হেসে উঠলেন মা। বললেন- কী মজার কথা। আমার পাখি শিকারি গুলতি বাবার পোকামাকড় এত প্রিয় হয়ে উঠলো। আমি তো অবাক হচ্ছি। সেই সাথে আনন্দ পাচ্ছি খুব। এতসব চিন্তা কী করে এলো তোর মাথায়! বাহ্ বাহ্ আমার সোনার ছেলে। বলেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে।
সম্রাট অবাক আনন্দে ওর চোখে অশ্রু জমে উঠলো। ও ভেবেছিলো ওর মা সাথে সাথেই না শব্দটি জোরের সাথে বলে উঠবে। পরিবর্তে মা এখন উৎসাহ দিচ্ছে ওকে। কী আনন্দ! কী আনন্দ।
দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে গেলো সম্রাট। উঠেই যথারীতি কাজ শুরু। পরিকল্পনা মতো সাজিয়ে নিলো সব। জন্মদিন উপলক্ষে কেনা আর্ট কার্ডগুলো এখন ওর টেবিলে। আর্ট লাইন কলম নিলো হাতে। তারপর একে একে লিখলো- জোনাকি বাগান। পিঁপড়ে তলা। ঝিঁঝি বাড়ি। কেঁচো কুঠির। প্রজাপতি বাসর। ফড়িং আলয়। পাখি অরণ্য। জলপিপি নীড়। সর্প নীলয়। লিখে বিছানায় ছড়িয়ে রাখলো একে একে।
ফুরফুরে হয়ে উঠলো সম্রাটের মন। লিখিত নামগুলো একে একে পড়লো আবার। পড়ে নিজেই আনন্দ পাচ্ছে খুব। আনন্দ শেয়ার করার জন্য প্রায় চেঁচিয়ে ডাকলো- মা… মা।
দ্রুত ছুটে এলেন মা। বললেন- কী হলোরে বাপ! এতো চেঁচিয়ে ডাকছিস কেন। কোনো সমস্যা?
ততক্ষণে মায়ের চোখ পড়লো বিছানায় ছড়ানো নামগুলোর ওপর। পড়লেন প্রতিটি নাম। আনন্দে জড়িয়ে নিলেন ছেলেকে। কপালে চুমু এঁকে বললেন- বাহ আমার সোনা! এত চমৎকার নামগুলো কিভাবে ভাবলি! একদম কাব্যিক নাম। খুব সুন্দর বাবা। আমি খুব খুশি। আমার বাবাটি এত গভীর এবং সুন্দর মনের। বলে আবার মাথাটা বুকের সাথে জড়িয়ে রাখলেন। মায়ের উষ্ণ আদর এবং প্রশংসায় খুশিতে ভরে উঠলো সম্রাটের মন। আনন্দে অশ্রু এসে গেলো চোখে। বললো- মা যাই। এগুলো লাগিয়ে দিয়ে আসি।
পরম আদরে মাথায় হাত বুলিয়ে মা বললেন- যাও বাবা। যাও।
প্রথমেই গেলো বাঁশঝাড়ে। এখানে লাগালো পিঁপড়ে তলা। কাঁঠাল গাছের কাছে গেলো তারপর এখানে টাঙিয়ে দিলো- জোনাকিবাগান। হিজল বনে লাগিয়ে দিলো- পাখির অরণ্য। মেহেদি ও পেয়ারা গাছের এলাকা হলো- ঝিঁঝিঁবাড়ি। কলাবাগানের নাম কেঁচো কুটির। পাট ক্ষেতে টাঙিয়ে দিলো- ফড়িং আলয়। হাসনাহেনা ঝোপ ও বেলিফুল গাছের সাথে লাগালো- প্রজাপতির বাসর। পুকুর পাড়ে করঞ্চা গাছে টাঙালো- জলপিপি নীড়। বাঁশঝাড়ের পাশের বনে ঝুলিয়ে দিলো- সর্প নীলয়।
লাগানো শেষ হলে আবার প্রতিটি সাইনবোর্ড দেখে এলো। তখন প্রায় সন্ধ্যা পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে দেখলো চারপাশ। আহা কী নিঝুম প্রকৃতি। পুকুর পাড়ের ওপারে বিশাল ধানের প্রান্তর। প্রান্তর ভরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে ধীরে। দূরে গাছগুলো কখনো পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ভাবছে ও অন্ধকার নেমে এলো। দিনের পাখিরা ঘুমিয়ে যায়। জেগে ওঠে রাতের পাখি। জেগে ওঠে জোনাকির দল। আর জাগে আকাশের কোটি কোটি তারকার চোখ।
এসব ভাবতে ভাবতে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। দেখলো- নিমগাছ থেকে কটি বাদুর উড়ে যাচ্ছে। একটি হুতুম পাখিও উড়ে গেলো ডুমুর গাছ থেকে। এতসব পাখপাখালি প্রতিদিনই দেখতো ও। কিন্তু আজ এদের সবাইকে খুব আপন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এসব পাখি প্রাণী ওর হৃদয়ের সাথে জড়ানো। হঠাৎ ওর মনে পড়লো- পাঠ্য বিষয় সমাজে প্রাকৃতিক পরিবেশ পড়েছে ও। সেখানেই তো বলা আছে- পশু-পাখি-প্রাণী এসব নিয়েই মানুষের প্রকৃতি। মানুষের জীবন। ঘরে ঢুকেই এলিয়ে দিলো গা। প্রকৃতির সাথে আজ মিশে গেলো ও। মনে হচ্ছে ও নিজেই বিশাল প্রকৃতিরই একজন। বুকের ভেতর হেসে উঠলো অন্যরকম আনন্দ।

SHARE

Leave a Reply