Home গল্প সুখী মানুষের জামা -জ্যোতির্ময় মল্লিক

সুখী মানুষের জামা -জ্যোতির্ময় মল্লিক

অনেক অনেক দিন আগের কথা। উত্তর আফ্রিকায় ছিল এক রাজা। রাজার ছিল অগাধ ধন-সম্পদ, সৈন্য-সামন্ত, হাতি-ঘোড়া, কোনোটির কমতি ছিল না। স্ত্রী ছেলে-মেয়ে সবই ছিল। কিন্তু সব থাকলে কী হবে। তার মনে কোনো সুখ ছিল না।
সব সময় রাজা চিন্তা করত, আমার সবই আছে, ধন সম্পত্তি, ছেলে-মেয়ে, লোক লস্কর। কিন্তু এসব কিছু আমাকে সুখী করতে পারছে না। কী করলে আমি সুখী হবো! কে আমাকে সুখী হওয়ার উপায় বাতলে দেবে আমি জানি না, জানি না!
একদিন সভাসদবর্গের সামনে সিংহাসনে বসে রাজা চিৎকার করে বললেন আমি কেন সুখী হতে পারছি না! কী করলে আমি সুখী হতে পারব, তোমাদের মধ্যে থেকে কেউ কি বলতে পারো না? এই বলে রাজা বিলাপ করতে থাকেন।
রাজার বিলাপ শুনে একজন সভাসদ বলল, মহাত্মন, সুখী হওয়ার জন্য আপনাকে একটি উপায় বলতে পারি! তারপর সেই সভাসদ বলল, আপনি রাতে মুক্ত আকাশের দিকে নিষ্পলক তাকান। দেখবেন কী সুন্দর ঝলমলে এক চাঁদ, নক্ষত্র-রাজি! এসব দেখতে দেখতে আপনার মন ভরে যাবে। এভাবেই আপনি সুখী হতে পারবেন।
‘না-না-না-না’, রাজা রেগে গিয়ে উত্তর করলেন। যখনই আমি আকাশের তারা, চাঁদের দিকে তাকাই তখনই আমার রাগ হয়ে যায়। কারণ আমি জানি যে আকাশের চাঁদ-তারা কোনোটাই কখনোই পাবো না। অন্য পথ বাতলাও।
তখন অন্য একজন সভাসদ বললেন মান্যবর, সঙ্গীত শুনে দেখতে পারেন। সঙ্গীত মানুষকে শান্তি দিতে পারে। সুখী করতে পারে। আমরা ভোরবেলা থেকে রাত অবধি আপনার সামনে সুশ্রাব্য সঙ্গীত পরিবেশন করব। আমার বিশ্বাস সঙ্গীত শ্রবণ করলে আপনি সুখী হতে পারবেন।
এই কথা শুনে রাজা রেগে আগুন হয়ে বললেন কী বোকার মতো যুক্তি তোমাদের! সঙ্গীত নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু তাই বলে ভোরবেলা থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সঙ্গীত শুনতে হবে! তাও আবার দিনের পর দিন! অসম্ভব! অসম্ভব! এই সব চিন্তা তোমাদের মাথায় এলো কিভাবে?
সঙ্গীত শোনার প্রস্তাব দিয়েছিল যে সভাসদ রাজার সামনে থেকে সরে পড়ল। রাজা রেগে গজগজ করতে করতে তার খাসকামরায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য প্রবেশ করলেন।
পরে মুখ্যমন্ত্রী, রাজার খাসকামরায় ঢুকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন মহারাজ, আমার একটি কথা আছে, যদি অভয় দেন তো বলতে পারি।
রাজা বললেন আপনি নির্ভয়ে বলুন সে কথা।
মুখ্যমন্ত্রী একটু কেশে বললেন আমি একটি উপায় আপনাকে বলতে পারি যা আপনাকে অত্যন্ত সুখী করতে পারে।
রাজা সাগ্রহে বললেন বলুন, মন্ত্রীবর কী উপায় সেটি? মুখ্যমন্ত্রী উত্তর দিলেন, এটি অত্যন্ত সহজ উপায় মহারাজ! প্রথমে আপনাকে একজন সুখী মানুষকে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর সেই সুখী মানুষটির কাছ থেকে তার জামাটা নিয়ে আপনাকে পরতে হবে। এতে ওই সুখী মানুষটির সমস্ত সুখশান্তি আপনার দেহে প্রবেশ করবে। আপনি তখন সেই সুখী মানুষটির মতোই সুখী হবেন।
রাজা সব শুনে বললেন তোমার যুক্তিটি আমার পছন্দ হয়েছে। আমি যেভাবে পারি প্রথমে একজন সুখী মানুষ খুঁজে বের করব।
তারপর একজন সুখী মানুষের খোঁজে রাজা তার সৈন্য-সামন্তদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন।
সৈন্য-সামন্তরা যাকে পায় তাকেই জিজ্ঞেস করে সে সুখী কি না? সবার উত্তর একই, না, তারা সুখী নয়।
এমনিভাবে দিন যায়, রাত যায়, মাস যায়, বছরও পার হতে চলল। খুঁজে খুঁজে সবাই হয়রান! কিন্তু কোথাও একজন সুখী মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় না। সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল প্রায়। অবশেষে দেশের প্রান্তসীমায় অবস্থিত বনভূমির মধ্যে পাওয়া গেল এক কুঁড়েঘর। সৈন্যরা সেখানে দেখতে পেল শক্ত সামর্থ্য ছোটখাটো একজনকে। সে আপন মনে কাজ করে চলেছে। মুখখানি তার অনাবিল হাসিতে উদ্ভাসিত।
সৈন্যরা তাকে জিজ্ঞেস করল তুমি কি সুখী?
সাথে সাথে সেই লোকটি জবাব দিল অবশ্যই। পৃথিবীর মধ্যে আমি সবচেয়ে সুখী মানুষ।
ব্যস। সৈন্যদের আর পায় কে। তারা সেই সুখী মানুষটিকে মহাসমাদরে নিয়ে এলো রাজবাড়িতে। এরপর রাজাকে খবর পাঠানো হলো, মহারাজ, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুখী মানুষটিকে তারা খুঁজে এনেছে।
খবর পেয়ে রাজা মহাখুশি। খুশিতে সব কিছু ভুলে একপাক নেচে আপনমনে বলে উঠলÑ শেষমেশ তাহলে আমি সুখী মানুষ হতে যাচ্ছি। এক মুহূর্ত দেরি নয়, এক্ষুনি আমি তার জামা পরে ফেলব।
রাজা তার বিশ্রামাগার থেকে হুকুম দিলেন, মহাভাগ্যবান সেই সুখী মানুষকে এখানেই নিয়ে এসো। এখানে আমি তার সাথে কথা বলব।
প্রহরীরা বিশ্রামাগারের দরোজা খুলে দিল। মন্ত্রী সভাসদ পরিবেষ্টিত অবস্থায় রাজা বসে আছেন। এ সময় অনাবিল হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে ছোটখাটো সেই কাক্সিক্ষত মানুষটি খাসকক্ষে প্রবেশ করল।
রাজা সাগ্রহে সেই মানুষটিকে বরণ করে বললেন আমার পাশে এসো, বন্ধু! পথে তোমার কোনো কষ্ট হয়নি তো!
পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী মানুষটি হাসতে হাসতে রাজার কাছে এগিয়ে গেল। রাজা এবার ভালো করে তার দিকে তাকালেন। কিন্তু তিনি কী দেখলেন? এই সেই সুখী মানুষ! যে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সুখী মানুষ! লজ্জা নিবারণের জন্য কোমরের কাছে এক চিলতে কাপড় ছাড়া যার সারা গা খালি।
রাজা ভাবলেন, জামাটি হয়তো কোথাও লুকানো আছে। তাই তিনি বললেনÑ যত ধনরত্ন চাও, তোমাকে দিচ্ছি। তার বিনিময়ে তোমার জামাটি আমাকে দাও। দেরি করো না বাপু!
তখন সেই সুখী মানুষটি বলল রাজামশাই আমার কোনো জামা নেই! আর আমার বলতেও কিছুই নেই!
(আফ্রিকার রূপকথা)

SHARE

Leave a Reply