Home ফিচার ঈদের একাল-সেকাল -রবিউল কমল

ঈদের একাল-সেকাল -রবিউল কমল

ঈদ মানে আনন্দ। এই আনন্দ সব সময়ের। এখন তোমরা যেমন আনন্দ কর, আমার কিশোরবেলার আনন্দ আরো বেশি ছিল। ২০০২ সালের কথাই বলি। তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ঘুমাতে পারতাম না। নানান পরিকল্পনা মাথায় ঘুরপাক খেত। মাগরিবের নামাজ শেষে সব বন্ধু এক হতাম। সবাই মিলে ঠিক করতাম আমরা কী করবো। তখন তো মোবাইল ছিল না, তাই নামাজের সময় বেছে নিতাম। কারণ সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। আমাদের ছোট্ট একটা সংগঠন ছিল। কয়েকজন বন্ধু মিলেই এটা করেছিলাম। আমাদের সংগঠন ঈদের আগে কিছু কাজ করত। তাতে ঈদের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ হয়ে যেত। তোমরাও চাইলে এই আনন্দ ভাগ করে নিতে পার। সেই আইডিয়া আজ তোমাদের দেবো। তবে এই লেখার শেষের দিকে।
আমার লেখার বিষয় ছিল ঈদের সেকাল-একাল। আসলে ঈদ সবসময় ঈদ, একাল-সেকাল বলে ঈদকে ভাগ করে দেওয়ার কিছু নেই। কিন্তু, এ কথা মানতে হবে সময়ের সঙ্গে উদযাপনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমরা এখন অনেক আধুনিক। আধুনিকতার ছোঁয়া ঈদ উদযাপনে লেগেছে। তাই বলে ঈদের আনন্দ তো আর বদলে যেতে পারে না। ঈদ আগেও যেমন আনন্দের ছিল, এখন তেমনই আনন্দের। সেই আনন্দ আমার, তোমার, সকলের জন্য।
তোমরা এখন ঈদের আগে অনেক শপিংমলে যাও, অনেকেই ব্র্যান্ডের দোকান থেকে পোশাক কিনেও থাক। আগে কিন্তু এমন ছিল না। তখন থান কাপড় কিনে বানাতে হতো ঈদের নতুন পোশাক। রোজার প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত দর্জির দোকানের ভিড়। আর কাপড় কিনতে হতো সাপ্তাহিক হাটবার থেকে। এটা কিন্তু এখন যারা অনেক বড়, তাদের শৈশবের কথা বলছি।
তোমাদের অনেকেই হয়তো কসকো সাবানের নাম শুনেছ। আগে ঈদের দিন সকালবেলা ছোট বড় সবাই দল বেঁধে পুকুরে বা নদীতে কসকো সাবান মেখে গোসল করত। তারপর নতুন পোশাক পরে পায়েস-সেমাই খেয়ে সারিবদ্ধভাবে দূরের কোনো ঈদগাহ মাঠে যেত ঈদের নামাজ পড়তে। তখন খুব কম ঈদগাহ ছিল। কয়েকটি গ্রামের জন্য একটি ঈদগাহ মাঠ। নামাজ শেষে পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করে চলত কুশল বিনিময়। ঈদগাহ থেকে ফেরার পর প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া, মিষ্টিমুখ করা। ছোটরা নতুন জামা কাপড় পরে দল ধরে এ বাড়ি সে বাড়ি বেড়াতে বের হতো। আমি তো ২৫-৩০টি বাড়ি থেকে সেমাই খেতে না পারলে আমার ঈদের আনন্দ পূর্ণ হতো না। তখন ছিল যৌথ পরিবার। সবাই সেলামি দিত। অনেকগুলো টাকা জমা হতো। তখন তো দুই টাকার নোটও আমাদের কাছে আকাশের চাঁদ মনে হতো।
তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি, ইন্টারনেটের প্রভাবে এখন তো ঈদ উদযাপনের পদ্ধতি পাল্টে গেছে। এখন ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে ঈদ কার্ড ব্যবহার করা হয় না। অথচ এটা করে আমরা অনেক মজা পেতাম। এখন তো ঈদের শুভেচ্ছা জানানো হয় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনাস্টাগ্রাম, ভাইবার, টুইটার, ইমেইল বা মোবাইলের এসএমএসে। কিন্তু, পড়া যায়, ছোঁয়া যায় না, বা নাক দিয়ে শুঁকে নতুন কার্ডের মতো গন্ধ নেওয়া যায় না।
আমরা দেখেছি আপু ও তার বান্ধবীরা তখন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে মেহেদি পাতা সংগ্রহ করত। তারপর তাদের শিল-পাটা নিয়ে মেহেদি বাটতে বসত। আর তাকে ঘিরে চারদিকে গোল হয়ে বসে থাকত বাকিরা। চলত গল্পগুজব, হাসি-ঠাট্টা-গান। মেহেদি বাটা শেষ হলে একটি ছোট কাঠি দিয়ে হাতে মেহেদির নকশা আঁকা হতো বা চুন দিয়ে নকশা এঁকে হাতের তালুতে মেহেদি ছাপ মেরে রাখা হতো। পরে দেখা হতো কার হাত কতো বেশি লাল বা রঙিন হয়েছে। নিজের চাচাত-ফুফাত, প্রতিবেশী ভাই-বোনদের সঙ্গে মেহেদি লাগানোর সেই সময়টা অনেক মধুর ছিল।
আর এখন বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের রেডিমেড মেহেদি পাওয়া যায়। এমনকি রেডিমেড নকশাও কিনতে পাওয়া যায়। তবে, বাটা মেহেদি ও সেই রঙ আর টিউবের মেহেদি ও রঙের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
আগে পরিবারে ছোটরা ঈদের নতুন পোশাক লুকিয়ে রাখত। এখন হয়তো এগুলো কেউ করে না। এখন তো তোমরা নতুন জামার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে শেয়ার করো। অথচ আগে ঈদের দিন পরার পরই সবাই সেটা দেখতে পারত। তখন ঈদের জন্য বিভিন্ন রঙের কাগজের টুপি পাওয়া যেত। বড় ভাইয়েরা সেগুলো মাথায় দিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যেতেন। সেটা একবারই ব্যবহার করা যেত। দাম ছিল এক আনা, দুই আনা। অতীতের ঈদ ছিল পারিবারিক আর জমকালো। যেখানে বাইরের জাঁকজমক থেকে মুখ্য ছিল আত্মিক বন্ধন।
সময়ের সঙ্গে ঈদের সেলামিতে বৈচিত্র্য এসেছে। আগে বড়দের সঙ্গে ছোটদের ভালোবাসার পবিত্র এই লেনদেন সম্পর্ককে করে তুলতো আরও মধুর। ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা সবাই কেউই এই ঈদ সেলামি থেকে বাদ যেত না। টাকার অংকে যাই হোক না কেন, সেলামি দিতে হবে এবং নিতে হবে। এটা যেন ঈদ আনন্দের একটি রীতি।
ঈদের আগেই আমরা অনেক ম্যাগাজিনের ঈদসংখ্যা সংগ্রহ করতাম। কিশোরকণ্ঠ ঢাউস সাইজের ঈদসংখ্যা করতো। ঈদের আগে থেকেই তা পড়া শুরু করতাম। কত চমৎকার লেখা থাকতো। শেষ না করে উঠতেই মন চাইতো না। তখনকার কিশোর উপন্যাসগুলো এখনও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এখনও মাঝে মাঝে আমি নিজেই ওসব চরিত্র হয়ে যাই। ইশশ, সেই দিনগুলো যদি আবার ফিরে পেতাম।
এখন কিছু পরামর্শমূলক কথা বলব। তোমরা যারা কিশোর তোমাদের অনেক দায়িত্ব। তোমরা চাইলেই অনেক কিছু বদলে দিতে পার, অনেক কিছু করতে পার। মহান আল্লাহ সেই ক্ষমতা, বুদ্ধি ও বিবেক তোমাদের দিয়েছেন। তোমরা কিন্তু চাইলেই ঈদের খুশিটাকে সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পার। কয়েকজন বন্ধু মিলে পরিকল্পনা করেই দেখ পারবে। তোমাদের এলাকায় কতগুলো গরিব পরিবার আছে খুঁজে বের কর। তারপর তার একটা তালিকা বানাতে হবে। তবে, তারা যেন বুঝতে না পারে তোমাদের পরিকল্পনার কথা।
তোমরা বাবা-মায়ের কাছে, বড় ভাইয়ের কাছে বা বড়দের জানাও ওই পরিবারগুলোকে ঈদের সময় সাহায্য করতে চাও। খুব বেশি কিছু করতে হবে না। ওই পরিবারগুলোর হাতে মাত্র ৫০০ টাকা তুলে দাও। সম্ভব হলে আরও বেশি দিতে পার। অথবা তাদের পরিবারে ছোট ছেলেমেয়ে থাকলে তাদের পোশাক কিনে দাও। তোমাদের এমন প্রস্তাবে দেখবে বড়রা খুব খুশি হবে। কারণ, ভালো কাজে সবাই এগিয়ে আসে, ভালো কাজের সঙ্গে সবাই থাকতে চায়।
তোমাদের পরিকল্পনা মতো ঈদের ঠিক তিন দিন আগে তাদের হাতে এগুলো পৌঁছে দেবে। তোমরা নিজেরা গিয়ে পৌঁছে দেবে। বিশ^াস কর, এ সময় তারা এতোটাই খুশি হবে যে তোমাদের চোখে পানি চলে আসবে। আর ওই চোখের পানিতেই মিশে থাকে ঈদের প্রকৃত আনন্দ।
তোমাদের দেখে অনেকেই হিংসা করতে পারে। অন্য বন্ধুরাও তোমাদের পরিকল্পনা নকল করতে পারে। এটা কিন্তু খুব ভালো কথা। এভাবে বেশি বেশি ভালো কাজের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত। তাহলেই ছোট ছোট ভালো কাজগুলো বড় হয়ে একদিন বদলে দেবে আমাদের সমাজ। আর সেই বদলে যাওয়ার শুরুটা হোক তোমাদের হাত দিয়েই।
ভালো থেক বন্ধুরা। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।

SHARE

Leave a Reply