Home প্রবন্ধ ঈদের মজায় ফুলেল হাসি -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

ঈদের মজায় ফুলেল হাসি -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

“নাবিল স্কুলপড়ুয়া কিশোর। দশম শ্রেণিতে পড়ে। নার্সারি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-ছাত্রী ওদের স্কুলে। সবার চোখে মুখে ঈদের আনন্দ। প্রাণের বন্যা বইছে সবার মাঝে। শিহরন জেগেছে মনের বাগানে। কে কী কিনছে, কার জামার রঙ কেমন, কার বাবা কোন মার্কেটে শপিং করেছে, কার মামা-চাচ্চু কী কী গিফট নিয়ে আসছেন, নানা খোশগল্প। রাতুলটা একটু মনমরা। চুপচাপ বসে আছে। মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে থাকে। সে কিন্তু চঞ্চল! দুষ্টুমিতেও সেরা। অথচ কয়দিন থেকে খুব ঝিমিয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন? নাবিলকে ভাবিয়ে তোলে বিষয়টি। টিফিন সময়ে ওকে নিয়ে মাঠের এক কোণায় গিয়ে বসে। বাদাম খায়। গল্প করে। মন খুলে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করে। রাতুল খুলে বলে তার কষ্টের সব কথা।
বাবা অসুস্থ। ছোট্ট একটা দোকানের আয় দিয়ে সংসার চলে। কিছুদিন থেকে সে আয়টাও ঠিক মতো হচ্ছে না। টাকার সঙ্কটে বাবার চিকিৎসাও অনেকটা বন্ধ। মেজো চাচ্চু স্কুল টিচার। বেতন হয়নি এখনো। টিউশনি করেই চলে। তিনিই ঈদের সময় নতুন কাপড় কিনে দেন। এবার ছোট চাচ্চু ভার্সিটিতে ভর্তি হলো। তার খরচ দিতে গিয়ে মেজো চাচ্চুর হাত একবারেই ফাঁকা। এর মধ্যে চাচী আম্মু অসুস্থ। ঈদের কোন কেনাকাটা নেই আমাদের। আমার ছোটো বোনটা খুব মন খারাপ করে আছে। কী যে করবো বুঝতে পারছি না।”
সমাজের একটি কমন চিত্রগল্প এটা। এর চেয়েও কষ্টকর ইতিহাস আছে অনেক পরিবারের। অথচ অনেকেই প্রচুর টাকা খরচ করেন শুধু বিলাসিতায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করেন নিজের আভিজাত্য প্রকাশের জন্য। মূলত ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যায় চাঁদ দেখার সাথে সাথেই। শিশুরা রোজার শেষ দশকেই ঈদের প্রহর গুনতে থাকে। চাঁদ দেখার সাথে সাথে তাদের সে কী আনন্দ! দলবেঁধে তারা বাড়ির উঠানে, ছাদে অথবা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। ছোট্ট শিশুরা প্যাকেট খুলে তাদের নতুন জামা-কাপড় বারবার দেখে এবং ভাঁজ করে লুকিয়ে রাখে। তাদের অনেকের ধারণা, নতুন জামা কেউ দেখে ফেললে জামা নতুন থাকবে না, ঈদ পুরনো হয়ে যাবে। দুষ্টু কেউ যদি একবার বলে তোমার জামা দেখেছি। অমনি তারা কান্নায় ভেঙে পড়ে। বড়রা বুঝিয়ে শান্ত করেন। এই হাসি-কান্না আর আবেগ উচ্ছ¡াসের মধ্যে শিশুরা সূর্যোদয়ের প্রত্যাশায় ঘুমিয়ে পড়ে। ঈদের সকালে তাদের ঘুম থেকে ওঠাতে মোটেই কষ্ট হয় না। এক ডাকেই তারা উঠে বসে এবং ঈদের প্রস্তুতিতে নেমে পড়ে।
ঈদে শিশুরা রঙবেরঙের নতুন পোশাক পরে সেজেগুজে ঈদগাহে যায়। পাড়া-মহল্লায় ঘুরে বেড়ায়। আত্মীয়-স্বজনকে সালাম করে। সেলামি পায়। সে কী আনন্দ! শিশুদের চোখগুলো চিকচিক করে ওঠে। শিশুদের এ আনন্দ দেখাও এক ধরনের ঈদ। মনে হবে যেন বেহেশতের মেহমানরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবার কখনও মনে হবে একঝাঁক রাজকুমার ও রাজকন্যা দলবেঁধে ছুটছে। ঈদে ধনী গরিব সব সমান। নেই কোনো বিভেদ। এভাবে আনন্দ সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়াই ঈদের লক্ষ্য।
অথচ এ আনন্দে আমাদের সমাজের রাতুলদের মতো শিশুরা সমানভাবে অংশ নিতে পারছে না। সমাজে রাতুলরা ছাড়াও বহু এতিম শিশু রয়েছে তাদের কোন নতুন পোশাক নেই। তাদের ঘরে ফিরনি পায়েস তো দূরের কথা একটু খাবারের ব্যবস্থাও নেই। আনন্দের এইক্ষণে এ সব সুবিধাবঞ্চিত শিশু এবং অসুস্থ-দরিদ্র পিতার মনের বেদনা ও দীর্ঘশ্বাস আসমানকেও অন্ধকারে ছেয়ে ফেলে। আনন্দের এই শুভক্ষণে সকলের আনন্দ নিয়েই ভাবতে হবে আমাদের সবার। ইসলাম এ ধরনের দৃশ্যের সমাধানে চমৎকার সমাধান দিয়েছে। ইসলাম সচ্ছল ব্যক্তিদের ওপর পরিবারের সব সদস্যের ‘ফিতরা’ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। আর তা ঈদের নামাজের পূর্বেই গরিবদের দিতে বলেছে, যাতে তারা এবং তাদের সন্তানরা ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। দারিদ্র্য বিমোচন এবং গরিবদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ইসলাম ধনীদের ওপর জাকাত ফরজ করেছে। জাকাত যথার্থভাবে আদায় হলে আয়ের বৈষম্য কমে যাবে এবং সে অর্থ দিয়ে গরিবরা তাদের সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। ধনী ও গরিবের পার্থক্য কমিয়ে সামাজিক ভেদাভেদ হ্রাস করাই জাকাতের উদ্দেশ্য। সমাজ থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে সাম্যের পথে নিয়ে আসা। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা। প্রতিটি শিশুর ঈদ আনন্দ নিশ্চিত করা। সামাজিক এ ধরনের কার্যক্রমে জাকাতভিত্তিক সামাজিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা খুব দরকার। এ ক্ষেত্রে তারুণ্যময় প্রতিভাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
রমজান শেষে আসে ঈদ। ঈদ তো একা একা নয়। ঈদের সত্যিকার আনন্দ পেতে হলে তা সবাইকে সাথে নিতে হবে। রমজান শব্দের মূল ধাতুগত অর্থ ‘জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেওয়া’। রমজান মানুষের কু-প্রবৃত্তিকে ধ্বংস করে দেয়, মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে, তাকে পূর্ণ মানুষে পরিণত করে। ফলে সে মানুষটি অন্যের প্রতি দয়াবান হয়। নিজের ভোগের চেয়ে অন্য মানুষের মুখে হাসি ফুটাতেই বেশি তৃপ্তি পায়। নিজের উপার্জিত অর্থ গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে আনন্দ পায়।
“রাতুলের সাথে কথা বলে মনের বাগানে অন্যরকম ফুল ফুটায় নাবিল। মনে পড়ে গেলো তাদের বাসার কাজের বুয়ার কথা। বুয়াকে ওরা খালা বলে ডাকে। বাবা মা ওদের এভাবেই শিখিয়েছেন। গরিব মানুষ বলে তাদের ছোটো করে দেখতে নেই। খালার তিনটে সন্তান। সামান্য আয়ে খুব কষ্টে চলে সংসার। ঈদে নতুন কিছু কেনার সামর্থ্য নেই তাদের। শাহীনের কথাও মনে পড়লো ওর। বাবার সাথে কাজ করে বলে নিয়মিত স্কুলেই আসতে পারে না। অথচ বেশ মেধাবী ছাত্র সে।
কষ্টের মাঝেও আলো খুঁজে বের করে নাবিল। বন্ধু রিয়াদের বাবা বেশ বড়লোক। বেশ কয়েকটা বাড়ি ওদের। ব্যবসাও অনেক বড়। রিয়াদ বেশ ভালো বন্ধু। বড়লোকের সন্তান হলেও কোন অহংকার নেই। বাজে কোনো অভ্যাসও নেই ওর। শামীমকেও চিন্তা করা যায়। ওর বাবা আমার আব্বুর কলিগ। বেশ ভালো ছেলে।
টিফিন শেষ না হতেই একসাথে মিলিত হলো ওরা। কিছু কথা শেয়ার করলো। বললো, ছুটির পরে আবারো একটু বসবো। যেমন কথা তেমন কাজ। অল্প সময়েই দারুণ সিদ্ধান্ত। আরো কয়েকজন বন্ধুর তালিকা করলো। বন্ধুরা মিলে টাকা সংগ্রহ করবে। বাবাকে বলবে। চাচ্চুকে বলবে। মামাকে বলবে। তাছাড়া নিজের ঈদ খরচ থেকেও কিছু টাকা বাঁচাবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। জমাকৃত টাকা দিয়ে রাতুলদের মতো সবাইকে নিয়ে হাসিমুখে ঈদ করবে। সবার মুখে তৃপ্তির হাসি। বিকেলের সূর্যটাও ওদের সাথে হেসে উঠলো।”
গল্পটা নিছক গল্প নয়। সমাজের একজন তরুণ, একজন ছাত্র কিংবা সাধারণ নাগরিক হিসেবে নাবিলের মতো চিন্তা করা খুব বেশি প্রয়োজন। ইচ্ছে করলেই রাষ্ট্রীয় সাহায্যের বাইরে আমরা নিজেরাও কিছু করতে পারি। গরিব-দুঃখীদের মুখে এক টুকরো হাসি ছড়িয়ে দিতে পারি সামান্য ত্যাগের বিনিময়ে। এ ক্ষেত্রে রোজার সময় স্কুলবন্ধুদের সাথে কিংবা বাসা-বাড়ির ইফতার আয়োজনে ওদের শরিক করতে পারি। দাওয়াত দিয়ে পেটভর্তি করে খাওয়াতে পারি। এমনকি দুস্থ রোজাদারদের বাড়িতে ফল ও ইফতার দিয়ে আসতে পারি। যে ফলটা আমরা প্রতিদিন খাই, সেটি অন্য আরেকজন শিশু, তরুণ কিংবা বৃদ্ধের কাছে স্বপ্নের মতো; ভীষণ আনন্দের।
ঈদে আমরা যখন শপিং করি তখন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথাটিও মাথায় রাখবো। ওদের জন্য কিছু ঈদ উপহার কিনতে পারি। বিশেষ করে ওদের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য ঈদের নতুন জামা-কাপড় উপহার হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। কিছু মেহেদি কিনে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মেয়ে-শিশুদের মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে পারি। মহামারী দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় কিংবা যে কোন অসুস্থ বৃদ্ধ-শিশুদের জন্য চিকিৎসা খরচের জন্য কিছু টাকাও সংগ্রহ করে দিতে পারি।
রোজার সময় অনেকেই জাকাতের কাপড় বিলি করে থাকি। এটি বেশ ভালো কাজ। ‘এখানে জাকাতের কাপড় পাওয়া যায়’ এমন দোকান থেকে কাপড় কিনে নামমাত্র নি¤œমানের কাপড় চোপড় দিয়ে প্রতারণা করা ঠিক নয়। যে কাপড় দেওয়া হবে তা যেনো মানসম্মত হয়। মন খুশি হয়ে ওঠে। শিশুদের জন্য পোশাক নির্বাচনেও তাদের পছন্দ এবং আরামের দিকে খেয়াল রাখা উচিত। বাতাস চলাচল করতে পারে এমন ভালো সুতি পোশাক বেছে নেওয়া যেতে পারে। এখন গরমকাল। হালকা রংয়ের পোশাকে গরম কম, একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আভাস থাকে। হালকার মাঝে সাদা, চাপা সাদা, হালকা আকাশি কিংবা গোলাপি, হালকা সবুজ, ধূসর, বাদামি, হালকা লাল, হলুদ ও নীলের হালকা শেডগুলোকে পছন্দের তালিকায় রাখা যেতে পারে। প্রিন্টের কাপড়ের ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য ছোট বা মাঝারি প্রিন্টের পোশাক বেশি মানানসই। সুতির পাশাপাশি ভয়েল, সুইস ভয়েল, আদ্দি, ভিসকস, মিক্সড ভয়েল, বেক্সি ভয়েলসহ নানারকম সুতি কাপড়ে তৈরি পোশাকগুলো পছন্দ করা যেতে পারে। যে পোশাকই দেই না কেনো তা যেন ঈদকে আনন্দময় করে তোলে।
ঈদ আসছে। ঈদ মানেই মজা। ঈদ মানেই খুশি। ঈদ মানেই ভালোবাসা। ঈদ মানেই কষ্ট ভাগাভাগি। আনন্দ বিলানো। নতুন পোশাক। আতর-সুগন্ধি। হ্যান্ডশেক, কোলাকুলি। আনন্দ হাসিই তো ঈদ। ঈদের সময় মন বেজার করে গোমড়া মুখে বসে থাকা ভালো নয়। কতই না সুন্দর ইসলামের বিধান। এই আনন্দে সবচেয়ে বেশি মেতে ওঠে শিশু-কিশোর। নামাজ শেষে আমি ছোট্ট কারো জন্য যখন খেলার সামগ্রী কিনে দেই, তখন সেখানে কয়েকটি অনাথ শিশু হয়তো খেলার সামগ্রী নাড়াচড়া করছে; কিন্তু কিনতে পারছে না। ইচ্ছে করলে অতি অল্প পয়সায় তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারি। এভাবে আমরা যদি পাড়া প্রতিবেশীর প্রতি যতœবান হই তবে সবার ঘরে আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে। শিশুদের জন্যই তো ঈদ। ওদের হাসিতেই ঈদের চাঁদ হাসে। ওদের হাসিতেই হেসে ওঠে পৃথিবী। হেসে ওঠে ফুল। হেসে ওঠেন স্বয়ং আল্লাহ এবং তার রাসূল (সা.)।

SHARE

Leave a Reply