Home নিয়মিত বাংলাদেশের প্রাচীন ঈদগাহ- নাসির হেলাল

বাংলাদেশের প্রাচীন ঈদগাহ- নাসির হেলাল

বর্তমান বাংলাদেশে টিকে থাকা বা ধ্বংসপ্রাপ্ত ঈদগাহ্-এর মধ্যে কোনটি যে সর্বপ্রাচীন তা সঠিক করে বলা মুশকিল। উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যের বেশির ভাগই নির্মিত হতে দেখা যায় সুলতানি আমলে ও মোগল আমলে। চতুর্দশ শতকের একটি ঈদগাহ্র ধ্বংসাবশেষ প্রত্নতাত্তিক খননের মাধ্যমে যশোরের (বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার অন্তর্গত) বারবাজারে আবিষ্কৃত হয়েছে। যেটি নামাজগাহ হিসেবে পরিচিত। অবশ্য লালমনিরহাট জেলার রামদাস মৌজার মসজেদ-এর আড় গ্রামে ৬৯ হিজরির একটি মসজিদ ও তার সম্মুখভাগে শান বাঁধানো চত্বর স্থানীয় খননকাজের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে। চত্বরটিকে গবেষকগণ ঈদগাহ মনে করছেন। তাই যদি হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে এটিই বাংলাদেশের নির্মিত প্রথম ঈদগাহ। অপর দিকে ঢাকার ধানমন্ডিতে সমতল ভূমি থেকে চার ফুট উঁচুতে নির্মিত বিশালাকার একটি ঈদগাহ ময়দান আজও স্বমহিমায় টিকে আছে। যেটি শাহ সুজা বাংলার সুবাদার থাকাকালীন সময়ে তাঁর প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করেন। মুঘল আমলে নির্মিত সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার বসন্তপুরের ঈদগাহ ও পাটকেলঘাটা থানার নগরঘাটা ঈদগাহ দু’টি এখনও টিকে আছে। প্রাচীন ঈদগাহর মধ্যে আরো রয়েছে সিলেটের শাহী ঈদগাহ, সতের শতকের কুমিল্লা চান্দিনার ঈদগাহ প্রভৃতি। অন্য দিকে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহটিকে অনেকে ৪০০ বছরের প্রাচীন একটি ঈদগাহ বলে মনে করে থাকেন। তবে এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য মতে ঈদগাহটি ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয় বলে জানা গেছে। অন্য মতে ‘মসনদ-ই-আলা ঈসা খার উত্তরসূরি দেওয়ান হয়বত খান কর্তৃক ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠিত।’ দেশে এককভাবে ঈদগাহ-স্থাপত্য দেখা না গেলেও ঈদগাহ-মসজিদ কোথাও কোথাও দেখা যায়। এমন একটি ঈদগাহ মসজিদ দিনাজপুরের হালিগানা ঈদগাহ-মসজিদ। এটি আয়তাকার তিন-গম্বুজ-বিশিষ্ট মুগল স্থাপত্য। ৬.৯১ মিটার উচ্চতা-বিশিষ্ট মসজিদের ভেতরের আয়তন ১১.২০ী৪.১১ বর্গমিটার। পূর্ব দিকের সম্মুখ-ভাগে খিলান-যুক্ত তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব বিদ্যমান। এ ছাড়া কত ঈদগাহ যে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে তার কি ইয়ত্তা আছে?

ঊনসত্তর হিজরি সনের ঈদগাহ, লালমনিরহাট
বৃহত্তর রংপুর জেলার লালমনিরহাট (বর্তমানে জেলা) মহকুমার মসজেদের আড় গ্রামে ৬৯ হিজরি সনের একটি মসজিদের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে। এ মসজিদ সংলগ্ন পুবপাশে পাকা একটি ইট বিছানো মাঠ এবং মাঠের পশ্চিম দিকে তিন সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি প্রায় অক্ষত মিম্বরও আবিষ্কৃত হয়েছে। যেটিকে ঈদগাহ বলে মনে করা হচ্ছে। আবিষ্কারক ও ঐতিহাসিকদের ধারণা সঠিক হলে এটিই বর্তমান বাংলাদেশের আবিষ্কৃত সর্বপ্রাচীন ঈদগাহ, যাতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়।
এ বিষয়ে ’৬৯ হিজরি সনের মসজিদ ও বাংলাদেশে ইসলাম’ গ্রন্থের লেখক লিখেছেন, মসজিদের পূর্বপাশ ঘেঁষে ইট বিছানো একটি পাকা মাঠ ও মাঠের পশ্চিম পার্শ্বে মসজিদের প্রবেশপথের সামান্য দক্ষিণে দেয়াল ঘেঁষে তিন সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ মিম্বর দৃষ্টে অনুমিত হয় যে, মসজিদ সংলগ্ন পূর্ব দিকের ঐ পাকা মাঠটিতে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হতো। মাঠটি এক স্তরবিশিষ্ট ইট বিছানো, চুন ও সুরকি দিয়ে জমাট বাঁধানো। মসজিদ ও মাঠের ইটসমূহ একই পরিমাপের, একই সময় কালের নির্মিত বলে অনুমান করা যায়। মাঠটি যুগ-যুগান্তর ধরে অব্যবহৃত থাকায় ওপরে জমে থাকা ধুলোবালির স্তরে ঘাস জন্মানোর ফলে তা পাকা মাঠ হিসেবে বুঝা যায় না। বিভিন্ন সাইজের ইট দিয়ে মসজিদগৃহ ও ঈদগাহ মাঠের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

নামাজগাহ, বারবাজার
বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার বারবাজার শহর থেকে ১ কিলোমিটার পশ্চিমে বারবাজার-বেলাট গ্রামের কাঁচা রাস্তার দক্ষিণ পাশে আয়তাকার জঙ্গলাকীর্ণ অনুচ্চ একটি ঢিবি দেখা যায়। এটাই ‘নামাজগাহ’ নামে পরিচিত। এটা বেলাট-দৌলতপুর মৌজার আওতাভুক্ত। প্রাচীনকাল হতেই এখানে ঈদের নামাজ পড়া হতো বলে জানা যায়। পরবর্তীতে বিংশশতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে স্থানীয়রা এখানে নামাজ পড়তেন। কিন্তু ঐতিহাসিক গোড়ার মসজিদের উত্তর পাশে নতুন ঈদগাহ তৈরি হলে সেখানেই ঈদের নামাজ পড়া শুরু করে স্থানীয়রা।
জানা যায় এখানে একটি ইঁদারা ছিল যেটিতে আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগেও পানি দেখা যেত। অবশ্য প্রত্নতাত্তিক খননকালে ইঁদারার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অন্য দিকে নামাজগাহ-এর উত্তর পাশে ৮টি কবর আবিষ্কৃত হয়েছে। একটা কবর তুলনামূলকভাবে বেশ বড়, সেটি এক গম্ভুজ বিশিষ্ট ছিল বলে প্রতœতত্ত¡ বিভাগের কর্মীরা মনে করেন। বড় কবরটির কঙ্কাল ৮ ফুট লম্বা ছিল এবং মাথাটি স্বাভাবিকের চেয়ে বড় ছিল। খননকালে কঙ্কালটির দাঁত অক্ষত অবস্থায় ছিল। প্রত্নতাত্তিক বিভাগের কর্মীদের ধারণা উক্ত কঙ্কাল যে ব্যক্তির ছিল তিনি একজন বাস্তুত্যাগী কামিল ব্যক্তি ছিলেন, অন্য সাতটি কবরে শায়িত ব্যক্তিরা তাঁর শিষ্য ছিলেন। কবর ৮টি প্রত্নতাত্তিক বিভাগ কর্তৃক আগের আদলে বাঁধানো হয়েছে। এ ঈদগাহটি সুলতানি আমলে প্রতিষ্ঠিত বলে অনুমান করা হয়।

ধানমন্ডি ঈদগাহ, ঢাকা
বাদশাহ শাহজানের শাসনামলে (১৬২৮-১৬৫৮ খ্রি:) তৎকালীন বাংলার সুবেদার শাহজাদা সুজার সুবেদারি আমলে (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রি:) দেওয়ান মীর আবুল কাসিম ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার ধানমন্ডিতে বর্তমানে সাত মসজিদ রোডের পুবপাশে একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেন। ‘আয়তাকার বিশিষ্ট ঈদগাহটির আয়তন ২৪র্৫ী১৩র্৭ ফুট, ঈদগাহ চত্বর চতুষ্পাশের্^র ভূমি হইতে ৪ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। কিবলা দেওয়ালটি ১৫ ফুট উঁচু, পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণের বেষ্টনী প্রাচীর ছিল ৬ ফুট উঁচু। চার কোণায় চারটি অষ্টকোণা বুরুজ (পড়ৎহবৎ ঃড়বিৎ) ছিল এবং পূর্ব প্রাচীরের কেন্দ্রস্থলে একটি প্রধান ফটক ছিল। পুনঃনির্মাণের আগে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় মিহরাব ও ইহার উভয় পার্শ্বের ছয়টি মিহরাব সমেত কিবলা প্রাচীরের প্রায় ৮৬ ফুট লম্বা অংশটির অস্তিত্ব ছিল। উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব প্রাচীরের সম্পূর্ণ অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত। ১৯৯০ খ্রি: বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতাত্তিকবিভাগ কর্তৃক প্রায় পূর্বের মত করে ঈদগাহটি পুনঃনির্মিত হয়।’
‘ঈদগাহটির অলংকরণ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ‘প্রত্নতাত্তিক ঐতিহ্য’ নামক গ্রন্থে লিখেছে, ‘কেন্দ্রীয় মিহরাবের উভয়পাশের্^ আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে দুটি নকশা করা বহু-খাঁজ-বিশিষ্ট প্যানেল রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবের উভয় বাহুর দেয়াল সংলগ্ন তিন-ধাপ-বিশিষ্ট মিম্বার রয়েছে। চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ রয়েছে যার মধ্যে উত্তর-পশ্চিম কোণেরটি আদি বলে মনে হয়। প্রাচীরের ইটে প্লাস্টার এবং প্রাচীরের ওপরে মারলন নকশাকৃত, আনুভ‚মিক প্যারাপেট দেখা যায়। রাজধানী রাজমহলে পুনঃস্থাপিত করার সময়ে নির্মিত ঈদগাহটি সে সময়ে ঢাকার গুরুত্বের পরিচয় বহন করে।’
শাহি ঈদগাহ, সিলেট
মোগল স¤্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (১৬৫৮-১৭০৭ খ্রি:) মোগল ফৌজদার ফরহাদ খান (১৬৭০-১৬৮৫ খ্রি:) সিলেটের শাহি ঈদগাহটি নির্মাণ করেন। অবশ্য এখানে কোনো শিলালিপি পাওয়া না যাওয়ায় এর সঠিক নির্মাণকাল জানা যায়নি।
‘আয়তাকার একটি উঁচু টিলার ওপর ঈদগাহের মূল ভূ-খণ্ডটি অবস্থিত। ইহার চতুর্দিকে প্রাচীর বেষ্টিত। কিবলা প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে প্রধান মিহরাবটি অর্ধ গম্বুজে নির্মিত। এর উপরিভাগে ৪টি ছোট মিনার দ্বারা শোভিত। পূর্বদিকে ভূমি হতে ঈদগাহের মূল ভূ-খণ্ডে উঠবার জন্য ২০ ধাপ বিশিষ্ট প্রশস্ত সিঁড়ি আছে। সিঁড়ি পার হয়ে ঈদগাহে প্রবেশের জন্য পূর্ব প্রাচীরে ৩টি প্রবেশদ্বার আছে। প্রতিটি প্রবেশদ্বারের উভয় পাশে ১টি করে কারুকার্যময় মিনার আছে। ঈদগাহের মূল ভূ-খণ্ডের পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বিশাল সমতল চত্বর আছে। সমগ্র ঈদগাহ চত্বরটি প্রাচীর বেষ্টিত এবং চত্বরে প্রবেশের জন্য চতুর্দিকে ছোট বড় ১০টি প্রবেশদ্বার আছে। সীমানা প্রাচীরের চতুর্দিকে বৃক্ষরাজি দ্বারা সুশোভিত। চত্বরের পূর্বদিকে সীমানা প্রাচীর সংলগ্ন মুসল্লিদের ওযু করবার জন্য একটি পুকুর আছে। ঈদগাহে একসাথে প্রায় দেড় লক্ষ মুসল্লি নামায আদায় করতে পারেন।’
উল্লেখ্য যে, ১৭৮২ খ্রি: আশুরার দিনে এ ঈদগাহের কাছে ইংরেজদের সাথে বাঙালিদের একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাতে সৈয়দ হাদা মিয়া, সৈয়দ মাদা মিয়া ও তাঁদের আর এক ভাইসহ বেশ কয়েকজন শহীদ হন।
এ হত্যাকাণ্ড যার হাতে ঘটেছিল তৎকালীন সিলেটের সেই ডেপুটি কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসে অভ্যুত্থানের বিষয়ে নিজে লিখেছেন, ‘তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক মাওলানা পীরজাদা। তাকে বেশ খানদানিই মনে হলো। তার আচরণ ছিল অস্থির। আমি পুরোপুরি শান্ত। বললাম, এলাকার প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে আমি এসেছি। শুনেছি এইমাত্র শহরে দাঙ্গা হয়েছে। আমি কাল ঘটনা তদন্ত করবো। এবং ন্যায়বিচার করা হবে। এখন আমি চাই তারা অস্ত্র সংবরণ করে শান্তভাবে ফিরে যাক। কিন্তু কথা শেষ না হতেই তিনি খাপ থেকে তলোয়ার বের করে সজোরে চিৎকার করে বললেন, আজ মারবার অথবা মরবার দিন। ইংরেজ রাজত্ব এই খতম হয়ে এলো। This is the day to kill or to die, the reign of the English is at an end. বলতে বলতে আমার মাথা লক্ষ্য করে প্রচণ্ড আঘাত করলেন। ভাগ্য ভালো যে আমি তা প্রতিহত করতে সক্ষম হলাম। কিন্তু আঘাত ছিল এমন প্রচণ্ড যে, আমার তলোয়ার ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গেল। হাতলের ছোট অংশটি কেবল আমার হাতে রইল। কৃষ্ণাঙ্গ ভৃত্য সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতে পিস্তল ছুড়ে দিল। তৎক্ষণাৎ গুলি ছুড়লাম। পীরজাদা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। আমরা এত কাছাকাছি ছিলাম যে তার কাপড়ে আগুন ধরে গেল।
স্বল্প সময়ের মধ্যে কী ঘটে গেছে তা বুঝবার চেষ্টা করলাম। সেই পীরজাদা এবং তার দুই ভাই মারা গেছেন। লাশ পড়ে আছে মাটিতে। বেশ কয়েকজন হয়েছেন আহত। আমার পক্ষের একটি সিপাই নিহত এবং ছয়জন আহত। ভাগ্য ভালো যে সিপাইরা পালায়নি। তারা রণেভঙ্গ দিলে সেদিন সিলেটে একজন ইংরেজও প্রাণে বাঁচতো না।’
২০১৬ সনে এ ঈদগাহের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি ২২০ ফুট দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চ মিনার সংযোজন করা হয়েছে, যা পথচারী ও নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

শোলাকিয়া ঈদগাহ, কিশোরগঞ্জ
১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদীর তীরে অলিয়ে কামিল সৈয়দ শাহ আহমদ (র) এ ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠা করেন। কিশোরগঞ্জের সাহেব বাড়িতে ১৮২৭ খ্রি: শাহ আহমদ প্রথমে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি হয়বতনগর ও জঙ্গল বাড়িতে মুসলমান জমিদারদের সহযোগিতায় ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮২৮ খ্রি: ঈদুল ফিতরের নামায তাঁরই ইমামতিতে প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় এ ঈদের জামায়াতটি জনসমাগমের দিক থেকে উপমহাদেশের প্রধান জামায়াতের মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
কথিত আছে শাহ আহমদ প্রথম জামায়াত শেষে মুনাজাতে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! এই ঈদগাহ মাঠে যেন ভবিষ্যতে সোয়া লাখ মুসল্লির সমাগম হয়।’ পরবর্তীতে সোয়া লাখ শব্দটি বিকৃত হয়ে স্থানের নামই শোলাকিয়া ঈদগাহ নামকরণ হয়েছে। এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ব কোষে লেখা হয়েছে, ‘বিভিন্ন সময়ে ময়দানটির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ হইয়াছে। মাঠের পশ্চিমাংশের জায়গা হয়বতনগর জমিদারগণ কর্তৃক প্রদত্ত। ঢাকা উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় মাঠের চতুর্দিকে অনুচ্চ প্রাচীর নির্মিত হইয়াছে। পশ্চিম দিকের মিম্বরটি একটি গম্বুজের নিচে অবস্থিত। ঈদগাহ ময়দানের প্রাচীর ঘেরা অংশের মধ্যে ২৬৫টি কাতারে ১,৩২,৫০০ জন মুসল্লি নামায আদায় করিতে পারেন। ইহা ছাড়া পার্শ্ববর্তী খালি জায়গাসমূহ লইয়া একত্রে প্রায় দুই লক্ষাধিক মুসল্লি এই মাঠে ঈদের নামায আদায় করিয়া থাকেন। অধিক নেকি লাভের আশায় এবং একটি বিশেষ বিশ্বাসের কারণে এলাকার অধিকাংশ পার্শ্ববর্তী জিলাসমূহ ও দূর-দূরান্ত হইতে মুসল্লিগণ এইখানে ঈদের নামাযে শরিক হইবার জন্য সমবেত হন।’ প্রতি বছর এ ঈদগাহ ময়দানে মুসল্লির সংখ্যা বাড়ছে। ঈদগাহটি বর্তমানে সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি কাড়তে বিশেষভাবে সক্ষম হয়েছে।
এ ঈদগাহ সম্বন্ধে প্রত্নতাত্তিক ঐতিহ্য গ্রন্থে লেখা হয়েছে, ‘ঈদের জামায়াতের বিচারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ-বিশিষ্ট ঈদগাহ অবস্থিত কিশোরগঞ্জ শহরের শোলাকিয়ায়। শহরের পূর্বপাশে নরসুন্দা নদের উত্তর তীরে ঈদগাহ অবস্থিত। স্থাপত্যিক যে বৈশিষ্ট্য এতে দেখা যায় তা সম্পূর্ণ আধুনিক। মূল ঈদগাহ ময়দানটি ইট-নির্মিত দেয়াল দ্বারা আবৃত। পশ্চিমে একটি পাকা মসজিদ রয়েছে যা ঈদগাহ মসজিদ নামে পরিচিত।
বস্তুগত নিদর্শন পাওয়া না গেলেও ঈদগাহের ইতিহাস সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, মসনদ-ই-আলা ঈসা খাঁর উত্তরসূরি দেওয়ান হয়বত খান কর্তৃক ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠিত হয়।’

নগরঘাটা ঈদগাহ, সাতক্ষীরা
নগরঘাটা ঈদগাহ বৃহত্তর খুলনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমার (বর্তমানে জেলা) তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার পাঁচপাড়া ও নগরঘাটা গ্রামের সীমানায় নির্জন মাঠে অবস্থিত। অবস্থানগতভাবে এটি সাতক্ষীরা-খুলনা সড়কের ত্রিশ মাইল মোড় থেকে সরসকাটিগামী রাস্তার সাড়ে ৩ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। সাতক্ষীরা জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যমূলক গ্রন্থ ‘ব্যাঘ্রতট পরিক্রমণ’ এ ঈদগাহ সম্বন্ধে ঈদগাহটির প্রদত্ত ছবির নিচে শুধু এতটুকু লেখা আছে, ‘নগরঘাটা মসজিদের ভিত্তি ও একটি দেয়াল। বর্তমানে ঈদগাহ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।’
খোঁজ খবর নিয়ে যতদূর জানা যায় তা হলো এটা একটি ঈদগাহ, মসজিদ নয়। তবে ঈদগাহটি কত সনে কে নির্মাণ করেছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। এ ঈদগাহ সম্বন্ধে এলাকায় প্রচলিত প্রবল জনশ্রুতি হলো লস্কর উপাধিধারী একদল ইসলাম প্রচারক উত্তরাঞ্চল থেকে ইসলাম প্রচার করার মানসে এ এলাকায় আসেন। তাঁরা ইসলাম প্রচারের সাথে সাথে এ এলাকায় মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন। যেমন আলীপুরের মসজিদ, নগরঘাটা ঈদগাহ ও লস্কর দীঘি প্রভৃতি। এগুলোর নির্মাণ ও খননকাল প্রায় ৪০০ বছর আগে।
এ ঈদগাহর প্রতিষ্ঠাতা হলেন স্বরূপ লস্কর। তাঁরা ছিলেন দুই ভাই স্বরূপ ও চেতন লস্কর। তাঁদের পিতার নাম ছিল ইসহাক লস্কর। ইসহাক লস্করের পিতা স¤্রাট আকবরের আমলে আফগানিস্তান থেকে এখানে আসেন ব্যবসায়িক ও ইসলাম প্রচারের মানসে। অর্থাৎ এগুলো মোগল আমলে নির্মিত বলেই সকলের ধারণা।
অবশ্য এ ঈদগাহটি সম্বন্ধে এলাকায় অন্য একটি জনশ্রুতিও প্রচলিত আছে যে, কোন এক রাতের শেষে অলৌকিকভাবে উক্ত ঈদগাহ ও একটি বটগাছের অবস্থান এলাকাবাসী দেখতে পান, যা আগে ছিল না। আরও কথিত আছে, ঐ একইভাবে অর্থাৎ এক রাত্রিতে সাত একর (একুশ বিঘা) জলাকার লস্কর দীঘিটিও খনন করা হয়। যে কারণে ঈদগাহটিতে বর্তমানেও প্রতি শুক্রবার পুণ্যার্থীরা একত্রিত হন। পুণ্যার্থীরা এখানে আসে মনোবাসনা পূর্ণ করার ইচ্ছাতে, রোগমুক্তি ও বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকার মানসে। সে কারণে তারা এখানে এসে ছাগল, মুরগি, হাঁস ইত্যাদি জবাই করে রান্নাবান্না করে উপস্থিত লোকজনদের খাওয়ায়।
নগরঘাটা ঈদগাহটি একটি বর্গক্ষেত্র যা সমতল ভ‚মি থেকে ৩ ফুট উঁচু করে নির্মিত। বর্তমানে এর চারপাশ ভরাট করা হয়েছে। ঈদগাহর পশ্চিম দেয়াল অর্থাৎ মেহরাবের দেয়ালটি প্রায় ৩০ ফুট উঁচু। সমতল ভ‚মি থেকে ঈদগাহ দেয়াল প্রথমে ৩ ফুট উঁচু চত্বর, এরপর ১৪ ফুট উঁচু একটি স্তর, যে স্তরে রয়েছে ৭টি বহুপত্র খিলানযুক্ত শৈল্পিক মেহরাব, এরপরের স্তর ৭ ফুট উঁচু যার মধ্যে সামনের দিকে ১৫টি ও পেছন দিকে ১৮টি মেহরাবের নকশা রয়েছে। মেহরাব ৭টির দু’পাশের শুরুতে ইট কেটে নকশা করা হয়েছে। তবে মেহরাবের ওপরের নকশা নিচের নকশা থেকে অনেক নান্দনিক। ঈদগাহ দেয়ালটির পুরুত্ব (চওড়া) তিন ফুট আড়াই ইঞ্চি এবং কেন্দ্রীয় মেহরাবের গভীরতা তৈরির জন্য ঈদগা দেয়ালের পেছন দিকে ১ ফুট বাড়ানো হয়েছে, যা ঈদগাহ দেয়ালের চ‚ড়া পর্যন্ত বিস্তৃত। তার ওপরের স্তরে ৬ ফুট মতো উঁচু যা কেন্দ্রীয় মেহরাব বরাবর চূড়ায় গিয়ে শেষ হয়েছে। চ‚ড়াতে গিয়ে গম্বুজাকৃতির নকশা রয়েছে। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পুরো দেয়ালের দু’ দিক থেকে পর্যায়ক্রমে চ‚ড়ার দিকে উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। এ স্তরের শুরুতে দু’টি বড় বড় দৃষ্টিনন্দন ফাঁকা জায়গা বা ছিদ্র রাখা হয়েছে।
ঈদগাহ দেয়ালে নির্মিত কেন্দ্রীয় মেহরাবটি অর্ধবৃত্তাকারে তৈরি। কেন্দ্রীয় মেহরাবের উভয় পাশে যে ৩টি করে মেহরাব রয়েছে সেগুলি চওড়ায় ও উচ্চতায় কেন্দ্রীয় মেহরাবের মাপের হলেও গভীরতায় মাত্র ১ ফুট এবং এগুলি অর্ধবৃত্তাকার নয় বরং সমান করে তৈরি।
ঈদগাহ দেয়ালের ওপরে রয়েছে অনুচ্চ মোট ১১টি পিলার বা থাম, যার মাথায় কলস বসানো ছিল (বর্তমানে নেই) অর্থাৎ কলস চ‚ড়া মিনার ছিল। ঈদগাহ চত্বরে ওঠার জন্য ২টি সিঁড়ি ছিল, যার উপরিভাগ এখনও দেখা যায়। ২০১১ সালে পুরুষদের জায়গার সঙ্কুলান না হওয়ায় এর (ঈদগাহর) ঠিক পশ্চিম দিকে নতুন করে।
স্থানীয়রা অনেকটাই হুবহু আগের আদলে পুরাতন ঈদগাহ থেকে ৫০ ফুট মতো পশ্চিমে পাকা রাস্তা সংলগ্ন একটি ঈদগাহ দেয়াল নির্মাণ করেছেন। এ ঈদগাহ দেয়াল নির্মাণের সময় পুরো জায়গায় মাটি ফেলে আগের ঈদগাহ চত্বরের সমান্তরাল করতে গিয়ে পুরাতন সিঁড়ি ঢাকা পড়েছে, তবে সিঁড়ির ওপরের অংশ এখনো দৃষ্টিগোচর হয়। পূর্বের সিঁড়িটি চন্দ্রাকৃতির বাঁকানো ছিলÑএটির দৈর্ঘ্য ৭ ফুট ৬ ইঞ্চি। তবে এটি কয় ধাপ বিশিষ্ট ছিল তা জানা যায়নি।
বর্তমানে নতুন করে একই ইমামের ইমামতিতে নতুন ঈদগাহে আহলে হাদীস মতাবলম্বী পুরুষেরা এবং পুরাতন ঈদগাহে নারী মুসল্লিরা ঈদের নামায আদায় করে থাকেন।

মাকারুল্লাহ ঈদগাহ, বাগেরহাট
বাগেরহাট জেলার ফকির হাট উপজেলার পিলজঙ্গ ইউনিয়নের বিলজঙ্গা মৌজায় এ ঈদগাহটির অবস্থান।
এ ঈদগাহ স্থলে যেতে হলে খুলনা বাগেরহাট সড়কের কাটালতলা বাসস্ট্যান্ডে নেমে একটি আধা-পাকা সড়ক ধরে যেতে হয়। এখানে একটি অজিফা ঘর যাকে ‘মাকারুল্লাহ অজিফাখানা বলে, একটি প্রাচীন মসজিদ যার নাম ‘মাকারুল্লাহ মসজিদ’, একটি জোড়াশিব মন্দির ও একটি প্রাচীন ঈদগাহ যেটি ‘মাকারুল্লাহ ঈদগাহ’ নামে পরিচিতি রয়েছে।
‘অজিফা ঘরের অদূরবর্তী পশ্চিম দিকে ঈদগাহ’-এর অবস্থান। এটি উত্তর-দক্ষিণ লম্বা একটি দেয়াল। দু’ প্রান্তের দু’টি চৌকো অংশের প্রতিটিতে একটি করে চৌকো এবং মাঝের তিনটি চৌকো অংশের প্রতিটিতে একটি করে খিলান বিশিষ্ট মিহরাব রয়েছে।
খিলানগুলো আধাগোলাকার। দেয়ালের ওপর এক সারি অনুগম্বুজ বসানো আছে। এদের সংখ্যা তেরো। তবে একটি অংশ বিলীন হয়ে গেছে। দেয়ালজুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে মূল পলেস্তারার চিহ্ন বিদ্যমান। নির্মাণসামগ্রী ও স্থাপত্যিক ধরন অনুযায়ী এটি অজিফা ঘরের সমকালীন নিদর্শন।’
স্থাপত্যিক নিদর্শন অনুযায়ী এটি খ্রিষ্টীয় পনেরো-ষোলো শতাব্দীর নির্মিত বলে অনুমিত হয়। উল্লেখ্য যে হযরত মাকরুল্লাহ (র) একজন ইসলাম প্রচারক ছিলেন।

SHARE

Leave a Reply